নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 7 জাতিসংঘ ও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ৮ নম্বরের প্রশ্নত্তোর
অধ্যায় ৭: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৮)
প্রশ্ন ১: লিগ অফ নেশনস বা জাতিপুঞ্জ (১৯২০) গঠনের উদ্দেশ্য এবং এর ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো।
ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের ‘চৌদ্দ দফা নীতি’র ভিত্তিতে ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি লিগ অফ নেশনস বা জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়।
লিগ গঠনের উদ্দেশ্য:
- ১. বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা: লিগের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা।
- ২. বিবাদের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা: যুদ্ধের পরিবর্তে আলাপ-আলোচনা, সালিশি বা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ মেটানো।
- ৩. নিরাপত্তা প্রদান: ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা (১০নং ধারা অনুযায়ী)।
- ৪. নিরস্ত্রীকরণ: বিশ্বের দেশগুলিকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে এবং মারণাস্ত্র কমাতে উৎসাহিত করা।
- ৫. জনকল্যাণ: শ্রমিক কল্যাণ, নারী ও শিশু পাচার রোধ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা।
লিগের ব্যর্থতার কারণসমূহ:
মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হলেও লিগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আটকাতে ব্যর্থ হয়। এর কারণগুলি হলো—
- ১. আমেরিকার অনুপস্থিতি: লিগের প্রধান রূপকার উড্রো উইলসন হলেও, আমেরিকার সিনেট রাজি না হওয়ায় আমেরিকা লিগের সদস্য হয়নি। ফলে শুরুতেই লিগ শক্তিহীন হয়ে পড়ে।
- ২. নিজস্ব বাহিনীর অভাব: লিগের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী ছিল না। আগ্রাসী দেশগুলিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। তাকে সদস্য দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো, যারা সাহায্য করতে চাইত না।
- ৩. তোষণ নীতি: লিগের প্রধান দুই চালিকাশক্তি—ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিজেদের স্বার্থে জার্মানি ও ইতালিকে তোষণ করত। তারা লিগের নীতিকে গুরুত্ব দিত না।
- ৪. একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসন: ১৯৩০-এর দশকে হিটলার, মুসোলিনি ও জাপানের তোজো লিগকে তোয়াক্কা না করে আগ্রাসন চালাতে থাকে (যেমন—মাঞ্চুরিয়া দখল, আবিসিনিয়া দখল)। লিগ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়।
- ৫. সদস্যপদ ত্যাগ: শক্তিশালী দেশগুলি (জাপান, জার্মানি, ইতালি) যখন খুশি লিগ ত্যাগ করেছে এবং লিগ কিছুই করতে পারেনি।
উপসংহার: লিগ অফ নেশনস ব্যর্থ হলেও এটি ছিল বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রথম আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা। এর ব্যর্থতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়।
প্রশ্ন ২: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের (UNO) উদ্দেশ্য ও নীতিগুলি আলোচনা করো।
ভূমিকা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সনদের ১ ও ২নং ধারায় এর উদ্দেশ্য ও নীতিগুলি স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।
জাতিপুঞ্জের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ (১নং ধারা):
- ১. শান্তি ও নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- ২. বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
- ৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য একে অপরকে সহযোগিতা করা।
- ৪. কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা: এই উদ্দেশ্যগুলি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।
জাতিপুঞ্জের মূল নীতিসমূহ (২নং ধারা):
- ১. সার্বভৌম সমতা: জাতিপুঞ্জের কাছে ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব সদস্য রাষ্ট্র সমান সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
- ২. প্রতিশ্রুতি পালন: সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সনদের নিয়মাবলি ও প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে হবে।
- ৩. শান্তিপূর্ণ মীমাংসা: আন্তর্জাতিক বিরোধের মীমাংসা শান্তিপূর্ণ উপায়ে করতে হবে, যাতে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত না হয়।
- ৪. শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ: কোনো দেশ অন্য দেশের স্বাধীনতা বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি দিতে পারবে না।
- ৫. সহায়তা দান: জাতিপুঞ্জ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে তাতে সাহায্য করতে হবে।
- ৬. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা: কোনো দেশের ঘরোয়া বা অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে জাতিপুঞ্জ হস্তক্ষেপ করবে না।
উপসংহার: এই উদ্দেশ্য ও নীতিগুলি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই জাতিপুঞ্জ গত সাত দশক ধরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রুখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কার্যাবলি (রাজনৈতিক ও অ-রাজনৈতিক) আলোচনা করো।
ভূমিকা: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কেবল যুদ্ধ থামানোর সংস্থা নয়, এটি বিশ্বের সার্বিক কল্যাণেও কাজ করে। এর কাজকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—রাজনৈতিক ও অ-রাজনৈতিক।
ক. রাজনৈতিক কার্যাবলি (শান্তি রক্ষা):
জাতিপুঞ্জের প্রধান রাজনৈতিক কাজ হলো বিশ্বশান্তি রক্ষা করা।
- ১. বিবাদ মীমাংসা: আলাপ-আলোচনা ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিবাদ মেটানো। যেমন—ইন্দোনেশিয়া থেকে ডাচ সেনা প্রত্যাহার, সুয়েজ সংকট সমাধান ইত্যাদি।
- ২. শান্তিরক্ষা বাহিনী প্রেরণ: যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তিরক্ষী বাহিনী (Peacekeeping Force) পাঠানো। যেমন—কঙ্গো, সাইপ্রাস, লেবানন ও কাশ্মীরে শান্তিরক্ষী পাঠানো।
- ৩. নিরস্ত্রীকরণ: পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার রোধ (CTBT, NPT) এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমানোর জন্য কাজ করা।
- ৪. বি-ঔপনিবেশায়ন: পরাধীন দেশগুলিকে স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করা (যেমন—লিবিয়া, সোমালিয়া, ঘানা)।
খ. অ-রাজনৈতিক বা জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি:
রাজনৈতিক কাজের চেয়ে জাতিপুঞ্জ মানবকল্যাণে বেশি সফল। এর বিশেষ সংস্থাগুলি (WHO, UNESCO, UNICEF, ILO) এই কাজ করে।
- ১. স্বাস্থ্য রক্ষা: WHO-এর মাধ্যমে বসন্ত, ম্যালেরিয়া, পোলিও নির্মূল করা এবং মহামারী (কোভিড-১৯) মোকাবিলা করা।
- ২. শিশু ও নারী কল্যাণ: UNICEF-এর মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি শিশুর খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা।
- ৩. শিক্ষা ও সংস্কৃতি: UNESCO-এর মাধ্যমে নিরক্ষরতা দূর করা এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা।
- ৪. মানবাধিকার ও শরণার্থী: মানবাধিকার রক্ষা করা এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার: রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভেটোর কারণে জাতিপুঞ্জ অনেক সময় ব্যর্থ হলেও, অ-রাজনৈতিক বা জনকল্যাণমূলক কাজে এর সাফল্য অভূতপূর্ব।