সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় ৭: মানুষের খাদ্য, ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৭: মানুষের খাদ্য — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান ২)

1. শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট আমাদের শরীরের জন্য কেন প্রয়োজন?

উত্তর:
(i) শর্করা আমাদের দেহে কার্য করার শক্তি যোগায় (1 গ্রাম শর্করা থেকে প্রায় 4.0 kcal শক্তি পাওয়া যায়)।
(ii) এটি প্রোটিনকে তাপশক্তি উৎপাদনের কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়, তাই একে ‘প্রোটিন বাঁচোয়া খাদ্য’ বলে।

2. প্রাণীজ প্রোটিন ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের মধ্যে পার্থক্য কী? উদাহরণ দাও।

উত্তর:
প্রাণীজ প্রোটিন: প্রাণীদেহ থেকে পাওয়া যায়। সাধারণত এতে সবকটি অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে (প্রথম শ্রেণীর প্রোটিন)। যেমন— মাছ, মাংস, ডিম।
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়। এতে সবকটি অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে না (দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রোটিন)। যেমন— ডাল, সোয়াবিন।

3. লিপিড বা ফ্যাটের প্রধান দুটি কাজ লেখো।

উত্তর:
(i) ফ্যাট দেহের তাপশক্তি উৎপন্ন করে (সবচেয়ে বেশি শক্তিদায়ক খাদ্য)।
(ii) চামড়ার নিচে জমা হয়ে এটি দেহের তাপ সংরক্ষিত রাখে এবং বাইরের আঘাত থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে রক্ষা করে।

4. ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: যে বিশেষ জৈব পরিপোষক খাদ্যে খুব অল্প পরিমাণে উপস্থিত থেকে দেহের স্বাভাবিক পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং যার অভাবে দেহে নানা রোগ সৃষ্টি হয়, তাকে ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ বলে।

5. জলে দ্রবণীয় ও ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর নাম লেখো।

উত্তর:
জলে দ্রবণীয়: ভিটামিন B-কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন C।
ফ্যাটে দ্রবণীয়: ভিটামিন A, ভিটামিন D, ভিটামিন E এবং ভিটামিন K।

6. ভিটামিন A-এর দুটি কাজ লেখো। এর অভাবে কী রোগ হয়?

উত্তর: কাজ: চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা এবং ত্বক বা চামড়া সুস্থ রাখা।
অভাবজনিত রোগ: রাতকানা (অল্প আলোতে দেখতে না পাওয়া) এবং চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া।

7. আমাদের দেহে ভিটামিন D কীভাবে তৈরি হয়? এর কাজ কী?

উত্তর: মানুষের ত্বকে সূর্যালোকের অতিবেগুনী রশ্মি পড়লে সেখানে ভিটামিন D সংশ্লেষিত হয়।
কাজ: হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করা। এর অভাবে শিশুদের রিকেট রোগ হয়।

8. ভিটামিন C-এর উৎস ও অভাবজনিত লক্ষণ লেখো।

উত্তর: উৎস: পাতিলেবু, কমলালেবু, আমলকি, পেয়ারা, কাঁচালঙ্কা।
লক্ষণ: মাড়ি ফুলে যাওয়া, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া এবং দাঁত পড়ে যাওয়া (স্কার্ভি রোগ)।

9. ভিটামিন B-কমপ্লেক্সের অভাবে শরীরে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

উত্তর:
(i) ঠোঁটের কোণে ও জিভে ঘা হওয়া (Stomatitis)।
(ii) স্নায়ুর দুর্বলতা বা বেরিবেরি রোগ।
(iii) রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া।

10. মানবদেহে আয়রনের (লৌহ) কাজ কী? এর অভাবে কী হয়?

উত্তর: কাজ: আয়রন রক্তে লোহিত রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সাহায্য করে, যা সারা দেহে অক্সিজেন পরিবহণ করে।
অভাবজনিত ফল: রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া, শরীর দুর্বল লাগা, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।

11. ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস আমাদের শরীরের জন্য কেন অপরিহার্য?

উত্তর: ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস প্রধানত হাড় এবং দাঁতের গঠন মজবুত করার জন্য প্রয়োজন। এছাড়া ক্যালশিয়াম পেশি সংকোচন ও রক্ত তঞ্চনে সাহায্য করে।

12. আয়োডিনের অভাবে কী রোগ হয়? এই মৌলের গুরুত্ব কী?

উত্তর: রোগ: গয়টার বা গলগণ্ড এবং শিশুদের মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া।
গুরুত্ব: আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন (থাইরক্সিন) তৈরিতে সাহায্য করে, যা দেহের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে।

13. খাদ্যতন্তু (Dietary Fiber) কী? এর কাজ কী?

উত্তর: খাদ্যতন্তু হলো সেলুলোজ ও পেকটিন জাতীয় অপাচ্য কার্বোহাইড্রেট যা শাকসবজি, ফল ও দানাশস্যে থাকে।
কাজ: মল নির্গমনে সাহায্য করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলত্ব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

14. ফাইটোকেমিকেলস (Phytochemicals) বা উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক কী?

উত্তর: রঙিন ফল, শাকসবজি, চা ইত্যাদিতে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত কিছু রাসায়নিক যৌগ যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সুরক্ষায় সাহায্য করে এবং মানুষের বার্ধক্য রোধে ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। যেমন— ক্যারোটিনয়েড, ফ্ল্যাভোনয়েড।

15. সুষম খাদ্য (Balanced Diet) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: যে খাদ্যে শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং জল—খাদ্যের এই ছয়টি উপাদান সঠিক গুণাগুণ ও পরিমাণে উপস্থিত থাকে এবং যা গ্রহণ করলে দেহের স্বাভাবিক পুষ্টি ও বৃদ্ধি হয়, তাকে সুষম খাদ্য বলে। যেমন— দুধ, খিচুড়ি।

16. অপুষ্টি (Malnutrition) কী? এর দুটি কারণ লেখো।

উত্তর: খাদ্যে এক বা একাধিক পুষ্টি উপাদানের অভাব বা আধিক্যের ফলে শরীরে যে অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি হয়, তাকে অপুষ্টি বলে।
কারণ: ১. পর্যাপ্ত সুষম খাদ্যের অভাব (দারিদ্র্য)। ২. খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অজ্ঞতা।

17. কোয়াশিওরকর (Kwashiorkor) রোগের লক্ষণগুলি লেখো।

উত্তর: এটি প্রোটিনের অভাবে হয়। লক্ষণগুলি হলো:
(i) শিশুদের পেট ফুলে যায়।
(ii) গায়ের চামড়া গাঢ় বর্ণের ও খসখসে হয়ে যায়।
(iii) চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে।

18. ম্যারাসমাস (Marasmus) রোগের লক্ষণগুলি লেখো।

উত্তর: এটি প্রোটিন ও শক্তির (ক্যালোরি) অভাবে হয়। লক্ষণগুলি হলো:
(i) দেহের পেশি ও চর্বি ক্ষয়ে গিয়ে হাড় বেরিয়ে পড়ে।
(ii) চামড়া কুঁচকে যায় এবং হাত-পা খুব সরু হয়ে যায়।

19. স্থূলত্ব বা ওবেসিটি (Obesity) কী? এর কারণ কী?

উত্তর: প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ওজন বেড়ে যাওয়াকে স্থূলত্ব বলে।
কারণ: ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুড বেশি খাওয়া এবং কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা।

20. BMI কী? এর সূত্রটি লেখো।

উত্তর: BMI বা Body Mass Index হলো দেহের ওজনের সাথে উচ্চতার অনুপাত, যা দিয়ে পুষ্টির মান নির্ণয় করা হয়।
$$BMI = \frac{\text{দেহের ওজন (কেজি)}}{\text{দেহের উচ্চতা (মিটার)}^2}$$

21. প্রক্রিয়াজাত খাদ্য (Processed Food) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: প্রাকৃতিক খাবারকে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে, প্যাকেটজাত করে এবং অনেকদিন সংরক্ষণযোগ্য করে যে খাবার তৈরি করা হয়, তাকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বলে। যেমন— চিপস, জ্যাম, সস, কোল্ড ড্রিংকস।

22. মেটানিল ইয়েলো কী? এটি শরীরের কী ক্ষতি করে?

উত্তর: মেটানিল ইয়েলো হলো এক ধরনের সস্তা, কৃত্রিম হলুদ রাসায়নিক রং যা লাড্ডু, বেগুনি বা হলুদ গুঁড়োতে ভেজাল হিসেবে মেশানো হয়।
এটি স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।

23. আজিনোমোটো কী? এটি কেন ক্ষতিকারক?

উত্তর: আজিনোমোটো হলো মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট নামক এক ধরনের রাসায়নিক যা খাবারে স্বাদ বাড়াতে (বিশেষত চাইনিজ খাবারে) ব্যবহার করা হয়।
অতিরিক্ত ব্যবহারে মাথা ধরা, স্নায়ুর ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। একে ‘চাইনিজ রেস্তোরাঁ সিনড্রোম’ বলা হয়।

24. আমাদের শরীরে জলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ লেখো।

উত্তর:
(i) দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা (ঘামের মাধ্যমে)।
(ii) খাদ্য হজম করা এবং দূষিত পদার্থ (মূত্র ও ঘাম) শরীর থেকে বের করে দেওয়া।

25. জিংক (Zinc) বা দস্তা আমাদের শরীরের জন্য কেন প্রয়োজন?

উত্তর: জিংক মস্তিষ্কের গঠন ও বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে। এছাড়া রক্তে শর্করার পরিমাণ ঠিক রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এটি সাহায্য করে।

26. প্রোটিন ও ফ্যাটের শক্তির মান (Calorific Value) কত?

উত্তর:
১ গ্রাম প্রোটিন দহনে প্রায় 4.1 kcal শক্তি উৎপন্ন হয়।
১ গ্রাম ফ্যাট দহনে প্রায় 9.3 kcal শক্তি উৎপন্ন হয়।

27. কৃত্রিম খাদ্য রঞ্জক বা রং (Food Colors) ব্যবহারের কুফল কী?

উত্তর: সস্তা ও অননুমোদিত কৃত্রিম রং (যেমন- মেটানিল ইয়েলো, ম্যালাকাইট গ্রিন) দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি, ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয় এবং ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

28. “দুধ একটি সুষম খাদ্য”— ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: দুধে খাদ্যের প্রায় সবকটি উপাদান (শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ লবণ) সঠিক অনুপাতে থাকে যা শিশুদের পুষ্টির জন্য আদর্শ। তাই দুধকে সুষম খাদ্য (যদিও ভিটামিন C ও আয়রনের ঘাটতি থাকে) বলা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার