সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান; অধ্যায় – চুম্বক; সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (২ নম্বর)

অধ্যায় ৩: চুম্বক (Magnet) — সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান ২)

1. চৌম্বক ও অচৌম্বক পদার্থ কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

উত্তর:
চৌম্বক পদার্থ: যেসব পদার্থ চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় এবং যাদের কৃত্রিম উপায়ে চুম্বকে পরিণত করা যায়, তাদের চৌম্বক পদার্থ বলে। যেমন— লোহা, নিকেল, কোবাল্ট।
অচৌম্বক পদার্থ: যেসব পদার্থ চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না এবং চুম্বকে পরিণত করা যায় না, তাদের অচৌম্বক পদার্থ বলে। যেমন— কাঠ, প্লাস্টিক, কাঁচ।

2. প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম চুম্বকের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) আকৃতি: প্রাকৃতিক চুম্বকের নির্দিষ্ট কোনো জ্যামিতিক আকার নেই (অমসৃণ পাথর), কিন্তু কৃত্রিম চুম্বকের নির্দিষ্ট আকার (দণ্ড, অশ্বখুরাকৃতি) আছে।
(ii) শক্তি: প্রাকৃতিক চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা খুব কম, কিন্তু কৃত্রিম চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা অনেক বেশি এবং ইচ্ছামতো বাড়ানো-কমানো যায়।

3. চুম্বকের দিশাদায়ী ধর্ম বা দিক নির্দেশক ধর্ম বলতে কী বোঝো?

উত্তর: একটি চুম্বককে সুতো দিয়ে বেঁধে অবাধে ঝুলিয়ে দিলে দেখা যায়, চুম্বকটি সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে স্থির হয়। চুম্বকের উত্তর মেরু উত্তর দিকে এবং দক্ষিণ মেরু দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করে। চুম্বকের এই ধর্মকে দিশাদায়ী ধর্ম বলে। নাবিকরা এই ধর্মের সাহায্যেই দিক নির্ণয় করেন।

4. চুম্বক মেরু কাকে বলে? একটি চুম্বকের কয়টি মেরু থাকে?

উত্তর: চুম্বকের দুই প্রান্তের সামান্য ভেতরে যে দুটি বিন্দুতে আকর্ষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই বিন্দু দুটিকে চুম্বক মেরু বলে।
প্রতিটি চুম্বকের দুটি মেরু থাকে— উত্তর মেরু ($N$) এবং দক্ষিণ মেরু ($S$)।

5. চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল (Neutral Zone) বলতে কী বোঝো?

উত্তর: দণ্ডচুম্বকের দুই মেরুর ঠিক মাঝখানের অংশে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা প্রায় থাকে না বললেই চলে। এই আকর্ষণহীন অঞ্চলটিকে চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল বলে। লোহাচুর পরীক্ষায় দেখা যায় এই অংশে কোনো লোহাচুর আটকে থাকে না।

6. “আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়”— ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: যখন কোনো শক্তিশালী চুম্বককে কোনো চৌম্বক পদার্থের (যেমন লোহা) কাছে আনা হয়, তখন চুম্বকটি প্রথমে ওই পদার্থটিকে আবেশ প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত করে এবং নিকটতম প্রান্তে বিপরীত মেরুর সৃষ্টি করে। যেহেতু বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে, তাই এরপর চুম্বকটি পদার্থটিকে আকর্ষণ করে। সুতরাং, আকর্ষণের আগেই আবেশ ঘটে।

7. বিকর্ষণই যে চুম্বকত্বের প্রকৃষ্ট বা নিশ্চিত প্রমাণ— তা বুঝিয়ে লেখো।

উত্তর: একটি চুম্বক যেমন অপর একটি চুম্বকের বিপরীত মেরুকে আকর্ষণ করে, তেমনই একটি সাধারণ চৌম্বক পদার্থকেও (লোহা) আকর্ষণ করে। তাই আকর্ষণ দেখে বোঝা যায় না বস্তুটি চুম্বক কি না।
কিন্তু বিকর্ষণ শুধুমাত্র দুটি চুম্বকের সমমেরুর মধ্যেই ঘটে। কোনো সাধারণ লোহাকে চুম্বক বিকর্ষণ করে না। তাই বিকর্ষণ হলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে দুটি বস্তুই চুম্বক।

8. চুম্বক আবেশ (Magnetic Induction) কাকে বলে?

উত্তর: একটি চুম্বককে কোনো চৌম্বক পদার্থের (যেমন লোহার পেরেক) কাছে এনে বা স্পর্শ করিয়ে রাখলে, ওই চৌম্বক পদার্থটি সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হয়। এই ঘটনাকে চুম্বক আবেশ বলে। চুম্বক সরিয়ে নিলে এই আবেশিত চুম্বকত্ব লোপ পায়।

9. তড়িৎচুম্বক কাকে বলে? এটি কীভাবে তৈরি হয়?

উত্তর: একটি কাঁচা লোহার দণ্ডের ওপর অন্তরিত তামার তার জড়িয়ে তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে লোহার দণ্ডটি সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হয়। একে তড়িৎচুম্বক বলে। তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এর চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
[attachment_0](attachment)

10. তড়িৎচুম্বকের দুটি ব্যবহার লেখো।

উত্তর:
(i) ইলেকট্রিক কলিং বেল, লাউড স্পিকার এবং টেলিফোনে তড়িৎচুম্বক ব্যবহৃত হয়।
(ii) চোখের ভেতর লোহার গুঁড়ো পড়লে তা বের করতে ডাক্তাররা তড়িৎচুম্বক ব্যবহার করেন। এছাড়া ভারী লোহার জিনিস ওঠানামা করতে ক্রেনে এটি ব্যবহৃত হয়।

11. পৃথিবী যে নিজেই একটি বিরাট চুম্বক, তার স্বপক্ষে একটি প্রমাণ দাও।

উত্তর: একটি লোহার দণ্ডকে বহুদিন ধরে উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে মাটির নিচে পুঁতে রাখলে দেখা যায় দণ্ডটি একটি ক্ষীণ চুম্বকে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্র আছে বলেই আবেশের ফলে ওই লোহাটিতে চুম্বকত্বের সৃষ্টি হয়। এটি প্রমাণ করে পৃথিবী একটি বিরাট চুম্বক।

12. চুম্বকের চুম্বক দৈর্ঘ্য ও জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য বলতে কী বোঝো?

উত্তর:
জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য: চুম্বকের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্যকে জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য বলে।
চৌম্বক দৈর্ঘ্য: চুম্বকের দুটি মেরুর মধ্যবর্তী দূরত্বকে চৌম্বক দৈর্ঘ্য বলে। চৌম্বক দৈর্ঘ্য জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যের চেয়ে সামান্য কম হয়। (চৌম্বক দৈর্ঘ্য $\approx$ $0.86 \times$ জ্যামিতিক দৈর্ঘ্য)।

13. চুম্বক শলাকা (Magnetic Needle) কী এবং এটি কী কাজে লাগে?

উত্তর: চুম্বক শলাকা হলো ইস্পাতের তৈরি পাতলা মাকুর মতো একটি চুম্বক, যা একটি খাড়া দণ্ডের ওপর এমনভাবে বসানো থাকে যাতে এটি অবাধে ঘুরতে পারে।
এটি মূলত দিক নির্ণয়ের জন্য কম্পাস তৈরিতে এবং তড়িৎ প্রবাহের ওপর চুম্বকের ক্রিয়া প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়।

14. একটি চুম্বককে ভাঙলে কি একক মেরু পাওয়া সম্ভব? ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: না, সম্ভব নয়। একটি চুম্বককে মাঝখান দিয়ে ভাঙলে প্রতিটি টুকরো একটি করে পূর্ণাঙ্গ চুম্বকে পরিণত হয় এবং প্রতিটিতেই নতুন করে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু সৃষ্টি হয়। চুম্বককে অণুর পর্যায়ে ভাঙলেও তার দুটি মেরু বজায় থাকে। তাই একক মেরুর কোনো অস্তিত্ব নেই।

15. কী কী উপায়ে চুম্বকের চুম্বকত্ব নষ্ট হতে পারে?

উত্তর:
(i) চুম্বককে খুব বেশি গরম করলে (লোহিত তপ্ত)।
(ii) চুম্বককে হাতুড়ি দিয়ে পেটালে বা ওপর থেকে শক্ত মেঝের ওপর বারবার আছাড় মারলে।
(iii) তড়িৎচুম্বকের ক্ষেত্রে তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করে দিলে বা বিপরীতমুখী প্রবাহ পাঠালে।

16. চুম্বক রক্ষক (Magnetic Keeper) কী?

উত্তর: চুম্বকের ব্যবহার না থাকলে দীর্ঘদিন রেখে দিলে এর শক্তি কমে যায়। চুম্বকত্ব বজায় রাখার জন্য চুম্বকের দুই মেরুর মাঝে কাঁচা লোহার যে পাত ব্যবহার করা হয়, তাকে চুম্বক রক্ষক বলে। এটি চুম্বকের শক্তি নষ্ট হতে দেয় না।

17. অশ্বখুরাকৃতি চুম্বক কাকে বলে?

উত্তর: যে কৃত্রিম চুম্বককে ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো বা ঘোড়ার খুরের মতো বাঁকিয়ে তৈরি করা হয়, তাকে অশ্বখুরাকৃতি চুম্বক বলে। এর দুটি মেরু খুব কাছাকাছি থাকে বলে এর আকর্ষণ ক্ষমতা দণ্ডচুম্বকের চেয়ে বেশি হয়।

18. চৌম্বক অক্ষ (Magnetic Axis) কাকে বলে?

উত্তর: চুম্বকের উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু যে কাল্পনিক সরলরেখা দ্বারা যুক্ত থাকে, তাকে চুম্বক অক্ষ বা চৌম্বক অক্ষ বলে। অবাধে ঝুলন্ত চুম্বক এই অক্ষ বরাবরই উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকে।

19. পরিযায়ী পাখিরা কীভাবে দিক নির্ণয় করে?

উত্তর: পরিযায়ী পাখিদের মস্তিষ্কে ম্যাগনেটাইট নামক এক ধরনের চৌম্বক বস্তু থাকে। এটি তাদের পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে সাহায্য করে। এর সাহায্যে তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় সঠিক দিক নির্ণয় করতে পারে।

20. তড়িৎচুম্বক তৈরিতে ইস্পাত ব্যবহার না করে কাঁচা লোহা ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর: কাঁচা লোহার চুম্বক ধারণ ক্ষমতা কম, তাই তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করার সাথে সাথে এটি চুম্বকত্ব হারিয়ে ফেলে, যা তড়িৎচুম্বকের (যেমন কলিং বেল) কাজের জন্য জরুরি। কিন্তু ইস্পাত ব্যবহার করলে তা স্থায়ী চুম্বকে পরিণত হতো এবং সহজে চুম্বকত্ব হারাত না।

21. এটিএম (ATM) কার্ড বা ক্রেডিট কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপে কী তথ্য থাকে?

উত্তর: এটিএম কার্ডের পিছনের কালো ম্যাগনেটিক স্ট্রিপে গ্রাহকের নাম, অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং অন্যান্য গোপনীয় তথ্য বিশেষ চৌম্বকীয় বিন্যাসে (Magnetic Pattern) সঞ্চিত থাকে। কার্ড রিডার মেশিনে ঘষলে মেশিন সেই তথ্য পড়তে পারে।

22. স্থায়ী চুম্বক ও অস্থায়ী চুম্বকের দুটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:
(i) স্থায়িত্ব: স্থায়ী চুম্বকের চুম্বকত্ব দীর্ঘস্থায়ী, সহজে নষ্ট হয় না। অস্থায়ী চুম্বকের চুম্বকত্ব সাময়িক (তড়িৎ প্রবাহ বা আবেশ যতক্ষণ থাকে)।
(ii) উপাদান: স্থায়ী চুম্বক সাধারণত ইস্পাত দিয়ে তৈরি হয়, আর অস্থায়ী চুম্বক কাঁচা লোহা দিয়ে তৈরি হয়।

23. চুম্বকের আবেশ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন মেরুগুলির প্রকৃতি কেমন হয়?

উত্তর: আবেশের ফলে চুম্বকের নিকটবর্তী প্রান্তে বিপরীত মেরুর (উত্তর মেরুর কাছে দক্ষিণ মেরু) এবং দূরবর্তী প্রান্তে সমমেরুর (উত্তর মেরুর দূরে উত্তর মেরু) সৃষ্টি হয়।

24. অবাধে ঝুলন্ত চুম্বক ঠিক উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে থাকে না কেন?

উত্তর: কারণ পৃথিবীর ভৌগোলিক মেরু এবং চৌম্বক মেরু একই বিন্দুতে অবস্থিত নয়। এদের মধ্যে কিছুটা কৌণিক ব্যবধান থাকে। তাই ঝুলন্ত চুম্বক ভৌগোলিক উত্তর-দক্ষিণ রেখা থেকে সামান্য বেঁকে থাকে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার