সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান; অধ্যায় – সময় ও গতি ; ৩ বা ৫ নম্বারের প্রশ্ন উত্তর

অধ্যায় ৫: সময় ও গতি (Time and Motion) — সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন (মান ৩)

1. নিউটনের প্রথম গতিসূত্রটি লেখো এবং এই সূত্র থেকে কী কী জানা যায়?

উত্তর: সূত্র: বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করে অবস্থার পরিবর্তন না ঘটালে, স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় চলতে থাকবে।
এই সূত্র থেকে দুটি বিষয় জানা যায়:
(i) পদার্থের জাড্য ধর্ম (Inertia)।
(ii) বলের সংজ্ঞা (Definition of Force)।

2. স্থিতি জাড্য কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর: স্থির বস্তুর চিরকাল স্থির থাকার প্রবণতাকে বা ধর্মকে স্থিতি জাড্য বলে।
উদাহরণ: একটি গ্লাসের ওপর পোস্টকার্ড রেখে তার ওপর একটি মুদ্রা রাখা হলো। এবার জোরে টোকা দিয়ে পোস্টকার্ডটি সরিয়ে দিলে দেখা যাবে মুদ্রাটি কার্ডের সাথে না গিয়ে গ্লাসের মধ্যে পড়ে গেছে। স্থিতি জাড্যের জন্য মুদ্রাটি নিজের জায়গায় স্থির থাকতে চাওয়ার ফলেই এমন হয়।

3. গতি জাড্য কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর: গতিশীল বস্তুর চিরকাল সমবেগে সরলরেখায় গতিশীল থাকার প্রবণতাকে গতি জাড্য বলে।
উদাহরণ: চলন্ত সাইকেলের প্যাডেল করা বন্ধ করে দিলেও সাইকেলটি সঙ্গে সঙ্গে না থেমে আরও কিছুটা পথ এগিয়ে যায়। গতি জাড্যের কারণেই সাইকেলটি তার গতি বজায় রাখার চেষ্টা করে।

4. চলন্ত বাস হঠাৎ ব্রেক কষলে যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে কেন?

উত্তর: বাস যখন গতিশীল থাকে, তখন যাত্রীর সমগ্র দেহ বাসের সঙ্গে একই বেগে গতিশীল থাকে। বাস হঠাৎ থামলে যাত্রীর দেহের নিচের অংশ বাসের মেঝের সংস্পর্শে থাকায় স্থির হয়ে যায়। কিন্তু দেহের উপরের অংশ ‘গতি জাড্যের’ কারণে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। তাই যাত্রীরা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

5. স্থির বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীরা পিছনের দিকে হেলে পড়ে কেন?

উত্তর: বাস যখন স্থির থাকে, যাত্রীর দেহও স্থির থাকে। বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে যাত্রীর দেহের নিচের অংশ বাসের সংলগ্ন থাকায় গতিশীল হয়। কিন্তু দেহের উপরের অংশ ‘স্থিতি জাড্যের’ কারণে নিজের জায়গায় স্থির থাকতে চায়। ফলে নিচের অংশ এগিয়ে যায় এবং উপরের অংশ পিছিয়ে পড়ে, তাই যাত্রী পিছনের দিকে হেলে পড়ে।

6. নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্রটি লেখো। এর একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ উল্লেখ করো।

উত্তর: সূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।
প্রয়োগ: নৌকা থেকে তীরে লাফ দেওয়ার সময় আমরা পা দিয়ে নৌকাটিকে পিছনের দিকে ঠেলি (ক্রিয়া)। ফলে নৌকাটিও আমাদের শরীরের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া), যা আমাদের তীরে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

7. রকেট বা জেট প্লেন কীভাবে আকাশে ওড়ে?

উত্তর: রকেটের দহন প্রকোষ্ঠে জ্বালানি পোড়ানোর ফলে প্রচুর গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই গ্যাস তীব্র বেগে রকেটের পিছনের সরু ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, এই নির্গত গ্যাস রকেটের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া)। এই প্রতিক্রিয়া বলই রকেটকে তীব্র বেগে সামনের দিকে বা উপরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

[Image of rocket propulsion diagram]

8. অতিক্রান্ত দূরত্ব ও সরণের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) সংজ্ঞা: কোনো বস্তু মোট যে পথ অতিক্রম করে তা হলো দূরত্ব। আর প্রাথমিক ও অন্তিম অবস্থানের নূন্যতম সরলরৈখিক দূরত্ব হলো সরণ।
(ii) দিক: দূরত্বের কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই, সরণের নির্দিষ্ট দিক আছে।
(iii) মান: দূরত্ব কখনোই শূন্য হতে পারে না (যদি বস্তু গতিশীল হয়), কিন্তু বস্তুর সরণ শূন্য হতে পারে (যদি বস্তু ঘুরে আগের জায়গায় ফিরে আসে)।

9. দ্রুতি ও বেগের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) সংজ্ঞা: সময়ের সাপেক্ষে অতিক্রান্ত দূরত্ব হলো দ্রুতি। সময়ের সাপেক্ষে সরণ হলো বেগ।
(ii) রাশি: দ্রুতি একটি স্কেলার রাশি। বেগ একটি ভেক্টর রাশি।
(iii) শূন্য হওয়া: গতিশীল বস্তুর গড় দ্রুতি শূন্য হতে পারে না, কিন্তু গড় বেগ শূন্য হতে পারে।

10. নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র থেকে কীভাবে বলের পরিমাপ করা হয়?

উত্তর: নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক।
গাণিতিকভাবে দেখা যায়, প্রযুক্ত বল ($F$) = বস্তুর ভর ($m$) $\times$ বস্তুর ত্বরণ ($a$)।
অর্থাৎ, বস্তুর ভর এবং ত্বরণের গুণফল দিয়ে বলের পরিমাপ করা হয়। ($F = ma$)।

11. ভর ও ওজনের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর:
(i) সংজ্ঞা: বস্তুর মধ্যে যতটা জড় পদার্থ থাকে তাকে ভর বলে। পৃথিবীকে যে বল দ্বারা নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে তাকে ওজন বলে।
(ii) পরিবর্তনশীলতা: মহাবিশ্বের সর্বত্র বস্তুর ভর ধ্রুবক বা একই থাকে। কিন্তু অভিকর্ষজ ত্বরণের পরিবর্তনের ফলে স্থানভেদে বস্তুর ওজন পরিবর্তিত হয়।
(iii) একক: ভরের SI একক কিলোগ্রাম (kg), ওজনের SI একক নিউটন (N)।

12. কার্য কাকে বলে? কখন কৃতকার্য শূন্য হয়?

উত্তর: কার্য: কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করলে যদি বলের প্রয়োগবিন্দুর সরণ ঘটে, তবে প্রযুক্ত বল কার্য করেছে বলা হয়।
শূন্য কার্য: যদি বল প্রয়োগ করা সত্ত্বেও বস্তুর কোনো সরণ না ঘটে (যেমন দেওয়ালকে ধাক্কা দেওয়া), অথবা যদি সরণের অভিমুখ প্রযুক্ত বলের লম্ব দিকে হয় (যেমন হাতে সুটকেস নিয়ে সমতলে হাঁটা), তবে কৃতকার্য শূন্য হয়।

13. যান্ত্রিক শক্তি কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?

উত্তর: কোনো বস্তুর অবস্থান, আকৃতি বা গতির জন্য যান্ত্রিক কার্য করার যে সামর্থ্য বা শক্তি জন্মায়, তাকে যান্ত্রিক শক্তি বলে।
যান্ত্রিক শক্তি দুই প্রকার:
(i) স্থিতি শক্তি (Potential Energy): বস্তুর অবস্থান বা আকৃতির পরিবর্তনের জন্য যে শক্তি।
(ii) গতি শক্তি (Kinetic Energy): বস্তুর গতির জন্য যে শক্তি।

14. আমরা কীভাবে হাঁটি? নিউটনের সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: হাঁটার সময় আমরা পা দিয়ে মাটির ওপর পেছনের দিকে একটি তীর্যক বল প্রয়োগ করি। এটি হলো ‘ক্রিয়া’। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, মাটিও আমাদের পায়ের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করে, এটি হলো ‘প্রতিক্রিয়া’। এই প্রতিক্রিয়া বলের একটি উপাংশ আমাদের সামনের দিকে ঠেলে দেয়, ফলে আমরা এগিয়ে যাই।

15. বৈদ্যুতিক পাখার সুইচ বন্ধ করার পরেও পাখাটি কিছুক্ষণ ঘুরতে থাকে কেন?

উত্তর: বৈদ্যুতিক পাখা যখন চলে তখন তা গতিশীল অবস্থায় থাকে। সুইচ বন্ধ করার সাথে সাথে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলেও, ‘গতি জাড্যের’ কারণে পাখাটি তার ঘূর্ণন গতি বজায় রাখার চেষ্টা করে। বাতাসের বাধা ও ঘর্ষণের কারণে কিছুক্ষণ পর সেটি থামে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ থামে না।

16. লং জাম্প (Long Jump) দেওয়ার সময় খেলোয়াড়রা দূর থেকে দৌড়ে আসে কেন?

উত্তর: দূর থেকে দৌড়ে আসার ফলে খেলোয়াড়ের শরীরে ‘গতি জাড্যের’ সৃষ্টি হয়। লাফ দেওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত এই গতি বজায় থাকে। ফলে লাফ দেওয়ার পর এই গতি জাড্য খেলোয়াড়কে শূন্যে ভাসিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে সাহায্য করে। দাঁড়িয়ে লাফ দিলে এই সুবিধা পাওয়া যায় না।

17. ১ নিউটন বল কাকে বলে?

উত্তর: ১ কিলোগ্রাম ভরের কোনো বস্তুর ওপর যে পরিমাণ বল প্রয়োগ করলে বস্তুটিতে বলের অভিমুখে ১ মিটার/সেকেন্ড$^2$ ত্বরণ সৃষ্টি হয়, সেই পরিমাণ বলকে ১ নিউটন (1 N) বলা হয়।

18. স্থিতি শক্তি ও গতি শক্তির পারস্পরিক রূপান্তরের একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর: একটি ঢিলকে উপরের দিকে ছুঁড়লে, যত উপরে ওঠে তার গতিবেগ কমে এবং উচ্চতা বাড়ে; অর্থাৎ গতি শক্তি কমে স্থিতি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সর্বোচ্চ বিন্দুতে গতি শক্তি শূন্য এবং স্থিতি শক্তি সর্বাধিক হয়। আবার নিচে পড়ার সময় উচ্চতা কমে এবং বেগ বাড়ে; অর্থাৎ স্থিতি শক্তি গতি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

19. বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়ার সময় বন্দুকটি পিছন দিকে সরে আসে কেন?

উত্তর: গুলি ছোঁড়ার সময় বন্দুকটি বারুদের বিস্ফোরণের ফলে গুলির ওপর সামনের দিকে একটি প্রচণ্ড বল প্রয়োগ করে (ক্রিয়া)। নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, গুলিটিও বন্দুকের ওপর সমান ও বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া)। এই প্রতিক্রিয়ার ফলেই বন্দুকটি পিছনের দিকে সরে আসে বা ধাক্কা দেয়।

[Image of gun recoil action reaction]

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার