নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 3 উনবিংশ শতকের ইউরোপ: রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত ৮ নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৩: ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ – রচনাধর্মী প্রশ্ন (মান – ৮)

প্রশ্ন ১: ইতালির ঐক্য আন্দোলনে মাৎসিনি (Mazzini), কাভুর (Cavour) ও গ্যারিবল্ডির (Garibaldi) অবদান আলোচনা করো।

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ইতালি কোনো অখণ্ড রাষ্ট্র ছিল না। মেটারনিক ব্যঙ্গ করে বলতেন, “ইতালি একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞামাত্র।” ইতালির এই খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থা থেকে তাকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করার পেছনে তিনজন মহান নেতার অবদান অনস্বীকার্য—মাৎসিনি (আত্মা), কাভুর (মস্তিষ্ক) এবং গ্যারিবল্ডি (তলোয়ার)।

১. জোসেফ মাৎসিনির অবদান (আত্মা):

মাৎসিনি ছিলেন ইতালির ঐক্যের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন যুবশক্তির জাগরণ ছাড়া দেশের মুক্তি অসম্ভব।
ইয়ং ইতালি: ১৮৩১ সালে তিনি ‘ইয়ং ইতালি’ দল গঠন করেন। এর মাধ্যমে তিনি ইতালিবাসীর মনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার মন্ত্র জাগিয়ে তোলেন।
আদর্শ: তিনি চেয়েছিলেন অস্ট্রিয়াকে বিতাড়িত করে ইতালিতে একটি ঐক্যবদ্ধ ‘প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে। যদিও তিনি সরাসরি সফল হননি, কিন্তু তিনি ইতালির ঐক্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন।

২. কাউন্ট কাভুরের অবদান (মস্তিষ্ক):

পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কাভুর ছিলেন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ। তিনি বুঝতেন যে কেবল আবেগে কাজ হবে না, চাই কূটনীতি ও বিদেশি সাহায্য।
সংস্কার: তিনি পিডমন্টের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করেন।
কূটনীতি: তিনি ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সহানুভূতি আদায় করেন। ১৮৫৮ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয়ের সাথে ‘প্লম্বিয়ার্স-এর চুক্তি’ করে তিনি অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সাহায্য নিশ্চিত করেন।
সাফল্য: তাঁর নেতৃত্বে লোম্বার্ডি, পারমা, মডেনা ও টাস্কানি পিডমন্টের সাথে যুক্ত হয়।

৩. গ্যারিবল্ডির অবদান (তলোয়ার):

গ্যারিবল্ডি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা ও মাৎসিনির ভাবশিষ্য।
লাল কর্তা বাহিনী: তিনি তাঁর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ‘রেড শার্টস’ নিয়ে দক্ষিণ ইতালি আক্রমণ করেন।
বিজয়: তিনি সিসিলি ও নেপলস জয় করে সেখানকার বুরবোঁ রাজবংশকে উচ্ছেদ করেন।
ত্যাগ: তিনি তাঁর বিজিত সমস্ত অঞ্চল রাজা ভিক্টর ইম্যানুয়েলের হাতে তুলে দেন, যা ইতিহাসের এক বিরল ত্যাগের উদাহরণ।

উপসংহার: মাৎসিনির আদর্শ, কাভুরের কূটনীতি এবং গ্যারিবল্ডির বীরত্বের সমন্বয়ে ১৮৭০ সালে রোম জয়ের মাধ্যমে ইতালির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়। ভিক্টর ইম্যানুয়েল ঐক্যবদ্ধ ইতালির রাজা হন।


প্রশ্ন ২: জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে বিসমার্কের (Bismarck) ভূমিকা আলোচনা করো। তিনি কি সত্যিই ‘রক্ত ও লৌহ’ নীতির দ্বারা জার্মানি গড়েছিলেন?

ভূমিকা: ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিয়মতান্ত্রিক পথে জার্মানির ঐক্য সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অটো ভন বিসমার্কের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ছিলেন উগ্র রাজতন্ত্রী ও প্রুশিয়ার আধিপত্যে বিশ্বাসী।

রক্ত ও লৌহ নীতি (Blood and Iron Policy):

বিসমার্ক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, “জার্মানির ভাগ্য বক্তৃতা বা সংখ্যাধিক্যের ভোটে নির্ধারিত হবে না, তা হবে একমাত্র রক্ত ও লৌহ নীতির দ্বারা।” অর্থাৎ, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি তিনটি যুদ্ধ করেছিলেন:

১. ডেনমার্কের সাথে যুদ্ধ (১৮৬৪):

বিসমার্ক প্রথমে অস্ট্রিয়ার সাথে মিত্রতা করে ডেনমার্ককে পরাজিত করেন এবং স্লেশউইগ ও হলস্টেইন প্রদেশ দুটি দখল করেন। পরে গ্যাস্টিনের সন্ধির মাধ্যমে তিনি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন যাতে অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

২. অস্ট্রো-প্রুশীয় যুদ্ধ বা স্যাডোয়ার যুদ্ধ (১৮৬৬):

বিসমার্কের কূটনীতিতে অস্ট্রিয়া ইউরোপে বন্ধুহীন হয়ে পড়ে। ১৮৬৬ সালে স্যাডোয়ার যুদ্ধে প্রুশিয়া অস্ট্রিয়াকে মাত্র সাত সপ্তাহে পরাজিত করে।
ফলাফল: জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়ার প্রভাব লুপ্ত হয় এবং উত্তর জার্মানির রাজ্যগুলি প্রুশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়।

৩. ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধ (১৮৭০):

দক্ষিণ জার্মানির রাজ্যগুলি ফ্রান্সের প্রভাবে ছিল। বিসমার্ক ‘এমস টেলিগ্রাম’-এর মাধ্যমে ফ্রান্সকে অপমানিত করে যুদ্ধের প্ররোচনা দেন। ১৮৭০ সালে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
ফলাফল: ফ্রান্স আলসাস ও লোরেন প্রদেশ জার্মানিকে ছেড়ে দেয়। ১৮৭১ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে প্রথম উইলিয়াম ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সম্রাট ঘোষিত হন।

উপসংহার: বিসমার্কের অসামান্য কূটনীতি এবং সামরিক শক্তির জোরেই আধুনিক জার্মানির জন্ম হয়েছিল। ঐতিহাসিকরা তাঁকে যথার্থই ‘জার্মানির ঐক্যের স্থপতি’ বলে অভিহিত করেন।


প্রশ্ন ৩: জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের (Alexander II) সংস্কারগুলি আলোচনা করো। তাঁকে কেন ‘মুক্তিদাতা জার’ বলা হয়?

ভূমিকা: রাশিয়ার ইতিহাসে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বকাল (১৮৫৫-১৮৮১) এক নবযুগের সূচনা করে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয় প্রমাণ করেছিল যে, মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থা নিয়ে আধুনিক ইউরোপের সাথে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি সংস্কারে মন দেন।

১. ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ (মুক্তিদাতা জার):

তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ভূমিদাস প্রথার বিলোপ। রাশিয়ার জনসংখ্যার অধিকাংশ ছিল ভূমিদাস, যারা পশুর মতো জীবনযাপন করত। ১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘মুক্তিি ঘোষণা’ (Edict of Emancipation) দ্বারা এই প্রথা রদ করেন।
মুক্তি: প্রায় ৫ কোটি ভূমিদাস ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার পায়।
জমি লাভ: কৃষকরা জমির একাংশের মালিকানা পায় (বিনিময়ে জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে হতো)।
• এই যুগান্তকারী কাজের জন্যই তাঁকে ‘মুক্তিদাতা জার’ বলা হয়।

২. বিচার বিভাগীয় সংস্কার:

তিনি বিচার ব্যবস্থাকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করেন। আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়। জুরি প্রথা এবং উন্মুক্ত আদালতে বিচার ব্যবস্থার প্রচলন করেন।

৩. স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন (জেমস্তভ):

১৮৬৪ সালে তিনি ‘জেমস্তভ’ (Zemstvo) নামে জেলা ও প্রাদেশিক স্তরে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা চালু করেন। এর মাধ্যমে রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতির দায়িত্ব স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাতে দেওয়া হয়।

৪. শিক্ষা সংস্কার:

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন এবং দরিদ্র ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। নারী শিক্ষার প্রসারেও তিনি উদ্যোগী ছিলেন।

উপসংহার: যদিও তাঁর সংস্কারগুলি ত্রুটিমুক্ত ছিল না এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি পুরোপুরি আসেনি, তবুও তিনি রাশিয়াকে মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে আধুনিকতার আলোয় নিয়ে এসেছিলেন।


প্রশ্ন ৪: মেটারনিক ব্যবস্থা (Metternich System) কী? এই ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছিল? (৩+৫)

ভূমিকা: নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ডিউক মেটারনিক। এই সময়কালকে ‘মেটারনিক যুগ’ বলা হয়।

মেটারনিক ব্যবস্থা:

মেটারনিক ছিলেন ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী। ইউরোপে পুরাতন তন্ত্র বা রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা এবং বিপ্লবের গতিরোধ করার জন্য তিনি যে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তাকে ‘মেটারনিক ব্যবস্থা’ বলা হয়।
• তিনি অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও ইতালিতে পুলিশি রাজ কায়েম করেন।
• সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন (কার্লসবাড ডিক্রি)।
• ছাত্র আন্দোলন ও গুপ্ত সমিতিগুলিকে কঠোর হাতে দমন করেন।

ব্যর্থতার কারণ:

দীর্ঘ ৩০ বছর ইউরোপকে শাসন করার পর ১৮৪৮ সালে এই ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এর কারণগুলি হলো:

  • ১. যুগের বিপরীত: মেটারনিক ইতিহাসের গতির বিরুদ্ধে দেওয়াল তুলতে চেয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লব মানুষের মনে যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল, তা পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে দীর্ঘকাল দমন করা সম্ভব ছিল না।
  • ২. সংকীর্ণতা: তিনি কেবল রাজাদের স্বার্থ দেখেছিলেন, কিন্তু উদীয়মান মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর দাবিদাওয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন।
  • ৩. শিল্প বিপ্লব: শিল্প বিপ্লবের ফলে সমাজে নতুন নতুন শ্রেণীর উদ্ভব হয়, যারা পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিতে চায়নি।
  • ৪. ১৮৪৮-এর বিপ্লব: ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ঢেউ যখন অস্ট্রিয়ায় আছড়ে পড়ে, তখন মেটারনিক নিজের প্রাণ বাঁচাতে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমেই এই ব্যবস্থার পতন ঘটে।

উপসংহার: ঐতিহাসিক ফিশার যথার্থই বলেছেন, “মেটারনিক একটি ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রতিনিধি ছিলেন।” তিনি পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারেননি বলেই তাঁর পতন ছিল অনিবার্য।

প্রশ্ন ৫: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৪-৫৬) কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে ইউরোপীয় রাজনীতির এক জটিল অধ্যায় হলো ক্রিমিয়ার যুদ্ধ। আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় কারণে এই যুদ্ধ শুরু হলেও এর মূলে ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও ‘পূর্ব সমস্যা’।

যুদ্ধের কারণ:

  • ১. রাশিয়ার আগ্রাসন: তুরস্ক সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে (‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’) রাশিয়া বলকান অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। রাশিয়ার উদ্দেশ্য ছিল উষ্ণ জলরাশিতে পৌঁছানো।
  • ২. ধর্মীয় বিবাদ: জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলির রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার নিয়ে গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ (রাশিয়ার সমর্থিত) এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের (ফ্রান্সের সমর্থিত) মধ্যে বিরোধ বাধে।
  • ৩. শক্তিসাম্য নীতি: ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার শক্তিবৃদ্ধি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরোধী ছিল। তাই তারা তুরস্ককে সমর্থন করে।
  • ৪. ‘মেনশিকভ মিশন’: রাশিয়ার জার প্রথম নিকোলাস তুরস্কের খ্রিস্টান প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়ে মেনশিকভকে তুরস্কে পাঠান। তুরস্ক এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ফলাফল ও গুরুত্ব:

দীর্ঘ দুই বছর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৫৬ সালে প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

  • ১. রাশিয়ার পরাজয়: রাশিয়া তুরস্কের অখণ্ডতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং কৃষ্ণসাগরে তার সামরিক অধিকার হারায়।
  • ২. তুরস্কের লাভ: তুরস্ক ‘ইউরোপীয় শক্তি সমবায়’-এর সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
  • ৩. ইতালির লাভ: পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া এই যুদ্ধে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করে, যা ইতালির ঐক্যে সাহায্য করে।
  • ৪. মেটারনিক ব্যবস্থার পতন: এই যুদ্ধের ফলে ইউরোপীয় শক্তিগুলির ঐক্য ভেঙে যায় এবং মেটারনিক ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।

উপসংহার: ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল একটি অনাবশ্যক যুদ্ধ। তবুও এর পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে ইতালি ও জার্মানির ঐক্যের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।


প্রশ্ন ৬: ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে লুই ফিলিপের জুলাই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়, তা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত। এই বিপ্লব কেবল ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দাবানলের মতো সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ:

  • ১. লুই ফিলিপের ব্যর্থতা: ‘নাগরিক রাজা’ লুই ফিলিপ প্রথমে জনপ্রিয় হলেও পরে তিনি ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও কৃষকদের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন।
  • ২. রাজনৈতিক দলগুলোর অসন্তোষ: রাজতন্ত্রী, প্রজাতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী—কোনো দলই লুই ফিলিপের শাসনে সন্তুষ্ট ছিল না।
  • ৩. ভোটাধিকারের দাবি: ফ্রান্সের অধিকাংশ মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। সংস্কারপন্থীরা ভোটাধিকার সম্প্রসারণের দাবি জানালে রাজা ও তাঁর মন্ত্রী গিজো তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
  • ৪. অর্থনৈতিক সংকট: ১৮৪৬-৪৭ সালের খারাপ ফসল, খাদ্যাভাব এবং শিল্পে মন্দা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

গুরুত্ব ও ফলাফল:

  • ১. রাজতন্ত্রের অবসান: লুই ফিলিপ ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান এবং ফ্রান্সে অরলিয়েন্স রাজবংশের পতন ঘটে।
  • ২. প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: ফ্রান্সে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং লুই নেপোলিয়ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
  • ৩. ইউরোপে প্রভাব: মেটারনিকের বিখ্যাত উক্তি, “ফ্রান্স যখন হাঁচে, তখন সারা ইউরোপের সর্দি লাগে”—এই বিপ্লবের ক্ষেত্রে সত্য প্রমাণিত হয়। এর প্রভাবে অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও ইতালিতে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে এবং মেটারনিকের পতন ঘটে।
  • ৪. মেটারনিক ব্যবস্থার পতন: এই বিপ্লবের আঘাতেই ইউরোপের রক্ষণশীল মেটারনিক ব্যবস্থা চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে।

উপসংহার: ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের বিজয়। এটি আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

শিক্ষার্থীদের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) — ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ

🏛️ ভিয়েনা সম্মেলন (১৮১৫) কেন অনুষ্ঠিত হয়েছিল?

নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠন এবং ফরাসি বিপ্লবের আগের রাজতন্ত্র বা ‘পুরাতন তন্ত্র’ ফিরিয়ে আনার জন্য অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর মূল নেতা ছিলেন মেটারনিক

🚫 মেটারনিক ব্যবস্থা (Metternich System) কী?

১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর মেটারনিক ইউরোপে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তাকেই মেটারনিক ব্যবস্থা বলা হয়।

🇮🇹 ইতালির ঐক্যে প্রধান তিন নেতা কারা ছিলেন?

ইতালির ঐক্য আন্দোলনে তিনজনের অবদান প্রধান:

১) জোসেফ মাৎসিনি: ইতালির ঐক্যের ‘আত্মা’ ও ইয়ং ইতালির প্রতিষ্ঠাতা।

২) কাউন্ট কাভুর: ইতালির ঐক্যের ‘মস্তিষ্ক’ ও পিডমন্টের প্রধানমন্ত্রী।

৩) গ্যারিবল্ডি: ইতালির ঐক্যের ‘তলোয়ার’ ও লাল কর্তা বাহিনীর নেতা।

⚔️ ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ (Blood and Iron Policy) কী?

প্রুশিয়ার চ্যান্সেলর বিসমার্ক বিশ্বাস করতেন যে, কেবল আলোচনা বা ভোটে জার্মানির ঐক্য সম্ভব নয়। একমাত্র সামরিক শক্তি ও যুদ্ধের মাধ্যমেই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। তাঁর এই কঠোর নীতিকেই ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ বলা হয়।

🔥 ১৮৪৮ সালকে কেন ‘বিপ্লবের বছর’ বলা হয়?

১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব শুরু হওয়ার সাথে সাথে তার প্রভাবে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ইতালি ও হাঙ্গেরিতেও একযোগে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছিল। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে এই গণজাগরণের জন্য ১৮৪৮ সালকে ‘বিপ্লবের বছর’ বলা হয়।

👑 ‘মুক্তিদাতা জার’ কাকে বলা হয় এবং কেন?

রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে ‘মুক্তিদাতা জার’ বলা হয়। কারণ, তিনি ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে এক ঘোষণার মাধ্যমে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অমানবিক ভূমিদাস প্রথার বিলোপ ঘটিয়ে লক্ষ লক্ষ দাসকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

🌍 ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’ (Sick Man of Europe) কাকে বলা হতো?

ঊনবিংশ শতকে বিশাল উসমানীয় সাম্রাজ্য বা তুরস্ক অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও দুর্বলতার কারণে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তার এই জরাজীর্ণ অবস্থার জন্য তাকে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’ বলা হতো।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার