নবম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞান: অধ্যায় ৩, জৈবনিক প্রক্রিয়া‌ পর্ব -১, (সালোকসংশ্লেষ ও খনিজ‌ পুষ্টি) ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর

অধ্যায় ৩: জৈবনিক প্রক্রিয়া (পর্ব-১) — ৫ নম্বরের রচনাধর্মী প্রশ্ন (LAQ)

1. সালোকসংশ্লেষের আলোক দশা বা আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়াটি সংক্ষেপে বর্ণনা করো। (৫)

উত্তর দেখুন

স্থান: এই দশাটি ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রানা (Grana) অঞ্চলে সম্পন্ন হয়।

পদ্ধতি: এই দশাটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

  • সৌরশক্তি শোষণ ও ক্লোরোফিলের সক্রিয়করণ: ক্লোরোফিল অণু সূর্যালোকের ফোটন (Photon) কণা শোষণ করে উত্তেজিত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে ($Chl \rightarrow Chl^*$)।
  • জলের ফোটোলাইসিস (Photolysis): সক্রিয় ক্লোরোফিল জলকে বিশ্লিষ্ট করে হাইড্রোজেন আয়ন ($H^+$) এবং হাইড্রক্সিল আয়নে ($OH^-$) পরিণত করে। একে হিল বিক্রিয়াও বলে।
    বিক্রিয়া: $2H_2O \rightarrow 2H^+ + 2OH^-$
  • অক্সিজেন নির্গমন: হাইড্রক্সিল আয়ন ($OH^-$) ইলেকট্রন বর্জন করে $OH$ মূলকে পরিণত হয় এবং পরে তা থেকে জল ও উপজাত পদার্থ হিসেবে অক্সিজেন ($O_2$) উৎপন্ন হয়।
  • বিজারিত গ্রাহক গঠন ও ATP সংশ্লেষ:
    • জলের $H^+$ আয়ন $NADP$-কে বিজারিত করে $NADPH + H^+$ গঠন করে।
    • পাতার কোশে উপস্থিত ADP অজৈব ফসফেটের ($Pi$) সঙ্গে যুক্ত হয়ে উচ্চশক্তিযুক্ত ATP গঠন করে। একে ফোটোফসফোরাইলেশন বলে।

2. সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার দশা বা কেলভিন চক্রটি (Calvin Cycle) ছকের সাহায্যে বা সংক্ষেপে বর্ণনা করো। (৫)

উত্তর দেখুন

স্থান: এই দশাটি ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমা (Stroma) অঞ্চলে ঘটে এবং এতে আলোর প্রয়োজন হয় না।

পদ্ধতি:

  • $CO_2$ সংবন্ধন (Fixation): বাতাস থেকে গৃহীত $CO_2$ কোশস্থ ৫-কার্বনযুক্ত যৌগ RuBP (রিবিউলোজ বিসফসফেট)-এর সাথে যুক্ত হয়ে ৩-কার্বনযুক্ত স্থায়ী যৌগ PGA (ফসফোগ্লিসারিক অ্যাসিড) গঠন করে। এতে RuBiSco উৎসেচক সাহায্য করে।
  • PGA-এর বিজারণ: আলোক দশায় উৎপন্ন ATP ও $NADPH_2$-এর সহায়তায় PGA বিজারিত হয়ে PGAld (ফসফোগ্লিসারালডিহাইড) গঠন করে।
  • শর্করা সংশ্লেষ: উৎপন্ন PGAld-এর কিছু অংশ রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লুকোজ ($C_6H_{12}O_6$) সংশ্লেষ করে, যা পরে স্টার্চ বা শ্বেতসারে পরিণত হয়।
  • RuBP-এর পুনঃসংশ্লেষ: অবশিষ্ট PGAld বিভিন্ন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় RuBP উৎপাদন করে, যাতে চক্রটি সচল থাকে।

এই চক্রাকার পদ্ধতিটি বিজ্ঞানী কেলভিন আবিষ্কার করেন বলে একে কেলভিন চক্র বা $C_3$ চক্র বলে।


3. সালোকসংশ্লেষের উপাদান হিসেবে (ক) জল এবং (খ) কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভূমিকা আলোচনা করো। (২.৫+২.৫)

উত্তর দেখুন

(ক) জলের ($H_2O$) ভূমিকা:

  • ইলেকট্রন প্রদান: ক্লোরোফিল অণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে যাওয়ার পর যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়, তা জল পূরণ করে।
  • বিজারক গঠন: জল বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন ($H^+$) উৎপন্ন করে, যা $CO_2$-কে বিজারিত করার জন্য $NADPH_2$ গঠন করতে সাহায্য করে।
  • অক্সিজেন উৎস: সালোকসংশ্লেষে উপজাত হিসেবে যে অক্সিজেন ($O_2$) নির্গত হয়, তার উৎস হলো জল।

(খ) কার্বন ডাই-অক্সাইডের ($CO_2$) ভূমিকা:

  • গ্লুকোজ উৎপাদন: $CO_2$ হলো সালোকসংশ্লেষের প্রধান কাঁচামাল। গ্লুকোজ অণুর কার্বন ও অক্সিজেন কাঠামো $CO_2$ থেকেই আসে।
  • খাদ্য সংশ্লেষ: অন্ধকার দশায় $CO_2$ বিজারিত হয়েই শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি হয়।

4. সালোকসংশ্লেষের তাৎপর্য বা গুরুত্বগুলি লেখো। (৫)

উত্তর দেখুন
  • খাদ্য উৎপাদন: সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। সমগ্র প্রাণীজগৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল।
  • শক্তির আবদ্ধকরণ: এই প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে (স্থিতিশক্তি) রূপান্তরিত হয়ে খাদ্যের মধ্যে আবদ্ধ হয়, যা পরে শ্বসনের মাধ্যমে জীবদেহে শক্তি যোগায়।
  • $O_2$ ও $CO_2$-এর ভারসাম্য রক্ষা: জীবকুলের শ্বসনের ফলে পরিবেশে $CO_2$ বাড়ে এবং $O_2$ কমে। সালোকসংশ্লেষের সময় উদ্ভিদ $CO_2$ গ্রহণ করে এবং $O_2$ ত্যাগ করে এই গ্যাসীয় ভারসাম্য বজায় রাখে।
  • মানবসভ্যতায় অবদান: কয়লা, পেট্রোল, কাঠ ইত্যাদি জ্বালানি উদ্ভিদদেহ থেকেই আসে, যা মূলত সালোকসংশ্লেষের ফলেই বহু বছর আগে তৈরি হয়েছিল।

5. অতিমাত্রিক ও স্বল্পমাত্রিক মৌলিক উপাদান কাদের বলে? উদ্ভিদের পুষ্টিতে নাইট্রোজেন (N) ও ম্যাগনেশিয়ামের (Mg) গুরুত্ব লেখো। (২+৩)

উত্তর দেখুন

অতিমাত্রিক মৌল (Macro-nutrients): উদ্ভিদের পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য যেসব খনিজ মৌল বেশি পরিমাণে প্রয়োজন হয়, তাদের অতিমাত্রিক মৌল বলে। যেমন— C, H, O, N, P, K, Mg।

স্বল্পমাত্রিক মৌল (Micro-nutrients): যেসব খনিজ মৌল উদ্ভিদের পুষ্টিতে খুব সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন হয়, তাদের স্বল্পমাত্রিক মৌল বলে। যেমন— Fe, Zn, Cu, Mo, B।

নাইট্রোজেনের (N) গুরুত্ব:

  • উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধি ও কোশ বিভাজনে সাহায্য করে।
  • প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA, RNA) ও ক্লোরোফিল গঠনের প্রধান উপাদান।
  • এর অভাবে পাতা হলুদ হয় (ক্লোরোসিস) এবং বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

ম্যাগনেশিয়ামের (Mg) গুরুত্ব:

  • ক্লোরোফিল অণুর কেন্দ্রীয় ধাতব উপাদান হলো ম্যাগনেশিয়াম।
  • শ্বসন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উৎসেচকের সক্রিয়ক হিসেবে কাজ করে।
  • এর অভাবে ক্লোরোসিস ও নেক্রোসিস রোগ হয়।

6. উদ্ভিদের পুষ্টিতে ফসফরাস (P) ও পটাশিয়ামের (K) ভূমিকা লেখো। অপরিহার্য খনিজ মৌলের সাধারণ কাজগুলি কী কী? (৩+২)

উত্তর দেখুন

ফসফরাসের (P) ভূমিকা:

  • কোশপর্দা ও কোশপ্রাচীর গঠনে সাহায্য করে।
  • নিউক্লিক অ্যাসিড ও উচ্চশক্তিযুক্ত যৌগ ATP গঠনে অপরিহার্য।
  • এর অভাবে মূলের বৃদ্ধি কমে যায়।

পটাশিয়ামের (K) ভূমিকা:

  • পত্ররন্ধ্র খোলা ও বন্ধ হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
  • কোশ বিভাজন ও প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে।
  • এর অভাবে পাতা কুঁকড়ে যায়।

খনিজ মৌলের সাধারণ কাজ:

  • প্রোটোপ্লাজম গঠন: বিভিন্ন মৌল প্রোটোপ্লাজমের ভৌত ও রাসায়নিক গঠন বজায় রাখে।
  • উৎসেচক সক্রিয়করণ: অনেক মৌল কো-ফ্যাক্টর হিসেবে উৎসেচককে সক্রিয় করে।
  • অভিস্রবণ নিয়ন্ত্রণ: কোশরসের অভিস্রবণ চাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

7. সালোকসংশ্লেষের আলোক দশা ও অন্ধকার দশার মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো। (৩)

উত্তর দেখুন
বিষয় আলোক দশা (Light Phase) অন্ধকার দশা (Dark Phase)
১. স্থান ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রানা (Grana) অঞ্চলে ঘটে। ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমা (Stroma) অঞ্চলে ঘটে।
২. আলোকের প্রয়োজনীয়তা এই দশায় আলো অপরিহার্য। এই দশায় আলোর প্রত্যক্ষ প্রয়োজন হয় না।
৩. কাঁচামাল প্রধান কাঁচামাল হলো জল ($H_2O$) এবং ক্লোরোফিল। প্রধান কাঁচামাল হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড ($CO_2$) এবং আলোক দশায় উৎপন্ন ATP ও $NADPH_2$।

8. উদ্ভিদের পুষ্টিতে মৌলের অপরিহার্যতার শর্তগুলি (Criteria of Essentiality) কী কী? (৩)

উত্তর দেখুন

বিজ্ঞানী আরনন (Arnon) ও স্টাউট (Stout)-এর মতে, কোনো মৌলকে অপরিহার্য বলার শর্তগুলি হলো:

  • অঙ্গজ গঠন ও জনন: মৌলটির অভাবে উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ও প্রজনন ব্যাহত হবে।
  • অভাবজনিত লক্ষণ: মৌলটির অনুপস্থিতিতে উদ্ভিদে নির্দিষ্ট অভাবজনিত লক্ষণ প্রকাশ পাবে, যা অন্য কোনো মৌল দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়।
  • প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ: মৌলটি উদ্ভিদের বিপাক ক্রিয়ায় (Metabolism) সরাসরি অংশগ্রহণ করবে।

9. হিল বিক্রিয়া (Hill Reaction) কী? সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করো। (৩)

উত্তর দেখুন

সংজ্ঞা: ১৯৩৭ সালে বিজ্ঞানী রবিন হিল প্রমাণ করেন যে, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে সক্রিয় ক্লোরোফিলের সহায়তায় জল বিশ্লিষ্ট হয়ে অক্সিজেন ($O_2$) নির্গত হয় এবং একটি হাইড্রোজেন গ্রাহক (যেমন- পটাশিয়াম ফেরিক অক্সালেট বা কোশে থাকা NADP) বিজারিত হয়। এই বিক্রিয়াকে হিল বিক্রিয়া বলে।

সমীকরণ:

$2H_2O + 2A \xrightarrow[\text{ক্লোরোফিল}]{\text{সূর্যালোক}} 2AH_2 + O_2 \uparrow$

(এখানে ‘A’ হলো হাইড্রোজেন গ্রাহক বা হিল বিকারক)।

তাৎপর্য: এই বিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন অক্সিজেনের উৎস হলো জল。


10. উদ্ভিদের পুষ্টিতে আয়রন (Fe) ও বোরন (B)-এর ভূমিকা উল্লেখ করো। (২+৩)

উত্তর দেখুন

আয়রন বা লোহা (Fe)-এর ভূমিকা:

  • ক্লোরোফিল অণু সংশ্লেষের জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
  • সাইটোক্রোম (Cytochrome) নামক শ্বাস-উৎসেচকের প্রধান উপাদান।
  • এর অভাবে কচি পাতায় ক্লোরোসিস হয়।

বোরন (B)-এর ভূমিকা:

  • ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে শর্করা বা খাদ্য পরিবহণে সাহায্য করে।
  • পরাগরেণুর অঙ্কুরোদগম এবং কোশ বিভাজনে সাহায্য করে।
  • এর অভাবে উদ্ভিদের ‘ব্রাউন হার্ট’ রোগ হয়।

11. হাইড্রপনিক্স (Hydroponics) বা জল-অনুশীলন কাকে বলে? এর গুরুত্ব কী? (২+৩)

উত্তর দেখুন

সংজ্ঞা: মৃত্তিকা বা মাটি ব্যবহার না করে, উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পরিপোষক বা খনিজ উপাদানযুক্ত জলীয় দ্রবণে উদ্ভিদের মূল ডুবিয়ে চাষ করার পদ্ধতিকে হাইড্রপনিক্স বা জল-অনুশীলন বলা হয় [attachment_0](attachment)。

গুরুত্ব:

  • এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য কোন কোন মৌল অপরিহার্য।
  • কোন মৌলের অভাবে উদ্ভিদে কী কী রোগ বা লক্ষণ দেখা দেয়, তা নির্ণয় করা যায়।
  • মরুভূমি বা অনুর্বর অঞ্চলেও এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্ভব।

12. ক্লোরোফিল ও হিমোগ্লোবিনের মধ্যে গঠনগত ও কার্যগত পার্থক্য কী? সালোকসংশ্লেষীয় কার্যবর্ণালি ও শোষণ বর্ণালির পার্থক্য কী? (৩+২)

উত্তর দেখুন

ক্লোরোফিল ও হিমোগ্লোবিনের পার্থক্য:

  • গঠনগত: ক্লোরোফিল অণুর কেন্দ্রে ম্যাগনেসিয়াম (Mg) থাকে, কিন্তু হিমোগ্লোবিনের কেন্দ্রে লোহা (Fe) থাকে।
  • কার্যগত: ক্লোরোফিল সৌরশক্তি শোষণ করে খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে, আর হিমোগ্লোবিন প্রাণীদেহে শ্বাসবায়ু ($O_2, CO_2$) পরিবহণ করে।

কার্যবর্ণালি ও শোষণ বর্ণালির পার্থক্য:

  • শোষণ বর্ণালি (Absorption Spectrum): রঞ্জক পদার্থ দৃশ্যমান আলোক বর্ণালির যে যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করতে পারে, তাকে শোষণ বর্ণালি বলে।
  • কার্যবর্ণালি (Action Spectrum): যে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোতে সালোকসংশ্লেষের হার বা $O_2$ উৎপাদনের হার সর্বাধিক হয়, তাকে কার্যবর্ণালি বলে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার