নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় -4:শিল্প বিপ্লব, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ ৪ নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৪: শিল্প বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদ – বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (মান ৪)

1. ইংল্যান্ডে কেন সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল?

বিস্তারিত উত্তর

অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্প বিপ্লব হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী ছিল:

  • ১. প্রাকৃতিক সম্পদ: ইংল্যান্ডের খনিগুলিতে শিল্পের অপরিহার্য উপাদান—কয়লা ও লোহা প্রচুর পরিমাণে এবং পাশাপাশি পাওয়া যেত। ফলে ভারী যন্ত্রপাতি ও কারখানা তৈরি সহজ হয়।
  • ২. ঔপনিবেশিক বাজার: ইংল্যান্ডের বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য (যেমন—ভারত, আমেরিকা) থাকায় সেখান থেকে সস্তায় কাঁচামাল (তুলো) সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির একচেটিয়া বাজার পাওয়া সহজ ছিল।
  • ৩. মূলধন ও শ্রমিক: বাণিজ্যের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে প্রচুর পুঁজি সঞ্চিত ছিল। পাশাপাশি, এনক্লোজার আন্দোলনের ফলে গ্রাম থেকে আসা হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক কারখানার সস্তা শ্রমিকে পরিণত হয়।
  • ৪. বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার: জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন, হারগ্রিভসের স্পিনিং জেনি এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করে।

2. শিল্প বিপ্লবের সামাজিক প্রভাব বা ফলাফলগুলি আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

শিল্প বিপ্লব কেবল উৎপাদন ব্যবস্থাই নয়, সমাজ কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন এনেছিল:

  • ১. নতুন শ্রেণির উদ্ভব: সমাজ প্রধানত দুটি পরস্পরবিরোধী শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়—ক) ধনী মালিক বা ‘বুর্জোয়া’, যারা উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করত এবং খ) দরিদ্র শ্রমিক বা ‘প্রলেতারিয়েত’, যারা কায়িক শ্রম বিক্রি করত।
  • ২. নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি: কাজের সন্ধানে গ্রামের মানুষ শহরে ভিড় করায় ম্যাঞ্চেস্টার, লিভারপুল, লিডস-এর মতো নতুন নতুন শিল্পনগরি গড়ে ওঠে।
  • ৩. ঘেটো ও বস্তি সমস্যা: শ্রমিকরা শহরের অস্বাস্থ্যকর, আলো-বাতাসহীন ঘিঞ্জি বস্তিতে (Slums) গাদাগাদি করে বাস করতে বাধ্য হতো। এর ফলে জনস্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হয় এবং মহামারী দেখা দেয়।
  • ৪. নারী ও শিশুশ্রম: কারখানায় কম মজুরিতে নারী ও শিশুদের নিয়োগ করা হতো এবং তাদের ওপর অমানবিক শোষণ চালানো হতো।

3. ফ্যাক্টরি প্রথা (Factory System) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

শিল্প বিপ্লবের আগে উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল মূলত কুটির শিল্পভিত্তিক। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের ফলে যে নতুন উৎপাদন কাঠামো গড়ে ওঠে, তাকেই ফ্যাক্টরি প্রথা বা কারখানা প্রথা বলা হয়।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • ১. বৃহৎ আয়োজন: এই ব্যবস্থায় বিশাল অট্টালিকা বা কারখানায় বড় বড় বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বসানো হয়।
  • ২. শ্রম বিভাজন: হাজার হাজার শ্রমিক নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট মজুরিতে এবং মালিকের কড়া তত্ত্বাবধানে কাজ করে। এখানে শ্রমিকের নিজস্ব স্বাধীনতা থাকে না।
  • ৩. গণউৎপাদন: এই ব্যবস্থায় খুব কম সময়ে এবং কম খরচে প্রচুর পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়।
  • ৪. মালিকানা: উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের মালিক হন পুঁজিপতি, আর শ্রমিকরা কেবল মজুরির বিনিময়ে শ্রম দেয়।

4. ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্রী (Utopian Socialists) কাদের বলা হয় এবং কেন?

বিস্তারিত উত্তর

কার্ল মার্কসের আবির্ভাবের পূর্বে ইউরোপে, বিশেষত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে একদল সমাজতন্ত্রীর উদ্ভব হয়, যাঁরা শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার কথা বলতেন। এঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সাঁ সিমোঁ, চার্লস ফুরিয়ে, রবার্ট ওওয়েন এবং লুই ব্ল্যাঙ্ক

‘ইউটোপীয়’ বলার কারণ:

  • ১. বাস্তববিমুখতা: এঁরা সমাজ পরিবর্তনের কোনো বাস্তবসম্মত বা বৈজ্ঞানিক পথ দেখাতে পারেননি। এঁদের চিন্তা ছিল অনেকাংশে আবেগনির্ভর ও কল্পনাপ্রসূত।
  • ২. শ্রেণী সহযোগিতা: এঁরা বিপ্লব বা শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাসী ছিলেন না। এঁরা মনে করতেন, ধনীদের ‘হৃদয় পরিবর্তন’ বা আবেদনের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যা বাস্তবে অসম্ভব ছিল।

5. কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ বা মার্কসবাদ সংক্ষেপে আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ছিলেন আধুনিক বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দাস ক্যাপিটাল’ এবং ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’-তে তিনি তাঁর মতবাদ তুলে ধরেন। মার্কসবাদের প্রধান স্তম্ভগুলি হলো:

  • ১. দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ: মার্কস মনে করতেন, জগতের সবকিছুর মূলে আছে জড়বস্তু এবং পরিবর্তনের মূল কারণ হলো দুই বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব।
  • ২. শ্রেণী সংগ্রাম: তাঁর মতে, “মানব সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।” আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছাড়া প্রতিটি সমাজেই শোষক ও শোষিত—এই দুই শ্রেণি বিদ্যমান এবং তাদের মধ্যে সংগ্রাম অনিবার্য।
  • ৩. উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব: শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে যে মূল্যের পণ্য উৎপাদন করে এবং মালিক তাকে যে সামান্য মজুরি দেয়—এই দুইয়ের পার্থক্যই হলো ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’, যা মালিক মুনাফা হিসেবে আত্মসাৎ করে।
  • ৪. বিপ্লব: তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র সর্বহারা বা শ্রমিক বিপ্লবের মাধ্যমেই পুঁজিবাদ ধ্বংস করে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

6. উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে পার্থক্য কী?

বিস্তারিত উত্তর

উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও এদের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে:

  • ১. সংজ্ঞা: সাম্রাজ্যবাদ হলো একটি রাষ্ট্রীয় নীতি বা ধারণা, যার মাধ্যমে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য দেশের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে চায়। অন্যদিকে, উপনিবেশবাদ হলো সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ, যেখানে একটি দেশ অন্য দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করে বা শাসন কায়েম করে।
  • ২. লক্ষ্য: সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা বিস্তার। উপনিবেশবাদের মূল লক্ষ্য হলো বিজিত দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ লুণ্ঠন ও শোষণ করা।
  • ৩. সম্পর্ক: সাম্রাজ্যবাদ হলো কারণ বা মতবাদ, আর উপনিবেশবাদ হলো তার ফলাফল। লেনিনের মতে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর।

7. ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ (Scramble for Africa) বা আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদ বলতে কী বোঝো?

বিস্তারিত উত্তর

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল ইউরোপীয়দের কাছে অজানা বা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ ছিল। কিন্তু ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে আফ্রিকার খনিজ সম্পদ (হীরে, সোনা), কাঁচামাল এবং বাজারের লোভে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে আফ্রিকা দখলের এক তীব্র ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইতালি প্রভৃতি দেশ আফ্রিকার বিভিন্ন অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। ঐতিহাসিকরা আফ্রিকা মহাদেশ দখলের এই নির্লজ্জ কাড়াকাড়িকেই ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদ বলে অভিহিত করেছেন।


8. বার্লিন সম্মেলনের (১৮৮৪-৮৫) প্রেক্ষাপট ও ফলাফল আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

প্রেক্ষাপট: ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। বিশেষ করে কঙ্গো ও নাইজার নদীর অববাহিকার অধিকার নিয়ে বিবাদ দেখা দেয়। এই বিবাদ মেটানোর জন্য জার্মান চ্যান্সেলর বিসমার্ক বার্লিনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকেন।

ফলাফল:

  • ১. কার্যকরী দখলদারিত্ব: স্থির হয় যে, কোনো দেশ আফ্রিকার কোনো উপকূল দখল করলে তা অন্য দেশগুলিকে জানাতে হবে এবং সেখানে কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • ২. কঙ্গো: কঙ্গোকে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • ৩. অবাধ বাণিজ্য: কঙ্গো ও নাইজার অববাহিকায় সকল দেশের বাণিজ্যের অধিকার স্বীকৃত হয়। এর মাধ্যমে আফ্রিকা ভাগাভাগি আইনি বৈধতা পায়।

9. ‘শ্বেতাঙ্গদের বোঝা’ (White Man’s Burden) তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করো।

বিস্তারিত উত্তর

সাম্রাজ্যবাদকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ইউরোপীয়রা বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করেছিল, যার অন্যতম হলো ‘শ্বেতাঙ্গদের বোঝা’। ইংরেজ কবি রুডইয়ার্ড কিপলিং তাঁর একটি কবিতায় এই তত্ত্বটি প্রচার করেন।

মূল বক্তব্য: এই তত্ত্বে বলা হয়, এশিয়া ও আফ্রিকার অ-ইউরোপীয় মানুষরা হলো ‘অসভ্য’, ‘বর্বর’ এবং ‘অর্ধ-দানব’। এই পিছিয়ে পড়া জাতিগুলিকে শিক্ষিত, সভ্য ও উন্নত করা শ্বেতাঙ্গ বা ইউরোপীয় জাতিগুলির ঈশ্বরপ্রদত্ত নৈতিক দায়িত্ব বা ‘বোঝা’। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক শোষণ ও অত্যাচারকে ‘সভ্যতার বিস্তার’ নামে চালিয়ে দেওয়ার একটি চতুর কৌশল।


10. চিনে ‘মুক্ত দ্বার নীতি’ (Open Door Policy) কেন ও কে ঘোষণা করেন?

বিস্তারিত উত্তর

ঘোষণাকারী: ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিব জন হে (John Hay) এই নীতি ঘোষণা করেন।

কারণ ও উদ্দেশ্য:

  • ঊনবিংশ শতকের শেষে ইউরোপীয় দেশগুলি (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি) চিনকে নিজেদের প্রভাবাধীন অঞ্চলে ভাগ করে নিচ্ছিল (‘চিনা তরমুজ’)।
  • আমেরিকা ভয় পায় যে, এর ফলে চিনে তাদের বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • তাই জন হে প্রস্তাব দেন যে, চিনে কোনো বিশেষ দেশের একচেটিয়া অধিকার থাকবে না। চিনের বাজার সকলের জন্য সমানভাবে খোলা থাকবে এবং সব দেশ সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। এটিই মুক্ত দ্বার নীতি।

11. বক্সার বিদ্রোহের (১৯০০) কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

কারণ: ঊনবিংশ শতকে চিনে বিদেশি শক্তিগুলির অবাধ লুণ্ঠন, খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং চিনা ঐতিহ্যের অবমাননায় চিনা জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই ক্ষোভ থেকেই ‘বক্সার’ বা ‘আই-হো-চুয়ান’ নামক গুপ্ত সমিতি বিদেশিদের চিন থেকে বিতাড়িত করার জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।

গুরুত্ব:

  • যদিও আটটি বিদেশি শক্তির যৌথ বাহিনীর কাছে এই বিদ্রোহ পরাজিত হয়, তবুও এটি চিনে মাঞ্চু রাজবংশের অযোগ্যতা ও দুর্বলতা সবার সামনে তুলে ধরে।
  • এই বিদ্রোহ চিনা জনগণের মনে তীব্র জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে, যা পরবর্তীকালে সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে চিনে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।

12. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণই ছিল উগ্র সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক রেষারেষি:

  • ১. বাজার দখল: শিল্প বিপ্লবের পর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স এশিয়া ও আফ্রিকায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। কিন্তু পরে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি ও ইতালি শিল্পের প্রসারের জন্য নতুন বাজারের দাবি জানায়, যা সংঘাতের সৃষ্টি করে।
  • ২. জার্মানির নীতি: কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ বা বিশ্ব রাজনীতি এবং নৌশক্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইংল্যান্ডকে শঙ্কিত করে তোলে।
  • ৩. মরক্কো ও বলকান সংকট: আফ্রিকা ও বলকান অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বৃহৎ শক্তিগুলির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব যুদ্ধের বারুদ জমা করে। লেনিন তাই বলেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদই যুদ্ধের জন্ম দেয়।”

13. সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড (Sarajevo Incident) সম্পর্কে টীকা লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ।

ঘটনা: ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভো ভ্রমণে যান। সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ নামক সার্বীয় সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্য গ্যাব্রিয়েল প্রিন্সিপ তাঁদের গুলি করে হত্যা করেন।

ফলাফল: অস্ট্রিয়া এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে বিভিন্ন দেশ মৈত্রী চুক্তির কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।


14. বলকান সংকট (Balkan Crisis) বলতে কী বোঝো?

বিস্তারিত উত্তর

ঊনবিংশ শতকে দুর্বল তুরস্ক সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বলকান অঞ্চলের খ্রিস্টান স্লাভ জাতিগুলি স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন শুরু করলে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে বলকান সংকট বা ‘পূর্ব সমস্যা’ বলা হয়।

  • ১. জাতীয়তাবাদ: গ্রিস, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া প্রভৃতি জাতি তুরস্কের শাসন থেকে মুক্তি চেয়ে আন্দোলন শুরু করে।
  • ২. বৃহৎ শক্তির হস্তক্ষেপ: রাশিয়া প্যান-স্লাভ আন্দোলনের নামে এই জাতিগুলিকে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে, অস্ট্রিয়া বলকানে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে রাশিয়ার বিরোধিতা করে।
  • ৩. ফলাফল: এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বলকান অঞ্চলকে ‘ইউরোপের বারুদের স্তূপে’ পরিণত করে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের কারণ হয়।

15. মরক্কো সংকট (Moroccan Crisis) কী?

বিস্তারিত উত্তর

উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে যে বিবাদ বাধে, তাকে মরক্কো সংকট বলা হয়।

  • ১. প্রথম সংকট (১৯০৫): ফ্রান্স মরক্কোয় নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইলে জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম মরক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার বন্দরে গিয়ে এর বিরোধিতা করেন।
  • ২. দ্বিতীয় সংকট (১৯১১): মরক্কোয় বিদ্রোহ দেখা দিলে ফ্রান্স সেনা পাঠায়। এর প্রতিবাদে জার্মানি তার ‘প্যান্থার’ নামক যুদ্ধজাহাজ আগাদির বন্দরে পাঠায় (আগাদির সংকট), যা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে।
  • ইংল্যান্ড ফ্রান্সকে সমর্থন করায় জার্মানি পিছু হটতে বাধ্য হয়, কিন্তু এর ফলে জার্মানির সাথে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের শত্রুতা তীব্র হয়।

16. কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ (Weltpolitik) নীতি কী?

বিস্তারিত উত্তর

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে বিসমার্কের পদত্যাগের পর জার্মানির সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম জার্মানিকে একটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত করার জন্য যে আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন, তাকে ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ বা বিশ্ব রাজনীতি বলা হয়।

মূল বৈশিষ্ট্য:

  • ১. জার্মানির নৌশক্তি বৃদ্ধি করে ইংল্যান্ডের সমকক্ষ হওয়া।
  • ২. এশিয়া ও আফ্রিকায় নতুন নতুন উপনিবেশ দখল করা (“সূর্যের নিচে জায়গা চাই”)।
  • ৩. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জার্মানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই নীতি ইংল্যান্ড ও অন্যান্য শক্তিকে শঙ্কিত করে তোলে।

17. ত্রিশক্তি আঁতাত ও ত্রিশক্তি মৈত্রী সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

ঊনবিংশ শতকের শেষে ইউরোপ প্রধান দুটি পরস্পরবিরোধী সামরিক জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

  • ১. ত্রিশক্তি মৈত্রী (Triple Alliance): ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সকে একঘরে করে রাখা।
  • ২. ত্রিশক্তি আঁতাত (Triple Entente): জার্মানির শক্তিবৃদ্ধিতে ভীত হয়ে ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে এই জোট গঠিত হয়।

এই দুই সশস্ত্র শিবিরের উপস্থিতি সামান্য ঘটনাতেই বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী ছিল।


18. তাইপিং বিদ্রোহের (১৮৫০-৬৪) গুরুত্ব কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

চিনে মাঞ্চু সরকারের দুর্বলতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাং-সিউ-চুয়ানের নেতৃত্বে সংঘটিত এই বিদ্রোহ আধুনিক চিনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

  • ১. গণআন্দোলন: এটি ছিল চিনের প্রথম বিশাল কৃষক ও গণআন্দোলন, যা প্রায় ১৪ বছর ধরে চলেছিল।
  • ২. দুর্বলতা প্রকাশ: বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে মাঞ্চু সরকার এই বিদ্রোহ দমন করে, যা প্রমাণ করে যে মাঞ্চু শাসকরা কতটা দুর্বল ও পরনির্ভরশীল ছিল।
  • ৩. জাতীয়তাবাদ: এই বিদ্রোহ চিনা জনগণের মনে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটায়, যা পরবর্তীকালে সান ইয়াৎ সেনের বিপ্লবে সাহায্য করে।

19. নানকিং-এর সন্ধির (১৮৪২) শর্ত ও গুরুত্ব লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

প্রথম আফিম যুদ্ধে চিনের পরাজয়ের পর ইংল্যান্ড ও চিনের মধ্যে এই সন্ধি হয়। এটি ছিল চিনের ওপর চাপানো প্রথম ‘অসম সন্ধি’ (Unequal Treaty)।

শর্তাবলী:

  • ১. চিন হংকং বন্দরটি চিরকালের জন্য ইংল্যান্ডকে ছেড়ে দেয়।
  • ২. ক্যান্টন, সাংহাই-সহ ৫টি বন্দর ব্রিটিশ বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
  • ৩. চিন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইংল্যান্ডকে ২১ মিলিয়ন ডলার দিতে বাধ্য হয়।

এর ফলে চিনের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হয় এবং বিদেশি শোষণের পথ প্রশস্ত হয়।


20. শিল্প বিপ্লব নারীর জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?

বিস্তারিত উত্তর

শিল্প বিপ্লব নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে মিশ্র প্রভাব ফেলেছিল:

  • ১. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (ইতিবাচক): নারীরা পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে কারখানায় কাজ করার সুযোগ পায়। নিজস্ব উপার্জনের ফলে তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
  • ২. শোষণ ও বঞ্চনা (নেতিবাচক): মালিকরা পুরুষদের চেয়ে নারীদের অনেক কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় (১২-১৪ ঘণ্টা) কাজ করাত।
  • ৩. পারিবারিক সংকট: মায়েরা দীর্ঘ সময় কারখানায় থাকায় শিশু পালন ও পারিবারিক জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করত।

21. সুয়েজ খাল খননের ফলে ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়েছিল?

বিস্তারিত উত্তর

১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ায় ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪০০০ মাইল কমে যায়। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:

  • ১. বাণিজ্যে গতি: ইংল্যান্ড থেকে ভারতে পণ্য আনা এবং ভারত থেকে কাঁচামাল নেওয়া অনেক সস্তা ও দ্রুততর হয়।
  • ২. শাসন সুদৃঢ়করণ: ব্রিটিশরা খুব কম সময়ে সেনা ও রসদ ভারতে পাঠাতে সক্ষম হয়, ফলে ভারতে তাদের ঔপনিবেশিক শাসন আরও শক্তপোক্ত হয়।
  • ৩. শোষণ বৃদ্ধি: ভারতের ওপর ব্রিটিশ অর্থনৈতিক শোষণ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

22. ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ (Black Hand) কী এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

পরিচয়: ‘ব্ল্যাক হ্যান্ড’ বা ‘ইউনিয়ন অফ ডেথ’ ছিল সার্বিয়ার একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সমিতি। ১৯১১ সালে এটি গঠিত হয়।

উদ্দেশ্য: এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বলকান অঞ্চল, বিশেষ করে বসনিয়া ও হারজেগোভিনাকে অস্ট্রিয়ার শাসন থেকে মুক্ত করে সার্বিয়ার নেতৃত্বে একটি বিশাল ‘যুক্ত স্লাভ রাষ্ট্র’ বা বৃহত্তর সার্বিয়া গঠন করা। এই দলের সদস্য গ্যাব্রিয়েল প্রিন্সিপই সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।


23. রুশ-জাপান যুদ্ধের (১৯০৪-০৫) গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

এই যুদ্ধে এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশ জাপান ইউরোপের বিশাল শক্তিশালী দেশ রাশিয়াকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এর গুরুত্ব অপরিসীম:

  • ১. শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের পতন: এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে ইউরোপীয়রা অপরাজেয় নয়। ‘শ্বেতাঙ্গদের অজেয়’ থাকার মিথ ভেঙে যায়।
  • ২. জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: জাপানের এই জয় এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলিতে (যেমন ভারত) প্রবল জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।
  • ৩. রাশিয়ার দুর্বলতা: এই পরাজয় রাশিয়ার জারের দুর্বলতা প্রকট করে এবং রাশিয়ায় ১৯০৫ সালের বিপ্লব ত্বরান্বিত করে।

24. প্যান-স্লাভ আন্দোলন (Pan-Slav Movement) সম্পর্কে টীকা লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

ঊনবিংশ শতকে বলকান অঞ্চলে বসবাসকারী স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর (সার্ব, বুলগেরীয়, মন্টিনিগ্রোবাসী) মধ্যে জাতীয়তাবাদী জাগরণ ঘটে। তারা তুরস্ক ও অস্ট্রিয়ার শাসন থেকে মুক্তি চেয়ে রাশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আন্দোলন শুরু করে। একেই প্যান-স্লাভ বা সর্ব-স্লাভ আন্দোলন বলা হয়।

রাশিয়া এই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বলকানে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে অস্ট্রিয়ার সাথে তার সংঘাত বাধে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।


25. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বারুদ আগেই জমেছিল, কিন্তু ১৯১৪ সালের ২৮ জুন সংঘটিত ‘সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড’ ছিল সেই বারুদে দেওয়া আগুনের স্ফুলিঙ্গ।

বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভোতে এক সার্বীয় সন্ত্রাসবাদী অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্দিনান্দকে হত্যা করে। অস্ট্রিয়া এই ঘটনার জন্য সার্বিয়া সরকারকে দায়ী করে চরমপত্র দেয়। সার্বিয়া তা পুরোপুরি মানতে অস্বীকার করলে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফলেই মৈত্রী জোটের দেশগুলি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।


26. শিল্প বিপ্লব কীভাবে শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম দেয়?

বিস্তারিত উত্তর

শিল্প বিপ্লবের ফলে মালিকরা শ্রমিকদের ওপর চরম শোষণ চালাত। কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।

এই শোষণের বিরুদ্ধেই শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। তারা নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ বা শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলে এবং ধর্মঘট ও আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। এভাবেই শিল্প বিপ্লব পরোক্ষভাবে শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম দেয়।


Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার