নবম শ্রেণি: ভৌত বিজ্ঞান, অধ্যায় – 7 শব্দ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় ৭: শব্দ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
1. শব্দ কাকে বলে? এটি কীভাবে উৎপন্ন হয়?
উত্তর দেখো
সংজ্ঞা: শব্দ হলো এক প্রকার শক্তি যা কোনো জড় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে তরঙ্গাকারে বিস্তার লাভ করে এবং আমাদের কানে শ্রবণের অনুভূতি জাগায়।
উৎপত্তি: যেকোনো বস্তুর দ্রুত কম্পনের ফলেই শব্দের সৃষ্টি হয়।
2. অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ (Longitudinal Wave) কাকে বলে? উদাহরণ দাও。
উত্তর দেখো
[Image of longitudinal wave compression and rarefaction]
যে তরঙ্গে মাধ্যমের কণাগুলোর কম্পনের অভিমুখ তরঙ্গ বিস্তারের অভিমুখের সমান্তরাল হয়, তাকে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ বলে।
উদাহরণ: বায়ু মাধ্যমে শব্দের বিস্তার।
3. তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wavelength) কাকে বলে? এর SI একক কী?
উত্তর দেখো
তরঙ্গস্থিত কোনো কণা পূর্ণ কম্পন সম্পন্ন করতে যে সময় নেয়, সেই সময়ে তরঙ্গটি যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য ($\lambda$) বলে।
এর SI একক হলো মিটার (m)।
4. শব্দের বেগ ($v$), কম্পাঙ্ক ($n$) এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য ($\lambda$)-এর মধ্যে সম্পর্কটি স্থাপন করো।
উত্তর দেখো
আমরা জানি, বেগ = অতিক্রান্ত দূরত্ব / সময়।
তরঙ্গ $T$ সময়ে (পর্যায়কাল) $\lambda$ দূরত্ব অতিক্রম করে।
$\therefore v = \lambda / T$
আবার, কম্পাঙ্ক $n = 1/T$।
$\therefore v = n\lambda$ (তরঙ্গবেগ = কম্পাঙ্ক $\times$ তরঙ্গদৈর্ঘ্য)।
5. শ্রুতিগোচর শব্দ ও শব্দেতর শব্দের কম্পাঙ্কের পাল্লা কত?
উত্তর দেখো
১) শ্রুতিগোচর শব্দ: 20 Hz থেকে 20,000 Hz।
২) শব্দেতর শব্দ (Infrasonic): 20 Hz-এর কম।
6. কঠিন মাধ্যমে শব্দের বেগ গ্যাসীয় মাধ্যমের চেয়ে বেশি হয় কেন?
উত্তর দেখো
শব্দের বেগ মাধ্যমের স্থিতিস্থাপকতার ওপর নির্ভর করে। কঠিন পদার্থের স্থিতিস্থাপকতা গ্যাসীয় পদার্থের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ঘনত্ব বেশি হওয়া সত্ত্বেও স্থিতিস্থাপকতা বেশি হওয়ার কারণে কঠিন মাধ্যমে শব্দের বেগ বেশি হয়।
7. বায়ুর উষ্ণতা বাড়লে শব্দের বেগের কী পরিবর্তন হয় এবং কেন?
উত্তর দেখো
উষ্ণতা বাড়লে শব্দের বেগ বাড়ে।
কারণ, উষ্ণতা বাড়লে গ্যাসের ঘনত্ব কমে যায়। শব্দের বেগ ঘনত্বের বর্গমূলের ব্যস্তানুপাতিক ($v \propto 1/\sqrt{d}$)। তাই ঘনত্ব কমলে বেগ বাড়ে।
8. আর্দ্র বায়ুতে শব্দের বেগ শুষ্ক বায়ু অপেক্ষা বেশি হয় কেন?
উত্তর দেখো
জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব শুষ্ক বায়ুর (নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের মিশ্রণ) ঘনত্বের চেয়ে কম। আর্দ্র বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় বাতাসের গড় ঘনত্ব কমে যায়। ঘনত্ব কমলে শব্দের বেগ বাড়ে, তাই আর্দ্র বায়ুতে শব্দ দ্রুত চলে।
9. শব্দোত্তর বা আল্ট্রাসনিক (Ultrasonic) শব্দ কী? এর একটি ব্যবহার লেখো。
উত্তর দেখো
সংজ্ঞা: 20,000 Hz-এর চেয়ে বেশি কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট শব্দকে শব্দোত্তর শব্দ বলে। মানুষ এটি শুনতে পায় না।
ব্যবহার: সমুদ্রের গভীরতা নির্ণয়ে বা ডুবোজাহাজের অবস্থান জানতে SONAR যন্ত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।
10. চাঁদে বিশাল বিস্ফোরণ হলেও পৃথিবীতে তার শব্দ শোনা যায় না কেন?
উত্তর দেখো
শব্দ চলাচলের জন্য জড় মাধ্যমের (কঠিন, তরল বা গ্যাস) প্রয়োজন হয়। চাঁদ ও পৃথিবীর মাঝখানের বিশাল অংশে কোনো বায়ুমণ্ডল বা জড় মাধ্যম নেই (শূন্যস্থান)। তাই শব্দ পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
11. মেঘের গুরুগম্ভীর শব্দ (Thunder) শোনার অনেক আগেই বিদ্যুৎ চমক (Lightning) দেখা যায় কেন?
উত্তর দেখো
আলোর বেগ ($3 \times 10^8$ m/s) শব্দের বেগের (332 m/s) চেয়ে অনেক গুণ বেশি। মেঘের ঘর্ষণে আলো ও শব্দ একই সাথে উৎপন্ন হলেও, অত্যধিক বেগের কারণে আলো চোখের নিমেষে পৃথিবীতে পৌঁছায়, কিন্তু শব্দ আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগে।
12. গাণিতিক প্রশ্ন: একটি সুরশলাকার কম্পাঙ্ক 256 Hz এবং বাতাসে শব্দের বেগ 332 m/s হলে, উৎপন্ন শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কত?
উত্তর দেখো
আমরা জানি, $v = n\lambda$
এখানে $v = 332$ m/s, $n = 256$ Hz
$\therefore \lambda = v/n = 332 / 256 \approx 1.29$ মিটার।
13. শব্দের প্রতিফলন (Reflection of Sound) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
শব্দ এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমের বিভেদতলে আপতিত হয়ে যদি আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, তবে এই ঘটনাকে শব্দের প্রতিফলন বলে। পাহাড় বা উঁচু দেওয়ালে শব্দ বাধা পেয়ে ফিরে আসা এর উদাহরণ।
14. শ্রবণানুভূতির স্থায়িত্বকাল (Persistence of Hearing) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
কোনো শব্দ শোনার পর তার রেশ মস্তিষ্কে প্রায় 0.1 সেকেন্ড (বা $1/10$ সেকেন্ড) পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এই সময়কালকে শ্রবণানুভূতির স্থায়িত্বকাল বলে। এই সময়ের মধ্যে অন্য শব্দ কানে এলেও আমরা তা আলাদা করতে পারি না।
15. প্রতিধ্বনি (Echo) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
মূল শব্দ কোনো দূরবর্তী প্রতিবন্ধকে বাধা পেয়ে প্রতিফলিত হয়ে যদি মূল শব্দ থেকে পৃথকভাবে শ্রোতার কানে পৌঁছায়, তবে প্রতিফলিত ওই শব্দকে প্রতিধ্বনি বলে।
16. বায়ুতে প্রতিধ্বনি শোনার জন্য উৎস ও প্রতিফলকের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব 16.6 মিটার হতে হয় কেন?
উত্তর দেখো
ক্ষণস্থায়ী শব্দের রেশ 0.1 সেকেন্ড থাকে। এই সময়ে শব্দ $332 \times 0.1 = 33.2$ মিটার পথ অতিক্রম করে। প্রতিধ্বনি শুনতে হলে শব্দকে গিয়ে ফিরে আসতে হবে। তাই ন্যূনতম দূরত্ব = $33.2 / 2 = 16.6$ মিটার হওয়া প্রয়োজন।
17. ছোটো ঘরে কথা বললে প্রতিধ্বনি শোনা যায় না কেন?
উত্তর দেখো
ছোটো ঘরে দেওয়াল ও উৎসের দূরত্ব 16.6 মিটারের কম হয়। ফলে প্রতিফলিত শব্দ 0.1 সেকেন্ডের আগেই কানে চলে আসে এবং মূল শব্দের সাথে মিশে যায়। তাই আলাদা করে প্রতিধ্বনি শোনা যায় না।
18. অনুরণন (Reverberation) কী?
উত্তর দেখো
বড় হলঘরে শব্দ করলে দেওয়াল, ছাদ ও মেঝের দ্বারা বারবার প্রতিফলিত হয়ে শব্দের রেশ অনেকক্ষণ ধরে বজায় থাকে। একে অনুরণন বলে। এটি কমানোর জন্য দেওয়ালে শব্দশোষক পদার্থ ব্যবহার করা হয়।
19. SONAR কী? এর একটি ব্যবহার লেখো।
উত্তর দেখো
SONAR: Sound Navigation And Ranging।
ব্যবহার: এটি শব্দোত্তর তরঙ্গ ব্যবহার করে সমুদ্রের গভীরতা নির্ণয় বা সমুদ্রের নিচে থাকা কোনো বস্তুর (যেমন আইসবার্গ, ডুবোজাহাজ) অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
20. সুরযুক্ত শব্দের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী?
উত্তর দেখো
সুরযুক্ত শব্দের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
১) প্রাবল্য (Loudness)
২) তীক্ষ্ণতা (Pitch)
৩) গুণ বা জাতি (Quality or Timbre)
21. প্রাবল্য (Loudness) কী? এটি কিসের ওপর নির্ভর করে?
উত্তর দেখো
শব্দ কানে কতটা জোরে বা আস্তে শোনা যায়, তার অনুভূতিকে প্রাবল্য বলে। এটি মূলত কম্পনশীল বস্তুর বিস্তারের (Amplitude) ওপর নির্ভর করে। বিস্তার বাড়লে প্রাবল্য বাড়ে।
22. তীক্ষ্ণতা (Pitch) কাকে বলে? এটি কিসের ওপর নির্ভর করে?
উত্তর দেখো
সুরের যে বৈশিষ্ট্যের জন্য একই প্রাবল্যযুক্ত মোটা ও সরু শব্দের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়, তাকে তীক্ষ্ণতা বলে। এটি উৎসের কম্পাঙ্কের ওপর নির্ভর করে। কম্পাঙ্ক বাড়লে তীক্ষ্ণতা বাড়ে (শব্দ সরু হয়)।
23. গুণ বা জাতি (Quality) কী?
উত্তর দেখো
সুরের যে বৈশিষ্ট্যের জন্য একই প্রাবল্য ও তীক্ষ্ণতাযুক্ত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের (যেমন বাঁশি ও হারমোনিয়াম) শব্দকে আলাদা করা যায়, তাকে গুণ বা জাতি বলে। এটি উপসুরের সংখ্যা ও প্রাবল্যের ওপর নির্ভর করে।
24. সুর ও স্বর-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
সুর (Tone): কেবল একটি কম্পাঙ্ক বিশিষ্ট শব্দকে সুর বলে। যেমন—সুরশলাকার শব্দ।
স্বর (Note): একাধিক কম্পাঙ্কের সমষ্টি বা একাধিক সুরের মিশ্রণকে স্বর বলে। যেমন—গানের গলার শব্দ।
25. পরবশ কম্পন (Forced Vibration) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
বাইরে থেকে প্রযুক্ত কোনো পর্যায়বৃত্ত বলের প্রভাবে যখন কোনো বস্তু তার নিজস্ব কম্পাঙ্কের পরিবর্তে প্রযুক্ত বলের কম্পাঙ্কে কম্পিত হয়, তখন সেই কম্পনকে পরবশ কম্পন বলে।
26. অনুনাদ (Resonance) কী?
উত্তর দেখো
পরবশ কম্পনের ক্ষেত্রে, প্রযুক্ত বলের কম্পাঙ্ক যদি বস্তুর নিজস্ব কম্পাঙ্কের সমান হয়, তবে বস্তুটি সর্বাধিক বিস্তারে কাঁপতে থাকে এবং জোরে শব্দ উৎপন্ন হয়। এই ঘটনাকে অনুনাদ বলে।
27. মশার ওড়ার শব্দ এবং বাঘের গর্জনের মধ্যে তীক্ষ্ণতা ও প্রাবল্যের তুলনা করো।
উত্তর দেখো
মশার ওড়ার শব্দের কম্পাঙ্ক বেশি তাই তীর্থ্ণতা বেশি, কিন্তু বিস্তার কম তাই প্রাবল্য কম (সরু শব্দ)।
বাঘের গর্জনের কম্পাঙ্ক কম তাই তীক্ষ্ণতা কম, কিন্তু বিস্তার অনেক বেশি তাই প্রাবল্য বেশি (গম্ভীর শব্দ)।
28. ম্যাক নম্বর (Mach Number) কী?
উত্তর দেখো
কোনো বস্তুর বেগ এবং ওই মাধ্যমে শব্দের বেগের অনুপাতকে ম্যাক নম্বর বলে।
ম্যাক নম্বর = বস্তুর বেগ / শব্দের বেগ।
জেট প্লেনের গতিবেগ প্রকাশে এটি ব্যবহৃত হয়।
29. স্টেথোস্কোপ যন্ত্রে শব্দের কোন ধর্মকে কাজে লাগানো হয়?
উত্তর দেখো
স্টেথোস্কোপ যন্ত্রে শব্দের প্রতিফলন ধর্মকে কাজে লাগানো হয়। হৃৎস্পন্দনের শব্দ নলের মধ্যে দিয়ে বারবার প্রতিফলিত হয়ে কানে পৌঁছায়।
30. গাণিতিক প্রশ্ন: একটি কূয়োর গভীরতা 340 মিটার। সেখানে শব্দ করলে কতক্ষণ পরে প্রতিধ্বনি শোনা যাবে? (বায়ুতে শব্দের বেগ 340 m/s)
উত্তর দেখো
শব্দকে কূয়োর তলায় গিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে।
মোট দূরত্ব = $2 \times 340$ মিটার।
সময় = দূরত্ব / বেগ = $(2 \times 340) / 340 = 2$ সেকেন্ড।
$\therefore$ 2 সেকেন্ড পরে প্রতিধ্বনি শোনা যাবে।