দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ২  সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা

বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | পূর্ণমান:


১. নতুন সামাজিক ইতিহাস (New Social History) চর্চার বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর:
বিংশ শতকের ছয়ের ও সাতের দশক থেকে ইতিহাস চর্চায় যে নতুন ধারার সূচনা হয়, তাকে ‘নতুন সামাজিক ইতিহাস’ বলা হয়। এর বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব নিম্নরূপ:

  • ১. সাধারণ মানুষের কথা: সনাতন ইতিহাসে কেবল রাজা-মহারাজা, যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজনৈতিক পালাবদলের কথা থাকত। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাসে সমাজের নিচুতলার মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখ ও জীবনসংগ্রামের কথা গুরুত্ব পায়।
  • ২. সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা জাতির ইতিহাস নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের ইতিহাস। এখানে মানুষের পোশাক, খাদ্য, খেলাধুলা, বিনোদন, শিল্পকলা—সবকিছুই ইতিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।
  • ৩. অবহেলিত অধ্যায় উদ্ধার: সমাজে যারা এতদিন উপেক্ষিত ছিল, তাদের ইতিহাসকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসাই এর লক্ষ্য। রণজিৎ গুহ, শাহিদ আমিন, সুমিত সরকার প্রমুখ ঐতিহাসিক এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
  • উপসংহার: নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চার ফলে ইতিহাস আজ আর কেবল উচ্চবিত্তের কাহিনী নয়, বরং তা গণমানুষের ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।

২. ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’ গ্রন্থে উনিশ শতকের বাংলার কীরূপ সমাজচিত্র পাওয়া যায়? [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
কালীপ্রসন্ন সিংহ ছদ্মনামে লেখা ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬১) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক সামাজিক নকশা। এতে তৎকালীন কলকাতার সমাজের নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে:

  • ১. বাবু কালচার বা নব্যধনী সমাজ: ইংরেজদের দালালি করে বা ফাটকাবাজি করে হঠাৎ ধনী হওয়া কলকাতার ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের উশৃঙ্খল জীবন, মদ্যপান, বাইজি নাচ এবং ভণ্ডামির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
  • ২. ধর্মীয় ভণ্ডামি: বারোয়ারি পূজা, চড়ক পূজা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের নামে যে আড়ম্বর, অর্থের অপচয় ও লাম্পট্য চলত, তা লেখক ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন।
  • ৩. অন্ধ অনুকরণ: ইংরেজি শিখে একদল যুবক কীভাবে নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে অন্ধভাবে সাহেবি কায়দা ও পোশাক অনুকরণ করত, তার সমালোচনাও এতে আছে।
  • ৪. ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এটি কলকাতার কথ্য ভাষায় লেখা প্রথম গ্রন্থ, যা ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

৩. নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার ভূমিকা কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:
হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা ছিল নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) প্রধান মুখপত্র। এর ভূমিকাগুলি হলো:

  • ১. অত্যাচারের সংবাদ প্রকাশ: এই পত্রিকা নিয়মিত নীলকর সাহেবদের অমানবিক অত্যাচার, জোর করে নীল চাষ করানো এবং কৃষকদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার খবর সাহসিকতার সাথে প্রকাশ করত।
  • ২. জনমত গঠন: পত্রিকার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে ওঠে এবং কৃষকদের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
  • ৩. আইনি সহায়তা: সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় কেবল খবর ছাপিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি নির্যাতিত নীলচাষিদের আইনি লড়াইয়ের জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করতেন এবং আইনজীবীদের সাহায্য নিতেন।
  • ৪. সরকারি নীতির সমালোচনা: ব্রিটিশ সরকারের পক্ষপাতমূলক বিচার ব্যবস্থা এবং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার কঠোর সমালোচনা করে এই পত্রিকা সরকারকে চাপে ফেলেছিল।

৪. ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি কেন সমসাময়িক বাংলা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

উত্তর:
১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্র রচিত ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ছিল নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত এক শক্তিশালী রাজনৈতিক দলিল।

  • ১. অত্যাচারের বাস্তব চিত্র: নাটকে তোরাপ, আদুরী, ক্ষেত্রমণি চরিত্রগুলির মাধ্যমে নীলকর সাহেবদের (যেমন উড ও রোগ) পৈশাচিক অত্যাচার এবং গরিব চাষিদের হাহাকার মূর্ত হয়েছে।
  • ২. মধ্যবিত্তের জাগরণ: নাটকটি কলকাতার মঞ্চে অভিনীত হলে বিদ্যাসাগরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এটি শিক্ষিত সমাজকে কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে সাহায্য করে।
  • ৩. রাজনৈতিক গুরুত্ব: রেভারেন্ড জেমস লং এই নাটকটি প্রকাশ করায় তাঁর জেল ও জরিমানা হয়, যা ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দেয়।
  • ৪. তুলনা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই নাটককে হ্যারিয়েট বিচার স্টো-র ‘আঙ্কল টমস কেবিন’-এর সাথে তুলনা করেছেন।

৫. ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকাটি কেন একটি ব্যতিক্রমী পত্রিকা ছিল?

উত্তর:
হরিনাথ মজুমদার বা কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ (১৮৬৩) ছিল উনবিংশ শতকের একটি অনন্য পত্রিকা। কারণ:

  • ১. গ্রামীণ সাংবাদিকতা: সমসাময়িক অধিকাংশ পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো এবং শহুরে সমস্যা নিয়ে লিখত। কিন্তু এটি প্রকাশিত হতো মফস্বল (কুষ্টিয়া) থেকে এবং এতে গ্রাম বাংলার কথা থাকত।
  • ২. শোষণের বিরোধিতা: নীলকর সাহেব, জমিদার এবং মহাজনরা কীভাবে প্রজাদের ওপর শোষণ চালাত, তার নির্ভীক বিবরণ এতে ছাপা হতো।
  • ৩. জনহিতকর কাজ: কেবল খবর পরিবেশন নয়, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি কৃষকদের অধিকার আদায়ে এই পত্রিকা জনমত গঠন করত।
  • ৪. প্রজা কল্যাণ: জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রজাদের সংঘবদ্ধ করতে এই পত্রিকা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল।

৬. এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর:
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক। তাঁর অবদানগুলি হলো:

  • ১. আমহার্স্টকে চিঠি: ১৮২৩ সালে তিনি লর্ড আমহার্স্টকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখে সংস্কৃত শিক্ষার বদলে ইংরেজি তথা আধুনিক বিজ্ঞান (গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন) শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুরোধ জানান।
  • ২. অ্যাংলো হিন্দু স্কুল: ১৮১৫ সালে তিনি নিজের খরচে ‘অ্যাংলো হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ছাত্রদের ইংরেজি, বিজ্ঞান ও দর্শন পড়ানো হতো।
  • ৩. হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ার যখন হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, রামমোহন রায় তাঁকে পরোক্ষভাবে সাহায্য ও সমর্থন করেন।
  • ৪. বেদান্ত কলেজ: তিনি ১৮২৫ সালে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান পড়ানোর ব্যবস্থাও ছিল।

৭. উনিশ শতকে নারীশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান ছিল যুগান্তকারী।

  • ১. বেথুন স্কুল ও বিদ্যাসাগর: ১৮৪৯ সালে জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন যখন ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন, বিদ্যাসাগর তার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রীদের স্কুলে আনতেন এবং তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতেন।
  • ২. বিদ্যালয় স্থাপন: তিনি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় স্কুল পরিদর্শক থাকাকালীন ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। নিজের খরচে মায়ের নামে ‘বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ৩. সামাজিক সচেতনতা: তিনি লেখনি ও বক্তৃতার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে হিন্দু শাস্ত্রে নারীশিক্ষার বিরোধী কোনো কথা নেই, যা রক্ষণশীল সমাজের মুখ বন্ধ করতে সাহায্য করে।
  • ৪. শিক্ষা তহবিল: তিনি ‘নারীশিক্ষা ভান্ডার’ গঠন করে নারীশিক্ষার জন্য অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন।

৮. উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪)-এর প্রধান সুপারিশগুলি কী ছিল? একে ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয় কেন?

উত্তর:
১৮৫৪ সালে বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে সুপারিশ পেশ করেন, তা উডের ডেসপ্যাচ নামে পরিচিত।

  • সুপারিশসমূহ:
    ১) প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুসংহত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা।

    ২) প্রতিটি প্রদেশে একটি করে শিক্ষা বিভাগ (Education Department) খোলা।

    ৩) কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।

    ৪) নারী শিক্ষা ও শিক্ষক শিক্ষণের (Teachers’ Training) ওপর জোর দেওয়া।

ম্যাগনাকার্টা: এই দলিলের ভিত্তিতেই ভারতের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তাই একে ভারতীয় শিক্ষার মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।

৯. আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা চর্চায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর:
১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ছিল এশিয়ার প্রথম আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা কেন্দ্র। এর ভূমিকাগুলি হলো:

  • ১. সবাক ব্যবচ্ছেদ (Dissection): ১৮৩৬ সালে মধুসূদন গুপ্ত ও তাঁর সঙ্গীরা এখানে প্রথম মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করেন। এর ফলে চিকিৎসাবিদ্যায় হিন্দু সমাজের হাজার বছরের কুসংস্কার দূর হয় এবং আধুনিক সার্জারির পথ প্রশস্ত হয়।
  • ২. আধুনিক শিক্ষা: কবিরাজি ও হাকিমি চিকিৎসার বদলে এখানে আধুনিক অ্যালোপ্যাথি, সার্জারি, অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজি শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়।
  • ৩. দক্ষ চিকিৎসক তৈরি: এই কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকরা সারা দেশে এবং বিদেশে আধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হন।
  • ৪. হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: এই কলেজের সাথে যুক্ত হাসপাতালগুলি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার এক বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১০. বাংলার নবজাগরণে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’-র ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর:
উইলিয়াম কেরি, যশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড—এই তিন মিশনারিকে একত্রে ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ বলা হয়।

  • ১. ছাপাখানা ও মুদ্রণ: তাঁরা শ্রীরামপুরে উন্নত মানের ছাপাখানা স্থাপন করেন, যার ফলে সুলভে পাঠ্যপুস্তক, ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্য সাধারণের কাছে পৌঁছে যায়। এটি শিক্ষা বিস্তারে বিপ্লব আনে।
  • ২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ১৮১৮ সালে তাঁরা ‘শ্রীরামপুর কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল এশিয়ার প্রথম ডিগ্রি কলেজ। এছাড়া তাঁরা বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
  • ৩. বাংলা গদ্যের বিকাশ: বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ এবং পাঠ্যপুস্তক রচনার মাধ্যমে তাঁরা বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
  • ৪. সমাজ সংস্কার: তাঁরা সতীদাহ প্রথা ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গঠনেও সক্রিয় ছিলেন এবং ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

১১. উচ্চশিক্ষার বিস্তারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৮৫৭) ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর:
উডের ডেসপ্যাচ অনুযায়ী ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

  • ১. নিয়ন্ত্রক সংস্থা: প্রথমদিকে এটি কেবল পরীক্ষা গ্রহণকারী ও উপাধি (Degree) প্রদানকারী সংস্থা ছিল। এটি অধীনস্থ কলেজগুলির পাঠ্যক্রম নির্ধারণ ও মান নিয়ন্ত্রণ করত।
  • ২. শিক্ষার বিস্তার: এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও চিকিৎসার উচ্চশিক্ষা প্রসারের ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে।
  • ৩. জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: এখান থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটরাই (যেমন- বঙ্কিমচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ) পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
  • ৪. গবেষণা: পরবর্তীকালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় এটি পঠন-পাঠন ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১২. টীকা লেখো: ডিরোজিও এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা নব্যবঙ্গ আন্দোলন।

উত্তর:
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও: তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক, কবি এবং যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ। তিনি ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা করতে এবং সত্যের অনুসন্ধান করতে শিখিয়েছিলেন।

ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন:

  • সংগঠন: ডিরোজিওর অনুগামী ছাত্ররা (প্যারিচাঁদ মিত্র, রামতনু লাহিড়ী, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়) ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • কার্যকলাপ: তাঁরা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, জাতিভেদ, মূর্তিপূজা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁরা নারীশিক্ষা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেন।
  • সীমাবদ্ধতা: তাঁদের আন্দোলন ছিল উগ্র এবং শহরকেন্দ্রিক। তাঁরা দেশের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেছিলেন বলে সাধারণ মানুষের সমর্থন পাননি এবং আন্দোলনটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

১৩. শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ারের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:
স্কটল্যান্ড থেকে ঘড়ি সারাইয়ের ব্যবসা করতে এসে ডেভিড হেয়ার নিজেকে ভারতের শিক্ষা বিস্তারে উৎসর্গ করেন।

  • ১. হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন এবং এর উন্নতির জন্য তিনি আজীবন চেষ্টা করেছেন।
  • ২. স্কুল বুক সোসাইটি: ছাত্রছাত্রীদের হাতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ভালো মানের পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার জন্য ১৮১৭ সালে তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ৩. স্কুল সোসাইটি: ১৮১৮ সালে তিনি স্কুল সোসাইটি গঠন করে বহু ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যম স্কুল স্থাপন করেন।
  • ৪. পটলডাঙা অ্যাকাডেমি: তিনি পটলডাঙা অ্যাকাডেমি (বর্তমান হেয়ার স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক শিক্ষার একনিষ্ঠ সেবক।

১৪. ‘মেকলে মিনিটস’ (১৮৩৫) কী? এর মাধ্যমে কীভাবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে?

উত্তর:
মেকলে মিনিটস: ১৮৩৫ সালে জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতের শিক্ষানীতি সম্পর্কে গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্কের কাছে যে প্রস্তাব পেশ করেন, তাকে মেকলে মিনিটস বলে।

দ্বন্দ্বের অবসান:

  • ১৮১৩ সালের সনদের পর ভারতে শিক্ষার মাধ্যম প্রাচ্য (সংস্কৃত/ফারসি) হবে না কি পাশ্চাত্য (ইংরেজি) হবে—তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
  • মেকলে তাঁর প্রস্তাবে ভারতীয় বা প্রাচ্য শিক্ষাকে ‘হেয়’ এবং অবৈজ্ঞানিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ইউরোপের একটি লাইব্রেরির এক তাক বই সমগ্র প্রাচ্য সাহিত্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ”।
  • তিনি প্রস্তাব দেন যে, সরকারি অর্থ কেবল ইংরেজি শিক্ষার জন্যই ব্যয় করা উচিত। লর্ড বেন্টিঙ্ক এই প্রস্তাব মেনে নিয়ে ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে রায় দিলে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে।

বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-২)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১৫-২৮ | পূর্ণমান:


১৫. ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তনে কেশবচন্দ্র সেনের ভূমিকা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর:
কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম আন্দোলন এক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়।

  • প্রচার ও প্রসার: তাঁর অসাধারণ বাগ্মীতা এবং উৎসাহে ব্রাহ্মধর্ম কলকাতা ছাড়িয়ে সারা ভারত তথা মহারাষ্ট্র, মাদ্রাজ ও পাঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ধর্ম প্রচারে ভক্তিবাদের প্রবর্তন করেন।
  • সমাজ সংস্কার: তিনি ধর্ম প্রচারের সাথে সমাজ সংস্কারকে যুক্ত করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৭২ সালে ‘তিন আইন’ (বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ এবং বিধবা বিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহ প্রচলন) পাস হয়।
  • নববিধান: পরবর্তীকালে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের সারবস্তু নিয়ে উদার ও সর্বজনীন ধর্মমত ‘নববিধান’ (১৮৮০) প্রবর্তন করেন, যা সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা বলে।

১৬. উনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজের অবদান লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর:
ব্রাহ্মসমাজ কেবল ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার।

  • নারীমুক্তি: সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং নারীশিক্ষা বিস্তারে ব্রাহ্ম নেতারা (রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর) অগ্রণী ভূমিকা নেন।
  • জাতিভেদ প্রথা: তাঁরা জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং সমাজে অসবর্ণ বিবাহ প্রচলন করে জাতিভেদের মূলে আঘাত করেন।
  • কুসংস্কার দূরীকরণ: মূর্তিপূজা, বলিদান এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁরা জনমত গঠন করেন এবং একেশ্বরবাদ প্রচার করেন।
  • শিক্ষা: তাঁরা বহু স্কুল ও কলেজ (যেমন- সিটি কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ) প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটান।

১৭. বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ব্রাহ্মসমাজের সাথে যুক্ত থেকেও কেন আলাদা পথে চলে যান?

উত্তর:
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের একজন জনপ্রিয় আচার্য, কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

  • ভক্তিবাদের প্রভাব: তিনি ব্রাহ্মসমাজের কঠোর ও যুক্তিনির্ভর নিরাকার উপাসনার বদলে বৈষ্ণব ভক্তিবাদের (নামগান, কীর্তন) দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমেই ঈশ্বর লাভ সম্ভব।
  • গুরুবাদ ও মূর্তিপূজা: তিনি ক্রমশ গুরুবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং চৈতন্যদেবের ভাবাদর্শ গ্রহণ করেন, যা ব্রাহ্মসমাজের একেশ্বরবাদী মূল নীতির বিরোধী ছিল।
  • সমন্বয়: শেষপর্যন্ত তিনি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে নব্যবৈষ্ণব আন্দোলন গড়ে তোলেন, যেখানে ব্রাহ্ম নৈতিকতার সাথে ভক্তিবাদের সমন্বয় ঘটেছিল।

১৮. শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর আদর্শটি ব্যাখ্যা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর:
উনিশ শতকে যখন বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ভেদাভেদ প্রবল ছিল, তখন শ্রীরামকৃষ্ণ এক উদার ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করেন।

  • যত মত তত পথ: তিনি কালী সাধনা, ইসলাম, খ্রিস্টান—সব পথেই সাধনা করে উপলব্ধি করেন যে সব ধর্মের গন্তব্য এক, কেবল পথ আলাদা। তাই তিনি বলেন, “যত মত তত পথ”।
  • ধর্মের ঐক্য: তিনি সহজ উদাহরণ দিয়ে বলেন, “জলকে কেউ বলে ‘ওয়াটার’, কেউ ‘পানি’, কেউ ‘জল’—কিন্তু বস্তু একই। তেমনই ঈশ্বর এক, কিন্তু তাঁকে ডাকার নাম ভিন্ন।”
  • মানবতা: তাঁর ধর্মে কোনো জাতিভেদ বা গোঁড়ামি ছিল না। তিনি সকল ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দেন।

১৯. স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত’ (Neo-Vedanta) সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উত্তর:
প্রাচীন বেদান্ত দর্শনের সাথে আধুনিক মানবতাবাদের সমন্বয়ে বিবেকানন্দ যে নতুন ব্যাখ্যা দেন, তাকে নব্য বেদান্ত বলে।

  • শিবজ্ঞানে জীবসেবা: তিনি বলেন, বনে জঙ্গলে গিয়ে ঈশ্বর খোঁজার দরকার নেই। “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?” অর্থাৎ দরিদ্র ও আর্ত মানুষের সেবাই হলো ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ পূজা।
  • সামাজিক মুক্তি: তাঁর বেদান্তে কেবল ব্যক্তিগত মোক্ষলাভ নয়, সমাজের নিচুতলার মানুষের উন্নয়ন, শিক্ষা ও জাতিভেদ প্রথা দূরীকরণের কথা বলা হয়েছে।
  • কর্মযোগ: তিনি নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে দেশ ও দশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে বলেন। কর্মই ধর্ম—এটিই ছিল তাঁর বার্তা।

২০. উনিশ শতকের বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি বা চরিত্র আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর:
বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে:

  • শহুরে সীমাবদ্ধতা: এই নবজাগরণ মূলত কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর সুফল গ্রাম বাংলার বিশাল অংশের মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।
  • এলিটিস্ট আন্দোলন (Elitist Movement): এটি কেবল ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবর্ণের হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক বা মুসলিম সমাজের এতে বিশেষ অংশগ্রহণ ছিল না।
  • ঐতিহ্য ও আধুনিকতা: এটি ইতালির রেনেসাঁসের মতো সম্পূর্ণ নতুন কিছু ছিল না, বরং এটি ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে ভারতীয় ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ।
  • তাই অনেকে একে তথাকথিত নবজাগরণ বা ‘ঐতিহাসিক বিভ্রম’ বলেছেন।

২১. হাজী মহহসীনের জনহিতকর কার্যাবলী আলোচনা করো।

উত্তর:
হাজী মহম্মদ মহহসীন ছিলেন এক মহান দানবীর।

  • দানশীলতা: তিনি তাঁর পৈতৃক বিপুল সম্পত্তি জনকল্যাণে দান করেন এবং ১৮০৬ সালে ‘মহহসীন ফান্ড’ তৈরি করেন।
  • শিক্ষা বিস্তার: তাঁর ট্রাস্টের অর্থে হুগলি মহহসীন কলেজ, ঢাকা মাদ্রাসা এবং বহু স্কুল ও ছাত্রাবাস পরিচালিত হতো। তিনি দরিদ্র ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।
  • সম্প্রীতি: তিনি ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে আর্ত মানুষের সেবা করতেন। ১৭৭০ সালের মন্বন্তরের সময় তিনি অকাতরে দান করেছিলেন।

২২. লালন ফকিরের চিন্তাধারায় মানবতাবাদের কী পরিচয় পাওয়া যায়?

উত্তর:
বাউল সম্রাট লালন ফকির ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।

  • জাতিভেদ বিরোধিতা: তিনি তাঁর গানে বারবার জাতিভেদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির অসারতা প্রমাণ করেছেন। তিনি গেয়েছেন—”সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।”
  • সহজিয়া সাধনা: তিনি কোনো মন্দির-মসজিদ বা বাহ্যিক আচারে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন মানুষের হৃদয়েই ঈশ্বরের বাস (“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”)।
  • সমন্বয়: হিন্দু ও সুফি দর্শনের মিলনে তিনি এক উদার মানবধর্ম প্রচার করেন, যেখানে মানুষই সবার উপরে।

২৩. ব্রাহ্ম সমাজ কেন বিভাজিত হয়েছিল? (১৮৬৬ ও ১৮৭৮)

উত্তর:
ব্রাহ্মসমাজে দুবার বড় ভাঙন ধরে:

  • প্রথম বিভাজন (১৮৬৬): দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চাইতেন ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুধর্মে সীমাবদ্ধ থাকুক এবং ধীরে ধীরে সংস্কার হোক। কিন্তু তরুণ নেতা কেশবচন্দ্র সেন চাইতেন একে সর্বজনীন করতে এবং দ্রুত সমাজ সংস্কার (উপবীত ত্যাগ, অসবর্ণ বিবাহ) করতে। এই মতভেদে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ ও ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ তৈরি হয়।
  • দ্বিতীয় বিভাজন (১৮৭৮): কেশবচন্দ্র সেন নিজে বাল্যবিবাহের বিরোধী হয়েও তাঁর নাবালিকা মেয়েকে কোচবিহারের রাজার সাথে হিন্দু মতে বিয়ে দেন। এতে তাঁর অনুগামীরা (শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু) ক্ষুব্ধ হন এবং আলাদা হয়ে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠন করেন।

২৪. সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:

  • শাস্ত্রীয় প্রমাণ: রামমোহন রায় প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র (যেমন- মনুসংহিতা) উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ প্রথা হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক কোনো অঙ্গ নয়, বরং এটি একপ্রকার আত্মহত্যা বা নারীহত্যা।
  • জনমত গঠন: তিনি ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকার মাধ্যমে এবং বিভিন্ন পুস্তিকা লিখে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। তিনি নিজে শ্মশানে গিয়েও এই প্রথা আটকানোর চেষ্টা করতেন।
  • আইন পাস: তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে ১৭ নং রেগুলেশন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

২৫. বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ও তার ফলাফল লেখো।

উত্তর:

  • ভূমিকা: বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতা থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন—”বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত”। তিনি সরকারের কাছে প্রায় ১০০০ বিশিষ্ট ব্যক্তির সই সম্বলিত আবেদনপত্র জমা দেন।
  • আইন পাস: তাঁর প্রবল আন্দোলনের ফলে ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসির আমলে (ক্যানিং পাস করেন) ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয়।
  • বাস্তবায়ন: তিনি কেবল আইন পাস করেই ক্ষান্ত হননি, নিজের খরচে বহু বিধবা বিবাহ দেন এবং নিজের ছেলের সাথেও বিধবার বিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

২৬. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর:
বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার ছিল মানবমুখী ও আধুনিক।

  • জীবে প্রেম: তিনি বলতেন, “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” অর্থাৎ মানুষ ও জীবের সেবাই হলো ধর্মের সার।
  • কুসংস্কার বিরোধিতা: তিনি ধর্মের নামে অস্পৃশ্যতা ও ছুঁৎমার্গ-এর তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি একে “Don’t touchism” বলে ব্যঙ্গ করতেন।
  • শক্তি চর্চা: তিনি বলতেন, “গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো”। সবল শরীর ও মন ছাড়া ধর্মচর্চা বা দেশসেবা সম্ভব নয়।

২৭. উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ‘ইয়ং বেঙ্গল’-এর ভূমিকা মূল্যায়ন করো।

উত্তর:
ভূমিকা:

  • ডিরোজিওর ছাত্ররা হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেন।
  • তাঁরা নারীশিক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং কৃষকদের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেন।

মূল্যায়ন ও ব্যর্থতা: তাঁদের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পদ্ধতি ছিল উগ্র ও নেতিবাচক (যেমন- উপবীত ছিঁড়ে ফেলা, মন্দিরে গিয়ে গোমাংস খাওয়া)। তাঁরা দেশের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে অন্ধভাবে পাশ্চাত্য অনুকরণ করেছিলেন। ফলে তাঁদের আন্দোলন সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং সমাজে কোনো স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি।

২৮. উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনে চিকিৎসকদের ভূমিকা কী ছিল? (মধুসূদন গুপ্ত ও অন্যান্য)

উত্তর:
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর চিকিৎসকরা সমাজ সংস্কারে বড় ভূমিকা নেন।

  • কুসংস্কার দূরীকরণ: ১৮৩৬ সালে পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত প্রথম শবব্যবচ্ছেদ করে হিন্দু সমাজের হাজার বছরের কুসংস্কার (মড়া ছুঁলে পাপ হয়) ভেঙে দেন। এটি ছিল এক বৈপ্লবিক ঘটনা।
  • আধুনিকমনস্কতা: এই চিকিৎসকরা ছিলেন যুক্তিবাদী। তাঁরা নব্যবঙ্গ ও ব্রাহ্ম আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে বাল্যবিবাহ রোধ ও নারীশিক্ষা বিস্তারে সাহায্য করেন।
  • জনসেবা: তাঁরা মহামারী রোধে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন, যা সমাজকে আধুনিক করে তোলে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – সংস্কার আন্দোলন


প্রশ্ন: শ্রীরামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ইসলাম, খ্রিস্টান ও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন পথ সাধনা করে উপলব্ধি করেন যে, সব ধর্মের গন্তব্য এক। তিনি বলেন, “যত মত তত পথ”। অর্থাৎ ঈশ্বর এক, কেবল তাঁকে ডাকার পথগুলো আলাদা। এই উদার ধর্মমতই সর্বধর্ম সমন্বয়।

প্রশ্ন: স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত’ কী?

উত্তর: স্বামীজি প্রাচীন বেদান্তের ব্যাখ্যার সাথে আধুনিক মানবসেবার আদর্শ যুক্ত করেন। তিনি বলেন, মোক্ষলাভের জন্য সংসার ত্যাগের প্রয়োজন নেই; বরং দরিদ্র ও আর্ত মানুষের সেবার মাধ্যমেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়। তাঁর মূল মন্ত্র ছিল—“শিবজ্ঞানে জীবসেবা”

প্রশ্ন: বাংলার নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

উত্তর: উনিশ শতকের নবজাগরণ ইতালির রেনেসাঁসের মতো ব্যাপক ছিল না। এটি মূলত কলকাতা শহর কেন্দ্রিক এবং ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ বা মুসলিম সমাজের ওপর এর প্রভাব ছিল নগণ্য।

প্রশ্ন: ব্রাহ্মসমাজ কেন বিভাজিত হয়েছিল?

উত্তর: মূলত মতাদর্শগত কারণে ব্রাহ্মসমাজ ভাঙে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন রক্ষণশীল, আর কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন প্রগতিশীল ও সমাজ সংস্কারক। পরে কেশবচন্দ্র সেন নিজের নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দিলে তাঁর অনুগামীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭৮ সালে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ গঠন করেন।

প্রশ্ন: লালন ফকির কেন বিখ্যাত?

উত্তর: লালন ফকির ছিলেন বাউল সম্রাট। তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে এক অসাম্প্রদায়িক মানব ধর্মের কথা প্রচার করেন। তাঁর কাছে জাতপাত বা ধর্মীয় আচারের চেয়ে মানুষই ছিল বড় (“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”)।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার