সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান; অধ্যায় – সময় ও গতি ; দুই নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

অধ্যায় ৫: সময় ও গতি (Time and Motion) — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান ২)

1. স্থিতি ও গতি বলতে কী বোঝো?

উত্তর:
স্থিতি: সময়ের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন না হলে, বস্তুর সেই অবস্থাকে স্থিতি বলে। যেমন— ঘরবাড়ি, পাহাড়।
গতি: সময়ের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হলে, বস্তুর সেই অবস্থাকে গতি বলে। যেমন— চলন্ত বাস, উড়ান্ত পাখি।

2. স্কেলার রাশি ও ভেক্টর রাশি কাকে বলে?

উত্তর:
স্কেলার রাশি: যে ভৌত রাশির শুধুমাত্র মান আছে কিন্তু কোনো অভিমুখ নেই, তাকে স্কেলার রাশি বলে। যেমন— ভর, সময়, দ্রুতি, কার্য।
ভেক্টর রাশি: যে ভৌত রাশির মান এবং অভিমুখ দুই-ই আছে, তাকে ভেক্টর রাশি বলে। যেমন— সরণ, বেগ, ত্বরণ, বল।

3. অতিক্রান্ত দূরত্ব ও সরণের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) সংজ্ঞা: কোনো বস্তু যেকোনো পথে যতটা পথ অতিক্রম করে তা হলো দূরত্ব। আর নির্দিষ্ট দিকে বস্তুর প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থানের সরলরৈখিক দূরত্ব হলো সরণ।
(ii) প্রকৃতি: দূরত্ব স্কেলার রাশি, কিন্তু সরণ ভেক্টর রাশি।
[attachment_0](attachment)

4. দ্রুতি (Speed) ও বেগের (Velocity) মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য কী?

উত্তর:
পার্থক্য: দ্রুতির কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই (স্কেলার), কিন্তু বেগের নির্দিষ্ট দিক আছে (ভেক্টর)।
সম্পর্ক: নির্দিষ্ট দিকে দ্রুতিই হলো বেগ। অর্থাৎ, $\text{বেগ} = \frac{\text{সরণ}}{\text{সময়}}$ এবং $\text{দ্রুতি} = \frac{\text{অতিক্রান্ত দূরত্ব}}{\text{সময়}}$।

5. ত্বরণ ও মন্দন কাকে বলে?

উত্তর:
ত্বরণ: সময়ের সঙ্গে কোনো বস্তুর বেগ ক্রমশ বাড়তে থাকলে, বেগ বৃদ্ধির হারকে ত্বরণ বলে।
মন্দন: সময়ের সঙ্গে কোনো বস্তুর বেগ ক্রমশ কমতে থাকলে, বেগ হ্রাসের হারকে মন্দন বলে। মন্দনকে ঋণাত্মক ত্বরণও বলা হয়।

6. নিউটনের প্রথম গতিসূত্রটি লেখো।

উত্তর: বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে অবস্থার পরিবর্তন না করলে, স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় চলতে থাকবে।

7. জাড্য ধর্ম কাকে বলে? এটি কয় প্রকার?

উত্তর: যে ধর্মের জন্য কোনো বস্তু তার স্থির বা গতিশীল অবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করে, তাকে ওই বস্তুর জাড্য ধর্ম বলে।
জাড্য ধর্ম দুই প্রকার— (১) স্থিতি জাড্য এবং (২) গতি জাড্য।

8. চলন্ত বাস হঠাৎ ব্রেক কষলে যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কেন?

উত্তর: বাস যখন গতিশীল থাকে, তখন যাত্রীর পুরো শরীর বাসের সাথে গতিশীল থাকে। ব্রেক কষলে বাসের সাথে যাত্রীর শরীরের নিচের অংশ স্থির হয়ে যায়, কিন্তু গতি জাড্যের কারণে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। তাই যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

9. স্থির বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীরা পিছনের দিকে হেলে পড়ে কেন?

উত্তর: বাস স্থির থাকলে যাত্রীর শরীরও স্থির থাকে। বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীর শরীরের নিচের অংশ বাসের সাথে গতিশীল হয়, কিন্তু স্থিতি জাড্যের কারণে শরীরের উপরের অংশ স্থির থাকতে চায়। ফলে যাত্রীরা পিছনের দিকে হেলে পড়ে।

10. নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্রটি লেখো।

উত্তর: কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার বস্তুটির ওপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে প্রযুক্ত হয়, ভরবেগের পরিবর্তনও সেই দিকেই ঘটে।
গাণিতিক রূপ: $F = ma$ (যেখানে $F$=বল, $m$=ভর, $a$=ত্বরণ)।

11. নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রটি লেখো এবং একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর:
সূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
উদাহরণ: বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়লে গুলিটি সামনের দিকে তীব্র বেগে (ক্রিয়া) বেরিয়ে যায় এবং বন্দুকটি পিছনের দিকে ধাক্কা (প্রতিক্রিয়া) দেয়।

12. আমরা কীভাবে হাঁটি? (নিউটনের সূত্রের আলোকে ব্যাখ্যা)

উত্তর: হাঁটার সময় আমরা পা দিয়ে মাটির ওপর পেছনের দিকে একটি তীর্যক বল প্রয়োগ করি (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, মাটিও আমাদের পায়ের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া)। এই প্রতিক্রিয়াই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

13. মিশ্র গতি (Mixed Motion) কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

উত্তর: কোনো বস্তুর গতি যদি ঘূর্ণন এবং চলন গতির সমন্বয়ে ঘটে, তবে তাকে মিশ্র গতি বলে।
উদাহরণ: চলন্ত গাড়ির চাকা। চাকাটি নিজের অক্ষের চারপাশে ঘোরে (ঘূর্ণন) এবং একই সাথে রাস্তার ওপর দিয়ে সোজা এগিয়ে যায় (চলন)।

14. বৃত্তাকার গতি ও ঘূর্ণন গতির মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর:
বৃত্তাকার গতি: যখন কোনো বস্তু কোনো বিন্দুকে কেন্দ্র করে তার চারদিকে ঘোরে। বস্তুটি কেন্দ্রের বাইরে থাকে। যেমন— সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর গতি।
ঘূর্ণন গতি: যখন কোনো বস্তু নিজের শরীরের মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো অক্ষকে কেন্দ্র করে ঘোরে। যেমন— লাট্টুর গতি বা পৃথিবীর আহ্নিক গতি।

15. কার্য বা কাজ (Work) বলতে বিজ্ঞানে কী বোঝায়?

উত্তর: কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করলে যদি বলের প্রয়োগবিন্দুর সরণ ঘটে, তবে প্রযুক্ত বল কার্য করেছে বলা হয়।
কার্য ($W$) = প্রযুক্ত বল ($F$) $\times$ বলের অভিমুখে সরণ ($d$)।

16. যান্ত্রিক শক্তি কাকে বলে? এটি কয় প্রকার?

উত্তর: কোনো বস্তুর যান্ত্রিক কার্য করার সামর্থ্যকে যান্ত্রিক শক্তি বলে।
এটি দুই প্রকার— (১) স্থিতি শক্তি (Potential Energy) এবং (২) গতি শক্তি (Kinetic Energy)।

17. স্থিতি শক্তি ও গতি শক্তির উদাহরণ দাও।

উত্তর:
স্থিতি শক্তি: জলাধারে বা বাঁধের ওপর সঞ্চিত জল, ঘড়ির দম দেওয়া স্প্রিং।
গতি শক্তি: বন্দুক থেকে ছোঁড়া গুলি, চলন্ত গাড়ি, প্রবাহিত জল।

18. একটি বস্তুর সরণ শূন্য হতে পারে কি, যখন অতিক্রান্ত দূরত্ব শূন্য নয়? ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: হ্যাঁ, হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি একটি বৃত্তাকার মাঠের এক বিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করে সম্পূর্ণ মাঠ ঘুরে আবার সেই বিন্দুতেই ফিরে আসে, তবে তার অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে মাঠের পরিধির সমান, কিন্তু সরণ হবে শূন্য (কারণ প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থান এক)।

19. বলের সংজ্ঞা ও পরিমাপ নিউটনের কোন কোন সূত্র থেকে পাওয়া যায়?

উত্তর:
বলের সংজ্ঞা (Definition) পাওয়া যায় নিউটনের প্রথম গতিসূত্র থেকে।
বলের পরিমাপ (Measurement) পাওয়া যায় নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র থেকে ($F=ma$)।

20. পাখির ওড়া ও রকেটের উড্ডয়ন— এখানে কোন সাধারণ নীতি কাজ করে?

উত্তর: উভয়ক্ষেত্রেই নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র (ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া) কাজ করে। পাখি ডানা দিয়ে বাতাসকে নিচে ও পিছনে ঠেলে দেয় (ক্রিয়া) এবং বাতাস পাখিকে উপরে ও সামনে ঠেলে দেয় (প্রতিক্রিয়া)। রকেটের ক্ষেত্রেও নির্গত গ্যাসের প্রতিক্রিয়া বল রকেটকে উপরে তোলে।

21. গড় সৌর দিন (Mean Solar Day) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: সারা বছরের সমস্ত সৌর দিনের যোগফলকে $365$ দিয়ে ভাগ করলে যে গড় সময় পাওয়া যায়, তাকে গড় সৌর দিন বলে। ১ গড় সৌর দিন = ২৪ ঘণ্টা = ৮৬৪০০ সেকেন্ড।

22. সরল দোলক বা পেন্ডুলামের দোলনকাল কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না?

উত্তর: দোলনকাল পিণ্ড বা ববের (Bob) ভরের ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ হালকা বা ভারী যেকোনো বব ঝোলালে (সুতো একই দৈর্ঘ্যের হলে) দোলনকাল একই থাকবে।
[attachment_1](attachment)

23. “মহাবিশ্বে পরম স্থিতি বা পরম গতি বলে কিছু নেই”— ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: আমরা যখন কোনো বস্তুকে স্থির বা গতিশীল বলি, তা কোনো না কোনো বস্তুর সাপেক্ষে বলি (যেমন পৃথিবীর সাপেক্ষে গাছপালা স্থির)। কিন্তু পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, সূর্যও তার ছায়াপথে ঘুরছে। মহাবিশ্বে এমন কোনো বস্তু নেই যা সম্পূর্ণ স্থির। তাই পরম স্থিতি বা পরম গতি বলে কিছু নেই, সবই আপেক্ষিক।

24. কম্বলকে লাঠি দিয়ে পেটালে ধুলো ঝরে পড়ে কেন?

উত্তর: লাঠি দিয়ে পেটালে কম্বলটি গতিশীল হয়ে সরে যায়, কিন্তু কম্বলের গায়ে লেগে থাকা ধুলিকণাগুলি ‘স্থিতি জাড্যের’ কারণে নিজের জায়গায় স্থির থাকতে চায়। ফলে কম্বল সরে গেলেও ধুলো নিচে পড়ে যায়।

25. বস্তুর ভর ও ওজনের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) সংজ্ঞা: ভর হলো বস্তুর মধ্যে থাকা জড় পদার্থের পরিমাণ। ওজন হলো পৃথিবীকে যে বলে আকর্ষণ করে।
(ii) পরিবর্তন: স্থানভেদে ভর একই থাকে, কিন্তু ওজনের পরিবর্তন হয় (যেমন চাঁদে ওজন কমে যায়)।

26. দৌড় প্রতিযোগিতায় ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর পরেও দৌড়বিদরা সাথে সাথে থামতে পারে না কেন?

উত্তর: দৌড়বিদরা যখন দৌড়ায়, তখন তাদের শরীরে ‘গতি জাড্য’ সৃষ্টি হয়। ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর পর থামতে চাইলেও গতি জাড্যের কারণে শরীর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। তাই তারা সাথে সাথে থামতে না পেরে কিছুটা পথ এগিয়ে গিয়ে থামে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার