দশম শ্রেণী জীবন বিজ্ঞান : অধ্যায় – 3 বংশগতি ও কয়েকটি সাধারণ জিন ঘটিত রোগ
বিভাগ-ঘ: দীর্ঘ উত্তরধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান
বিষয়: জীবন বিজ্ঞান | অধ্যায়: বংশগতি ও জিনগত রোগ | প্রশ্ন সংখ্যা ৩০:
১. মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষাটি একটি চেকার বোর্ডের সাহায্যে বর্ণনা করো (গিনিপিগ)। এই পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত সূত্রটি লেখো। (৩+২) [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
মেন্ডেলের একসংকর জনন পরীক্ষা (গিনিপিগ):
মেন্ডেল একটি বিশুদ্ধ কালো রঙের গিনিপিগ ($BB$) এবং একটি বিশুদ্ধ সাদা রঙের গিনিপিগের ($bb$) মধ্যে ইতর পরাগযোগ বা সংকরায়ণ ঘটান।
P-জনু: বিশুদ্ধ কালো ($BB$) $\times$ বিশুদ্ধ সাদা ($bb$)
$F_1$ জনু: প্রথম অপত্য জনুতে উৎপন্ন সকল গিনিপিগ কালো রঙের হয়, তবে তারা সংকর প্রকৃতির ($Bb$)।
এরপর $F_1$ জনুর দুটি সংকর কালো গিনিপিগের ($Bb \times Bb$) মধ্যে সংকরায়ণ ঘটানো হলে $F_2$ জনু বা দ্বিতীয় অপত্য জনু পাওয়া যায়।
$F_2$ জনুর চেকার বোর্ড:
| গ্যামেট (পুং/স্ত্রী) | $B$ | $b$ |
|---|---|---|
| $B$ | $BB$ (বিশুদ্ধ কালো) | $Bb$ (সংকর কালো) |
| $b$ | $Bb$ (সংকর কালো) | $bb$ (বিশুদ্ধ সাদা) |
ফলাফল:
১) ফিনোটাইপ অনুপাত: কালো : সাদা = $3 : 1$।
২) জিনোটাইপ অনুপাত: বিশুদ্ধ কালো ($BB$) : সংকর কালো ($Bb$) : বিশুদ্ধ সাদা ($bb$) = $1 : 2 : 1$।
প্রাপ্ত সূত্র: পৃথকীভবন সূত্র (Law of Segregation):
কোনো জীবের একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য জনিতৃ থেকে অপত্যে সঞ্চারিত হওয়ার সময় একত্রিত হলেও তারা কখনোই মিশ্রিত হয় না, বরং গ্যামেট গঠনের সময় বৈশিষ্ট্যগুলি পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়।
[attachment_0](attachment)
২. মেন্ডেলের দ্বিসংকর জনন পরীক্ষাটি চেকার বোর্ডের সাহায্যে দেখাও (মটর গাছ)। $F_2$ জনুর ফিনোটাইপ অনুপাতটি লেখো। (৪+১) [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
পরীক্ষা: মেন্ডেল একটি বিশুদ্ধ হলুদ ও গোলাকার বীজযুক্ত ($YYRR$) মটর গাছের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ সবুজ ও কুঞ্চিত বীজযুক্ত ($yyrr$) মটর গাছের সংকরায়ণ ঘটান।
$F_1$ জনু: এখানে উৎপন্ন সকল গাছ হলুদ ও গোলাকার বীজযুক্ত ($YyRr$) হয়।
$F_2$ জনু: $F_1$ জনুর উদ্ভিদগুলির মধ্যে স্বপরাগযোগ ঘটালে $F_2$ জনু পাওয়া যায়।
গ্যামেটগুলি হলো: $YR, Yr, yR, yr$।
$F_2$ জনুর চেকার বোর্ড:
| গ্যামেট | $YR$ | $Yr$ | $yR$ | $yr$ |
|---|---|---|---|---|
| $YR$ | $YYRR$ (হলুদ-গোল) | $YYRr$ (হলুদ-গোল) | $YyRR$ (হলুদ-গোল) | $YyRr$ (হলুদ-গোল) |
| $Yr$ | $YYRr$ (হলুদ-গোল) | $YYrr$ (হলুদ-কুঞ্চিত) | $YyRr$ (হলুদ-গোল) | $Yyrr$ (হলুদ-কুঞ্চিত) |
| $yR$ | $YyRR$ (হলুদ-গোল) | $YyRr$ (হলুদ-গোল) | $yyRR$ (সবুজ-গোল) | $yyRr$ (সবুজ-গোল) |
| $yr$ | $YyRr$ (হলুদ-গোল) | $Yyrr$ (হলুদ-কুঞ্চিত) | $yyRr$ (সবুজ-গোল) | $yyrr$ (সবুজ-কুঞ্চিত) |
$F_2$ ফিনোটাইপ অনুপাত:
হলুদ-গোল : হলুদ-কুঞ্চিত : সবুজ-গোল : সবুজ-কুঞ্চিত = $\mathbf{9 : 3 : 3 : 1}$।
৩. মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণ পদ্ধতিটি চেকার বোর্ডের সাহায্যে বর্ণনা করো। এই পদ্ধতিতে পিতার ভূমিকাই যে প্রধান—তা বিশ্লেষণ করো। (৩+২) [মাধ্যমিক ২০১৮, ২০২০]
✅ উত্তর:
পদ্ধতি: মানুষের দেহকোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে ১ জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম। পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোম $XY$ (হেটারোগ্যামেটিক) এবং নারীর $XX$ (হোমোগ্যামেটিক)।
পিতা দুই প্রকার শুক্রাণু উৎপাদন করেন: ১) $22A+X$ এবং ২) $22A+Y$।
মাতা এক প্রকার ডিম্বাণু উৎপাদন করেন: $22A+X$。
লিঙ্গ নির্ধারণের চেকার বোর্ড:
| পিতা / মাতা $\rightarrow$ | $X$ (ডিম্বাণু) | $X$ (ডিম্বাণু) |
|---|---|---|
| $X$ (শুক্রাণু) | $XX$ (কন্যা) | $XX$ (কন্যা) |
| $Y$ (শুক্রাণু) | $XY$ (পুত্র) | $XY$ (পুত্র) |
পিতার ভূমিকা বিশ্লেষণ:
ওপরের ছক থেকে দেখা যায়, পিতার $X$-ক্রোমোজোম যুক্ত শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করলে কন্যা সন্তান ($XX$) হয় এবং $Y$-ক্রোমোজোম যুক্ত শুক্রাণু নিষিক্ত করলে পুত্র সন্তান ($XY$) হয়। যেহেতু মায়ের কাছে কেবল $X$ ক্রোমোজোম থাকে, তাই সন্তানের লিঙ্গ কী হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে পিতার কোন ধরনের শুক্রাণু ($X$ না $Y$) মিলছে তার ওপর। তাই লিঙ্গ নির্ধারণে পিতার ভূমিকাই প্রধান এবং মাতার কোনো ভূমিকা নেই।
৪. থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ ও লক্ষণগুলি লেখো। জেনেটিক কাউন্সিলিং কীভাবে এই রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে? (৩+২)
✅ উত্তর:
কারণ: থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন রোগ। মানুষের ১৬ নং ক্রোমোজোমে আলফা-গ্লোবিন জিন বা ১১ নং ক্রোমোজোমে বিটা-গ্লোবিন জিনের ত্রুটি বা মিউটেশনের ফলে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে লোহিত রক্তকণিকা ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং দ্রুত ভেঙে যায়।
লক্ষণ:
১) তীব্র রক্তাল্পতা: রোগী দ্রুত ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, ত্বক ফ্যাকাশে হয়।
২) অঙ্গহানি: যকৃৎ ও প্লীহা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যায় (Splenomegaly)।
৩) লৌহ সঞ্চয়: বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে দেহে অতিরিক্ত লোহা জমে হৃৎপিণ্ড ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করে।
জেনেটিক কাউন্সিলিং-এর ভূমিকা:
বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না তা নির্ণয় করা হয়। যদি দুজনই বাহক হন, তবে তাদের বিবাহ না করার বা সন্তান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ সেক্ষেত্রে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ২৫% ঝুঁকি থাকে। এভাবেই কাউন্সিলিং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৫. একজন স্বাভাবিক পুরুষ ও একজন বর্ণান্ধ মহিলার বিবাহ হলে তাদের সন্তানদের মধ্যে বর্ণান্ধতার সম্ভাবনা বিচার করো। চেকার বোর্ডসহ দেখাও। (৫)
✅ উত্তর:
ধরি, স্বাভাবিক জিনের অ্যালিল = $X^+$ এবং বর্ণান্ধতার জিনের অ্যালিল = $X^c$ (প্রচ্ছন্ন)।
জিনোটাইপ:
স্বাভাবিক পুরুষ: $X^+Y$
বর্ণান্ধ মহিলা: $X^cX^c$
চেকার বোর্ড:
| পিতা / মাতা $\rightarrow$ | $X^c$ | $X^c$ |
|---|---|---|
| $X^+$ | $X^+X^c$ (বাহক কন্যা) | $X^+X^c$ (বাহক কন্যা) |
| $Y$ | $X^cY$ (বর্ণান্ধ পুত্র) | $X^cY$ (বর্ণান্ধ পুত্র) |
ফলাফল বিশ্লেষণ:
১) কন্যা সন্তান: ১০০% কন্যা সন্তান স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন হবে, কিন্তু তারা সবাই রোগের বাহক ($X^+X^c$) হবে।
২) পুত্র সন্তান: ১০০% পুত্র সন্তান বর্ণান্ধ ($X^cY$) হবে।
অর্থাৎ, দম্পতির সমস্ত পুত্র বর্ণান্ধ হবে এবং কন্যারা বাহক হবে।
৬. হিমোফিলিয়া রোগের কারণ কী? ‘ক্রিস-ক্রস উত্তরাধিকার’ বলতে কী বোঝো? (২+৩)
✅ উত্তর:
কারণ: হিমোফিলিয়া একটি X-ক্রোমোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত রোগ। মানুষের X-ক্রোমোজোমে অবস্থিত নির্দিষ্ট জিনের মিউটেশনের ফলে রক্ত তঞ্চনকারী ফ্যাক্টর-VIII (হিমোফিলিয়া-A) বা ফ্যাক্টর-IX (হিমোফিলিয়া-B) তৈরি হয় না। ফলে কোনো স্থান কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধে না এবং অবিরাম রক্তক্ষরণ হয়।
ক্রিস-ক্রস উত্তরাধিকার:
যে বিশেষ ধরনের বংশগতিতে কোনো বংশগত রোগের জিন পিতা থেকে সরাসরি পুত্রে না গিয়ে, কন্যার মাধ্যমে নাতির (Grandson) দেহে সঞ্চারিত হয়, তাকে ক্রিস-ক্রস উত্তরাধিকার বলে।
যেমন—হিমোফিলিয়া বা বর্ণান্ধ আক্রান্ত পুরুষের জিন প্রথমে তার বাহক কন্যার ($X^+X^h$) মধ্যে সুপ্ত থাকে এবং পরে সেই কন্যার পুত্র সন্তানের দেহে প্রকাশিত হয়।
৭. অসম্পূর্ণ প্রকটতা (Incomplete Dominance) কী? সন্ধ্যামালতী ফুলের ক্ষেত্রে এটি চেকার বোর্ডের সাহায্যে দেখাও। এখানে ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত কী হয়? (২+২+১)
✅ উত্তর:
সংজ্ঞা: যখন কোনো হেটারোজাইগাস বা সংকর জীবে প্রকট জিনটি প্রচ্ছন্ন জিনের বৈশিষ্ট্যকে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করতে পারে না এবং উভয়ের মাঝামাঝি একটি নতুন বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে, তখন তাকে অসম্পূর্ণ প্রকটতা বলে।
চেকার বোর্ড (সন্ধ্যামালতী):
ধরি, লাল ফুলের জিন = $R$ এবং সাদা ফুলের জিন = $r$।
$P$-জনু: লাল ($RR$) $\times$ সাদা ($rr$)
$F_1$-জনু: গোলাপি ($Rr$)
$F_2$-জনু ($Rr \times Rr$):
| গ্যামেট | $R$ | $r$ |
|---|---|---|
| $R$ | $RR$ (লাল) | $Rr$ (গোলাপি) |
| $r$ | $Rr$ (গোলাপি) | $rr$ (সাদা) |
অনুপাত:
এক্ষেত্রে ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত একই হয়।
অনুপাত = ১ (লাল) : ২ (গোলাপি) : ১ (সাদা) বা **$1:2:1$**।
৮. মেন্ডেলের বংশগতি সংক্রান্ত সূত্র দুটি বিবৃত করো। মেন্ডেল মটর গাছ নির্বাচনের তিনটি সুবিধা লেখো। (২+৩)
✅ উত্তর:
সূত্র ১ (পৃথকীভবন সূত্র): একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের সংকরায়ণ ঘটালে $F_1$ জনুতে বৈশিষ্ট্যগুলি মিশ্রিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং গ্যামেট গঠনের সময় তারা পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়।
সূত্র ২ (স্বাধীন বিন্যাস সূত্র): দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে গ্যামেট গঠনের সময় বৈশিষ্ট্যগুলি কেবল পৃথকই হয় না, বরং প্রতিটি বৈশিষ্ট্য একে অপরের সাথে স্বাধীনভাবে সম্ভাব্য সকল প্রকার সমন্বয়ে বিন্যস্ত হয়।
মটর গাছ নির্বাচনের সুবিধা:
১) স্বল্পায়ু: মটর গাছ একবর্ষজীবী হওয়ায় খুব কম সময়ে বংশপরম্পরায় পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়।
২) বিপরীত বৈশিষ্ট্য: মটর গাছে অনেকগুলি স্পষ্ট বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য (যেমন- লম্বা/খর্ব, গোল/কুঞ্চিত বীজ) বর্তমান।
৩) উভলিঙ্গ ফুল: ফুলগুলি উভলিঙ্গ হওয়ায় স্বপরাগযোগ ঘটানো সহজ, আবার প্রয়োজনে ইতর পরাগযোগও ঘটানো যায়।
৯. একজন বর্ণান্ধ বাহক মহিলা ($X^+X^c$) ও একজন স্বাভাবিক পুরুষের ($X^+Y$) বিবাহ হলে তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে কী ফল দেখা যাবে? চেকার বোর্ডসহ লেখো। (৫)
✅ উত্তর:
মাতা: $X^+X^c$ (বাহক)
পিতা: $X^+Y$ (স্বাভাবিক)
চেকার বোর্ড:
| পিতা / মাতা $\rightarrow$ | $X^+$ | $X^c$ |
|---|---|---|
| $X^+$ | $X^+X^+$ (স্বাভাবিক কন্যা) | $X^+X^c$ (বাহক কন্যা) |
| $Y$ | $X^+Y$ (স্বাভাবিক পুত্র) | $X^cY$ (বর্ণান্ধ পুত্র) |
ফলাফল বিশ্লেষণ:
১) কন্যা সন্তানদের মধ্যে ৫০% সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং ৫০% বাহক হবে। কোনো কন্যাই বর্ণান্ধ হবে না।
২) পুত্র সন্তানদের মধ্যে ৫০% স্বাভাবিক এবং ৫০% বর্ণান্ধ হবে।
৩) মোট সন্তানের ২৫% বর্ণান্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (এবং তারা সবাই পুত্র)।
১০. হোমোজাইগাস ও হেটারোজাইগাস জীবের তিনটি পার্থক্য লেখো। ব্যাক ক্রস ও টেস্ট ক্রসের সংজ্ঞা দাও। (৩+২)
✅ উত্তর:
ক) পার্থক্য:
| বিষয় | হোমোজাইগাস (সমসংকর) | হেটারোজাইগাস (বিষমসংকর) |
|---|---|---|
| ১. অ্যালিল প্রকৃতি | সমসংস্থ ক্রোমোজোমের নির্দিষ্ট লোকাসে দুটি অ্যালিল সমপ্রকৃতির হয় (যেমন $TT$)। | দুটি অ্যালিল বিপরীত প্রকৃতির হয় (যেমন $Tt$)। |
| ২. গ্যামেট | এরা একই প্রকার গ্যামেট উৎপন্ন করে। | এরা দুই প্রকার ভিন্ন গ্যামেট উৎপন্ন করে। |
| ৩. বিশুদ্ধতা | এরা সর্বদা বিশুদ্ধ বা খাঁটি প্রকৃতির হয়। | এরা সর্বদা সংকর বা হাইব্রিড প্রকৃতির হয়। |
খ) সংজ্ঞা:
ব্যাক ক্রস (Back Cross): $F_1$ জনুর সংকর জীবের সাথে জনিতৃ জনুর (Parental Generation) যেকোনো একটির (প্রকট বা প্রচ্ছন্ন) সংকরায়ণকে ব্যাক ক্রস বলে।
টেস্ট ক্রস (Test Cross): $F_1$ জনুর সংকর জীবের সাথে শুধুমাত্র হোমোজাইগাস প্রচ্ছন্ন জনিতৃর ($tt$) সংকরায়ণকে টেস্ট ক্রস বলে। এর দ্বারা $F_1$ জীবের জিনোটাইপ নির্ণয় করা যায়।
১১. হিমোফিলিয়া রোগের ক্ষেত্রে মহিলাদের চেয়ে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হয় কেন? মহিলারা কখন এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে? (৩+২)
✅ উত্তর:
পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার কারণ: হিমোফিলিয়া একটি X-ক্রোমোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন রোগ। পুরুষদের ($XY$) মাত্র একটি X ক্রোমোজোম থাকে। তাই মায়ের থেকে পাওয়া ওই একটি X ক্রোমোজোমে যদি হিমোফিলিয়ার জিন থাকে, তবে পুরুষটি আক্রান্ত হয়। তাদের রোগ আটকানোর জন্য কোনো দ্বিতীয় সুস্থ X ক্রোমোজোম নেই।
মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার শর্ত: মহিলাদের দুটি X ক্রোমোজোম ($XX$) থাকে। তারা আক্রান্ত হবে যদি তাদের **বাবা হিমোফিলিক** হয় এবং **মা অন্তত বাহক** (বা আক্রান্ত) হন। অর্থাৎ দুটি X ক্রোমোজোমেই আক্রান্ত জিন থাকতে হবে ($X^hX^h$)। এই ঘটনা পরিসংখ্যানগতভাবে খুবই বিরল।
১২. মেন্ডেলের দ্বিসংকর জনন পরীক্ষায় $F_2$ জনুর ফলাফল থেকে তিনি কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হন? গিনিপিগের ক্ষেত্রে কালো বর্ণ ($B$) ও কর্কশ লোম ($R$) প্রকট হলে, $BbRr$ জিনোটাইপ যুক্ত দুটি গিনিপিগের ক্রসে কত প্রকার ফিনোটাইপ পাওয়া যাবে? (২+৩)
✅ উত্তর:
সিদ্ধান্ত: মেন্ডেল $F_2$ জনুর $9:3:3:1$ অনুপাত থেকে সিদ্ধান্তে আসেন যে, গ্যামেট গঠনের সময় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলি কেবল পৃথক হয় না, বরং স্বাধীনভাবে একে অপরের সাথে বিন্যস্ত হয়। একে ‘স্বাধীন বিন্যাস সূত্র’ বলে।
গিনিপিগের ক্রস ($BbRr \times BbRr$):
এটি একটি আদর্শ দ্বিসংকর জনন। তাই মেন্ডেলের সূত্রানুসারে ৪ ধরণের ফিনোটাইপ পাওয়া যাবে:
১) কালো ও কর্কশ লোম (উভয় প্রকট) $\rightarrow$ ৯ ভাগ।
২) কালো ও মসৃণ লোম (১ম প্রকট, ২য় প্রচ্ছন্ন) $\rightarrow$ ৩ ভাগ।
৩) সাদা ও কর্কশ লোম (১ম প্রচ্ছন্ন, ২য় প্রকট) $\rightarrow$ ৩ ভাগ।
৪) সাদা ও মসৃণ লোম (উভয় প্রচ্ছন্ন) $\rightarrow$ ১ ভাগ।
১৩. থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে জেনেটিক কাউন্সিলিং-এর ভূমিকা আলোচনা করো। সমাজে এই রোগের বিস্তার রোধে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা কী হতে পারে? (৩+২)
✅ উত্তর:
জেনেটিক কাউন্সিলিং-এর ভূমিকা:
১) বিবাহের পূর্বে পাত্র ও পাত্রীর রক্ত পরীক্ষা (Electrophoresis) করে তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না তা নির্ণয় করা হয়।
২) যদি দুজনেই বাহক হন, তবে তাদের বিবাহ এড়িয়ে চলা বা সন্তান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ২৫% সম্ভাবনা থাকে।
৩) গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের জিনগত পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা যায়।
ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা:
১) নিজের ও পরিবারের রক্ত পরীক্ষা করতে এবং অন্যদের উৎসাহিত করতে পারে।
২) লিফলেট বিলি বা পোস্টারের মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।
৩) ‘থ্যালাসেমিয়া মুক্ত সমাজ’ গড়তে বিবাহের আগে রক্ত পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলতে পারে।
১৪. মটর গাছের বীজের বর্ণ (হলুদ/সবুজ) এবং বীজের আকার (গোল/কুঞ্চিত)—এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে দ্বিসংকর জনন পরীক্ষা চেকার বোর্ডে দেখাও। (৫)
✅ উত্তর:
(শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দেশ: ১৬ ঘরের চেকার বোর্ডটি পেন্সিল দিয়ে আঁকতে হবে।)
জনিতৃ: হলুদ-গোল ($YYRR$) $\times$ সবুজ-কুঞ্চিত ($yyrr$)
$F_1$ জনু: সংকর হলুদ-গোল ($YyRr$)
$F_2$ জনু ($YyRr \times YyRr$):
গ্যামেট: $YR, Yr, yR, yr$
(ছকটি প্রশ্ন নং ২-এর অনুরূপ হবে)
ফলাফল:
– ৯টি হলুদ ও গোল
– ৩টি হলুদ ও কুঞ্চিত
– ৩টি সবুজ ও গোল
– ১টি সবুজ ও কুঞ্চিত
অনুপাত: $9:3:3:1$।
১৬. একজন স্বাভাবিক পুরুষ ও একজন বর্ণান্ধ বাহক মহিলার বিবাহ হলে তাদের সন্তানদের বর্ণান্ধ হওয়ার সম্ভাবনা চেকার বোর্ডের সাহায্যে নির্ণয় করো। বর্ণান্ধতার জিনটি প্রচ্ছন্ন না প্রকট? (৪+১)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ধরি, স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির জিন = $X^+$ (প্রকট)
বর্ণান্ধতার জিন = $X^c$ (প্রচ্ছন্ন)
পিতামাতার জিনোটাইপ:
১) স্বাভাবিক পুরুষ (পিতা): $X^+Y$ (যেহেতু পুরুষদের একটিই X ক্রোমোজোম থাকে)।
২) বর্ণান্ধ বাহক মহিলা (মাতা): $X^+X^c$ (একটি সুস্থ ও একটি আক্রান্ত জিন)।
চেকার বোর্ড:
| মাতা (গ্যামেট) $\rightarrow$ পিতা (গ্যামেট) $\downarrow$ |
$X^+$ (স্বাভাবিক) | $X^c$ (বর্ণান্ধ) |
|---|---|---|
| $X^+$ | $X^+X^+$ (স্বাভাবিক কন্যা) |
$X^+X^c$ (বাহক কন্যা) |
| $Y$ | $X^+Y$ (স্বাভাবিক পুত্র) |
$X^cY$ (বর্ণান্ধ পুত্র) |
ফলাফল বিশ্লেষণ:
১) কন্যা সন্তান: সমস্ত কন্যা সন্তান বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক হবে। তবে তাদের মধ্যে ৫০% সম্পূর্ণ সুস্থ ($X^+X^+$) এবং ৫০% বাহক ($X^+X^c$) হবে।
২) পুত্র সন্তান: ৫০% পুত্র স্বাভাবিক ($X^+Y$) এবং ৫০% পুত্র বর্ণান্ধ ($X^cY$) হবে।
৩) মোট সম্ভাবনা: দম্পতির মোট সন্তানের ২৫% বর্ণান্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জিনের প্রকৃতি: বর্ণান্ধতার জিনটি হলো **X-ক্রোমোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন** জিন।
১৭. থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ ও প্রকারভেদ আলোচনা করো। আলফা ও বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন কোন ক্রোমোজোমে থাকে? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ক) রোগের কারণ:
থ্যালাসেমিয়া হলো একটি বংশগত রোগ। আমাদের লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য গ্লোবিন প্রোটিন প্রয়োজন। জিনের মিউটেশন বা ত্রুটির কারণে এই গ্লোবিন চেইন ঠিকমতো তৈরি হয় না। ফলে:
১) ত্রুটিপূর্ণ ও ভঙ্গুর লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয়।
২) রক্তকণিকাগুলি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভেঙে যায় (হিমোলাইসিস)।
৩) এর ফলে দেহে তীব্র রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়।
খ) প্রকারভেদ ও ক্রোমোজোম:
হিমোগ্লোবিনের গ্লোবিন চেইনের ওপর ভিত্তি করে এটি দুই প্রকার:
১) আলফা ($\alpha$) থ্যালাসেমিয়া: ১৬ নং অটোজোমে অবস্থিত আলফা-গ্লোবিন জিন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হারিয়ে গেলে এটি হয়।
২) বিটা ($\beta$) থ্যালাসেমিয়া: ১১ নং অটোজোমে অবস্থিত বিটা-গ্লোবিন জিনের মিউটেশন হলে এটি হয়।
১৮. মেন্ডেলের স্বাধীন বিন্যাস সূত্রটি বিবৃত করো। মটর গাছের দ্বিসংকর জনন পরীক্ষায় $F_2$ জনুর জিনোটাইপ অনুপাতটি লেখো। (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
স্বাধীন বিন্যাস সূত্র (Law of Independent Assortment):
দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের মধ্যে সংকরায়ণ ঘটালে, গ্যামেট গঠনকালে বৈশিষ্ট্যগুলি কেবল একে অপরের থেকে পৃথকই হয় না, বরং প্রতিটি বৈশিষ্ট্য একে অপরের সাথে স্বাধীনভাবে সম্ভাব্য সকল প্রকার সমন্বয়ে গ্যামেটে সঞ্চারিত হয়।
$F_2$ জনুর জিনোটাইপ অনুপাত (দ্বিসংকর জনন):
মটর গাছের দ্বিসংকর জননে ৯ ধরণের জিনোটাইপ পাওয়া যায়। অনুপাতটি হলো:
$YYRR : YYRr : YyRR : YyRr : YYrr : Yyrr : yyRR : yyRr : yyrr$
= 1 : 2 : 2 : 4 : 1 : 2 : 1 : 2 : 1
১৯. একজন হিমোফিলিক পুরুষ এবং একজন স্বাভাবিক মহিলার বিবাহ হলে তাদের সন্তানদের হিমোফিলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কত? চেকার বোর্ডসহ দেখাও। (৫)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ধরি, স্বাভাবিক জিন = $X$ এবং হিমোফিলিক জিন = $X^h$ (প্রচ্ছন্ন)।
পিতামাতার জিনোটাইপ:
পিতা (হিমোফিলিক): $X^hY$
মাতা (স্বাভাবিক): $XX$
চেকার বোর্ড:
| মাতা $\rightarrow$ পিতা $\downarrow$ |
$X$ | $X$ |
|---|---|---|
| $X^h$ | $X^hX$ (বাহক কন্যা) |
$X^hX$ (বাহক কন্যা) |
| $Y$ | $XY$ (স্বাভাবিক পুত্র) |
$XY$ (স্বাভাবিক পুত্র) |
ফলাফল বিশ্লেষণ:
১) পুত্র সন্তান: ১০০% পুত্র সন্তান সুস্থ ও স্বাভাবিক হবে ($XY$)। কারণ তারা মায়ের থেকে সুস্থ $X$ ক্রোমোজোম এবং বাবার থেকে $Y$ ক্রোমোজোম পেয়েছে।
২) কন্যা সন্তান: ১০০% কন্যা সন্তান বাহক হবে ($X^hX$)। কারণ তারা বাবার থেকে আক্রান্ত $X^h$ জিনটি পেয়েছে। কিন্তু অপর $X$ টি সুস্থ হওয়ায় রোগ প্রকাশ পাবে না।
সিদ্ধান্ত: এই দম্পতির কোনো সন্তানই হিমোফিলিয়া আক্রান্ত হবে না (রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ০%)।
২০. মেন্ডেল পরীক্ষার জন্য মটর গাছ কেন নির্বাচন করেছিলেন? (যেকোনো তিনটি কারণ) মটর গাছের ৩ জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো। (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
মটর গাছ নির্বাচনের কারণ:
১) স্বল্পায়ু: মটর গাছ একবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এদের আয়ুষ্কাল কম হওয়ায় খুব কম সময়ের মধ্যে কয়েক পুরুষ ধরে বংশগতির ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
২) ফুল: মটর ফুল উভলিঙ্গ এবং স্বপরাগী। তাই বাইরে থেকে অবাঞ্ছিত কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। আবার প্রয়োজনে সহজেই এদের ইতর-পরাগযোগ ঘটানো যায়।
৩) বৈশিষ্ট্য: মটর গাছে অনেকগুলি সুস্পষ্ট বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য (যেমন- লম্বা বনাম খর্ব) বর্তমান, যা পরীক্ষার জন্য সুবিধাজনক।
৩ জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য:
১) কাণ্ডের দৈর্ঘ্য: লম্বা ($T$) বনাম খর্ব ($t$)।
২) বীজের আকার: গোলাকার ($R$) বনাম কুঞ্চিত ($r$)।
৩) বীজপত্রের বর্ণ: হলুদ ($Y$) বনাম সবুজ ($y$)।
২১. মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণ পদ্ধতিটি সংক্ষেপে লেখো। সমাজে কন্যা সন্তান জন্মের জন্য মাকে দায়ী করা কি বিজ্ঞানসম্মত? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
লিঙ্গ নির্ধারণ পদ্ধতি (XX-XY):
মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে সেক্স ক্রোমোজোম।
১) মাতা (XX): মহিলারা হোমোগ্যামেটিক। তারা কেবল এক প্রকার ডিম্বাণু ($22A+X$) তৈরি করেন।
২) পিতা (XY): পুরুষরা হেটারোগ্যামেটিক। তারা দুই প্রকার শুক্রাণু তৈরি করেন— ৫০% $X$-ক্রোমোজোম যুক্ত এবং ৫০% $Y$-ক্রোমোজোম যুক্ত।
– যদি পিতার $Y$-শুক্রাণু মায়ের ডিম্বাণুকে ($X$) নিষিক্ত করে, তবে জাইগোট হয় $XY$ $\rightarrow$ পুত্র সন্তান।
– যদি পিতার $X$-শুক্রাণু মায়ের ডিম্বাণুকে ($X$) নিষিক্ত করে, তবে জাইগোট হয় $XX$ $\rightarrow$ কন্যা সন্তান।
মাকে দায়ী করা কি ঠিক?
না, এটি মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ মায়ের কাছে কেবল $X$ ক্রোমোজোম থাকে, তিনি লিঙ্গ নির্ধারণে কোনো বিকল্প দিতে পারেন না। সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে বাবার কোন শুক্রাণু ($X$ না $Y$) নিষেক ঘটাচ্ছে তার ওপর। তাই এর জন্য পিতাই (বায়োলজিক্যালি) দায়ী, মা নন।
২২. অসম্পূর্ণ প্রকটতা মেন্ডেলের সূত্রের বিচ্যুতি কেন? সন্ধ্যামালতী ফুলের ক্ষেত্রে জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ অনুপাত দেখাও। (২+৩)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
বিচ্যুতির কারণ: মেন্ডেলের প্রকটতার সূত্র অনুযায়ী, দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যের বিশুদ্ধ জীবের মিলনে $F_1$ জনুতে কেবল প্রকট বৈশিষ্ট্যটিই প্রকাশ পাওয়ার কথা। কিন্তু অসম্পূর্ণ প্রকটতায় (যেমন- সন্ধ্যামালতী), লাল ও সাদা ফুলের ক্রসে $F_1$ জনুতে লাল বা সাদা কোনোটিই হয় না, বরং উভয়ের মিশ্রণে ‘গোলাপি’ বর্ণের ফুল হয়। যেহেতু এটি মেন্ডেলের নিয়ম মানে না, তাই এটি একটি বিচ্যুতি।
ক্রস ও অনুপাত:
লাল ফুল ($RR$) $\times$ সাদা ফুল ($rr$) $\rightarrow$ $F_1$ জনু: গোলাপি ($Rr$)।
$F_1$ জনুর উদ্ভিদগুলির মধ্যে স্বপরাগযোগ ($Rr \times Rr$) ঘটালে $F_2$ জনুতে:
– লাল ফুল ($RR$) : ১টি
– গোলাপি ফুল ($Rr$) : ২টি
– সাদা ফুল ($rr$) : ১টি
$\therefore$ জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ উভয় অনুপাতই $1 : 2 : 1$।
২৩. জেনেটিক কাউন্সিলিং-এর গুরুত্ব কী? থ্যালাসেমিয়া বাহক দুজন ব্যক্তির বিবাহ হলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কত? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
জেনেটিক কাউন্সিলিং-এর গুরুত্ব:
১) বংশগত রোগের (যেমন থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া) ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দম্পতিকে ভবিষ্যৎ সন্তানের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা।
২) বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া, যাতে দুজন বাহকের মধ্যে বিবাহ এড়ানো যায় এবং সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা যায়।
আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা:
যদি বাবা বাহক ($Th^+ Th$) এবং মা বাহক ($Th^+ Th$) হন, তবে মেন্ডেলীয় নিয়ম অনুযায়ী:
– ২৫% সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ ($Th^+ Th^+$)।
– ৫০% সন্তান বাহক ($Th^+ Th$), যারা রোগ ছড়াবে কিন্তু নিজেরা আক্রান্ত হবে না।
– ২৫% সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত (Major) হবে ($Th Th$)।
অর্থাৎ, প্রতি গর্ভাবস্থায় শিশুটির থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হওয়ার ২৫% ঝুঁকি থাকে।
২৪. গিনিপিগের ওপর মেন্ডেলের দ্বিসংকর জনন পরীক্ষাটি বর্ণনা করো (চেকার বোর্ড আবশ্যক)। (৫)
✅ উত্তর:
পরীক্ষা: একটি বিশুদ্ধ কালো ও কর্কশ লোমযুক্ত ($BBRR$) গিনিপিগের সাথে একটি বিশুদ্ধ সাদা ও মসৃণ লোমযুক্ত ($bbrr$) গিনিপিগের সংকরায়ণ ঘটানো হলো।
$F_1$ জনু: প্রথম অপত্য জনুতে সমস্ত গিনিপিগ সংকর কালো ও কর্কশ লোমযুক্ত ($BbRr$) হয়।
$F_2$ জনু: $F_1$ জনুর গিনিপিগদের মধ্যে সংকরায়ণ ($BbRr \times BbRr$) ঘটালে ১৬ ধরণের সমন্বয় পাওয়া যায়।
চেকার বোর্ড:
পুং ও স্ত্রী গ্যামেট: $BR, Br, bR, br$
(ছাত্রছাত্রীরা এখানে ১৬ ঘরের ছকটি আঁকবে)
ফলাফল (ফিনোটাইপ অনুপাত):
১) কালো ও কর্কশ ($B-R-$) = ৯ ভাগ
২) কালো ও মসৃণ ($B-rr$) = ৩ ভাগ
৩) সাদা ও কর্কশ ($bbR-$) = ৩ ভাগ
৪) সাদা ও মসৃণ ($bbrr$) = ১ ভাগ
$\therefore$ অনুপাত = $\mathbf{9 : 3 : 3 : 1}$।
২৫. একসংকর জনন ও দ্বিসংকর জননের পার্থক্য লেখো। টেস্ট ক্রস ও ব্যাক ক্রসের সম্পর্ক কী? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ক) পার্থক্য:
| বিষয় | একসংকর জনন | দ্বিসংকর জনন |
|---|---|---|
| ১. বৈশিষ্ট্য | একজোড়া বিপরীত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। | দুই জোড়া বিপরীত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। |
| ২. সূত্র | এই পরীক্ষা থেকে ‘পৃথকীভবন সূত্র’ পাওয়া যায়। | এই পরীক্ষা থেকে ‘স্বাধীন বিন্যাস সূত্র’ পাওয়া যায়। |
| ৩. $F_2$ অনুপাত | ফিনোটাইপ অনুপাত ৩:১। | ফিনোটাইপ অনুপাত ৯:৩:৩:১। |
খ) টেস্ট ক্রস ও ব্যাক ক্রসের সম্পর্ক:
ব্যাক ক্রস: $F_1$ জনুর সংকর জীবের সাথে যেকোনো জনিতৃর ($P$) সংকরায়ণ।
টেস্ট ক্রস: $F_1$ জনুর সংকর জীবের সাথে শুধুমাত্র প্রচ্ছন্ন জনিতৃর সংকরায়ণ।
যেহেতু টেস্ট ক্রসেও জনিতৃর সাথেই ক্রস হয়, তাই বলা যায়: “সকল টেস্ট ক্রসই ব্যাক ক্রস, কিন্তু সকল ব্যাক ক্রস টেস্ট ক্রস নয়।”
২৬. থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণগুলি বিস্তারিত লেখো। লোহা জমার ফলে দেহের কী ক্ষতি হয়? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
ক) থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ:
১) তীব্র অ্যানিমিয়া: লোহিত রক্তকণিকা বা RBC-এর আয়ুষ্কাল কমে যায় (স্বাভাবিক ১২০ দিনের বদলে ২০-৩০ দিন), ফলে রোগী ফ্যাকাশে ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
২) অস্থি বিকৃতি: অস্থির মজ্জা অতিরিক্ত রক্ত তৈরির চেষ্টা করায় হাড়গুলি প্রসারিত ও বিকৃত হয়, বিশেষ করে মুখের হাড় (Mongoloid face)।
৩) অঙ্গ বৃদ্ধি: যকৃৎ ও প্লীহা আকারে অস্বাভাবিক বড় হয়ে যায় (Hepatosplenomegaly)।
খ) লোহা জমার ক্ষতি (হিমোসিডারোসিস):
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত বাইরে থেকে রক্ত নিতে হয়। এর ফলে দেহে অতিরিক্ত লোহা বা আয়রন জমে যায়। এই লোহা হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় এবং বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতে জমা হয়ে সেগুলির কার্যকারিতা নষ্ট করে। এর ফলে হার্ট ফেইলিওর, ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
২৭. বর্ণান্ধতা রোগের বংশগতি কীভাবে ঘটে? পুরুষরা কেন বেশি আক্রান্ত হয়? (৩+২)
✅ বিস্তারিত উত্তর:
বংশগতি (ক্রিস-ক্রস): বর্ণান্ধতা একটি X-লিংকড প্রচ্ছন্ন রোগ। এটি সাধারণত পিতা থেকে কন্যার মাধ্যমে নাতির (Grandson) দেহে সঞ্চারিত হয়। একজন বর্ণান্ধ পুরুষ তার X-ক্রোমোজোমের মাধ্যমে রোগটি তার কন্যাকে দেন (কন্যা বাহক হয়), এবং সেই কন্যা তার X-ক্রোমোজোমের মাধ্যমে রোগটি তার পুত্রকে দেন।
পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার কারণ:
পুরুষদের সেক্স ক্রোমোজোম হলো $XY$। তাদের দেহে একটিমাত্র X-ক্রোমোজোম থাকে। তাই মায়ের থেকে পাওয়া ওই একটি X-ক্রোমোজোমে যদি বর্ণান্ধতার জিন থাকে, তবে পুরুষটি সরাসরি আক্রান্ত হয়। রোগ আটকানোর জন্য তাদের কোনো দ্বিতীয় সুস্থ X-ক্রোমোজোম নেই। কিন্তু মহিলাদের দুটি X থাকায় তারা সাধারণত বাহক হয়, আক্রান্ত কম হয়।
২৮. একটি বিশুদ্ধ কালো ($BB$) গিনিপিগের সঙ্গে একটি বিশুদ্ধ সাদা ($bb$) গিনিপিগের সংকরায়ণ ঘটালে $F_2$ জনুর ফলাফল চেকার বোর্ডে দেখাও। এখান থেকে ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত লেখো। (৫)
✅ উত্তর:
P-জনু: বিশুদ্ধ কালো ($BB$) $\times$ বিশুদ্ধ সাদা ($bb$)
$F_1$ জনু: সকল অপত্য সংকর কালো ($Bb$) হবে।
$F_2$ জনু: $F_1$-এর জীবদের মধ্যে সংকরায়ণ ($Bb \times Bb$)।
চেকার বোর্ড ($F_2$):
| গ্যামেট | $B$ | $b$ |
|---|---|---|
| $B$ | $BB$ (বিশুদ্ধ কালো) | $Bb$ (সংকর কালো) |
| $b$ | $Bb$ (সংকর কালো) | $bb$ (বিশুদ্ধ সাদা) |
ফলাফল:
১) ফিনোটাইপ অনুপাত: কালো : সাদা = $3 : 1$।
২) জিনোটাইপ অনুপাত: বিশুদ্ধ কালো ($BB$) : সংকর কালো ($Bb$) : বিশুদ্ধ সাদা ($bb$) = $1 : 2 : 1$।
২৯. ছোট টীকা লেখো: (ক) লোকাস, (খ) অ্যালিল, (গ) সংকরায়ণ। (৫)
✅ উত্তর:
(ক) লোকাস (Locus): ক্রোমোজোমের ওপর যে নির্দিষ্ট বিন্দুতে বা স্থানে কোনো জিন অবস্থান করে, তাকে ওই জিনের লোকাস বলে। সমসংস্থ ক্রোমোজোমে একই জিনের লোকাস একই হয়।
(খ) অ্যালিল (Allele): সমসংস্থ ক্রোমোজোমের নির্দিষ্ট লোকাসে অবস্থিত একই জিনের দুটি ভিন্ন ভিন্ন রূপভেদকে একে অপরের অ্যালিল বলে। যেমন- মটর গাছের উচ্চতার জন্য $T$ (লম্বা) এবং $t$ (খর্ব) হলো অ্যালিল।
(গ) সংকরায়ণ (Hybridization): কৃত্রিমভাবে দুটি ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীবের (পুরুষ ও স্ত্রী) মিলন ঘটিয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যযুক্ত জীব বা সংকর জীব সৃষ্টির পদ্ধতিকে সংকরায়ণ বলে।
৩০. ক্রোমোজোম, ডিএনএ (DNA) এবং জিনের আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করো। (৫)
✅ উত্তর:
জীবের বংশগতির প্রধান উপাদানগুলি একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
১) ক্রোমোজোম: কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত নিউক্লিওপ্রোটিন দিয়ে তৈরি দণ্ডাকার অংশ, যা বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে।
২) DNA: ক্রোমোজোম মূলত ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA) নামক প্যাঁচানো অণু এবং হিস্টোন প্রোটিন দিয়ে ঘনীভূত হয়ে তৈরি হয়।
৩) জিন: DNA অণুর যে নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র অংশ নির্দিষ্ট প্রোটিন সংশ্লেষের সংকেত বহন করে এবং জীবের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, তাকে জিন বলে।
সারসংক্ষেপ: অনেকগুলো জিন মিলে DNA তৈরি হয় এবং ডিএনএ কুণ্ডলীকৃত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। অর্থাৎ, জিন হলো DNA-এর অংশ এবং DNA হলো ক্রোমোজোমের অংশ।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বংশগতি ও জিনগত রোগ
প্রশ্ন: ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপের মূল পার্থক্য কী?
✅ উত্তর: ফিনোটাইপ হলো জীবের বাহ্যিক বা দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য (যেমন- মটর গাছটি লম্বা)। অন্যদিকে, জিনোটাইপ হলো জীবের জিনগত বা অভ্যন্তরীণ গঠন যা ওই বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে (যেমন- বিশুদ্ধ লম্বা $TT$ নাকি সংকর লম্বা $Tt$)।
প্রশ্ন: হিমোফিলিয়া বা বর্ণান্ধতা পুরুষদের বেশি হয় কেন?
✅ উত্তর: এগুলি X-ক্রোমোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন রোগ। পুরুষদের দেহে একটিমাত্র X ক্রোমোজোম থাকে ($XY$), তাই একটি আক্রান্ত জিন থাকলেই রোগ প্রকাশ পায়। কিন্তু মহিলাদের দুটি X ক্রোমোজোম থাকে ($XX$), তাই রোগ প্রকাশ পেতে হলে দুটি জিনকেই আক্রান্ত হতে হয় (হোমোজাইগাস অবস্থা), যা সচরাচর কম ঘটে।
প্রশ্ন: থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ কী?
✅ উত্তর: থ্যালাসেমিয়া একটি অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত রোগ। হিমোগ্লোবিনের গ্লোবিন প্রোটিন চেইন ($\alpha$ বা $\beta$) তৈরির জিনের ত্রুটির কারণে লোহিত রক্তকণিকা ঠিকমতো গঠিত হয় না এবং দ্রুত ভেঙে যায়, ফলে তীব্র রক্তাল্পতা দেখা দেয়।
প্রশ্ন: লিঙ্গ নির্ধারণে পিতার ভূমিকা কেন প্রধান?
✅ উত্তর: মাতা কেবল এক প্রকার গ্যামেট বা ডিম্বাণু ($A+X$) তৈরি করেন, কিন্তু পিতা দুই প্রকার শুক্রাণু তৈরি করেন: অ্যান্ড্রোপার্ম ($A+Y$) এবং গাইনিস্পার্ম ($A+X$)। পিতার Y-ক্রোমোজোম যুক্ত শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করলেই পুত্র সন্তান হয়। তাই লিঙ্গ নির্ধারণে পিতাই দায়ী।
প্রশ্ন: মেন্ডেল পরীক্ষার জন্য মটর গাছ কেন বেছে নিয়েছিলেন?
✅ উত্তর: ১) মটর গাছ দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে ও আয়ুষ্কাল কম।
২) এটি উভলিঙ্গ ফুল হওয়ায় স্বপরাগযোগ সম্ভব, আবার ইতর পরাগযোগও ঘটানো যায়।
৩) এতে অনেকগুলি বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য (যেমন- লম্বা/খর্ব, গোল/কুঞ্চিত বীজ) স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।