নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 8 পশ্চিমবঙ্গ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5

অধ্যায় ৮: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৫)

১. পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বিবরণ দাও।

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর প্রান্তে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরাংশ নিয়ে এই পার্বত্য অঞ্চল গঠিত। তিস্তা নদী এই অঞ্চলকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে:

ক) তিস্তার পশ্চিম দিকের পার্বত্য অঞ্চল:

  • এই অংশটি তুলনামূলকভাবে বেশি উঁচু।
  • এখানে দুটি প্রধান পর্বতশ্রেণি দেখা যায়—সিঙ্গলিলা শৈলশিরা এবং দার্জিলিং শৈলশিরা
  • সিঙ্গলিলা শৈলশিরায় পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফু (৩৬৩৬ মি) এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ফালুট (৩৫৯৫ মি) অবস্থিত।
  • দার্জিলিং শৈলশিরার প্রধান শৃঙ্গ হলো টাইগার হিল (২৫৯০ মি)।

খ) তিস্তার পূর্ব দিকের পার্বত্য অঞ্চল:

  • এই অংশের উচ্চতা পশ্চিমের তুলনায় কম।
  • এখানে দুরবিনদারাচোল পর্বতশ্রেণি দেখা যায়।
  • কালিম্পং-এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো ঋষিলা (৩১৩০ মি)
  • জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের জয়ন্তী ও বক্সা পাহাড় এই অংশের অন্তর্গত। বিখ্যাত বক্সা গিরিখাত এখানেই অবস্থিত।

২. পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির বর্ণনা দাও।

বিস্তারিত উত্তর

সমগ্র পুরুলিয়া জেলা এবং বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান ও পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ নিয়ে এই মালভূমি অঞ্চল গঠিত। এটি ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ।

ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য:

  • শিলা গঠন: এই অঞ্চলটি প্রাচীন আগ্নেয় (গ্রানাইট) ও রূপান্তরিত (নিস) শিলা দ্বারা গঠিত।
  • ভূমরূপ: দীর্ঘদিনের ক্ষয়কার্যের ফলে এটি বর্তমানে একটি ক্ষয়জাত মালভূমি বা সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাটি লাল ও কাঁকরময় (ল্যাটেরাইট)।
  • পাহাড় ও টিলা: মালভূমির ওপর মাঝে মাঝে কঠিন শিলা টিলার আকারে দাঁড়িয়ে থাকে, স্থানীয় ভাষায় একে ‘ডুংরি’ বলে।
  • উল্লেখযোগ্য পাহাড়: অযোধ্যা (সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গোর্গাবুরু – ৬৭৭ মি), বাঘমুন্ডি, পাঞ্চেত (পুরুলিয়া); বিহারীনাথ, সুশুনিয়া (বাঁকুড়া); মামা-ভাগ্নে (বীরভূম)।

৩. উত্তরবঙ্গের নদনদী ও দক্ষিণবঙ্গের (মালভূমি) নদনদীর মধ্যে পার্থক্য লেখো।

বিস্তারিত উত্তর
বিষয় উত্তরবঙ্গের নদনদী দক্ষিণবঙ্গের (মালভূমি) নদনদী
১. উৎস হিমালয় পর্বত ও বিভিন্ন হিমবাহ থেকে উৎপন্ন। ছোটনাগপুর মালভূমি বা স্থানীয় পাহাড় থেকে উৎপন্ন।
২. জলের উৎস বরফগলা ও বৃষ্টির জলে পুষ্ট। শুধুমাত্র বৃষ্টির জলে পুষ্ট।
৩. প্রবাহ সারা বছর জল থাকে (নিত্যবহ)। গ্রীষ্মকালে প্রায় শুকিয়ে যায় (অনিত্যবহ)।
৪. প্রকৃতি খুব খরস্রোতা, পাহাড়ি পথে গভীর গিরিখাত সৃষ্টি করে। কম স্রোতযুক্ত, তবে বর্ষায় হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা হয়।
৫. উদাহরণ তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা। দামোদর, অজয়, মৈরাক্ষী, কংসাবতী।

৪. পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু ‘ক্রান্তীয় মৌসুমি’ প্রকৃতির। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • ঋতু বৈচিত্র্য: এখানে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত—এই চারটি প্রধান ঋতু চক্রাকারে আবর্তিত হয়।
  • মৌসুমি বায়ুর প্রভাব: রাজ্যের জলবায়ু মূলত মৌসুমি বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৯০% বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঘটে।
  • উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল: গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩৫°C – ৪০°C থাকে এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ঘাম হয়। মালভূমি অঞ্চলে ‘লু’ বয়।
  • বৃষ্টিপাতের অসম বন্টন: উত্তরবঙ্গ ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও মালভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত খুব কম হয়, ফলে খরা দেখা দেয়।
  • স্থানীয় ঝড়: গ্রীষ্মকালে ‘কালবৈশাখী’ এবং শরৎকালে ‘আশ্বিনের ঝড়’ দেখা যায়।

৫. পশ্চিমবঙ্গে ধান চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গ ধান উৎপাদনে ভারতের প্রথম। এর অনুকূল পরিবেশগুলি হলো:

প্রাকৃতিক পরিবেশ:

  • জলবায়ু: ধান ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর ফসল। গড়ে ২০°-৩০° সে. উষ্ণতা এবং ১৫০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
  • মৃত্তিকা: নদী অববাহিকার উর্বর পলিমাটি ও এঁটেল মাটি ধান চাষের পক্ষে আদর্শ।
  • ভূমি: জল দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এমন সমতল ভূমি প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক পরিবেশ:

  • শ্রমিক: চারা রোপণ, ফসল কাটার জন্য প্রচুর সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজন, যা পশ্চিমবঙ্গে লভ্য।
  • চাহিদা: ধান বা ভাত বাঙালিদের প্রধান খাদ্য হওয়ায় এর স্থানীয় চাহিদা প্রচুর।

৬. দার্জিলিং জেলায় চা চাষের উন্নতির কারণগুলি লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

দার্জিলিং চা স্বাদে ও গন্ধে বিশ্ববিখ্যাত। এর উন্নতির কারণ:

  • ঢালু জমি: চা গাছের গোড়ায় জল জমলে গাছ পচে যায়। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি ঢালু জমি জল নিকাশির জন্য আদর্শ।
  • জলবায়ু: এখানকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, প্রচুর বৃষ্টিপাত (২০০-২৫০ সেমি), এবং সকালের কুয়াশা চায়ের সুগন্ধ বা ‘অ্যারোমা’ বাড়াতে সাহায্য করে।
  • মৃত্তিকা: লৌহ ও জৈব পদার্থ মিশ্রিত দোআঁশ মাটি চা চাষের উপযোগী।
  • ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ: চা গাছ প্রখর রোদ সহ্য করতে পারে না, তাই এখানে ওক, বার্চ প্রভৃতি ছায়াপ্রদানকারী গাছ লাগানো হয়।
  • শ্রমিক: স্থানীয় নেপালি ও লেপচা মহিলারা নিপুণ হাতে চা পাতা তুলতে পারে।

৭. হুগলি নদীর উভয় তীরে পাট শিল্প গড়ে ওঠার কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।

বিস্তারিত উত্তর

হুগলি নদীর দুই তীরে ভারতের বৃহত্তম পাট শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার কারণ:

  • কাঁচামাল: নিকটবর্তী জেলাগুলি (নদীয়া, ২৪ পরগনা, হুগলি) থেকে প্রচুর উৎকৃষ্ট মানের কাঁচা পাট পাওয়া যায়।
  • পরিবহন: গঙ্গা বা হুগলি নদীর সস্তা জলপথ এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত।
  • জলের জোগান: পাট ধোয়া, পচানো এবং কারখানার কাজের জন্য হুগলি নদী থেকে প্রচুর জল পাওয়া যায়।
  • শক্তির উৎস: রানীগঞ্জ ও আসানসোল থেকে কয়লা এবং DVC থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
  • বন্দর ও বাজার: কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে পাটজাত দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করার সুবিধা এবং কলকাতার মূলধনী বাজার এই শিল্পের প্রসারে সাহায্য করেছে।

৮. দুর্গাপুরে লৌহ-ইস্পাত শিল্প গড়ে ওঠার কারণগুলি আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

দুর্গাপুরকে ‘ভারতের রূঢ়’ বলা হয়। এখানে লৌহ-ইস্পাত শিল্প গড়ে ওঠার কারণ:

  • কয়লা: নিকটবর্তী রানীগঞ্জ ও ঝরিয়া কয়লাখনি থেকে উন্নত মানের কয়লা পাওয়া যায়।
  • আকরিক লোহা: ওড়িশার বোলানি ও ঝাড়খণ্ডের গুয়া থেকে আকরিক লোহা রেলপথে আনা হয়।
  • জল ও বিদ্যুৎ: দামোদর নদ থেকে জল এবং DVC-র দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে জলবিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
  • পরিবহন: পূর্ব রেলওয়ের মেইন লাইন এবং ২ নং জাতীয় সড়ক (GT Road) দ্বারা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
  • বন্দর: কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নৈকট্য যন্ত্রপাতি আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে সাহায্য করে।

৯. হলদিয়া পেট্রোরসায়ন শিল্পের উন্নতির কারণগুলি লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

হলদিয়া পশ্চিমবঙ্গের প্রধান পেট্রোরসায়ন শিল্পকেন্দ্র। উন্নতির কারণ:

  • বন্দরের সুবিধা: হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে বিদেশ থেকে খনিজ তেল ও ন্যাপথা (কাঁচামাল) আমদানি করার সুবিধা রয়েছে।
  • তেল শোধনাগার: এখানে অবস্থিত ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের (IOC) তেল শোধনাগার থেকে পেট্রোরসায়ন শিল্পের প্রয়োজনীয় উপজাত দ্রব্য সহজে পাওয়া যায়।
  • বিদ্যুৎ: কোলাঘাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং হলদিয়া নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
  • জমি ও জল: শিল্পের জন্য হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদ (HDA) প্রচুর জমি এবং হুগলি ও হলদি নদী থেকে জলের ব্যবস্থা করেছে।

১০. পশ্চিমবঙ্গে জনঘনত্ব অত্যধিক হওয়ার কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।

বিস্তারিত উত্তর

পশ্চিমবঙ্গের জনঘনত্ব ১০২৮ জন/বর্গকিমি, যা ভারতের মধ্যে দ্বিতীয়। এর কারণ:

  • সমতল ও উর্বর ভূমি: রাজ্যের ৯০% এলাকাই পলিগঠিত সমভূমি, যা কৃষিকাজ, বসতি স্থাপন এবং যাতায়াতের জন্য আদর্শ।
  • কৃষিকাজ: উর্বর মাটি ও প্রচুর বৃষ্টির কারণে এখানে বছরে ৩-৪ বার ফসল ফলে, যা বিশাল জনসংখ্যাকে খাদ্য যোগাতে পারে।
  • শিল্প ও নগরায়ন: কলকাতা, হাওড়া, হুগলি শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থানের টানে প্রচুর মানুষ ভিড় করেছে।
  • উদ্বাস্তু সমস্যা: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, যা জনঘনত্ব হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়েছে।


📚 অধ্যায় ৮: পশ্চিমবঙ্গ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

১. বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মোট জেলার সংখ্যা কয়টি?

বর্তমানে (২০২৪ সাল অনুযায়ী) পশ্চিমবঙ্গের মোট জেলার সংখ্যা ২৩টি। রাজ্যের নবীনতম জেলা হলো পশ্চিম বর্ধমান, যা ২০১৭ সালে বর্ধমান জেলা ভেঙে গঠিত হয়।

২. পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কোনটি এবং এর উচ্চতা কত?

পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হলো সান্দাকফু (Sandakphu)। এটি দার্জিলিং জেলার সিঙ্গলিলা পর্বতশ্রেণিতে অবস্থিত এবং এর উচ্চতা প্রায় ৩,৬৩৬ মিটার

৩. দুর্গাপুরকে ‘ভারতের রূঢ়’ বলা হয় কেন?

জার্মানির রাইন নদীর উপনদী ‘রূঢ়’ (Ruhr) অববাহিকায় যেমন কয়লা ও লৌহ-ইস্পাত শিল্পের সমাবেশ ঘটেছে, ঠিক তেমনই ভারতের দামোদর উপত্যকায় দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করে বিশাল লৌহ-ইস্পাত শিল্প গড়ে উঠেছে। এই সাদৃশ্যের কারণেই দুর্গাপুরকে ‘ভারতের রূঢ়’ বলা হয়।

৪. ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা শিলিগুড়ি করিডোর কী?

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া অঞ্চলে রাজ্যের আকৃতি অনেকটা মুরগির গলার মতো সরু (মাত্র ৯ থেকে ২২ কিমি চওড়া)। এই সংকীর্ণ অংশটিই দক্ষিণবঙ্গের সাথে উত্তরবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির সংযোগ রক্ষা করে। তাই একে ‘চিকেনস নেক’ বা মহানন্দা করিডোর বলা হয়।

৫. পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলাকে ‘ধানের ভাণ্ডার’ বলা হয়?

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান (Purba Bardhaman) জেলাকে ‘ধানের ভাণ্ডার’ (Rice Bowl of West Bengal) বলা হয়। এখানকার উর্বর পলিমাটি এবং উন্নত সেচ ব্যবস্থার কারণে প্রচুর পরিমাণে আমন, আউশ ও বোরো ধান উৎপাদিত হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার