নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 7 জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ 4 নম্বরের প্রশ্নত্তোর
অধ্যায় ৭: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৪)
1. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UNO) গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৯৪৫ সালে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মহান লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সনদের ১নং ধারায় এর উদ্দেশ্যগুলি বর্ণিত হয়েছে।
উদ্দেশ্যসমূহ:
- শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা: জাতিপুঞ্জের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের মধ্যে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য একে অপরকে সহযোগিতা করা।
- মানবাধিকার রক্ষা: জাতিপুঞ্জ মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
2. লিগ অফ নেশনস বা জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তির জন্য ১৯২০ সালে লিগ অফ নেশনস গঠিত হলেও তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আটকাতে ব্যর্থ হয়। এর কারণগুলি হলো:
- আমেরিকার অনুপস্থিতি: মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন লিগের প্রধান উদ্যোক্তা হলেও আমেরিকার সিনেটের আপত্তিতে আমেরিকা এর সদস্য হয়নি। ফলে শুরুতেই লিগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
- নিজস্ব বাহিনীর অভাব: লিগের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী ছিল না। আগ্রাসী দেশকে শায়েস্তা করার মতো ক্ষমতা এর ছিল না।
- তোষণ নীতি: লিগের প্রধান দুই শক্তি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিজেদের স্বার্থে জার্মানি ও ইতালিকে তোষণ করে চলেছিল, যা লিগকে অকার্যকর করে দেয়।
- সদস্যদের স্বার্থপরতা: জাপান, জার্মানি ও ইতালি যখন ইচ্ছে লিগ ত্যাগ করে এবং অন্য দেশ আক্রমণ করে, তখন লিগ কিছুই করতে পারেনি।
3. নিরাপত্তা পরিষদের গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
গঠন: নিরাপত্তা পরিষদ হলো জাতিপুঞ্জের শাসন বিভাগ। এটি ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত—৫টি স্থায়ী (আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চিন) এবং ১০টি অস্থায়ী সদস্য। অস্থায়ী সদস্যরা ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।
কার্যাবলি:
- শান্তি রক্ষা: বিশ্বশান্তি রক্ষা করা এবং বিবাদমান দেশগুলির মধ্যে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করা এর প্রধান কাজ।
- শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: কোনো দেশ শান্তি ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা সামরিক অবরোধ আরোপ করা।
- নতুন সদস্য গ্রহণ: নতুন রাষ্ট্রকে জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ দেওয়ার জন্য সাধারণ সভার কাছে সুপারিশ করা।
- মহাসচিব নিয়োগ: জাতিপুঞ্জের মহাসচিব নিয়োগের জন্য নাম সুপারিশ করা।
4. জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের (Secretary General) ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: মহাসচিব হলেন জাতিপুঞ্জের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে সাধারণ সভা ৫ বছরের জন্য তাঁকে নিয়োগ করে।
ক্ষমতা ও কাজ:
- প্রশাসনিক কাজ: তিনি জাতিপুঞ্জের সব বৈঠকের আয়োজন করেন, বাজেট পেশ করেন এবং কর্মচারীদের নিয়োগ করেন।
- রাজনৈতিক কাজ: বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন (৯৯নং ধারা অনুযায়ী)।
- কূটনৈতিক কাজ: বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তিনি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।
- প্রতিনিধিত্ব: তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাতিপুঞ্জের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।
5. সাধারণ সভাকে (General Assembly) ‘বিশ্বের নাগরিক সভা’ বলা হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: সাধারণ সভা হলো জাতিপুঞ্জের একমাত্র অঙ্গ যেখানে সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব থাকে।
কারণসমূহ:
- সর্বজনীনতা: বর্তমানে ১৯৩টি স্বাধীন রাষ্ট্র এর সদস্য। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র সব রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভোটাধিকার এখানে সমান (১টি করে ভোট)।
- আলোচনার মঞ্চ: বিশ্বের যেকোনো সমস্যা, যেমন—যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পরিবেশ দূষণ বা দারিদ্র্য নিয়ে এখানে খোলামেলা আলোচনা ও বিতর্ক করা যায়।
- বিশ্ব জনমত: এখানে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি বিশ্ব জনমতের প্রতিফলন ঘটায়। তাই মার্কিন সিনেটর ভ্যান্ডেনবার্গ একে ‘বিশ্বের নগর সভা’ (Town Meeting of the World) বা ‘বিশ্বের বিতর্ক সভা’ বলে অভিহিত করেছেন।
6. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO জাতিপুঞ্জের একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যার সদর দপ্তর জেনেভায়।
উদ্দেশ্য ও কাজ:
- রোগ প্রতিরোধ: ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডস, কোভিড-১৯ এর মতো সংক্রামক ব্যাধি নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা।
- স্বাস্থ্য সচেতনতা: মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা, পুষ্টি এবং পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
- সহায়তা: অনুন্নত দেশগুলিতে ওষুধ, টিকা এবং চিকিৎসক পাঠিয়ে সাহায্য করা।
- গবেষণা: নতুন নতুন রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে গবেষণা করা এবং স্বাস্থ্যবিধির মান নির্ধারণ করা।
7. ইউনেস্কো (UNESCO)-এর ভূমিকা বা কার্যাবলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: UNESCO (United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization) জাতিপুঞ্জের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা।
কার্যাবলি:
- শিক্ষার প্রসার: বিশ্বজুড়ে নিরক্ষরতা দূর করা এবং নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
- ঐতিহ্য সংরক্ষণ: বিশ্বের প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ (World Heritage) হিসেবে ঘোষণা ও সংরক্ষণ করা।
- সাংস্কৃতিক বিনিময়: বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটিয়ে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করা।
- শান্তি প্রতিষ্ঠা: এর মূল মন্ত্র হলো—”যেহেতু যুদ্ধের শুরু মানুষের মনে, তাই শান্তিরক্ষার কাজও মানুষের মনেই শুরু করতে হবে।”
8. আন্তর্জাতিক বিচারালয় (ICJ)-এর গঠন ও কার্যাবলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: জাতিপুঞ্জের প্রধান বিচার বিভাগীয় সংস্থা হলো আন্তর্জাতিক বিচারালয়, যা নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত।
গঠন: নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ সভার দ্বারা নির্বাচিত ১৫ জন বিচারক নিয়ে এটি গঠিত। বিচারকদের কার্যকাল ৯ বছর। তবে কোনো দেশ থেকে একাধিক বিচারক থাকতে পারেন না।
কার্যাবলি:
- বিরোধ নিষ্পত্তি: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমানা বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার বিচার ও নিষ্পত্তি করা।
- আইনি পরামর্শ: সাধারণ সভা বা নিরাপত্তা পরিষদ কোনো আইনি বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তা প্রদান করা।
9. আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর উদ্দেশ্য ও কাজ কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং পরে জাতিপুঞ্জের বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত ILO-এর সদর দপ্তর জেনেভায় অবস্থিত। এটি বিশ্বের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।
উদ্দেশ্য ও কাজ:
- শ্রমিক অধিকার: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কাজের সময় ও পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- জীবনযাত্রার মান: শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা।
- শিশুশ্রম রোধ: শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা প্রদান করা।
- মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক: মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিয়ম তৈরি করা।
10. ইউনিসেফ (UNICEF)-এর কার্যাবলি আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিসেফ (United Nations Children’s Fund) মূলত বিশ্বের শিশুদের কল্যাণে নিবেদিত। ১৯৬৫ সালে এটি নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়।
কার্যাবলি:
- জরুরি সহায়তা: যুদ্ধবিধ্বস্ত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জরুরি খাদ্য, পানীয় জল ও ওষুধ সরবরাহ করা।
- স্বাস্থ্য রক্ষা: শিশুদের টিকাকরণ ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা করা।
- শিক্ষা বিস্তার: শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
- অধিকার রক্ষা: শিশুশ্রম ও শিশু পাচার রোধে কাজ করা।
11. লিগ অফ নেশনস ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: উভয় সংস্থাই বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য গঠিত হলেও এদের মধ্যে গঠনগত ও কার্যগত পার্থক্য রয়েছে।
| বিষয় | লিগ অফ নেশনস | সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ |
|---|---|---|
| সদস্যপদ | আমেরিকা এর সদস্য ছিল না, যা একে দুর্বল করেছিল। | আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ (১৯৩টি) এর সদস্য। |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণ | সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে হতো, যা কঠিন ছিল। | সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা সহজ। |
| সামরিক ক্ষমতা | আক্রমণকারীকে বাধা দেওয়ার মতো কোনো বাহিনী ছিল না। | প্রয়োজনে সদস্য দেশগুলোর সাহায্যে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে পারে। |
12. অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC)-এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: জাতিপুঞ্জ কেবল রাজনৈতিক সংস্থাই নয়, এটি বিশ্বের জনকল্যাণেও কাজ করে। এই কাজের মূল দায়িত্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের।
গুরুত্ব:
- উন্নয়নমূলক কাজ: অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত করা, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এটি সাহায্য করে।
- মানবাধিকার: বিশ্বজুড়ে নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষায় এটি কাজ করে।
- সমন্বয় সাধন: এটি জাতিপুঞ্জের বিভিন্ন বিশেষ সংস্থা (WHO, UNESCO, ILO)-র কাজের তদারকি ও সমন্বয় করে, যা বিশ্বশান্তির পরোক্ষ ভিত্তি।