সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় ৭: মানুষের খাদ্য, ৩ বা ৫ নম্বরের ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন
অধ্যায় ৭: মানুষের খাদ্য — ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান ৩/৫)
1. শর্করা ও প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের উৎস এবং কাজগুলি লেখো।
(ক) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট:
উৎস: চাল, গম, আলু, চিনি, ভুট্টা।
কাজ:
1. দেহের কর্মক্ষমতা বজায় রাখা ও তাপশক্তি উৎপাদন করা।
2. গ্লাইকোজেন হিসেবে যকৃৎ ও পেশিতে শক্তি জমা রাখা।
(খ) প্রোটিন:
উৎস: মাছ, মাংস, ডিম (প্রাণিজ); ডাল, সোয়াবিন (উদ্ভিজ্জ)।
কাজ:
1. দেহের বৃদ্ধি ঘটানো এবং ক্ষয়পূরণ করা।
2. এনজাইম ও হরমোন তৈরি করা।
3. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা (অ্যান্টিবডি তৈরি করে)।
2. ফ্যাট বা লিপিড আমাদের শরীরের জন্য কেন প্রয়োজনীয়? অতিরিক্ত ফ্যাট জমার কুফল কী?
প্রয়োজনীয়তা:
1. ফ্যাট দেহের শক্তির প্রধান উৎস (1 গ্রাম ফ্যাট থেকে 9.3 kcal শক্তি মেলে)।
2. চামড়ার নিচে জমা হয়ে এটি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে।
3. ভিটামিন A, D, E, K-কে দ্রবীভূত করতে সাহায্য করে।
কুফল: রক্তনালীতে অতিরিক্ত ফ্যাট জমলে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, ফলে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের (Heart Attack) সম্ভাবনা বাড়ে।
3. ভিটামিন A এবং ভিটামিন D-এর উৎস, কাজ এবং অভাবজনিত রোগের নাম লেখো।
ভিটামিন A:
* উৎস: গাজর, পাকা আম, পেঁপে, কড লিভার অয়েল।
* কাজ: দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা এবং স্নায়ুকলা সুস্থ রাখা।
* রোগ: রাতকানা এবং চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া (ফ্রিনোডার্মা)।
ভিটামিন D:
* উৎস: সূর্যালোক (ত্বকে তৈরি হয়), দুধ, ডিমের কুসুম।
* কাজ: হাড় ও দাঁত শক্ত করা, ক্যালশিয়াম শোষণে সাহায্য করা।
* রোগ: শিশুদের রিকেট এবং বয়স্কদের হাড় নরম হয়ে যাওয়া (অস্টিওম্যালোসিয়া)।
4. জল এবং খাদ্যতন্তু (Fiber) আমাদের দেহে কী ভূমিকা পালন করে?
জলের ভূমিকা:
1. দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা (ঘামের মাধ্যমে)।
2. খাদ্য হজম ও পরিবহণে সাহায্য করা।
3. দেহ থেকে দূষিত পদার্থ (মূত্র) বের করে দেওয়া।
খাদ্যতন্তুর ভূমিকা:
1. মলের পরিমাণ বাড়িয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
2. রক্তের গ্লুকোজ ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
3. স্থূলত্ব বা মেদ কমাতে সাহায্য করে।
5. ম্যারাসমাস ও কোয়াশিওরকর রোগের কারণ ও লক্ষণগুলি তুলনা করো।
| বিষয় | ম্যারাসমাস | কোয়াশিওরকর |
|---|---|---|
| কারণ | প্রোটিন ও শক্তি (উভয়ের) অভাব। | প্রধানত প্রোটিনের অভাব। |
| লক্ষণ | 1. হাত-পা কাঠির মতো সরু হয়ে যায়। 2. চামড়া কুঁচকে যায়। |
1. পেট ফুলে যায় (গামলার মতো)। 2. চামড়া গাঢ় ও খসখসে হয়। |
6. মানবদেহে আয়রন (Fe), ক্যালশিয়াম (Ca) এবং আয়োডিন (I)-এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
1. আয়রন: হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদান। এর অভাবে রক্তাল্পতা হয় এবং সারা দেহে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়।
2. ক্যালশিয়াম: হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে। এছাড়া রক্ত জমাট বাঁধতে এবং পেশি সংকোচনে সাহায্য করে।
3. আয়োডিন: থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। এর অভাবে গলগণ্ড রোগ হয় এবং বুদ্ধির বিকাশ কমে যায়।
7. স্থূলত্ব বা ওবেসিটি (Obesity) কী? এর কারণ ও কুফলগুলি লেখো।
সংজ্ঞা: প্রয়োজনের তুলনায় শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াকে স্থূলত্ব বলে। (BMI 30-এর বেশি হলে)।
কারণ:
1. অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড বা তেল-চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া।
2. কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা।
কুফল:
রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে মধুমেহ (Diabetes) হতে পারে, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং হাড়ের জোড়ায় ব্যথা হতে পারে।
8. খাদ্যে ভেজাল (Food Adulteration) বলতে কী বোঝো? মেটানিল ইয়েলো ও আজিনোমোটোর ক্ষতিকারক প্রভাব লেখো।
খাদ্যে ভেজাল: অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার লোভে খাদ্যের সাথে যে সস্তা, নিম্নমানের বা ক্ষতিকারক দ্রব্য মেশায়, তাকে খাদ্যে ভেজাল বলে।
ক্ষতিকারক প্রভাব:
* মেটানিল ইয়েলো: সস্তা হলুদ রং (লাড্ডু বা হলুদ গুঁড়োতে মেশানো হয়)। এটি স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
* আজিনোমোটো: চাইনিজ খাবারে স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ক্ষতি করে এবং বুক ধড়ফড়ানি বা মাথা ধরার কারণ হতে পারে।
9. ফাইটোকেমিকেলস কী? মানবদেহে এদের গুরুত্ব লেখো।
সংজ্ঞা: রঙিন ফল, শাকসবজি, চা ইত্যাদিতে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত যে বিশেষ জৈব রাসায়নিক যৌগগুলি উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সুরক্ষায় কাজ করে, তাদের ফাইটোকেমিকেলস বলে। (যেমন- বিটা ক্যারোটিন, লাইকোপিন)।
গুরুত্ব:
1. মানবদেহের বার্ধক্য প্রতিরোধ করে (অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে)।
2. ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমায়।
3. হৃদপিণ্ড ভালো রাখে এবং হাড় শক্ত করে।
10. প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Food) বা ফাস্ট ফুড স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক কেন?
চিপস, বার্গার, কোল্ড ড্রিংকস বা ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, কারণ:
1. এতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং চর্বি থাকে, যা স্থূলত্ব ও উচ্চ রক্তচাপ বাড়ায়।
2. এতে ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং খাদ্যতন্তু প্রায় থাকেই না।
3. কৃত্রিম রং এবং সংরক্ষক (Preservatives) মেশানো থাকে যা লিভার ও কিডনির ক্ষতি করে।
11. ভিটামিন C এবং ভিটামিন B-কমপ্লেক্সের অভাবে কী কী সমস্যা দেখা দেয়?
ভিটামিন C-এর অভাব:
1. স্কার্ভি রোগ হয় (মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে)।
2. ঘা শুকাতে দেরি হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
ভিটামিন B-কমপ্লেক্সের অভাব:
1. বেরিবেরি রোগ (স্নায়ুর দুর্বলতা, পায়ে জল জমা)।
2. মুখে বা ঠোঁটের কোণে ঘা (Stomatitis)।
3. রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া।
12. সুষম খাদ্য কাকে বলে? একটি আদর্শ সুষম খাদ্যের উদাহরণ দাও এবং ব্যাখ্যা করো।
সংজ্ঞা: যে খাদ্যে শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও জল—এই ছয়টি উপাদান সঠিক অনুপাতে ও গুণাগুণ অনুসারে থাকে, তাকে সুষম খাদ্য বা Balanced Diet বলে।
উদাহরণ: দুধ বা খিচুড়ি।
ব্যাখ্যা: খিচুড়িতে চাল (শর্করা), ডাল (প্রোটিন), তেল/ঘি (ফ্যাট), সবজি (ভিটামিন, খনিজ ও তন্তু) এবং জল থাকে। তাই এটি একটি সুষম খাবার।
13. একজন রোগীর লক্ষণ দেখে তুমি কীভাবে বুঝবে তার রক্তাল্পতা (Anemia) এবং গয়টার (Goiter) হয়েছে?
রক্তাল্পতার লক্ষণ:
1. চোখের নিচের পাতা, ঠোঁট ও নখ ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যাওয়া।
2. অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা বা শ্বাসকষ্ট হওয়া।
3. সবসময় দুর্বলতা অনুভব করা।
গয়টারের লক্ষণ:
1. গলার সামনের দিক অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া (থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া)।
2. চোখগুলো ঠেলে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসা।
3. গলার স্বর পরিবর্তন হওয়া।
14. “শাকসবজি ও ফল ধুয়ে তারপর কাটা উচিত, কাটার পর ধোয়া উচিত নয়”— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
শাকসবজি ও ফলের মধ্যে অনেক জলে দ্রবণীয় ভিটামিন (যেমন- ভিটামিন B-কমপ্লেক্স ও ভিটামিন C) এবং খনিজ লবণ থাকে।
যদি সবজি কাটার পর ধোয়া হয়, তবে কাটা অংশ দিয়ে এই ভিটামিন ও খনিজগুলো জলের সাথে ধুয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে খাদ্যের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সবজি কাটার আগেই ভালো করে ধুয়ে নেওয়া উচিত।