নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 9 মানচিত্র ও স্কেল, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন: তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা (মান – ৩)

১. মানচিত্রের স্কেল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর
মানচিত্র অঙ্কনে স্কেল অপরিহার্য। এর গুরুত্বগুলি হলো:

  • দূরত্ব পরিমাপ: স্কেলের সাহায্যেই মানচিত্রের দুটি স্থানের মধ্যবর্তী দূরত্ব দেখে ভূমিতে তাদের প্রকৃত দূরত্ব নির্ণয় করা যায়।
  • আয়তন নির্ণয়: কোনো দেশ বা রাজ্যের মোট আয়তন বা ক্ষেত্রফল স্কেলের সাহায্যেই বের করা হয়।
  • বাস্তব রূপদান: বিশাল পৃথিবীকে ছোট কাগজের টুকরোয় নিখুঁতভাবে ও আনুপাতিক হারে উপস্থাপন করতে স্কেল ছাড়া কোনো উপায় নেই। স্কেলহীন মানচিত্র কেবলই একটি ছবি বা নকশা।

২. লৈখিক বা রৈখিক স্কেল ব্যবহারের সুবিধা কী?

বিস্তারিত উত্তর
লৈখিক স্কেল (Linear Scale) ব্যবহারের প্রধান সুবিধাগুলি হলো:

  • মানচিত্র ছোট-বড় করা: মানচিত্রকে যখন ফোটোগ্রাফিক পদ্ধতিতে ছোট বা বড় (Reduce or Enlarge) করা হয়, তখন মানচিত্রের আকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই স্কেলের রেখাটিও আনুপাতিক হারে ছোট বা বড় হয়ে যায়। ফলে স্কেলের মান বা নির্ভুলতা বজায় থাকে।
  • একক রূপান্তর: এই স্কেল দেখে সহজেই এক এককের দূরত্বকে অন্য এককে রূপান্তর করা যায়।
  • নির্ভুলতা: এতে দূরত্ব পরিমাপ খুব নিখুঁত হয়।

৩. বৃহৎ স্কেলের মানচিত্র ও ক্ষুদ্র স্কেলের মানচিত্রের মধ্যে পার্থক্য লেখো।

বিস্তারিত উত্তর
বিষয় বৃহৎ স্কেলের মানচিত্র ক্ষুদ্র স্কেলের মানচিত্র
১. এলাকা খুব ছোট এলাকাকে বড় করে দেখানো হয়। বিশাল এলাকাকে ছোট করে দেখানো হয়।
২. বিবরণ এতে অনেক খুঁটিনাটি বিবরণ থাকে। এতে বিবরণ খুব কম থাকে।
৩. R.F. R.F.-এর হর (Denominator) ছোট হয় (যেমন- ১:৫০০০)। R.F.-এর হর অনেক বড় হয় (যেমন- ১:১,০০,০০,০০০)।
৪. উদাহরণ মৌজা মানচিত্র। দেয়াল মানচিত্র বা অ্যাটলাস।

৪. ভগ্নাংশসূচক স্কেলের (R.F.) সুবিধা ও অসুবিধাগুলি উল্লেখ করো।

বিস্তারিত উত্তর

সুবিধা:

  • সার্বজনীনতা: এটি একটি অনুপাত এবং এর কোনো একক নেই। তাই পৃথিবীর যে-কোনো দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব এককে (সেমি বা ইঞ্চি) এটি ব্যবহার করতে পারে।
  • তুলনা: দুটি ভিন্ন এককের মানচিত্রের মধ্যে তুলনা করা সহজ।

অসুবিধা:

  • সাধারণ মানুষের পক্ষে এই অনুপাত দেখে চট করে দূরত্ব বোঝা কঠিন।
  • মানচিত্র ছোট বা বড় (Zoom) করলে এই স্কেলের মান আর সঠিক থাকে না, তখন নতুন করে অঙ্ক করতে হয়।

৫. প্রশ্ন: একটি মানচিত্রের বিবৃতিমূলক স্কেল হলো ‘১ সেমিতে ২ কিমি’। একে ভগ্নাংশসূচক স্কেলে (R.F.) পরিণত করো।

সমাধান দেখো

সমাধান:

আমরা জানি, R.F. = মানচিত্রের দূরত্ব / ভূমির দূরত্ব (উভয়ই একই এককে হবে)।

এখানে,
মানচিত্রের দূরত্ব = ১ সেমি
ভূমির দূরত্ব = ২ কিমি

যেহেতু উভয়কে একই এককে আনতে হবে, তাই কিমি-কে সেমি-তে নিতে হবে।
আমরা জানি, ১ কিমি = ১,০০,০০০ সেমি।
অতএব, ২ কিমি = ২ × ১,০০,০০০ সেমি = ২,০০,০০০ সেমি।

সুতরাং, R.F. = ১ / ২,০০,০০০
বা, R.F. ১ : ২,০০,০০০


৬. প্রশ্ন: একটি মানচিত্রের R.F. ১:৫০,০০০। একে বিবৃতিমূলক স্কেলে প্রকাশ করো।

সমাধান দেখো

সমাধান:

R.F. ১:৫০,০০০ এর অর্থ হলো—
মানচিত্রের ১ সেমি দূরত্ব ভূমিতে ৫০,০০০ সেমি দূরত্ব নির্দেশ করে।

এখন, ৫০,০০০ সেমি-কে কিমি-তে প্রকাশ করতে হবে।
আমরা জানি, ১,০০,০০০ সেমি = ১ কিমি।
অতএব, ৫০,০০০ সেমি = ৫০,০০০ / ১,০০,০০০ কিমি = ০.৫ কিমি (বা হাফ কিমি)।

সুতরাং, বিবৃতিমূলক স্কেলটি হবে—
মানচিত্রে ১ সেমিতে ভূমিতে ০.৫ কিমি।
(অথবা, ২ সেমিতে ১ কিমি)।


৭. প্রশ্ন: মানচিত্রে ৪ সেমি দূরত্ব যদি ভূমিতে ১০ কিমি দূরত্ব নির্দেশ করে, তবে স্কেলের R.F. কত?

সমাধান দেখো

সমাধান:

এখানে,
৪ সেমি (মানচিত্র) = ১০ কিমি (ভূমি)
বা, ৪ সেমি = ১০ × ১,০০,০০০ সেমি [যেহেতু ১ কিমি = ১ লক্ষ সেমি]
বা, ৪ সেমি = ১০,০০,০০০ সেমি

R.F. বের করতে হলে মানচিত্রের দূরত্বকে ১ সেমিতে আনতে হবে।
অতএব, ১ সেমি = ১০,০০,০০০ / ৪ সেমি
= ২,৫০,০০০ সেমি

সুতরাং, R.F. ১ : ২,৫০,০০০


৮. প্রশ্ন: ১৬ ইঞ্চিতে ১ মাইল – এই স্কেলের R.F. নির্ণয় করো।

সমাধান দেখো

সমাধান:

আমরা জানি, ১ মাইল = ৬৩,৩৬০ ইঞ্চি।

প্রশ্নানুসারে,
মানচিত্রের ১৬ ইঞ্চি = ভূমির ১ মাইল বা ৬৩,৩৬০ ইঞ্চি।
অতএব, মানচিত্রের ১ ইঞ্চি = ৬৩,৩৬০ / ১৬ ইঞ্চি
= ৩,৯৬০ ইঞ্চি।

সুতরাং, নির্ণেয় R.F. ১ : ৩,৯৬০

৯. বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র (Thematic Map) সম্পর্কে টীকা লেখো।

বিস্তারিত উত্তর
যে মানচিত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা থিমকে (যেমন- জনসংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, খনিজ সম্পদ, অরণ্য) রঙের সাহায্যে বা বিশেষ পদ্ধতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়, তাকে বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র বা থিমেটিক ম্যাপ বলে।

বৈশিষ্ট্য:

  • এতে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • বিভিন্ন রঙের শেড বা বিন্দু ব্যবহার করে তথ্যের ঘনত্ব দেখানো হয় (যেমন- জনঘনত্ব)।
  • NATMO এই ধরনের মানচিত্র তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

১০. ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র বা টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

বিস্তারিত উত্তর
  • স্কেল: এটি একটি বৃহৎ স্কেলের মানচিত্র (সাধারণত ১:৫০,০০০)।
  • উপাদান: এতে প্রাকৃতিক (পাহাড়, নদী, বনভূমি) এবং সাংস্কৃতিক (রাস্তা, বসতি, রেলপথ) উভয় উপাদানই দেখানো হয়।
  • রং ও চিহ্ন: এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রং ও প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় (যেমন- বনভূমির জন্য সবুজ, জলাশয়ের জন্য নীল)।
  • কন্ট্যুর রেখা: ভূমির উচ্চতা ও বন্ধুরতা দেখানোর জন্য এতে সমোন্নতি রেখা বা কন্ট্যুর লাইন (Contour Line) ব্যবহার করা হয়।

১১. মৌজা মানচিত্র বা ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্রের গুরুত্ব কী?

বিস্তারিত উত্তর
  • মালিকানা ও সীমানা: গ্রামের প্রতিটি জমি, বাড়ি বা প্লটের সঠিক সীমানা ও মালিকানা নির্ধারণ করতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • রাজস্ব আদায়: সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন জমির খাজনা বা কর আদায়ের জন্য এই মানচিত্র ব্যবহার করে।
  • পরিকল্পনা: গ্রাম বা শহরের উন্নয়নমূলক কাজের (যেমন- রাস্তা তৈরি, নিকাশি ব্যবস্থা) পরিকল্পনায় এটি অপরিহার্য।

১২. গ্লোব ও মানচিত্রের মধ্যে ৩টি পার্থক্য লেখো।

বিস্তারিত উত্তর
বিষয় গ্লোব (Globe) মানচিত্র (Map)
১. আকৃতি ত্রিমাত্রিক (3D) বা গোলাকার। দ্বিমাত্রিক (2D) বা সমতল।
২. দৃশ্যমানতা একবারে পৃথিবীর অর্ধেক অংশ দেখা যায়। একবারে পুরো পৃথিবী বা নির্দিষ্ট অংশ দেখা যায়।
৩. বহনযোগ্যতা বহন করা কিছুটা অসুবিধাজনক। সহজেই ভাঁজ করে বা গুটিয়ে বহন করা যায়।

১৩. মানচিত্র অভিক্ষেপ (Map Projection) কী এবং কেন প্রয়োজন?

বিস্তারিত উত্তর

সংজ্ঞা: যে জ্যামিতিক বা গাণিতিক পদ্ধতির সাহায্যে গোলাকার পৃথিবীর অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ রেখাগুলিকে সমতল কাগজের ওপর ছকে বা জালে পরিণত করে মানচিত্র আঁকা হয়, তাকে মানচিত্র অভিক্ষেপ বলে।

প্রয়োজনীয়তা: পৃথিবী গোলাকার, তাই তার তল বক্র। কোনো বক্রতলকে সমতল কাগজে হুবহু আঁকা অসম্ভব। তাই অভিক্ষেপের সাহায্যে পৃথিবীর বক্রতলকে সমতলে রূপান্তর করা হয় যাতে দূরত্ব, দিক ও আকৃতি সঠিক থাকে।



🗺️ অধ্যায় ৯: মানচিত্র ও স্কেল – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

১. মানচিত্রের স্কেল (Map Scale) বলতে কী বোঝায়?

মানচিত্রের ওপর অবস্থিত যে-কোনো দুটি বিন্দুর দূরত্ব এবং ভূপৃষ্ঠের ওপর অবস্থিত ওই একই দুটি বিন্দুর প্রকৃত দূরত্বের অনুপাতকে মানচিত্রের স্কেল বা মাপনী বলে। স্কেল ছাড়া কোনো মানচিত্র সঠিক হয় না, তাকে কেবল নকশা বা স্কেচ বলা হয়।

২. আর.এফ. (R.F.) স্কেল বা ভগ্নাংশসূচক স্কেলের সুবিধা কী?

R.F. (Representative Fraction) স্কেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একটি এককহীন অনুপাত (যেমন ১:৫০,০০০)। ফলে পৃথিবীর যে-কোনো দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব এককে (সেন্টিমিটার, ইঞ্চি, মিটার বা মাইল) এই স্কেল ব্যবহার করতে পারে। তাই একে ‘আন্তর্জাতিক স্কেল’ বা ‘সার্বজনীন স্কেল’ বলা হয়।

৩. মৌজা মানচিত্র (Mouza Map) কেন ব্যবহার করা হয়?

মৌজা মানচিত্র বা ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ (Cadastral Map) হলো একটি বৃহৎ স্কেলের মানচিত্র (১৬ ইঞ্চিতে ১ মাইল), যা মূলত গ্রামের জমি, বাড়ি বা প্লটের সীমানা নির্ধারণ এবং মালিকানা স্বত্ব প্রমাণের জন্য ব্যবহৃত হয়। জমি কেনাবেচা এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য এই মানচিত্র অপরিহার্য।

৪. লৈখিক স্কেল বা রৈখিক স্কেল (Linear Scale) মানচিত্রে কেন আঁকা থাকে?

মানচিত্রকে যখন ফোটোগ্রাফিক পদ্ধতিতে ছোট বা বড় (Zoom in/Zoom out) করা হয়, তখন লৈখিক স্কেলটিও আনুপাতিক হারে পরিবর্তিত হয়। ফলে মানচিত্রের মাপ ঠিক থাকে। অন্য কোনো স্কেলে (যেমন- লিখে প্রকাশ করা স্কেল) এই সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই আধুনিক মানচিত্রে লৈখিক স্কেল আঁকা থাকে।

৫. ভারতের ভূবৈচিত্র্যসূচক বা টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র কারা তৈরি করে?

ভারতে ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র বা টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র (Topographical Map) তৈরি করার একমাত্র অধিকার রয়েছে ‘সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ (Survey of India)-র। ১৭৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার সদর দপ্তর উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অবস্থিত।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার