সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় ৬: পরমাণু, অণু ও রাসায়নিক বিক্রিয়া ৩ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

অধ্যায় ৬: পরমাণু, অণু ও রাসায়নিক বিক্রিয়া — ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান ৩)

1. ডাল্টনের পরমাণুবাদের তিনটি মূল স্বীকার্য লেখো।

উত্তর:
জন ডাল্টনের পরমাণুবাদের মূল কথাগুলি হলো:
১. প্রতিটি মৌলিক পদার্থ অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র, অবিভাজ্য কণা দ্বারা গঠিত, যাদের পরমাণু (Atom) বলে।
২. একই মৌলিক পদার্থের পরমাণুগুলির ভর এবং রাসায়নিক ধর্ম হুবহু এক।
৩. ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক পদার্থের পরমাণুগুলির ভর এবং রাসায়নিক ধর্ম আলাদা।
৪. রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় পরমাণুগুলি পূর্ণসংখ্যার সরল অনুপাতে যুক্ত হয়ে যৌগ গঠন করে।

2. পরমাণুর গঠন চিত্রসহ বর্ণনা করো। (নিউক্লিয়াস ও কক্ষপথ)

উত্তর:
পরমাণুর প্রধানত দুটি অংশ থাকে:
১. নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক: এটি পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত। এখানে ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন ($p$) এবং নিস্তড়িৎ নিউট্রন ($n$) ঠাসাঠাসি করে থাকে। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর এখানেই জমা থাকে।
২. ইলেকট্রন মহল বা কক্ষপথ: নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনগুলি ($e$) ঘুরতে থাকে।
একটি সাধারণ পরমাণুতে প্রোটন ও ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান থাকে, তাই পরমাণু নিস্তড়িৎ হয়।

3. যোজ্যতা কাকে বলে? যোজ্যতার সাহায্যে কীভাবে যৌগের সংকেত লেখা হয় তা একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝাও।

উত্তর:
যোজ্যতা: রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় একটি মৌলের পরমাণু অন্য মৌলের পরমাণুর সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে যোজ্যতা বলে।
সংকেত লেখার নিয়ম: দুটি মৌলের যোজ্যতা একে অপরের সঙ্গে বিনিময় (Exchange) করে সংকেত লেখা হয়।
উদাহরণ: অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের সংকেত লেখার সময়—
অ্যালুমিনিয়ামের ($Al$) যোজ্যতা = ৩
অক্সিজেনের ($O$) যোজ্যতা = ২
$Al$-এর ৩ যাবে $O$-এর কাছে এবং $O$-এর ২ যাবে $Al$-এর কাছে।
$\therefore$ সংকেত হবে $Al_2O_3$।

4. নিচের সমীকরণগুলির সমতা বিধান (Balance) করো:
(i) $P_4 + O_2 \rightarrow P_2O_5$
(ii) $Fe + H_2O \rightarrow Fe_3O_4 + H_2$

উত্তর:
(i) $P_4 + 5O_2 = 2P_2O_5$
(বামপক্ষে ৪টি P, ডানপক্ষে ৪টি P; বামপক্ষে ১০টি O, ডানপক্ষে ১০টি O)

(ii) $3Fe + 4H_2O = Fe_3O_4 + 4H_2$
(বামপক্ষে ৩টি Fe, ডানপক্ষে ৩টি Fe; বামপক্ষে ৪টি O, ডানপক্ষে ৪টি O; বামপক্ষে ৮টি H, ডানপক্ষে ৮টি H)

5. প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া কাকে বলে? একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:
সংজ্ঞা: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো মৌল কোনো যৌগের অণু মধ্যস্থ অন্য কোনো মৌলকে সরিয়ে সেই স্থান দখল করে এবং নতুন যৌগ উৎপন্ন করে, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: একটি কপার সালফেট বা তুঁতের ($CuSO_4$) দ্রবণে একটি পরিষ্কার লোহার পেরেক ($Fe$) ডুবিয়ে রাখলে দেখা যাবে, লোহা কপারকে সরিয়ে নিজে সেই জায়গা নিয়েছে এবং ফেরাস সালফেট ($FeSO_4$) তৈরি করেছে।
সমীকরণ: $Fe + CuSO_4 \rightarrow FeSO_4 + Cu$ (তামার লালচে অধঃক্ষেপ পড়ে)।

6. প্রত্যক্ষ সংযোগ বিক্রিয়া কাকে বলে? উদাহরণসহ লেখো।

উত্তর:
সংজ্ঞা: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক মৌল বা যৌগ সরাসরি যুক্ত হয়ে একটিমাত্র নতুন যৌগ গঠন করে, তাকে প্রত্যক্ষ সংযোগ বিক্রিয়া বলে।
উদাহরণ ১: জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতাকে অক্সিজেনে পোড়ালে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড উৎপন্ন হয়।
$2Mg + O_2 \rightarrow 2MgO$
উদাহরণ ২: কার্বন ও অক্সিজেনের সংযোগে কার্বন ডাইঅক্সাইড গঠন।
$C + O_2 \rightarrow CO_2$

7. অনুঘটক কী? রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এর ভূমিকা কী?

উত্তর:
অনুঘটক: যে সব পদার্থ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় বা কমায় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজেরা ভর ও রাসায়নিক ধর্মে অপরিবর্তিত থাকে, তাদের অনুঘটক বলে।
ভূমিকা:
১. ধীর গতির বিক্রিয়াকে দ্রুত করতে সাহায্য করে (ধনাত্মক অনুঘটক)। যেমন— অক্সিজেন প্রস্তুতিতে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($MnO_2$)।
২. অতি দ্রুত বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ বা ধীর করতে সাহায্য করে (ঋণাত্মক অনুঘটক)।

8. এনজাইম বা উৎসেচক কী? মানবদেহে এর গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর:
এনজাইম: সজীব কোষে উৎপন্ন প্রোটিনধর্মী জৈব অনুঘটককে এনজাইম বা উৎসেচক বলে।
গুরুত্ব:
১. খাদ্য হজমে সাহায্য করে (যেমন— লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ শ্বেতসার হজম করে)।
২. শ্বাসকার্য ও শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে।
৩. জীবদেহের বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থ নষ্ট করতে বা নতুন প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।

9. নিচের যৌগগুলির সংকেত লেখো:
(i) জিংক ক্লোরাইড
(ii) সোডিয়াম কার্বনেট
(iii) অ্যালুমিনিয়াম সালফেট

উত্তর:
(i) জিংক ক্লোরাইড: $Zn$-এর যোজ্যতা ২, $Cl$-এর যোজ্যতা ১।
$\therefore$ সংকেত: $ZnCl_2$

(ii) সোডিয়াম কার্বনেট: $Na$-এর যোজ্যতা ১, কার্বনেট ($CO_3$)-এর যোজ্যতা ২।
$\therefore$ সংকেত: $Na_2CO_3$

(iii) অ্যালুমিনিয়াম সালফেট: $Al$-এর যোজ্যতা ৩, সালফেট ($SO_4$)-এর যোজ্যতা ২।
$\therefore$ সংকেত: $Al_2(SO_4)_3$

10. বিয়োজন বিক্রিয়া কাকে বলে? জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ কী ধরনের বিক্রিয়া এবং কেন?

উত্তর:
বিয়োজন বিক্রিয়া: যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো যৌগ ভেঙে গিয়ে দুই বা ততোধিক সরল মৌল বা যৌগে পরিণত হয়, তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে।
জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ: এটি একটি বিয়োজন বিক্রিয়া। কারণ এখানে সামান্য এসিড মিশ্রিত জলের ($H_2O$) মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে, জল ভেঙে গিয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্যাস— হাইড্রোজেন ($H_2$) এবং অক্সিজেন ($O_2$) উৎপন্ন করে।
$2H_2O \rightarrow 2H_2 + O_2$

11. পরিবর্তনশীল যোজ্যতা বলতে কী বোঝো? লোহার উদাহরণ দিয়ে বোঝাও।

উত্তর:
কিছু কিছু মৌল আছে যারা ভিন্ন ভিন্ন যৌগে ভিন্ন ভিন্ন যোজ্যতা প্রদর্শন করে। মৌলের এই ক্ষমতাকে পরিবর্তনশীল যোজ্যতা বলে।
উদাহরণ: লোহা ($Fe$) বা আয়রনের দুটি যোজ্যতা দেখা যায়— ২ এবং ৩।
১. ফেরাস ক্লোরাইড ($FeCl_2$)-এ লোহার যোজ্যতা ২ (কম যোজ্যতাকে ‘আস’ বলা হয়)।
২. ফেরিক ক্লোরাইড ($FeCl_3$)-এ লোহার যোজ্যতা ৩ (বেশি যোজ্যতাকে ‘ইক’ বলা হয়)।

12. মূলক (Radical) কী? ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মূলকের একটি করে উদাহরণ ও সংকেত দাও।

উত্তর:
মূলক: ভিন্ন ভিন্ন মৌলের একাধিক পরমাণু জোটবদ্ধ হয়ে যখন একটি তড়িৎগ্রস্ত পরমাণু গুচ্ছ তৈরি করে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটিমাত্র পরমাণুর ন্যায় আচরণ করে, তখন তাকে মূলক বলে।
উদাহরণ:
১. ধনাত্মক মূলক: অ্যামোনিয়াম মূলক, সংকেত: $NH_4^{+}$ (যোজ্যতা ১)।
২. ঋণাত্মক মূলক: সালফেট মূলক, সংকেত: $SO_4^{2-}$ (যোজ্যতা ২)।

13. রাসায়নিক বিক্রিয়া ও ভরের নিত্যতা সূত্রটি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:
সূত্র: যে-কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থগুলির মোট ভর এবং বিক্রিয়াজাত পদার্থগুলির মোট ভর সর্বদা সমান থাকে। ভরের সৃষ্টি বা বিনাশ হয় না।
ব্যাখ্যা: কার্বন ($C$) ও অক্সিজেন ($O_2$) বিক্রিয়া করে কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_2$) তৈরি করলে:
$C + O_2 = CO_2$
ভর হিসেবে: ১২ গ্রাম কার্বন + ৩২ গ্রাম অক্সিজেন = ৪৪ গ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড।
বামপক্ষ ($১২+৩২=৪৪$) এবং ডানপক্ষ ($৪৪$) সমান, অর্থাৎ ভর সংরক্ষিত থাকে।

14. “পরমাণু নিস্তড়িৎ হয় কেন?”— ব্যাখ্যা করো। কীভাবে এটি আয়ন বা তড়িৎগ্রস্ত কণায় পরিণত হয়?

উত্তর:
নিস্তড়িৎ হওয়ার কারণ: সাধারণ অবস্থায় একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যতগুলি ধনাত্মক প্রোটন থাকে, নিউক্লিয়াসের বাইরে ঠিক ততগুলিই ঋণাত্মক ইলেকট্রন ঘুরতে থাকে। বিপরীত ধর্মী আধানের পরিমাণ সমান হওয়ায় পরমাণু সামগ্রিকভাবে নিস্তড়িৎ হয়।
আয়ন গঠন: রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় পরমাণু এক বা একাধিক ইলেকট্রন বর্জন করলে ধনাত্মক আয়ন (ক্যাটায়ন) এবং ইলেকট্রন গ্রহণ করলে ঋণাত্মক আয়নে (অ্যানায়ন) পরিণত হয়।

15. নিচের মৌলগুলির যোজ্যতা লেখো এবং একটি করে যৌগের সংকেত তৈরি করো:
(i) কার্বন (ii) ম্যাগনেসিয়াম (iii) নাইট্রোজেন

উত্তর:
(i) কার্বন ($C$): যোজ্যতা ৪। অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করে কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_2$)।
(ii) ম্যাগনেসিয়াম ($Mg$): যোজ্যতা ২। ক্লোরিনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করে ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ($MgCl_2$)।
(iii) নাইট্রোজেন ($N$): যোজ্যতা ৩। হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করে অ্যামোনিয়াম ($NH_3$)।

16. মানুষের শরীরে ধাতব ও অধাতব আয়নগুলির ভূমিকা কী?

উত্তর:
মানবদেহে বিভিন্ন আয়ন বা খনিজ মৌল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
১. ক্যালশিয়াম আয়ন ($Ca^{2+}$): হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
২. আয়রন বা লোহা ($Fe^{2+}/Fe^{3+}$): রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা অক্সিজেন পরিবহণ করে।
৩. সোডিয়াম ($Na^+$) ও পটাশিয়াম ($K^+$): স্নায়ুস্পন্দন পরিবহণ এবং দেহের জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার