শ্রেণি – বাংলা, তৃতীয় পাঠ, অধ্যায় -৪, পথচলতি – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর মান 5
অধ্যায় 8: পথচলতি
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথচলতি’ রচনাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। (5)
উত্তর দেখো
সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সার্থক নামকরণের মাধ্যমেই রচনার মূল বিষয়বস্তু পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আলোচ্য রচনাটির ‘পথচলতি’ নামকরণটি বিষয়বস্তু ও অন্তর্নিহিত ভাবসত্যের দিক থেকে সম্পূর্ণ সার্থক।
‘পথচলতি’ শব্দের অর্থ হলো পথে চলতে চলতে বা যাত্রাপথে। রচনাটিতে লেখক তাঁর কলকাতা (হাওড়া) ফেরার যাত্রাপথের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। গয়া স্টেশন থেকে দেরাদুন এক্সপ্রেসের তৃতীয় শ্রেণির ভিড়ে ঠাসা কামরায় ওঠার পর, পথে চলতে চলতেই তাঁর পরিচয় হয় কয়েকজন দীর্ঘকায়, রুক্ষ পাঠান বা কাবুলিওয়ালা যাত্রীর সাথে।
অচেনা এই যাত্রীদের সাথে লেখক কোনো ঝগড়া না করে, কেবল ভাষাজ্ঞান ও আন্তরিকতা দিয়ে পথ চলতে চলতেই তাদের সাথে এক অপূর্ব বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন রচনা করেন। পশতু ও ফারসি সাহিত্য নিয়ে পথচলতি সেই আড্ডায় জাতি, ধর্ম ও ভাষার সমস্ত প্রাচীর ভেঙে যায়। যেহেতু সম্পূর্ণ রচনাটি একটি ট্রেনযাত্রার পথচলতি অভিজ্ঞতা এবং সেই যাত্রাপথে গড়ে ওঠা মানবমৈত্রীর কাহিনিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘পথচলতি’ নামকরণটি সর্বাঙ্গীণভাবে সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
2. ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির ভিড় কামরায় লেখক কীভাবে নিজের বসার জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা নিজের ভাষায় লেখো। (অথবা, লেখকের উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দাও)। (5)
উত্তর দেখো
দেরাদুন এক্সপ্রেসের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় ওঠার পর লেখক দেখেন সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। কামরাটি মূলত দীর্ঘকায় ও রুক্ষ চেহারার পাঠান যাত্রীদের দ্বারা পূর্ণ ছিল এবং সেখানে প্রবল কোলাহল চলছিল। এই পরিস্থিতিতে লেখক অত্যন্ত শান্ত থেকে নিজের অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি এবং ভাষাজ্ঞানের প্রয়োগ করেন।
লেখক অন্যান্য যাত্রীদের মতো জায়গা পাওয়ার জন্য কোনো ঝগড়া বা ঠেলাঠেলি করেননি। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য জাহির না করে, খুব বিনয়ের সাথে পশতু ভাষায় পাঠানদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। একজন সাধারণ বাঙালি বাবুর মুখে নিজেদের মাতৃভাষা শুনে পাঠানরা অত্যন্ত অবাক ও মুগ্ধ হয়ে যায়। এরপর লেখক চতুরতার সাথে পশতু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি খুশহাল খান খটকের নাম করেন এবং ফারসি কবি হাফিজের কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।
মাতৃভাষা এবং নিজেদের প্রিয় কবিদের প্রতি ভিনদেশি একজন বাঙালির এই জ্ঞান ও শ্রদ্ধা দেখে পাঠানরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মানীয় আলেম বা পণ্ডিত ব্যক্তি বলে মনে করে। লেখকের এই উপস্থিত বুদ্ধি ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে রূক্ষ পাঠানরাই তাঁকে সসম্মানে ‘বাবুজি’ বলে সম্বোধন করে এবং কামরায় বসার ও শোওয়ার আরামদায়ক জায়গা করে দেয়।
3. ‘পথচলতি’ রচনা অবলম্বনে পাঠান বা কাবুলিওয়ালাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করো। (5)
উত্তর দেখো
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথচলতি’ রচনায় আমরা পাঠান বা কাবুলিওয়ালাদের চরিত্রের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অথচ অত্যন্ত চমৎকার দিকের পরিচয় পাই।
বাহ্যিক রুক্ষতা: প্রথম দর্শনে পাঠানদের চেহারা অত্যন্ত দীর্ঘকায়, বলিষ্ঠ এবং রুক্ষ বলে মনে হয়। ট্রেনের কামরায় তারা অত্যন্ত কোলাহলপূর্ণ এবং অসহিষ্ণু পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাদের এই বাহ্যিক কাঠিন্য দেখে সাধারণ যাত্রীরা বেশ ভয় পেত এবং তাদের বদমেজাজি বা রূঢ় স্বভাবের মানুষ বলে মনে করত।
ভেতরের কোমলতা ও সাহিত্যপ্রীতি: কিন্তু লেখকের অভিজ্ঞতায় তাদের চরিত্রের এক অদ্ভুত সুন্দর দিক প্রকাশ পায়। এই পাঠানরা পেশায় সাধারণ ব্যবসায়ী বা কাবুলিওয়ালা হলেও, তারা তাদের মাতৃভাষা পশতু এবং সাহিত্যের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। খুশহাল খান খটক বা হাফিজের নাম শুনলে তাদের চোখেমুখে আনন্দ ও গর্ব ফুটে ওঠে। লেখকের মুখে নিজেদের ভাষা শুনে তারা যেভাবে তাঁকে সসম্মানে জায়গা করে দেয়, তাতে বোঝা যায় যে বাহ্যিক রুক্ষতার আড়ালে তারা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, গুণগ্রাহী, বন্ধুবৎসল এবং সাহিত্যের সমঝদার এক দারুণ মননশীল জাতি।
4. “ভাষার আদান-প্রদানে ধর্মের প্রাচীর ভেঙে গেল।” – এই উক্তির আলোকে লেখকের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবমৈত্রীর দিকটি আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথচলতি’ রচনাটি কেবল একটি ভ্রমণকাহিনি নয়, এটি মানবমৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
লেখক ছিলেন একজন হিন্দু বাঙালি পণ্ডিত, আর তাঁর সহযাত্রীরা ছিল ভিনদেশি, ভিন্ন সংস্কৃতির মুসলিম পাঠান বা কাবুলিওয়ালা। তাদের মধ্যে জাতি, ধর্ম, ভাষা এবং আভিজাত্যের একটি বিরাট প্রাচীর ছিল। কিন্তু লেখক সেই প্রাচীরকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং আন্তরিকতার সাথে ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার অহংকার না দেখিয়ে, অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পাঠানদের মাতৃভাষা পশতুতে কথা বলেছিলেন।
ফারসি সাহিত্যের গজল এবং পশতু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবির নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই পাঠানরা লেখককে নিজেদের আপনজন বা দোস্ত বলে মনে করে। এখানে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ বা শিক্ষিত-অশিক্ষিতের ফারাক সম্পূর্ণ মুছে যায়। ভাষার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমেই দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে যে এমন সুন্দর আত্মার আত্মীয়তা গড়ে উঠতে পারে, লেখকের এই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার দিকটিই আলোচ্য উক্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
5. ‘পথচলতি’ রচনাটিতে ভাষার ভূমিকা কীভাবে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তা বুঝিয়ে দাও। (5)
উত্তর দেখো
ভাষা কেবল মনের ভাব প্রকাশের একটি যান্ত্রিক মাধ্যম নয়, এটি দুটি মানুষের হৃদয়কে সংযুক্ত করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। ‘পথচলতি’ রচনায় ভাষা ঠিক এই জাদুকরী সেতুবন্ধনের কাজটিই করেছে।
ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণির ভিড় কামরায় যখন রুক্ষ পাঠান যাত্রীরা চিৎকার-চেঁচামেচি করে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল, তখন সাধারণ যাত্রীদের সাথে তাদের দূরত্ব কেবলই বাড়ছিল। কিন্তু ভাষাতত্ত্ববিদ লেখক যখন তাদের সাথে মাতৃভাষা পশতুতে কথা বলতে শুরু করলেন, তখন মুহূর্তে পুরো পরিবেশ বদলে গেল। নিজের মাতৃভাষা মানুষের কাছে সবচেয়ে আপন। তাই একজন ভিনদেশি বাঙালিকে নিজেদের ভাষায় কথা বলতে এবং ফারসি কবি হাফিজের কবিতা আবৃত্তি করতে দেখে পাঠানদের রুক্ষ হৃদয় নিমেষে গলে গেল।
ভাষার এই আদান-প্রদান এবং সাহিত্যের আলোচনার ফলেই সন্দেহ ও ভীতির পরিবেশ পালটে গিয়ে গভীর শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি হলো। লেখক প্রমাণ করলেন যে, যেকোনো মানুষের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানালে এবং সেই ভাষায় আন্তরিকতার সাথে কথা বললে, সবচেয়ে রূঢ় মানুষেরও হৃদয় জয় করা সম্ভব। এভাবেই রচনায় ভাষা মানুষের সাথে মানুষের সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
6. “তারা কাবুলিওয়ালা হয়েও সাহিত্যের সমঝদার।” – বক্তা কে? কাদের সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে? তাদের সাহিত্যপ্রীতির যে পরিচয় গদ্যাংশটিতে পাওয়া যায়, তা আলোচনা করো। (1+1+3=5)
উত্তর দেখো
বক্তা: আলোচ্য উক্তিটির বক্তা হলেন প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ও লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
কাদের সম্পর্কে: দেরাদুন এক্সপ্রেসের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় উপস্থিত সহযাত্রী পাঠান বা কাবুলিওয়ালাদের সম্পর্কে এই কথাটি বলা হয়েছে।
সাহিত্যপ্রীতির পরিচয়: কাবুলিওয়ালারা সাধারণত অত্যন্ত রুক্ষ চেহারার হয় এবং তারা মূলত সুদে টাকা খাটানোর ব্যবসা করে। কিন্তু এই রচনায় তাদের এক অন্য রূপ দেখা যায়। লেখক যখন তাদের সাথে পশতু ভাষায় কথা বলেন এবং ফারসি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি হাফিজের গজল আবৃত্তি করতে শুরু করেন, তখন তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা নিজেরাও লেখকের সাথে গলা মিলিয়ে কবিতা আবৃত্তি করে। এছাড়া পশতু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি খুশহাল খান খটকের নাম শুনে তাদের চোখেমুখে যে প্রবল উত্তেজনা ও গর্ব ফুটে ওঠে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় যে পেশায় সাধারণ ব্যবসায়ী হলেও তারা হৃদয় দিয়ে কবিতার রস আস্বাদন করতে জানে এবং তারা প্রকৃত অর্থেই সাহিত্যের সমঝদার বা গুণগ্রাহী।