নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 1 ‘ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক’ মান ৪
অধ্যায় ১: ফরাসি বিপ্লব – রচনাধর্মী প্রশ্ন (মান – ৮)
প্রশ্ন ১: ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলি আলোচনা করো। (২+৩+৩)
ভূমিকা: ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক অনাচার, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক শোষণের বারুদে অগ্নিসংযোগের ফলেই এই বিপ্লবের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ঐতিহাসিকরা এই পটভূমিকে ‘পুরাতন তন্ত্র’ (Ancien Regime) বলে অভিহিত করেছেন।
১. রাজনৈতিক কারণ:
- স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র: ফরাসি রাজারা ‘ঈদ্বরদত্ত ক্ষমতা’ বা দৈবস্বত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজা চতুর্দশ লুই দম্ভভরে বলতেন, “আমিই রাষ্ট্র”। রাজারা জনগণের সুখ-দুঃখের তোয়াক্কা না করে বিলাসিতায় মগ্ন থাকতেন।
- ষোড়শ লুইয়ের অযোগ্যতা: বিপ্লবকালের রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন অত্যন্ত দুর্বলচেতা ও অদূরদর্শী। তিনি রানি মেরি আতোয়ানেত ও চাটুকার সভাসদদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।
- ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থা: বিচারব্যবস্থা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। ‘লেতর দ্য ক্যাশে’ নামক এক প্রকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সাহায্যে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা যেত।
২. সামাজিক কারণ:
[Image of French Revolution three estates pyramid]
ফরাসি সমাজ তিনটি এস্টেট বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল, যা চরম বৈষম্যমূলক ছিল:
- প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট (সুবিধোভোগী): যাজক (প্রথম এস্টেট) এবং অভিজাতরা (দ্বিতীয় এস্টেট) ছিল সমাজের মাত্র ৩%। এরা দেশের সিংহভাগ জমির মালিক ছিল এবং রাষ্ট্রকে কোনো কর দিত না। অথচ সরকারি উচ্চপদ ও বিচারব্যবস্থায় এদেরই একচেটিয়া অধিকার ছিল।
- তৃতীয় এস্টেট (সুবিধাবঞ্চিত): জনসংখ্যার ৯৭% মানুষ (বুর্জোয়া, কৃষক, শ্রমিক, সাকুলোৎ) ছিল এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার বা সামাজিক মর্যাদা ছিল না, অথচ রাষ্ট্রের সমস্ত করের বোঝা এদেরই বহন করতে হতো। এই সামাজিক বৈষম্য সাধারণ মানুষকে বিপ্লবমুখী করে তোলে।
৩. অর্থনৈতিক কারণ:
- বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা: ফ্রান্সের কর ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। ধনীরা ছিল করমুক্ত, আর দরিদ্ররা করভারে জর্জরিত। প্রত্যক্ষ কর (টেইল) ছাড়াও কৃষকদের টাইদ (ধর্মকর), গ্যাবেল (লবণ কর), এইদে (মদ কর) ইত্যাদি দিতে হতো।
- ভ্রান্ত অর্থনীতি: রাজকোষের অর্থ রাজপরিবারের বিলাসিতা এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো ব্যয়বহুল যুদ্ধে অপচয় করা হয়। এর ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। অ্যাডাম স্মিথ তাই ফ্রান্সকে ‘ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর’ বলেছিলেন।
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: ১৭৮৮-৮৯ সালে অনাবৃষ্টি ও শস্যহানির ফলে খাদ্যশস্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়, যা সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, রাজা যখন অর্থনৈতিক সংকট মেটাতে উপায়ান্তর না দেখে ১৭৫ বছর পর ‘স্টেটস জেনারেল’-এর অধিবেশন ডাকেন, তখন তৃতীয় এস্টেটের ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে এবং বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন ২: ফরাসি বিপ্লব সংঘটনে দার্শনিকদের ভূমিকা আলোচনা করো। (৮)
ভূমিকা: ফরাসি বিপ্লব কেবল তলোয়ারের জোরে হয়নি, এর পেছনে ছিল মসি বা কলমের অসামান্য অবদান। অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের একঝাঁক দার্শনিক তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে ফরাসি জনগণের মনে রাজতন্ত্র, চার্চ ও সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী ও বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।
১. মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রি:):
মন্তেস্কু ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সমর্থক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য স্পিরিট অফ লজ’ (The Spirit of Laws)-এ তিনি ‘ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’ প্রচার করেন। তিনি বলেন, রাজার হাতে আইন, শাসন ও বিচার—সব ক্ষমতা থাকলে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। তাঁর ‘পার্সিয়ান লেটার্স’ গ্রন্থে তিনি ফরাসি সমাজ ও অভিজাততন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করেন।
২. ভলতেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রি:):
ভলতেয়ার ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যঙ্গ-রচয়িতা। তিনি তাঁর ‘কাদিদ’ (Candide) ও ‘লেতর ফিলোজফিক’ গ্রন্থের মাধ্যমে ফরাসি চার্চের দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা এবং রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি চার্চকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর লেখনী মানুষকে অন্ধবিশ্বাস মুক্ত হতে শিখিয়েছিল।
৩. জঁ জ্যাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রি:):
রুশো ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের প্রাণপুরুষ। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘সামাজিক চুক্তি’ বা ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’-এ তিনি প্রচার করেন যে, “রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি নন, তিনি জনগণের সঙ্গে চুক্তির ফলমাত্র।” তিনি ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ বা ‘গণইচ্ছা’ (General Will)-র ওপর জোর দেন। তাঁর সাম্য ও মৈত্রীর বাণী বিপ্লবীদের মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “রুশো না জন্মালে ফরাসি বিপ্লব হতো না।”
৪. অন্যান্য দার্শনিক ও বিশ্বকোষ রচয়িতা:
ডেনিস দিদরো এবং ডি’এলেম্বার ৩৫ খণ্ডে ‘বিশ্বকোষ’ বা ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ সংকলন করেন। এই গ্রন্থে বিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন প্রবন্ধের মাধ্যমে তাঁরা ফরাসিদের কুসংস্কারমুক্ত করার চেষ্টা করেন। এছাড়া ফিজিওক্র্যাট নামক অর্থনীতিবিদরা (যেমন—কুয়েসনে, তুর্গো) অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে মত দেন।
মূল্যায়ন: দার্শনিকরা হয়তো সরাসরি অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামেননি, কিন্তু তাঁরা বারুদের স্তূপ তৈরি করেছিলেন, যাতে অগ্নিসংযোগ করেছিল তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। তাঁরা ফরাসি জনগণকে মানসিক দিক থেকে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ফরাসি সংবিধান সভার (১৭৮৯-৯১) কার্যাবলি ও সাফল্য আলোচনা করো। (৮)
ভূমিকা: ফরাসি বিপ্লবের পর ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্সের সংবিধান সভা বা ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’ ফ্রান্সের পুরাতন তন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের ওপর এক নতুন ফ্রান্স গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে তারা যে আমূল পরিবর্তন এনেছিল, তা ইতিহাসে বিরল।
১. সামন্ততন্ত্রের বিলোপ:
১৭৮৯ সালের ৪ আগস্ট সংবিধান সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে সামন্তপ্রথা ও অভিজাতদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিলোপ ঘটায়। এর ফলে বেগার শ্রম (করভি), ভূমিদাস প্রথা এবং টাইদ বা ধর্মকরের অবসান ঘটে। এটি ছিল বিপ্লবের এক বিরাট সামাজিক বিজয়।
২. ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণা:
১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট সংবিধান সভা বিশ্ববিখ্যাত ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকার’ (Declaration of Rights of Man and Citizen) ঘোষণা করে। এতে বলা হয়—মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং সমান অধিকারের অধিকারী। বাক্ স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং আইনের চোখে সাম্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
৩. শাসনতান্ত্রিক সংস্কার:
ফ্রান্সকে ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে ভাগ করা হয় এবং শাসনকার্যে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করা হয়। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের প্রথম লিখিত সংবিধান রচিত হয়, যার মাধ্যমে রাজার ক্ষমতা সীমিত করে ‘নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৪. গির্জার সংস্কার:
‘সিভিল কনস্টিটিউশন অফ দ্য ক্লার্জি’ (১৭৯০) আইনের মাধ্যমে ফরাসি গির্জাকে পোপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে রাষ্ট্রের অধীনে আনা হয়। যাজকদের সরকারি কর্মচারীতে পরিণত করা হয় এবং গির্জার বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে অর্থনৈতিক সংকট মেটানোর চেষ্টা করা হয়।
সীমাবদ্ধতা ও উপসংহার:
সংবিধান সভার কাজে কিছু ত্রুটি ছিল। যেমন—সম্পত্তিহীনদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি এবং গির্জার সংস্কার ধর্মপ্রাণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তবুও, এই সভা ফ্রান্সকে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণ ঘটিয়েছিল এবং একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
প্রশ্ন ৪: সন্ত্রাসের রাজত্বের বিবরণ দাও এবং এর যৌক্তিকতা বিচার করো। (৫+৩)
ভূমিকা: ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস থেকে ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাস পর্যন্ত ফ্রান্সে জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্বে যে একনায়কতন্ত্র ও কঠোর দমনমূলক শাসন চলেছিল, তা ইতিহাসে ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ (Reign of Terror) নামে পরিচিত। এর প্রধান পরিচালক ছিলেন রোবসপিয়র।
সন্ত্রাসের রাজত্বের বিবরণ:
- সংগঠন: সন্ত্রাসের রাজত্ব পরিচালনার জন্য তিনটি প্রধান সংস্থা ছিল—জননিরাপত্তা কমিটি, সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি এবং বিপ্লবাত্মক বিচারালয়।
- দমন নীতি: ‘সন্দেহের আইন’ (Law of Suspects)-এর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করা হয়। গিলোটিন যন্ত্রে প্রায় ৪০-৫০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন রানি মেরি আতোয়ানেত, মাদাম রোঁলা এবং অনেক জিরন্ডিস্ট নেতা।
- অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: কালোবাজারি রোধ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘সর্বোচ্চ মূল্য বাঁধার আইন’ (Law of Maximum) চালু করা হয়।
সন্ত্রাসের রাজত্বের যৌক্তিকতা বা মূল্যায়ন:
সন্ত্রাসের রাজত্বকে অনেকেই নিষ্ঠুর ও অমানবিক বলে সমালোচনা করেন, কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে এর কিছু যৌক্তিকতা ছিল:
- বিপ্লব রক্ষা: সেই সময় ফ্রান্সের অভ্যন্তরে রাজতন্ত্রী ও ধর্মযাজকদের বিদ্রোহ এবং সীমান্তে ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার আক্রমণ বিপ্লবকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে কঠোর হাতে শাসন ছাড়া বিপ্লবকে বাঁচানো সম্ভব ছিল না।
- শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা: দেশের অরাজকতা দূর করতে এবং সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে জ্যাকোবিনদের এই কঠোরতা সাময়িকভাবে সফল হয়েছিল।
উপসংহার: সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল ‘আপৎকালীন স্বৈরতন্ত্র’। এটি বিপ্লবকে রক্ষা করেছিল ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত রক্তপাত এবং রোবসপিয়রের ব্যক্তিগত আক্রোশ একে কলঙ্কিত করেছিল। ১৭৯৪ সালে রোবসপিয়রের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমেই এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন ৫: ফ্রান্স এবং বিশ্বের ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব বা ফলাফল আলোচনা করো। (৫+৩)
ভূমিকা: ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক যুগের ইতিহাসে এক জলবিভাজিকা। এই বিপ্লব কেবল ফ্রান্সের পুরাতন তন্ত্রকেই ধ্বংস করেনি, বরং সারা বিশ্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
ফ্রান্সের ওপর প্রভাব:
- পুরাতন তন্ত্রের বিনাশ: ফরাসি বিপ্লব হাজার বছরের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র এবং চার্চের আধিপত্যকে ধূলিসাৎ করে দেয়। অভিজাত ও যাজকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয়।
- সাম্য ও মৈত্রী: বিপ্লব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান—এই নীতি স্বীকৃত হয়। মানুষের জন্মগত অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা স্বীকৃতি পায়।
- জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের মানুষকে সংকীর্ণ রাজভক্তি থেকে বের করে এনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। ‘এক জাতি, এক রাষ্ট্র’—এই ধারণা শক্তিশালী হয়।
- অর্থনৈতিক পরিবর্তন: গিল্ড প্রথার বিলোপ, অভ্যন্তরীণ শুল্ক প্রত্যাহার এবং সুষম কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ফ্রান্সে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির পথ প্রশস্ত হয়।
বিশ্বের ওপর প্রভাব:
- গণতন্ত্রের প্রসার: ফরাসি বিপ্লবের ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’র বাণী ইউরোপ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণ আন্দোলন শুরু করে।
- জাতীয়তাবাদী আন্দোলন: ইতালি, জার্মানি-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্ম দেয় এই বিপ্লব। পরাধীন জাতিগুলো স্বাধীনতার স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়।
- ভারতের ওপর প্রভাব: টিপু সুলতান, রাজা রামমোহন রায় এবং পরবর্তীকালে ডিরোজিও-র মতো ভারতীয় মণীষীরা ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ফরাসি বিপ্লব মানবসভ্যতাকে মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে আধুনিক যুগের আলোয় নিয়ে এসেছিল। ঐতিহাসিক ডেভিড থমসনের মতে, “ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।”
প্রশ্ন ৬: ফরাসি বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ এবং তাদের সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো। (৫+৩)
ভূমিকা: ফরাসি বিপ্লব কেবল পুরুষদের দ্বারা পরিচালিত হয়নি, এতে নারীদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও সক্রিয়। অভিজাত থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমজীবী নারী—সবাই বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।
বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ:
- বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ: ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতনের সময় নারীরা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল।
- ভার্সাই অভিযান: ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে প্রায় ৬০০০ নারী প্যারিস থেকে ভার্সাই রাজপ্রাসাদ অভিমুখে পদযাত্রা করে। তাদের নেতৃত্বেই রাজাকে প্যারিসে ফিরে আসতে বাধ্য করা হয়। এটি বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
- রাজনৈতিক সংগঠন: নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রায় ৬০টি রাজনৈতিক ক্লাব গড়ে তোলে। এর মধ্যে ‘দ্য সোসাইটি অফ রেভোলিউশনারি রিপাবলিকান উইমেন’ ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। অলিম্প দ্য গুজ, মাদাম রোঁলা প্রমুখ নারীরা বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন।
সীমাবদ্ধতা ও বঞ্চনা:
- ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা: নারীরা বিপ্লবে রক্ত দিলেও, ১৭৯১ সালের সংবিধানে তাদের ‘নিষ্ক্রিয় নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।
- রাজনৈতিক ক্লাবের বিলুপ্তি: সন্ত্রাসের রাজত্বকালে জ্যাকোবিন সরকার নারীদের রাজনৈতিক ক্লাবগুলিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপে বিধিনিষেধ আরোপ করে।
- নেত্রীদের হত্যা: অলিম্প দ্য গুজ এবং মাদাম রোঁলার মতো বিপ্লবী নারীদের গিলোটিনে হত্যা করা হয়।
উপসংহার: ফরাসি বিপ্লব নারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলেও, এটি নারী জাগরণের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পরবর্তীকালে নারীবাদী আন্দোলনের ভিত্তি এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল।