নবম শ্রেণী জীবন বিজ্ঞান: অধ্যায় তিন জৈবনিক প্রক্রিয়া, পর্ব – সংবহন ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান ৫
সংবহন: রচনাধর্মী প্রশ্ন (LAQ)
1. মানব হৃৎপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ গঠন চিত্রসহ সংক্ষেপে বর্ণনা করো। (৫)
উত্তর দেখো
মানব হৃৎপিণ্ডের গঠন: মানুষের হৃৎপিণ্ড চারটি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত।

- অলিন্দ (Auricle): হৃৎপিণ্ডের উপরের দিকের প্রকোষ্ঠ দুটিকে অলিন্দ বলে।
- ডান অলিন্দ: সারা দেহ থেকে ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মহাশিরার মাধ্যমে $CO_2$ যুক্ত রক্ত এখানে আসে।
- বাম অলিন্দ: ফুসফুস থেকে ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে $O_2$ যুক্ত রক্ত এখানে আসে।
- নিলয় (Ventricle): হৃৎপিণ্ডের নিচের দিকের প্রকোষ্ঠ দুটিকে নিলয় বলে। নিলয়ের প্রাচীর অলিন্দের চেয়ে পুরু হয় (বাম নিলয় সবচেয়ে পুরু)।
- ডান নিলয়: এখান থেকে ফুসফুসীয় ধমনীর মাধ্যমে রক্ত ফুসফুসে যায়।
- বাম নিলয়: এখান থেকে মহাধমনীর মাধ্যমে রক্ত সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে।
- কপাটিকা (Valves):
- ত্রিপত্রক কপাটিকা: ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে থাকে।
- দ্বিপত্রক কপাটিকা: বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে থাকে।
*(দ্রষ্টব্য: পরীক্ষার খাতায় একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র অঙ্কন করে বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করতে হবে।)*
2. শব্দচিত্রের (Flowchart) মাধ্যমে মানবদেহে রক্ত সংবহন পদ্ধতিটি বর্ণনা করো। (৫)
উত্তর দেখো
মানবদেহে রক্ত সংবহন প্রধানত দুটি চক্রে সম্পন্ন হয়: পালমোনারি এবং সিস্টেমিক সংবহন। প্রবাহপথটি নিচে দেওয়া হলো:
সারা দেহ (দূষিত রক্ত)
⬇
ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মহাশিরা
⬇
ডান অলিন্দ
⬇ (ত্রিপত্রক কপাটিকা)
ডান নিলয়
⬇ (ফুসফুসীয় ধমনী)
ফুসফুস (রক্ত শোধন: $CO_2$ ত্যাগ ও $O_2$ গ্রহণ)
⬇ (ফুসফুসীয় শিরা)
বাম অলিন্দ
⬇ (দ্বিপত্রক কপাটিকা)
বাম নিলয়
⬇ (মহাধমনী)
সারা দেহ (বিশুদ্ধ রক্ত)
এইভাবে হৃৎপিণ্ডের সংকোচনের ফলে রক্ত সারা দেহে আবর্তিত হয়।
3. রক্ত তঞ্চন বা জমাট বাঁধা (Blood Coagulation) পদ্ধতিটি বর্ণনা করো। (৫)
উত্তর দেখো
রক্ত তঞ্চন প্রধানত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
ধাপ ১: থ্রম্বোপ্লাস্টিন উৎপাদন
ক্ষতস্থানের ভাঙা অণুচক্রিকা ও ক্ষতিগ্রস্ত কলাকোষ থেকে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নামক এনজাইম নিঃসৃত হয়। এটি রক্তের ক্যালসিয়াম আয়ন ($Ca^{++}$) এর সাথে বিক্রিয়া করে প্রোথ্রম্বিনেজ এনজাইম গঠন করে।
ধাপ ২: থ্রম্বিন গঠন
প্রোথ্রম্বিনেজ ও $Ca^{++}$ আয়ন হেপারিনের ক্রিয়া নষ্ট করে এবং নিষ্ক্রিয় প্রোথ্রম্বিনকে সক্রিয় থ্রম্বিন-এ পরিণত করে।
$\text{প্রোথ্রম্বিন} \xrightarrow{\text{থ্রম্বোপ্লাস্টিন, } Ca^{++}} \text{থ্রম্বিন}$
ধাপ ৩: ফাইব্রিন জালক গঠন ও তঞ্চন
থ্রম্বিন রক্তরসে ভাসমান দ্রবণীয় ফাইব্রিনোজেন প্রোটিনকে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালকে পরিণত করে। এই জালকে রক্তকণিকাগুলি আটকে গিয়ে জেলি বা থকথকে পিণ্ড তৈরি করে, একে রক্ততঞ্চন বা ক্লট (Clot) বলে।
$\text{ফাইব্রিনোজেন} \xrightarrow{\text{থ্রম্বিন}} \text{ফাইব্রিন} \rightarrow \text{ক্লট}$
4. ধমনী ও শিরার গঠন ও কাজের মধ্যে পার্থক্য লেখো। (৫)
উত্তর দেখো
| বিষয় | ধমনী (Artery) | শিরা (Vein) |
|---|---|---|
| প্রবাহের দিক | হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত সারা দেহে বহন করে। | সারা দেহ থেকে রক্ত হৃৎপিণ্ডে ফিরিয়ে আনে। |
| রক্তের প্রকৃতি | সাধারণত অক্সিজেনযুক্ত ($O_2$) বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে (পালমোনারি ধমনী ছাড়া)। | সাধারণত কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত ($CO_2$) দূষিত রক্ত বহন করে (পালমোনারি শিরা ছাড়া)। |
| প্রাচীর ও গহ্বর | প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক। গহ্বর ছোট। | প্রাচীর পাতলা ও কম স্থিতিস্থাপক। গহ্বর বড়। |
| কপাটিকা | থাকে না। | থাকে (রক্তের বিপরীত প্রবাহ রোধ করতে)। |
5. ABO পদ্ধতি অনুযায়ী মানুষের রক্তের শ্রেণীবিভাগ করো এবং রক্ত সঞ্চালনের নীতিগুলি লেখো। (৩+২)
উত্তর দেখো
রক্তের শ্রেণীবিভাগ (ABO System): লোহিত রক্তকণিকার পর্দায় অ্যান্টিজেন (A ও B) এবং রক্তরসে অ্যান্টিবডি (a ও b) এর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে ৪টি গ্রুপে ভাগ করা হয়:
- গ্রুপ A: অ্যান্টিজেন A এবং অ্যান্টিবডি b থাকে।
- গ্রুপ B: অ্যান্টিজেন B এবং অ্যান্টিবডি a থাকে।
- গ্রুপ AB: অ্যান্টিজেন A ও B উভয়ই থাকে, কোনো অ্যান্টিবডি থাকে না।
- গ্রুপ O: কোনো অ্যান্টিজেন থাকে না, অ্যান্টিবডি a ও b উভয়ই থাকে।
রক্ত সঞ্চালনের নীতি:
- দাতার রক্তের অ্যান্টিজেন এবং গ্রহীতার রক্তের অ্যান্টিবডি যেন এক না হয়। এক হলে রক্ত জমাট বেঁধে যাবে।
- ‘O’ গ্রুপ: সবাইকে রক্ত দিতে পারে (সার্বিক দাতা)।
- ‘AB’ গ্রুপ: সবার রক্ত নিতে পারে (সার্বিক গ্রহীতা)।
6. মানুষের রক্তে উপস্থিত তিন প্রকার রক্তকণিকার কাজ বর্ণনা করো। (২+২+১)
উত্তর দেখো
১. লোহিত রক্তকণিকা (RBC):
- শ্বাসবায়ু পরিবহন: এতে থাকা হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে $O_2$ কোষে এবং কোষ থেকে $CO_2$ ফুসফুসে পরিবহন করে।
- অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য: এটি রক্তের বাফার হিসেবে কাজ করে অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য বজায় রাখে।
২. শ্বেত রক্তকণিকা (WBC):
- জীবাণু ধ্বংস: নিউট্রোফিল ও মনোসাইট ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে রোগজীবাণু ভক্ষণ করে।
- অ্যান্টিবডি উৎপাদন: লিম্ফোসাইট কণিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- হেপারিন নিঃসরণ: বেসোফিল হেপারিন নিঃসরণ করে রক্তবাহে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।
৩. অণুচক্রিকা (Platelets):
- কেটে যাওয়া স্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে বা রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে।
7. সংক্ষেপে মানব হৃৎপিণ্ডের হৃদচক্র বা কার্ডিয়াক সাইকেল (Cardiac Cycle) বর্ণনা করো। (৫)
উত্তর দেখো
হৃৎপিণ্ডের একবার সংকোচন (সিস্টোল) ও একবার প্রসারণকে (ডায়াস্টোল) একত্রে হৃদচক্র বলে। এর সময়কাল ০.৮ সেকেন্ড। এর পর্যায়গুলি হলো:
১. অলিন্দের ডায়াস্টোল (০.৭ সে.): এই সময় অলিন্দ প্রসারিত থাকে এবং মহাশিরা ও ফুসফুসীয় শিরা দিয়ে রক্ত অলিন্দে প্রবেশ করে।
২. অলিন্দের সিস্টোল (০.১ সে.): অলিন্দ সংকুচিত হয় এবং ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক কপাটিকা খুলে গিয়ে রক্ত নিলয়ে প্রবেশ করে।
৩. নিলয়ের সিস্টোল (০.৩ সে.): নিলয় সংকুচিত হয়। ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হয় (লুব শব্দ) এবং অর্ধচন্দ্রাকার কপাটিকা খুলে গিয়ে রক্ত মহাধমনী ও ফুসফুসীয় ধমনীতে প্রবেশ করে।
৪. নিলয়ের ডায়াস্টোল (০.৫ সে.): নিলয় প্রসারিত হয়। অর্ধচন্দ্রাকার কপাটিকা বন্ধ হয় (ডাব শব্দ) এবং নিলয় পুনরায় রক্ত গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়।

8. লসিকা কী? লসিকার তিনটি প্রধান কাজ লেখো। রক্ত ও লসিকার দুটি পার্থক্য লেখো। (২+৩)
উত্তর দেখো
লসিকা: রক্তজালক থেকে নির্গত এবং কলাকোষের অন্তর্বর্তী স্থানে অবস্থিত বর্ণহীন বা ঈষৎ হলুদ তরল যোগকলা।
লসিকার কাজ:
- পুষ্টি সরবরাহ: রক্ত যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে লসিকা কোষে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে।
- ফ্যাট শোষণ: ক্ষুদ্রান্ত্রর ভিলাইয়ের ল্যাকটিয়েল লসিকা দ্বারা ফ্যাট জাতীয় খাদ্য শোষণ করে।
- প্রতিরক্ষা: লসিকার লিম্ফোসাইট কণিকা দেহে প্রবিষ্ট জীবাণু ধ্বংস করে।
পার্থক্য:
- রক্ত লাল বর্ণের (হিমোগ্লোবিন থাকে), কিন্তু লসিকা বর্ণহীন (হিমোগ্লোবিন থাকে না)।
- রক্তে লোহিত কণিকা ও অণুচক্রিকা থাকে, লসিকায় থাকে না।