নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় -4 : শিল্প বিপ্লব, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ ৮ নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৪: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৮)

প্রশ্ন ১: ইংল্যান্ডে কেন সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল? এর কারণগুলি আলোচনা করো।

ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে, তাকে ‘শিল্প বিপ্লব’ বলা হয়। এই বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। তবে এই বিপ্লব ফ্রান্স বা জার্মানিতে না হয়ে ইংল্যান্ডেই প্রথম শুরু হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, এর পেছনে অনুকূল ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল।

১. অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ:

ইংল্যান্ডের আবহাওয়া ছিল স্যাঁতসেঁতে, যা সুতো কাটার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এছাড়া, ইংল্যান্ডের খনিগুলিতে শিল্পের অপরিহার্য উপাদান—কয়লা ও লোহা প্রচুর পরিমাণে এবং একে অপরের খুব কাছাকাছি পাওয়া যেত। এর ফলে ভারী যন্ত্রপাতি তৈরি এবং কারখানা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও কাঁচামাল হাতের কাছেই মিলত।

২. ঔপনিবেশিক বাজার ও কাঁচামাল:

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ড বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে (যেমন—ভারত, উত্তর আমেরিকা) এক বিশাল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল।

কাঁচামাল: ইংল্যান্ড নিজের উপনিবেশগুলো থেকে অত্যন্ত সস্তায় তুলা, নীল ও অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারত।

বাজার: ইংল্যান্ডে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশগুলো ছিল একচেটিয়া ও নিশ্চিত বাজার।

৩. মূলধনের প্রাচুর্য:

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ইংরেজ বণিকরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিল। কৃষি বিপ্লব ও বাণিজ্যের লভ্যাংশ থেকে সঞ্চিত এই বিপুল মূলধন তারা নতুন নতুন কলকারখানা ও শিল্পে বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড (১৬৯৪)-এর প্রতিষ্ঠা মূলধন জোগান দেওয়া আরও সহজ করে দেয়।

৪. সুলভ শ্রমিক ও উন্নত পরিবহন:

‘এনক্লোজার আন্দোলন’-এর ফলে গ্রামের হাজার হাজার কৃষক জমি হারিয়ে শহরে ভিড় করে। এরা কারখানার সস্তা শ্রমিকে পরিণত হয়। এছাড়া, ইংল্যান্ডের উন্নত নদীপথ এবং পরবর্তীকালে রেলপথ ও পিচ ঢালা রাস্তা পণ্য পরিবহনে গতি আনে।

৫. বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার:

ইংরেজরা ছিল খুব উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। জন কে-র ‘উড়ন্ত মাকু’, হারগ্রিভসের ‘স্পিনিং জেনি’, আর্করাইটের ‘ওয়াটার ফ্রেম’ এবং জেমস ওয়াটের ‘বাষ্পীয় ইঞ্জিন’ আবিষ্কার উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপ্লব এনেছিল।

উপসংহার: উপরোক্ত কারণগুলির সম্মিলিত প্রভাবেই ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। এর ফলেই ইংল্যান্ড ‘বিশ্বের কারখানা’ (Workshop of the World)-য় পরিণত হয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে তার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।


প্রশ্ন ২: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই যুদ্ধের পেছনে কোনো একটিমাত্র কারণ দায়ী ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বারুদের স্তূপে একটি স্ফুলিঙ্গ এই মহাযুদ্ধের সূচনা করে।

১. উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ:

ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। প্রতিটি জাতি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করত এবং অন্যকে ঘৃণা করত। এর সাথে যুক্ত হয় সাম্রাজ্যবাদী লোলুপতা। এশিয়া ও আফ্রিকার বাজার দখলকে কেন্দ্র করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে তীব্র রেষারেষি শুরু হয়। জার্মানি নৌশক্তি বাড়িয়ে ইংল্যান্ডের সমকক্ষ হতে চাইলে ইংল্যান্ড শঙ্কিত হয়।

২. পরস্পরবিরোধী সামরিক জোট:

ইউরোপের দেশগুলি নিরাপত্তার অজুহাতে দুটি সশস্ত্র শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

ত্রিশক্তি মৈত্রী (Triple Alliance): ১৮৮২ সালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালির মধ্যে।

ত্রিশক্তি আঁতাত (Triple Entente): ১৯০৭ সালে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে।
এই জোটবদ্ধ রাজনীতি ইউরোপে যুদ্ধের আবহাওয়া তৈরি করে।

৩. মরক্কো ও বলকান সংকট:

আফ্রিকার মরক্কো নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির বিরোধ (১৯০৫ ও ১৯১১) এবং বলকান অঞ্চলে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের লড়াই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। বলকান অঞ্চলকে বলা হতো ‘ইউরোপের বারুদের স্তূপ’

৪. কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের নীতি:

জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়ামের ‘ওয়েল্ট পলিটিক’ বা বিশ্ব রাজনীতি ছিল অত্যন্ত আগ্রাসী। তিনি জার্মানিকে বিশ্বশক্তিতে পরিণত করতে গিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে শত্রুতে পরিণত করেন।

৫. প্রত্যক্ষ কারণ (সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড):

১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভোতে এক সার্বীয় সন্ত্রাসবাদীর (ব্ল্যাক হ্যান্ড গোষ্ঠী) গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রিয়া এর জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ২৮ জুলাই যুদ্ধ ঘোষণা করে। ক্রমে মৈত্রী জোটের দেশগুলি এতে জড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

উপসংহার: সুতরাং, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং সামরিক জোটের রাজনীতির ফলেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড ছিল কেবল বারুদে দেওয়া আগুন।


প্রশ্ন ৩: ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল ইউরোপীয়দের কাছে অজানা ও দুর্গম ছিল। তাই একে বলা হতো ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’। কিন্তু ১৮৭০-এর দশকের পর থেকে ইউরোপীয় শক্তিগুলি আফ্রিকার সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যে নির্লজ্জ কাড়াকাড়ি শুরু করে, তাকেই ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বলা হয়।

১. আফ্রিকা দখলের কারণ:

  • সম্পদ ও কাঁচামাল: লিভিংস্টোন ও স্ট্যানলির মতো পর্যটকদের অভিযানের ফলে জানা যায় যে আফ্রিকায় প্রচুর হীরে, সোনা, তামা, রবার ও হাতির দাঁত রয়েছে। শিল্পের প্রয়োজনে এই সম্পদ দখল করা জরুরি ছিল।
  • বাজার: ইউরোপের অতিরিক্ত পণ্য বিক্রির জন্য আফ্রিকার বাজার দখল করা প্রয়োজন ছিল।
  • ধর্ম প্রচার ও জাতীয় মর্যাদা: খ্রিস্টান মিশনারিরা ধর্ম প্রচারের জন্য এবং রাষ্ট্রনায়করা নিজ দেশের মর্যাদা বাড়াতে আফ্রিকা দখলে উৎসাহী ছিলেন।

২. বার্লিন সম্মেলন (১৮৮৪-৮৫):

আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতায় যাতে ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে যুদ্ধ না বাধে, সেই উদ্দেশ্যে জার্মানির চ্যান্সেলর বিসমার্ক বার্লিনে একটি সম্মেলন ডাকেন। এখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘কার্যকরী দখলদারিত্বের’ ভিত্তিতে আফ্রিকাকে ভাগ করে নেওয়া হবে।

৩. আফ্রিকার ব্যবচ্ছেদ বা ভাগাভাগি:

বার্লিন সম্মেলনের পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় গোটা আফ্রিকা মহাদেশ ভাগ হয়ে যায়:

ইংল্যান্ড: মিশর, সুদান, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা দখল করে।

ফ্রান্স: আলজেরিয়া, মরক্কো, টিউনিসিয়া, মাদাগাস্কার ও পশ্চিম আফ্রিকার বিশাল এলাকা দখল করে।

বেলজিয়াম: রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিশাল কঙ্গো অববাহিকা দখল করেন।

জার্মানি ও ইতালি: জার্মানি পায় টোগোল্যান্ড, ক্যামেরুন এবং ইতালি পায় লিবিয়া ও সোমালিল্যান্ড।

উপসংহার: ১৯১৪ সালের মধ্যে ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া ছাড়া সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত হয়। এর ফলে আফ্রিকার নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংস হয় এবং সেখানকার মানুষ দীর্ঘস্থায়ী দাসত্ব ও শোষণের শিকার হয়।

প্রশ্ন ৪: শিল্প বিপ্লবের সুফল ও কুফল (বা প্রভাব) আলোচনা করো।

ভূমিকা: শিল্প বিপ্লব ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং মিশ্র। একদিকে এটি মানুষকে অকল্পনীয় সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিল, অন্যদিকে ডেকে এনেছিল চরম বৈষম্য ও দুর্ভোগ।

সুফল (Positive Effects):

  • ১. উৎপাদন বৃদ্ধি: যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে খুব কম সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র সস্তা ও সহজলভ্য হয়।
  • ২. যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি: বাষ্পীয় ইঞ্জিন, রেলগাড়ি ও স্টিমার আবিষ্কারের ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ হয়।
  • ৩. নগরায়ন: শিল্পকে কেন্দ্র করে ম্যাঞ্চেস্টার, লিভারপুল, ল্যাঙ্কাশায়ারের মতো নতুন নতুন উন্নত শহর গড়ে ওঠে।
  • ৪. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: মানুষের আয় বাড়ে এবং ভোগবিলাসের সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

কুফল (Negative Effects):

  • ১. কুটির শিল্পের ধ্বংস: কারখানার সস্তা পণ্যের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে গ্রামের তাঁতি ও কারিগরদের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। বেকারের সংখ্যা বাড়ে।
  • ২. সমাজ বিভাজন ও শোষণ: সমাজ ‘মালিক’ ও ‘শ্রমিক’—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ হয়ে যায়। মালিকরা শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি দিয়ে অমানবিক শোষণ করত।
  • ৩. বস্তি সমস্যা ও স্বাস্থ্যহানি: শহরের ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে গাদাগাদি করে থাকার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে মহামারী ছড়িয়ে পড়ত।
  • ৪. নারী ও শিশুশ্রম: কারখানায় কম বেতনে নারী ও শিশুদের দিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটানো হতো।
  • ৫. সাম্রাজ্যবাদ: কাঁচামাল ও বাজারের প্রয়োজনে ইউরোপীয় দেশগুলি এশিয়া ও আফ্রিকায় উপনিবেশ দখলে মেতে ওঠে, যা পরাধীনতার জন্ম দেয়।

উপসংহার: শিল্প বিপ্লব মানব সভ্যতাকে আধুনিকতার আলোয় নিয়ে এলেও এর অন্ধকার দিকটিও কম ছিল না। ঐতিহাসিক টয়েনবি তাই একে ‘মিশ্র আশীর্বাদ’ বলেছেন।


প্রশ্ন ৫: কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করো।

ভূমিকা: বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জনক কার্ল মার্কস মানব সমাজের ইতিহাসকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর এই ব্যাখ্যাই ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ নামে পরিচিত।

মূল বক্তব্য:

মার্কসের মতে, ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি কোনো মহাপুরুষ বা রাজা নন, বরং তা হলো ‘অর্থনীতি’ বা উৎপাদনের উপাদান। মানুষ কীভাবে জীবনধারণের উপকরণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান) উৎপাদন করে, তার ওপরই সমাজের গঠন নির্ভর করে।

সমাজের দুটি কাঠামো:

মার্কস সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন:

১. ভিত্তি (Base): এটি হলো সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বা উৎপাদন ব্যবস্থা।

২. উপরিসৌধ (Superstructure): ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের আইন, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি। মার্কস বলেন, ভিত্তি (অর্থনীতি) পাল্টালে উপরিসৌধও পাল্টে যায়।

ইতিহাসের পর্যায়ক্রম:

উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে ইতিহাস ৫টি যুগে বিবর্তিত হয়েছে:

১) আদিম সাম্যবাদী সমাজ: এখানে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না।

২) দাস সমাজ: সমাজ ‘মালিক’ ও ‘দাস’—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়।

৩) সামন্ততান্ত্রিক সমাজ: এখানে জমিদার ও ভূমিদাসদের সংঘাত প্রধান ছিল।

৪) পুঁজিবাদী সমাজ: শিল্প বিপ্লবের ফলে এই সমাজের উদ্ভব। এখানে মালিক (বুর্জোয়া) ও শ্রমিক (প্রলেতারিয়েত) প্রধান দুই শ্রেণি।

৫) সমাজতান্ত্রিক সমাজ: মার্কসের মতে, শ্রমিক বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদের পতন ঘটবে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

উপসংহার: মার্কসের এই তত্ত্ব ইতিহাস চর্চায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। তিনি প্রমাণ করেন যে, ইতিহাস হলো আসলে শ্রেণী সংগ্রামেরই ইতিহাস।


প্রশ্ন ৬: বিংশ শতকে ইউরোপীয় শক্তিগুলির ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

ভূমিকা: শিল্প বিপ্লবের পর এশিয়া ও আফ্রিকার সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তা বিংশ শতকের শুরুতে চরম আকার ধারণ করে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণ:

  • ১. কাঁচামাল ও বাজার: শিল্পের চাকা সচল রাখতে সস্তা কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য সংরক্ষিত বাজারের প্রয়োজন ছিল।
  • ২. পুঁজি বিনিয়োগ: শিল্পোন্নত দেশগুলিতে প্রচুর অলস পুঁজি জমেছিল। সেই পুঁজি উপনিবেশে বিনিয়োগ করে (রেলপথ, খনি) অধিক মুনাফা লাভের আশা ছিল।
  • ৩. জাতীয় মর্যাদা: উপনিবেশ থাকাকে তখন ‘জাতীয় কৌলীন্য’ বা মর্যাদার প্রতীক মনে করা হতো। জার্মানি ও ইতালির মতো নতুন দেশগুলোও এই দৌড়ে শামিল হয়।
  • ৪. জার্মানির নীতি: কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম ঘোষণা করেন, “সূর্যের নিচে জার্মানিরও জায়গা চাই”। তাঁর এই আগ্রাসী নীতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে ক্ষুব্ধ করে।

ফলাফল:

  • ১. আন্তর্জাতিক সংকট: এই রেষারেষির ফলে মরক্কো সংকট, আগাদির সংকট, বলকান সংকটের মতো একাধিক আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়।
  • ২. সামরিক জোট গঠন: পারস্পরিক ভীতি থেকে ইউরোপ ‘ত্রিশক্তি মৈত্রী’ ও ‘ত্রিশক্তি আঁতাত’—এই দুই সশস্ত্র শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
  • ৩. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: ঔপনিবেশিক স্বার্থের এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়।

উপসংহার: লেনিন যথার্থই বলেছিলেন, “সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর এবং এটিই যুদ্ধের জন্ম দেয়।” বিংশ শতকের ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই উক্তির সত্যতা প্রমাণ করে।

শিক্ষার্থীদের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) — শিল্প বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদ

🏭 কেন ইংল্যান্ডেই সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল?

এর প্রধান কারণগুলো হলো: ১) ইংল্যান্ডে প্রচুর কয়লা ও লোহার খনি ছিল। ২) তাদের বিশাল ঔপনিবেশিক বাজার (যেমন ভারত) থেকে সস্তায় কাঁচামাল আনা ও পণ্য বিক্রি করা সহজ ছিল। ৩) বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা।

🛠️ ফ্যাক্টরি প্রথা (Factory System) কী?

শিল্প বিপ্লবের ফলে কুটির শিল্পের বদলে বড় বড় কারখানায় বা ফ্যাক্টরিতে হাজার হাজার শ্রমিক দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে যে বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাকেই ফ্যাক্টরি প্রথা বলা হয়।

লুডাইট দাঙ্গা (Luddite Riots) কেন হয়েছিল?

ইংল্যান্ডে নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ে। তারা মনে করত যন্ত্রই তাদের শত্রু। তাই নেড লুড-এর নেতৃত্বে ১৮১১-১২ সালে তারা কারখানার মেশিন ভাঙার আন্দোলন শুরু করে, যা লুডাইট দাঙ্গা নামে পরিচিত।

🌍 ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ (Scramble for Africa) বলতে কী বোঝো?

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলি (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি) আফ্রিকার সম্পদ ও ভূখণ্ড দখলের জন্য যে তীব্র ও নির্লজ্জ কাড়াকাড়ি বা প্রতিযোগিতা শুরু করে, তাকেই ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বলা হয়।

🇨🇳 চিনে ‘মুক্ত দ্বার নীতি’ (Open Door Policy) কে ঘোষণা করেন?

১৮৯৯ সালে আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিব জন হে এই নীতি ঘোষণা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল চিনে কোনো বিশেষ দেশের একচেটিয়া অধিকার না থাকা এবং সব দেশের বাণিজ্যের জন্য সমান সুযোগ রাখা।

🚢 সুয়েজ খাল খননের গুরুত্ব কী ছিল?

১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার ফলে ইউরোপ থেকে ভারতে আসার পথ প্রায় ৪০০০ মাইল কমে যায়। এতে যাতায়াত ও বাণিজ্যের সময় এবং খরচ অনেক কমে যায়, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধি করে।

🔫 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?

১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সেরাজেভোতে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দকে এক সার্বীয় সন্ত্রাসবাদী হত্যা করে। এই ‘সেরাজেভো হত্যাকাণ্ড’-ই ছিল বিশ্বযুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার