নবম শ্রেণী জীবন বিজ্ঞান অধ্যায় ৪ মানব কল্যাণ ও জীববিদ্যা
⭐ চতুর্থ অধ্যায়: জীববিদ্যা ও মানবকল্যাণ (LAQ – মান: ৫)
📜 দীর্ঘ উত্তরভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
১. অনাক্রমতার প্রকারভেদগুলি আলোচনা করো।
✅ **অনাক্রমতার প্রকারভেদ:**
অনাক্রম্যতা মূলত **দুই প্রকার**: সহজাত অনাক্রম্যতা এবং অর্জিত অনাক্রম্যতা। এই দুটি ব্যবস্থা মানবদেহে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।
- সহজাত অনাক্রম্যতা (Innate Immunity):
- এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রাণী **জন্মসূত্রে** লাভ করে এবং এটি জন্ম থেকেই দেহে উপস্থিত থাকে।
- এটি কোনো **নির্দিষ্ট জীবাণুর** উপর নির্ভর করে না, বরং সমস্ত আক্রমণকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে এটি সাধারণ ও অনির্দিষ্টভাবে কাজ করে।
- ত্বক, লালা এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির মতো অঙ্গগুলি এই প্রতিরক্ষায় প্রথম সারির ঢাল হিসেবে কাজ করে।
- অর্জিত অনাক্রম্যতা (Acquired Immunity):
- এটি প্রাণী তার **জন্মের পর জীবনকালে** কোনো নির্দিষ্ট জীবাণু বা টিকার সংস্পর্শে এসে লাভ করে।
- এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট (Specific) প্রকৃতির। এটি একবার তৈরি হলে সেই নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয়।
- অর্জিত অনাক্রম্যতা আবার সক্রিয় (দেহ নিজে অ্যান্টিবডি তৈরি করে) এবং নিষ্ক্রিয় (বাইর থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি সরবরাহ করা হয়) হতে পারে।
এই দুটি অনাক্রম্যতা পদ্ধতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং মানবদেহকে রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
২. অ্যান্টিজেনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করো।
✅ **অ্যান্টিজেনের প্রধান বৈশিষ্ট্য:**
- **বহিরাগত প্রকৃতি:** অ্যান্টিজেন সাধারণত বহিরাগত বস্তু বা জীবাণু হয়। এরা মানবদেহের জন্য অপরিচিত হয় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করে।
- **ইমিউনোজেনিসিটি:** এটি অ্যান্টিজেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ হলো, অ্যান্টিজেনের দেহে প্রবেশ করার পর ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধমূলক সাড়া সৃষ্টি করার ক্ষমতা।
- **নির্দিষ্টতা (Specificity):** প্রতিটি অ্যান্টিজেনের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে, যা তাকে অন্য অ্যান্টিজেন থেকে আলাদা করে। এই কাঠামোর কারণেই এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
- **অ্যান্টিজেনিসিটি:** এটি হলো অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা। অ্যান্টিজেন দেহে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি বা T কোষের গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হয়।
- **বৃহদাকার:** কার্যকর অ্যান্টিজেনগুলি সাধারণত প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড জাতীয় বৃহৎ অণু হয়। ছোট অণুগুলি সাধারণত ইমিউন রেসপন্স জাগাতে পারে না।
অ্যান্টিজেন হলো মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সজাগ করার মূল উদ্দীপক। এদের এই বৈশিষ্ট্যগুলির কারণেই মানবদেহ সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
৩. অ্যান্টিবায়োটিকের প্রকৃতি, গঠন ও কাজ লেখো।
✅ **অ্যান্টিবায়োটিকের প্রকৃতি, গঠন ও কাজ:**
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রকৃতি ও গঠন
- **প্রকৃতি:** অ্যান্টিবায়োটিক হলো এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ যা মূলত **ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া**-র মতো অণুজীব থেকেই তৈরি হয়। এদের প্রকৃতি হয় বিষাক্ত, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্য।
- **গঠন:** অ্যান্টিবায়োটিকগুলি গঠনগতভাবে বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে (যেমন – পেনিসিলিন, টেট্রাসাইক্লিন)। তবে সব অ্যান্টিবায়োটিকই এমনভাবে গঠিত হয়, যাতে তারা ব্যাকটেরিয়ার **কোষ প্রাচীর গঠনে বা প্রোটিন সংশ্লেষে বাধা** দিতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রধান কাজ
- **ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস:** কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন – পেনিসিলিন) ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর গঠনে বাধা দিয়ে সরাসরি তাদের **ধ্বংস** করে দেয়।
- **বৃদ্ধি ব্যাহত:** কিছু অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন – টেট্রাসাইক্লিন) ব্যাকটেরিয়ার অভ্যন্তরে প্রোটিন সংশ্লেষে বাধা দিয়ে তাদের **বৃদ্ধি ও বংশবিস্তারকে থামিয়ে দেয়**।
- **রোগ নিরাময়:** মানবদেহে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ নিরাময়ের জন্য এই ওষুধগুলি ব্যবহার করা হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার, যা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বিপ্লব এনেছে।
৪. অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির পাঁচটি পার্থক্য লেখো।
✅ **অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির পার্থক্য:**
| পার্থক্যের বিষয় | অ্যান্টিজেন | অ্যান্টিবডি |
|---|---|---|
| প্রকৃতি ও উৎস | এটি সাধারণত বহিরাগত পদার্থ বা জীবাণু (প্রোটিন/পলিস্যাকারাইড)। | এটি মানবদেহের প্লাজমা কোষ থেকে উৎপন্ন প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন (ইমিউনোগ্লোবিউলিন)। |
| কার্যক্ষেত্র | এটি দেহে প্রবেশ করে প্রতিরোধমূলক সাড়া (ইমিউন রেসপন্স) সৃষ্টি করে। | এটি অ্যান্টিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে। |
| রাসায়নিক গঠন | বিভিন্ন রকম বৃহৎ অণু হতে পারে (যেমন: ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার অংশ)। | এরা Y-আকৃতির প্রোটিন (IgG, IgM ইত্যাদি)। [attachment_0](attachment) |
| উপস্থিতি | দেহে ক্ষণস্থায়ীভাবে উপস্থিত থাকে বা কোষের অংশ হতে পারে। | রক্তরস (প্লাজমা) এবং লসিকার মধ্যে উপস্থিত থাকে। |
| গুরুত্বপূর্ণ অংশ | যে অংশ অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাকে এপিটোপ বলে। | যে অংশ অ্যান্টিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাকে প্যারাটোপ বলে। |
৫. B লিম্ফোসাইট ও T লিম্ফোসাইট এর পাঁচটি পার্থক্য লেখো।
✅ **B লিম্ফোসাইট ও T লিম্ফোসাইট এর পার্থক্য:**
| পার্থক্যের বিষয় | B লিম্ফোসাইট (B কোষ) | T লিম্ফোসাইট (T কোষ) |
|---|---|---|
| উৎপাদন ও পরিপক্কতা | অস্থি মজ্জায় (Bone Marrow) উৎপন্ন ও সেখানেই পরিপক্ক হয়। | অস্থি মজ্জায় উৎপন্ন হলেও **থাইমাস গ্রন্থিতে** পরিপক্ক হয়। |
| প্রতিরক্ষা পদ্ধতি | এরা অ্যান্টিবডি তৈরি করে **রস নির্ভর অনাক্রমতা** যোগায়। | এরা সরাসরি আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করে **কোশ নির্ভর অনাক্রমতা** যোগায়। |
| কোষের প্রকৃতি | পরিপক্ক B কোষ প্লাজমা কোষ গঠন করে। | এগুলি সাইটোটক্সিক, হেল্পার, সাপ্রেসর T কোষ রূপে কাজ করে। |
| কার্যক্ষেত্র | কোষের **বাইরের** জীবাণু ও টক্সিন নিষ্ক্রিয় করে। | ভাইরাস আক্রান্ত কোষ বা ক্যান্সার কোষের মতো **আক্রান্ত কোষকে** ধ্বংস করে। |
| স্মৃতিকোষ | স্মৃতি B কোষ তৈরি করে। | স্মৃতি T কোষ তৈরি করে। |
৬. টিকাকরণের প্রয়োজনীয়তা কী? সংক্ষেপে আলোচনা করো।
✅ **টিকাকরণের প্রয়োজনীয়তা:**
- **রোগ প্রতিরোধ:** টিকাকরণের প্রধান প্রয়োজনীয়তা হলো মানবদেহকে কোনো রোগের সংক্রমণ হওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে সক্রিয় অনাক্রম্যতা প্রদান করা। এর ফলে শরীর রোগের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।
- **স্মৃতি কোষ গঠন:** টিকা দেওয়ার ফলে দেহে স্মৃতি কোষ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আসল জীবাণু প্রবেশ করলে দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগটিকে নির্মূল করতে সাহায্য করে।
- **মহামারী রোধ:** সমাজে বেশিরভাগ মানুষ টিকা নিলে সেই রোগের জীবাণু ছড়ানোর সুযোগ পায় না। এই অবস্থাকে হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity) বলে, যা সামগ্রিকভাবে সমাজ থেকে রোগ নির্মূল করতে সাহায্য করে।
- **শিশু সুরক্ষা:** পোলিও, হাম, টিটেনাসের মতো মারাত্মক শৈশবাবস্থার রোগগুলির আক্রমণ থেকে শিশুদের রক্ষা করা এবং শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য টিকাকরণ অপরিহার্য।
- **চিকিৎসার খরচ হ্রাস:** প্রতিরোধ নিরাময়ের চেয়ে শ্রেয়। টিকাকরণ রোগ প্রতিরোধ করে বলে জনগণের চিকিৎসার খরচ অনেক কমে আসে।
সংক্ষেপে বলা যায়, টিকাকরণ কেবল ব্যক্তিগত সুরক্ষা নয়, বরং সমাজ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
৭. ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণুর নাম লেখো। রোগের লক্ষণ ও সংক্রমণ পদ্ধতি উল্লেখ করো।
✅ **ম্যালেরিয়া রোগ:**
- **জীবাণুর নাম:** ম্যালেরিয়া রোগ প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) নামক প্রোটোজোয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। (P. vivax, P. falciparum প্রভৃতি প্রজাতি)
রোগের লক্ষণ
- **কম্পন সহ জ্বর:** পর্যায়ক্রমে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা (বিশেষ করে বিকেলের দিকে) এবং এর পরে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ।
- **রক্তাল্পতা:** প্লাজমোডিয়াম জীবাণু মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ধ্বংস করে বলে শরীরে রক্তাল্পতা দেখা যায়।
- **অন্যান্য:** এর পাশাপাশি ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং প্লীহা ও যকৃতের বৃদ্ধি ঘটতে পারে।
সংক্রমণ পদ্ধতি
ম্যালেরিয়া মূলত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা দ্বারা বাহিত হয়। যখন কোনো সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন মশার লালার মাধ্যমে প্লাজমোডিয়ামের স্পোরোজোয়েট (Sporozoite) নামক দশা সুস্থ মানুষের রক্তে প্রবেশ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে।
৮. টিটেনাস রোগকে ‘লকজ’ বলে কেন? এই রোগের জীবাণুর নাম, রোগের উপসর্গ ও সংক্রমণ পদ্ধতি আলোচনা করো।
✅ **টিটেনাস রোগ (লকজ):**
টিটেনাস রোগকে ‘লকজ’ বলার কারণ
টিটেনাস রোগ সৃষ্টি হওয়ার ফলে রোগীর দেহের পেশীগুলিতে **তীব্র সংকোচন** (Spasm) ঘটে। এর ফলে চোয়ালের পেশীগুলি স্থায়ীভাবে আড়ষ্ট হয়ে যায় এবং রোগীর চোয়াল শক্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই কারণে রোগটিকে সাধারণভাবে ‘লকজ’ (Lockjaw) বলা হয়।
জীবাণুর নাম ও প্রকৃতি
- **জীবাণুর নাম:** ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি (Clostridium tetani) নামক ব্যাকটেরিয়া।
উপসর্গ ও সংক্রমণ পদ্ধতি
- **উপসর্গ:** চোয়াল আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া ছাড়াও রোগীর ঘাড় এবং শরীরের অন্যান্য পেশীতে তীব্র ও বেদনাদায়ক সংকোচন দেখা যায়। এর ফলে শ্বাসকষ্ট বা খাদ্য গ্রহণে সমস্যা হতে পারে।
- **সংক্রমণ পদ্ধতি:** টিটেনাস রোগের জীবাণুর স্পোরগুলি সাধারণত দূষিত মাটি, ধুলো বা মরচে ধরা বস্তুর মধ্যে থাকে। এই স্পোরগুলি **ক্ষতস্থানের মাধ্যমে** মানবদেহে প্রবেশ করলে সেখানে সংখ্যাবৃদ্ধি করে টক্সিন নিঃসরণ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে।
৯. যক্ষ্মা রোগের জীবাণুর নাম এবং এই রোগে কোন অঙ্গ রোগাক্রান্ত হয় তা লেখো। এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি লেখো।
✅ **যক্ষ্মা রোগ (Tuberculosis):**
জীবাণুর নাম ও আক্রান্ত অঙ্গ
- **জীবাণুর নাম:** মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis) নামক ব্যাকটেরিয়া।
- **আক্রান্ত অঙ্গ:** এই রোগে প্রধানত **ফুসফুস** আক্রান্ত হয়। তবে এই জীবাণু মানবদেহের অন্যান্য অঙ্গ, যেমন – অস্থি, বৃক্ক বা মস্তিষ্ককেও আক্রমণ করতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা মূলত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল এবং তা বেশ দীর্ঘমেয়াদী হয়।
- **অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি:** রোগীকে ৬ থেকে ৯ মাস ধরে রিফাম্পিসিন, আইসোনিয়াজিড-এর মতো একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করতে হয়।
- **DOTS পদ্ধতি:** এই রোগের চিকিৎসার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক অনুমোদিত DOTS (Directly Observed Treatment Short-course) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যকর্মীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে রোগীকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করানো হয়।
- **প্রতিরোধ:** শিশুদের জন্মের পরই BCG টিকা দিয়ে রোগটি প্রতিরোধ করা যায়।
১০. এইডস রোগের জীবাণুর নাম ও তার প্রকৃতি লেখো। এই রোগ কিভাবে সংক্রমিত হয়?
✅ **AIDS রোগের জীবাণু ও সংক্রমণ:**
জীবাণুর নাম ও প্রকৃতি
- **জীবাণুর নাম:** হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV)।
- **প্রকৃতি:** HIV ভাইরাস হলো এক ধরনের রেট্রোভাইরাস। এই ভাইরাসের জিনগত পদার্থ হলো RNA, যা কোষে প্রবেশ করে DNA-তে রূপান্তরিত হয়। এই ভাইরাস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার T-লিম্ফোসাইট কোষকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়।
সংক্রমণ পদ্ধতি
AIDS রোগটি প্রধানত শরীরের তরল পদার্থের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ছড়ায়:
- **যৌন মিলন:** HIV আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কনডম ছাড়া অসুরক্ষিত যৌন মিলনের মাধ্যমে।
- **রক্ত সঞ্চালন:** সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত বা রক্তজাত দ্রব্য কোনো সুস্থ ব্যক্তির দেহে সঞ্চালিত হলে।
- **সংক্রমিত সূঁচ:** নেশা করার সময় বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত একই সংক্রমিত সূঁচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে।
- **মা থেকে শিশুতে:** HIV আক্রান্ত মা গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় বা মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুকে সংক্রমিত করতে পারেন।
তবে এই রোগ হাঁচি, কাশি, স্পর্শ বা একই পাত্রে খাবার খেলে ছড়ায় না।
🌿 চতুর্থ অধ্যায়: জীববিদ্যা ও মানবকল্যাণ (LAQ – প্রশ্ন ১১ থেকে ১৪)
📜 দীর্ঘ উত্তরভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (বাকি অংশ)
১১. রোগ প্রতিরোধে ধৌতকরণের ভূমিকা লেখো। ধৌতকরণের মাধ্যমে কী কী রোগ প্রতিরোধ করা যায়?
✅ **রোগ প্রতিরোধে ধৌতকরণের ভূমিকা:**
ধৌতকরণের ভূমিকা
- **জীবাণু দূরীকরণ:** সাবান ও জল ব্যবহার করে হাত বা কোনো বস্তুর উপরিভাগ থেকে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাকের মতো জীবাণুগুলিকে কার্যকরভাবে দূর করে।
- **সংক্রমণ শৃঙ্খল ভঙ্গ:** ধৌতকরণ রোগের সংক্রমণ শৃঙ্খল ভেঙে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, খাবার আগে হাত ধুলে হাত থেকে খাবারের মাধ্যমে জীবাণু পেটে প্রবেশ করতে পারে না।
- **স্বাস্থ্যবিধি প্রতিষ্ঠা:** ধৌতকরণের অভ্যাস মানুষকে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, যা রোগের বিস্তার রোধে অত্যন্ত জরুরি।
যে রোগগুলি প্রতিরোধ করা যায়
ধৌতকরণের মাধ্যমে মূলত মল-মৌখিক পথবাহিত রোগগুলি প্রতিরোধ করা যায়। যেমন:
- ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ: কলেরা, টাইফয়েড।
- ভাইরাসজনিত রোগ: হেপাটাইটিস A, পোলিও, ডায়রিয়ার ভাইরাস।
- প্রোটোজোয়াজনিত রোগ: অ্যামিবায়োসিস।
১২. জৈবিক নিয়ন্ত্রণে জীবাণুর ভূমিকা লেখো। জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সুবিধা ও অসুবিধা লেখো।
✅ **জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ও জীবাণুর ভূমিকা:**
জৈবিক নিয়ন্ত্রণে জীবাণুর ভূমিকা
- জৈবিক নিয়ন্ত্রণে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের মতো অণুজীবদের ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস (Bt) নামক ব্যাকটেরিয়া একটি টক্সিন তৈরি করে যা ক্ষতিকারক শুঁয়োপোকা জাতীয় পতঙ্গদের মেরে ফেলে।
- কিছু ভাইরাস ক্ষতিকারক পোকামাকড়কে সংক্রমিত করে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এইভাবে জীবাণুগুলি প্রাকৃতিক শত্রু হিসেবে কাজ করে ক্ষতিকারক পতঙ্গদের দমন করে।
সুবিধা ও অসুবিধা
| সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|
| (১) এটি পরিবেশ দূষণমুক্ত কারণ কোনো রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় না। | (১) এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় না। |
| (২) জৈবিক নিয়ন্ত্রণের উপাদানগুলি সাধারণত সুনির্দিষ্ট, তাই উপকারী পোকার ক্ষতি হয় না। | (২) কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক জীবটি পরিবেশের পরিবর্তন-এর সঙ্গে মানিয়ে নিলে নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হতে পারে। |
১৩. অণুজীব সার কাকে বলে? এই সার ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা লেখো।
✅ **অণুজীব সার (Biofertilizer):**
অণুজীব সার
যে সমস্ত উপকারী অণুজীব (যেমন – রাইজোবিয়াম, সায়ানোব্যাকটেরিয়া) তাদের স্বাভাবিক জৈবিক কার্যকলাপের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান (বিশেষত নাইট্রোজেন) সরবরাহ করে, তাদের অণুজীব সার বলে।
সুবিধা ও অসুবিধা
| সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|
| (১) এটি পরিবেশ দূষণমুক্ত এবং মাটির গুণাগুণ (স্বাস্থ্য) বজায় রাখে। | (১) রাসায়নিক সারের তুলনায় পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে সরবরাহ হয়। |
| (২) বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। | (২) প্রয়োগ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে হয়, যা কঠিন। |
১৪. জৈব সার ও অণুজীব সারের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
✅ **জৈব সার ও অণুজীব সারের পার্থক্য:**
| পার্থক্যের বিষয় | জৈব সার (Organic Fertilizer) | অণুজীব সার (Biofertilizer) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | জীবের বর্জ্য পদার্থ বা পচনশীল অংশ থেকে তৈরি (যেমন – গোবর সার)। | নির্দিষ্ট উপকারী অণুজীব দ্বারা তৈরি (যেমন – রাইজোবিয়াম)। |
| পুষ্টি সরবরাহ | পুষ্টি উপাদান কম পরিমাণে থাকে এবং ধীরে ধীরে মুক্ত হয়। | পুষ্টি উপাদান অধিক পরিমাণে (যেমন: নাইট্রোজেন) সংবন্ধন করে। |
| প্রধান কাজ | মাটির গঠন উন্নত করা, জলধারণ ক্ষমতা বাড়ানো। | নাইট্রোজেন সংবন্ধন বা ফসফরাসের মতো পুষ্টিকে দ্রবীভূত করা। |
| উদাহরণ | কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট, গোবর সার। | অ্যাজোটোব্যাক্টর, সায়ানোব্যাকটেরিয়া, মাইকোরাইজা। |
❓ নবম শ্রেণির জীববিদ্যা ও মানবকল্যাণ FAQ
রোগ প্রতিরোধে ধৌতকরণের দুটি ভূমিকা কী?
ধৌতকরণের দুটি প্রধান ভূমিকা হলো: (১) সাবান-জল ব্যবহার করে হাত থেকে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দূর করা এবং (২) খাদ্য ও জলবাহিত রোগের (যেমন—কলেরা, টাইফয়েড) সংক্রমণ শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া।
জৈব সার ও অণুজীব সারের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
জৈব সার হলো জীবের বর্জ্য পদার্থ থেকে তৈরি পচনশীল সার যা মাটির গঠন উন্নত করে। অন্যদিকে, অণুজীব সার হলো নির্দিষ্ট উপকারী অণুজীব (যেমন—রাইজোবিয়াম) দ্বারা তৈরি, যা মূলত নাইট্রোজেন সংবন্ধনের মাধ্যমে পুষ্টি সরবরাহ করে।
জৈবিক নিয়ন্ত্রণ কেন রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ থেকে ভালো?
জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ দূষণ ঘটায় না এবং এটি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল ক্ষতিকারক জীবকেই দমন করে, যার ফলে উপকারী জীব (যেমন—মৌমাছি) সুরক্ষিত থাকে।
অণুজীব সার ব্যবহারের দুটি অসুবিধা কী?
অণুজীব সারের দুটি অসুবিধা হলো: পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে সরবরাহ হয় এবং সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে হয়।