দশম শ্রেণী ইতিহাস: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বিশ্লেষণ ধর্মের প্রশ্ন উত্তর
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ | প্রশ্ন সংখ্যা: ৩৬ | পূর্ণমান: ৪
১. ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন (১৮৬৫ ও ১৮৭৮) পাসের উদ্দেশ্য বা পটভূমি আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিশাল বনজ সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য অরণ্য আইন পাস করে। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- ১. সম্পদ লুট: ব্রিটিশদের জাহাজ তৈরি এবং রেললাইন পাতার জন্য প্রচুর শক্ত কাঠের (যেমন- শাল, সেগুন) প্রয়োজন ছিল। ভারতের বনভূমি থেকে বিনামূল্যে এই কাঠ সংগ্রহ করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
- ২. রাজস্ব আদায়: আগে অরণ্য ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার অরণ্যকে সরকারি সম্পত্তি ঘোষণা করে কাঠ ও বনজ সম্পদ সংগ্রহের ওপর কর বসিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়াতে চেয়েছিল।
- ৩. আদিবাসীদের অধিকার হরণ: আদিবাসীরা অরণ্যকে নিজেদের মা মনে করত। অরণ্য আইন পাস করে ব্রিটিশরা আদিবাসীদের শিকার করা, কাঠ কাটা ও পশুচারণের প্রথাগত অধিকার কেড়ে নেয়।
- ৪. কৃষি জমি বিস্তার: অরণ্য পরিষ্কার করে চা, কফি ও রবার বাগিচা তৈরি করাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য।
২. ১৮৭৮ সালের অরণ্য আইনে অরণ্যের শ্রেণিবিভাগ কীভাবে করা হয়েছিল? এর প্রভাব কী ছিল?
✅ উত্তর:
১৮৭৮ সালের দ্বিতীয় অরণ্য আইনে ভারতের বনাঞ্চলকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- ১. সংরক্ষিত অরণ্য (Reserved Forest): এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও সম্পদ সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। এটি সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল।
- ২. সুরক্ষিত অরণ্য (Protected Forest): এখানে বিশেষ অনুমতি বা লাইসেন্স নিয়ে মানুষ কাঠ সংগ্রহ করতে পারত।
- ৩. গ্রামীণ অরণ্য (Village Forest): গ্রামের আশেপাশের ছোট জঙ্গল, যা গ্রামবাসীরা ব্যবহার করতে পারত।
প্রভাব: এই বিভাজনের ফলে আদিবাসীরা তাদের জীবনজীবিকা হারায় এবং ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।
৩. চুঁয়াড় বিদ্রোহের (১৭৯৮-৯৯) কারণগুলি আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর:
মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম অঞ্চলের চুঁয়াড়রা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ করেছিল, তার কারণগুলি হলো:
- ১. পাইকান জমি বাজেয়াপ্ত: চুঁয়াড়রা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে পাইক বা প্রহরীর কাজ করত এবং বেতনের বদলে নিষ্কর ‘পাইকান জমি’ ভোগ করত। ব্রিটিশরা এই জমি কেড়ে নিলে তারা ক্ষুব্ধ হয়।
- ২. উচ্চ রাজস্ব: ব্রিটিশ ইজারাদাররা জমির ওপর অত্যধিক হারে রাজস্ব ধার্য করে, যা দেওয়া চুঁয়াড় কৃষকদের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
- ৩. জমিদারদের উচ্ছেদ: কোম্পানি ঠিকমতো খাজনা না পাওয়ায় স্থানীয় জমিদারদের জমিদারি নিলামে চড়িয়ে দেয় এবং বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করে। এর প্রতিবাদে চুঁয়াড়রা তাদের জমিদারদের (যেমন- রানি শিরোমণি) নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে।
৪. কোল বিদ্রোহের (১৮৩১-৩২) প্রধান কারণগুলি কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
ছোটনাগপুর অঞ্চলের কোল উপজাতিদের বিদ্রোহের কারণগুলি নিম্নরূপ:
- ১. রাজস্ব বৃদ্ধি: ব্রিটিশ সরকার কোলদের নিষ্কর জমির ওপর চড়া হারে রাজস্ব বসায়। রাজস্ব দিতে না পারলে তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হতো।
- ২. দিকুদের শোষণ: বহিরাগত মহাজন বা ‘দিকু’রা কোলদের চড়া সুদে টাকা ধার দিত এবং পরে তাদের জমিজায়গা ও গবাদি পশু কেড়ে নিত।
- ৩. আবগারি কর: কোলদের প্রিয় পানীয় ছিল পচানি বা হঁড়িয়া (মদ)। সরকার এর ওপর আবগারি কর বসালে তারা ক্ষিপ্ত হয়।
- ৪. সামাজিক অবমাননা: ইংরেজ ও মহাজনরা কোল নারীদের সম্মানহানি করত এবং তাদের দিয়ে জোর করে কাজ করাত (বেগার খাটাত)।
৫. সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-৫৬) অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি বিশ্লেষণ করো। [খুব গুরুত্বপূর্ণ]
✅ উত্তর:
সাঁওতাল বিদ্রোহ বা ‘হুল’ ছিল ব্রিটিশ বিরোধী এক বৃহত্তম উপজাতি আন্দোলন।
- ১. মহাজনদের শোষণ: বহিরাগত মহাজনরা সাঁওতালদের ৫০% থেকে ৫০০% সুদে টাকা ধার দিত। তারা ‘কেনারাম’ (ভারী বাটখারা) ও ‘বেচারাম’ (হালকা বাটখারা) ব্যবহার করে সাঁওতালদের ঠকাত।
- ২. জমির অধিকার হরণ: সাঁওতালরা জঙ্গল পরিষ্কার করে যে ‘দামিন-ই-কোহ’ অঞ্চল তৈরি করেছিল, ব্রিটিশরা সেখানে উচ্চ হারে খাজনা বসায় এবং খাজনা না দিলে জমি কেড়ে নেয়।
- ৩. ঠিকাদারদের অত্যাচার: রেললাইন তৈরির কাজে সাঁওতাল শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি দেওয়া হতো এবং তাদের নারীদের ওপর অত্যাচার করা হতো।
- ৪. নীলকরদের চাপ: নীলকর সাহেবরা সাঁওতালদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করত।
৬. সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল বা গুরুত্ব আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:
সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল:
- ১. পৃথক জেলা গঠন: ব্রিটিশ সরকার সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে ‘সাঁওতাল পরগনা’ নামে একটি পৃথক জেলা গঠন করে।
- ২. বিশেষ আইন: সাঁওতালদের জন্য পৃথক আইন (সাঁওতাল পরগনা টেন্যান্সি অ্যাক্ট) পাস করে তাদের জমি হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা হয় এবং সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
- ৩. মহাজনদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ: দিকু বা বহিরাগত মহাজনদের অবাধ প্রবেশ ও শোষণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
- ৪. অনুপ্রেরণা: এই বিদ্রোহ পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
৭. মুন্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০) কারণগুলি কী ছিল?
✅ উত্তর:
বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে উলগুলান বা মুন্ডা বিদ্রোহের কারণগুলি হলো:
- ১. খুৎকাঠি প্রথার বিলোপ: মুন্ডাদের জমির ওপর যৌথ মালিকানা বা ‘খুৎকাঠি প্রথা’ ব্রিটিশ ও জমিদাররা বাতিল করে ব্যক্তিগত মালিকানা চালু করে। এর ফলে মুন্ডারা জমির অধিকার হারায়।
- ২. বেগার শ্রম: জমিদার ও ঠিকাদাররা মুন্ডাদের দিয়ে জোর করে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করাত, যাকে ‘বেট-বেগার’ বলা হতো।
- ৩. ধর্মান্তরকরণ: খ্রিস্টান মিশনারিরা মুন্ডাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম নষ্ট করে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করলে তারা ক্ষুব্ধ হয়।
৮. বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহের বিবরণ দাও। এই বিদ্রোহের ফলাফল কী হয়েছিল?
✅ উত্তর:
বিদ্রোহের বিবরণ: বিরসা মুন্ডা নিজেকে ‘ঈশ্বরের দূত’ বা ‘ধরতি আবা’ ঘোষণা করে মুন্ডাদের ঐক্যবদ্ধ করেন। ১৮৯৯ সালে ক্রিসমাসের আগের দিন তাঁরা জমিদার, পুলিশ ও ইংরেজদের ওপর আক্রমণ শুরু করেন। তীর-ধনুক নিয়ে তাঁরা আধুনিক ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়েন।
ফলাফল:
- বিরসার মৃত্যু ও বিদ্রোহ দমন হলেও সরকার ১৯০৮ সালে ‘ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন’ পাস করে।
- মুন্ডাদের ‘খুৎকাঠি’ বা যৌথ মালিকানা প্রথা পুনরায় স্বীকৃত হয়।
- বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম বা বেগার প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়।
৯. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের (১৭৬৩-১৮০০) কারণ ও ব্যর্থতা আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর:
কারণ:
- তীর্থে বাধা: ব্রিটিশ সরকার সন্ন্যাসী ও ফকিরদের তীর্থযাত্রার ওপর কর বসায় এবং তাদের অবাধ যাতায়াতে বাধা দেয়।
- অর্থনৈতিক শোষণ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পরেও জোর করে রাজস্ব আদায় করায় কৃষক ও সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ করে।
ব্যর্থতার কারণ:
- নেতৃত্বের অভাব: ভবানী পাঠক ও মজনু শাহের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতার অভাবে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।
- সংগঠনের অভাব: এটি কোনো সুসংগঠিত বা আদর্শভিত্তিক আন্দোলন ছিল না, বরং ছিল খণ্ডযুদ্ধ।
- আধুনিক অস্ত্র: ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে বিদ্রোহীরা টিকতে পারেনি।
১০. তিতুমিরের বারাসাত বিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র বিশ্লেষণ করো। এটি কি কেবল ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?
✅ উত্তর:
তিতুমিরের আন্দোলন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে:
- ধর্মীয় রূপ: তিতুমির ওয়াহাবি মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তাই অনেকে একে ধর্মীয় গোঁড়ামির আন্দোলন বলেন।
- কৃষক আন্দোলন: কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষক ও তাঁতিদের সংগ্রাম। এখানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকরাই যোগ দিয়েছিল।
- ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম: শেষপর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে নিজেকে ‘বাদশাহ’ ঘোষণা করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেন।
- উপসংহার: তাই এটি ধর্মীয় মোড়কে শুরু হলেও মূলত ছিল একটি ব্রিটিশ বিরোধী কৃষক বিদ্রোহ।
১১. নীলকরদের বিরুদ্ধে তিতুমিরের সংঘাতের কারণ কী ছিল? বাঁশের কেল্লার গুরুত্ব লেখো।
✅ উত্তর:
সংঘাতের কারণ: তিতুমির নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছিলেন। নীলকররা কৃষকদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করত। তিতুমির কৃষকদের নীল বুনতে নিষেধ করেন এবং নীলকরদের অন্যায় দাবি মানতে অস্বীকার করেন।
বাঁশের কেল্লার গুরুত্ব: ১৮৩১ সালে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তিতুমির বাঁশ ও মাটি দিয়ে একটি কেল্লা তৈরি করেন। এটি ছিল ব্রিটিশদের আধুনিক কামানের বিরুদ্ধে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রতিরোধের প্রতীক। এই কেল্লা প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষও সংগঠিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।
১২. রংপুর বিদ্রোহের (১৭৮৩) পটভূমি ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
পটভূমি: রংপুরের ইজারাদার দেবীসিংহ কৃষকদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালাতেন এবং জোর করে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতেন। খরা ও শস্যহানির পরেও রাজস্ব মকুব করা হয়নি। এর প্রতিবাদে নুরুল উদ্দিনের নেতৃত্বে কৃষকরা বিদ্রোহ করে।
গুরুত্ব:
- এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকদের প্রথম দিকের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ।
- এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে কৃষকরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে।
- এর ফলে সরকার দেবীসিংহের অত্যাচার বন্ধ করতে বাধ্য হয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনে।
১৩. ভিল বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
১৮১৮-১৯ সালে খান্দেশ অঞ্চলের ভিল উপজাতিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
- কারণ: ১) ব্রিটিশরা ভিলদের এলাকায় অনুপ্রবেশ করে তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। ২) কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন ও উচ্চ রাজস্ব ভিলদের ক্ষুব্ধ করে।
- প্রকৃতি: এটি ছিল আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অধিকার রক্ষার লড়াই। শিউরামের নেতৃত্বে তারা গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালায়। যদিও ব্রিটিশরা নির্মমভাবে এটি দমন করে, তবুও এটি আদিবাসী প্রতিরোধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
১৪. খাসি বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল কী ছিল?
✅ উত্তর:
কারণ: ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক সিলেট থেকে আসাম পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করেন। এই রাস্তাটি খাসি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। খাসি সর্দার তিরৎ সিং মনে করেন যে এর ফলে তাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে এবং বহিরাগতদের প্রবেশ ঘটবে। তাই তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
ফলাফল: প্রায় ৪ বছর ধরে চলা এই বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের কাছে পরাজিত হয়। তিরৎ সিং আত্মসমর্পণ করেন এবং খাসি পাহাড় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
১৫. পাগলপন্থী বিদ্রোহ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
✅ উত্তর:
ময়মনসিংহের শেরপুর পরগনায় ‘পাগলপন্থী’ নামক এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
- নেতৃত্ব: করিম শাহ এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং তাঁর পুত্র টিপু শাহ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
- কারণ: জমিদাররা কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত কর (গাড়োয়াল কর) চাপায় এবং নানাভাবে শোষণ করে।
- ঘটনা: টিপু শাহ নিজেকে ‘রাজা’ ঘোষণা করেন, নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা চালু করেন এবং খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেন। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ বাহিনী কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করে।
১৬. ফরাজি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও দুদু মিঞার অবদান আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
বৈশিষ্ট্য: ১) এটি ছিল ইসলাম ধর্ম সংস্কার আন্দোলন যা পরে কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়। ২) এটি ছিল জমিদার ও নীলকর বিরোধী।
দুদু মিঞার অবদান: হাজী শরিয়তউল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদু মিঞা আন্দোলনের হাল ধরেন।
- তিনি কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ঘোষণা করেন, “জমি আল্লাহর দান, তাই এর ওপর কর বসানোর অধিকার জমিদারের নেই।”
- তিনি একটি সমান্তরাল প্রশাসন বা ‘খেলাফত’ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং ব্রিটিশ আদালত বর্জন করে নিজস্ব পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিচার শুরু করেন।
১৭. ‘দিকু’ এবং ‘সাঁওতাল’দের সংঘাতের কারণ কী ছিল?
✅ উত্তর:
সাঁওতাল পরগনায় বাইরে থেকে আসা বাঙালি ও অবাঙালি মহাজন, জমিদার ও ব্যবসায়ীদের সাঁওতালরা ‘দিকু’ বলত।
- ঋণের ফাঁদ: দিকুরা সাঁওতালদের চড়া সুদে টাকা ধার দিত এবং একবার ঋণ নিলে তা বংশপরম্পরায় শোধ হতো না (কামিওতি প্রথা)।
- প্রতারণা: তারা ওজনে কারচুপি করত (কেনারাম ও বেচারাম বাটখারা) এবং সাঁওতালদের ফসল ও জমি কেড়ে নিত।
- এই শোষণ ও বঞ্চনাই দিকু ও সাঁওতালদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি করে যা সাঁওতাল বিদ্রোহের রূপ নেয়।
১৮. আদিবাসী বিদ্রোহগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:
কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি বিদ্রোহের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো:
- ১. স্থানীয় চরিত্র: এই বিদ্রোহগুলি ছিল নির্দিষ্ট অঞ্চল ভিত্তিক এবং স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা।
- ২. বহিরাগত বিরোধী: প্রতিটি বিদ্রোহেই মূল লক্ষ্য ছিল ‘দিকু’ বা বহিরাগত শোষক (মহাজন, জমিদার) এবং ব্রিটিশ প্রশাসন।
- ৩. চিরাচরিত অস্ত্র: বিদ্রোহীরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে তীর-ধনুক, টাঙ্গি, বল্লম প্রভৃতি পুরনো অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করত।
- ৪. ধর্মীয় বিশ্বাস: নেতারা প্রায়ই ধর্মের দোহাই দিয়ে বা দৈবশক্তির কথা বলে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতেন (যেমন- বিরসা মুন্ডা, সিধু-কানু)।
১৯. নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০২০]
✅ উত্তর:
নীল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকদের এক প্রবল প্রতিবাদ। এর কারণগুলি হলো:
- ১. দাদন প্রথা: নীলকররা চাষিদের বিঘা প্রতি ২ টাকা অগ্রিম বা দাদন দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করত। এই ঋণ কোনোদিনই শোধ হতো না এবং বংশপরম্পরায় চলত।
- ২. অর্থনৈতিক ক্ষতি: নীল চাষ করলে জমির উর্বরতা নষ্ট হতো এবং কৃষকরা ধান বা অন্য লাভজনক ফসল ফলাতে পারত না। নীলের দামও ছিল খুব কম।
- ৩. অমানুষিক অত্যাচার: কেউ নীল চাষ করতে না চাইলে নীলকররা তাদের কুঠিতে ধরে এনে চাবুক মারত, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত এবং নারীদের সম্মানহানি করত।
- ৪. পঞ্চম আইন: ১৮৩০ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক পঞ্চম আইন পাস করে নীল চুক্তি ভঙ্গ করাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেন, যা কৃষকদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।
২০. নীল বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর:
নীল বিদ্রোহই ছিল ভারতের প্রথম আন্দোলন যেখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
- সাংবাদিকতা: হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় নিয়মিত নীলকরদের অত্যাচারের খবর প্রকাশ করে জনমত গঠন করেন। শিশিরকুমার ঘোষ গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতেন।
- সাহিত্য: দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক নীলকরদের পৈশাচিক রূপ সমাজের সামনে তুলে ধরে এবং মানুষকে বিচলিত করে।
- আইনি সাহায্য: কলকাতার আইনজীবীরা দরিদ্র কৃষকদের হয়ে আদালতে বিনামূল্যে মামলা লড়তেন।
- এই সমর্থন কৃষকদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
২১. নীল বিদ্রোহ কেন সফল হয়েছিল? এর কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।
✅ উত্তর:
নীল বিদ্রোহ ছিল ভারতের সফলতম কৃষক আন্দোলন। এর সাফল্যের কারণ:
- ১. ব্যাপক ঐক্য: এই বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলিম, ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণির কৃষক ঐক্যবদ্ধভাবে যোগ দিয়েছিল। গ্রামের প্রধান বা মণ্ডলরাও এতে নেতৃত্ব দেন।
- ২. মধ্যবিত্তের সমর্থন: শিক্ষিত সমাজের সমর্থন আন্দোলনকে জাতীয় স্তরে পৌঁছে দেয়।
- ৩. সরকারের মনোভাব: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার নতুন কোনো বড় বিদ্রোহ চাইছিল না। তাই তারা দ্রুত ‘নীল কমিশন’ গঠন করে এবং কৃষকদের ক্ষোভ প্রশমন করে।
- ৪. দৃঢ় সংকল্প: কৃষকদের প্রতিজ্ঞা ছিল—”প্রাণ দেব তবু নীল বুনব না”। এই অনমনীয় মনোভাব নীলকরদের পিছু হটতে বাধ্য করে।
২২. নীল কমিশন (Indigo Commission) কেন গঠিত হয়? এর সুপারিশ ও ফলাফল কী ছিল?
✅ উত্তর:
নীল বিদ্রোহের তীব্রতায় ভীত হয়ে সরকার ১৮৬০ সালে ‘নীল কমিশন’ গঠন করে।
- সুপারিশ: কমিশন রায় দেয় যে—১) নীল চাষ কৃষকদের ইচ্ছাধীন। ২) জোর করে দাদন দেওয়া বা নীল চাষে বাধ্য করা বেআইনি। ৩) নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।
- ফলাফল: এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার আইন করে জোরপূর্বক নীল চাষ বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলায় নীল চাষ ক্রমশ উঠে যায় এবং নীলকররা বিহার ও উত্তরপ্রদেশে চলে যায়।
২৩. ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি সমসাময়িক সমাজে কী প্রভাব ফেলেছিল?
✅ উত্তর:
১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্র রচিত ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি নীল বিদ্রোহে বারুদের মতো কাজ করেছিল।
- সামাজিক প্রভাব: এই নাটক দেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিত্বও আবেগপ্রবণ হয়ে নীলকরদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। এটি সাধারণ মানুষকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতন করে।
- রাজনৈতিক প্রভাব: রেভারেন্ড জেমস লং এটি প্রকাশ করায় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এক মাসের জেল ও ১০০০ টাকা জরিমানা করে। এই ঘটনা ব্রিটিশদের আসল রূপ প্রকাশ করে দেয় এবং ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবকে শক্তিশালী করে।
২৪. পাবনা কৃষক বিদ্রোহের (১৮৭০) কারণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
✅ উত্তর:
সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ করে।
- কারণ: ১) জমিদাররা অন্যায়ভাবে খাজনা বৃদ্ধি করত (আবওয়াব)। ২) ১০ বছর দখলি স্বত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রজাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো।
- বৈশিষ্ট্য: ১) এটি ব্রিটিশ বিরোধী ছিল না, কেবল জমিদার বিরোধী ছিল। কৃষকরা বলত, “আমরা মহামান্য রাণীর প্রজা হতে চাই”। ২) এটি ছিল মূলত আইনি লড়াই এবং অহিংস আন্দোলন।
- ফলাফল: এর প্রভাবে ১৮৮৫ সালে ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’ (Bengal Tenancy Act) পাস হয়।
২৫. ফরাজি আন্দোলন কি নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
✅ উত্তর:
না, ফরাজি আন্দোলন কেবল ধর্মীয় ছিল না।
- ধর্মীয় শুরু: হাজী শরিয়তউল্লাহ ইসলাম ধর্ম সংস্কারের জন্য এটি শুরু করেন (ফরাজি মানে ইসলাম নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন)।
- রাজনৈতিক রূপান্তর: দুদু মিঞার নেতৃত্বে এটি জমিদার ও নীলকর বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। তিনি ঘোষণা করেন, “জমি আল্লাহর দান, তাই জমির ওপর কর বসানোর অধিকার জমিদারের নেই।”
- সামাজিক সাম্য: এই আন্দোলন গরিব কৃষকদের ওপর অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, যা একে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র দান করে।
২৬. তিতুমিরের বারাসাত বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি লেখো।
✅ উত্তর:
১) অসম যুদ্ধ: তিতুমিরের লাঠি ও তীর-ধনুক ব্রিটিশদের আধুনিক কামান ও বন্দুকের সামনে টিকতে পারেনি। বাঁশের কেল্লা সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়।
২) সীমিত সমর্থন: এই আন্দোলন মূলত নিম্নবর্গের মুসলমান কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। উচ্চবিত্ত হিন্দু বা মুসলমান সমাজ একে সমর্থন করেনি।
৩) নেতৃত্বের অভাব: তিতুমিরের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলনটি দ্রুত স্তিমিত হয়ে পড়ে।
২৭. বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা করো। এটি কি সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল?
✅ উত্তর:
বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলন (বারাসাত বিদ্রোহ) সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত আছে।
- ধর্মীয় সংস্কার: এটি ইসলামের শুদ্ধিকরণ আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়।
- কৃষক সংগ্রাম: এটি দ্রুত জমিদার ও নীলকর বিরোধী কৃষক সংগ্রামে পরিণত হয়।
- সাম্প্রদায়িকতা?: উইলিয়াম হান্টার একে রাজদ্রোহী ও সাম্প্রদায়িক বলেছেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এটি সাম্প্রদায়িক ছিল না কারণ এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় কৃষকই যোগ দিয়েছিল এবং তাদের লক্ষ্য ছিল জমিদার শ্রেণির শোষণ, কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নয়।
২৮. সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্যগুলি কী ছিল?
✅ উত্তর:
১) যৌথ নেতৃত্ব: হিন্দু সন্ন্যাসী (ভবানী পাঠক) এবং মুসলিম ফকিররা (মজনু শাহ) কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিল।
২) গেরিলা যুদ্ধ: তারা ঝটিকা আক্রমণ বা গেরিলা পদ্ধতিতে ব্রিটিশ কুঠি ও রসদ লুঠ করত এবং জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ত।
৩) ধর্মীয় ও পেশাগত কারণ: তীর্থযাত্রায় বাধা এবং তাদের জীবিকা (ভিক্ষা ও কৃষি) বিপন্ন হওয়াই ছিল বিদ্রোহের মূল কারণ।
২৯. ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহের পূর্বে ভারতের কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহগুলির গুরুত্ব কী ছিল?
✅ উত্তর:
মহাবিদ্রোহের আগে ঘটা এই বিদ্রোহগুলি (কোল, সাঁওতাল, নীল) বিফলে গেলেও ব্যর্থ ছিল না।
- প্রতিরোধের সূচনা: এগুলি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ শাসন অপরাজেয় নয়। সাধারণ মানুষও তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।
- চেতনা বৃদ্ধি: এই বিদ্রোহগুলি ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে।
- প্রশাসনিক পরিবর্তন: সাঁওতাল পরগনা গঠন বা টেন্যান্সি অ্যাক্ট পাসের মতো প্রশাসনিক সংস্কার করতে সরকার বাধ্য হয়।
৩০. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহের মধ্যে দুটি সাদৃশ্য ও দুটি বৈসাদৃশ্য লেখো।
✅ উত্তর:
সাদৃশ্য: ১) উভয়ই ব্রিটিশ ও তাদের সহযোগী শোষকদের (মহাজন/নীলকর) বিরুদ্ধে ছিল। ২) উভয়েই শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সশস্ত্র রূপ নেয়।
বৈসাদৃশ্য: ১) সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল উপজাতিদের আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ ছিল সমস্ত কৃষকের আন্দোলন। ২) নীল বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ সমর্থন করেছিল, কিন্তু সাঁওতাল বিদ্রোহে তারা নীরব বা বিরোধী ছিল।
৩১. হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা কীভাবে নীল বিদ্রোহে সাহায্য করেছিল?
✅ উত্তর:
হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিক।
- তিনি তাঁর পত্রিকায় নীলকরদের অত্যাচারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রকাশ করে সরকারের মুখোশ খুলে দেন।
- তিনি গ্রামে গ্রামে নিজস্ব সংবাদদাতা নিয়োগ করে সঠিক খবর সংগ্রহ করতেন।
- তিনি সম্পাদকীয় কলামে লিখতেন—”নীল চাষ বাংলার কৃষকের কাছে এক অভিশাপ।” তাঁর এই প্রচার আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেয়।
৩২. চুঁয়াড় বিদ্রোহকে কি ‘বিপ্লব’ বলা যায়? যুক্তি দাও।
✅ উত্তর:
না, চুঁয়াড় বিদ্রোহকে বিপ্লব বলা যায় না, এটি একটি বিদ্রোহ মাত্র।
- বিপ্লব: বিপ্লব বলতে বোঝায় প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল ও দ্রুত পরিবর্তন (যেমন- ফরাসি বিপ্লব)।
- বিদ্রোহ: চুঁয়াড়রা কেবল ব্রিটিশদের বাড়তি কর ও জমি কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করেছিল। তারা পুরো শাসন ব্যবস্থা বা সমাজ কাঠামো পাল্টে দিতে চায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় এবং সীমিত। তাই এটি বিদ্রোহ, বিপ্লব নয়।
৩৩. কোল বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি লেখো।
✅ উত্তর:
১) অস্ত্রের অভাব: কোলদের তীর-ধনুক, টাঙ্গি ব্রিটিশদের বন্দুক ও কামানের সামনে তুচ্ছ ছিল।
২) সংগঠনের অভাব: বিদ্রোহটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু অসংগঠিত। তাদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ছিল।
৩) বিচ্ছিন্নতা: শিক্ষিত সমাজ বা অন্যান্য শ্রেণির মানুষ এই বিদ্রোহে সমর্থন দেয়নি। ফলে ব্রিটিশরা সহজেই এটি দমন করতে সক্ষম হয়।
৩৪. সাঁওতালরা কেন মহাজনদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল?
✅ উত্তর:
মহাজনরা সাঁওতালদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের চড়া সুদে টাকা ধার দিত (৫০-৫০০%)। একবার ঋণ নিলে তা বংশপরম্পরায় শোধ হতো না। ঋণের দায়ে মহাজনরা তাদের জমি, ফসল এবং গবাদি পশু কেড়ে নিত। এমনকি সাঁওতালদের ক্রীতদাসের মতো খাটাত (কামিয়াতি প্রথা)। এই সীমাহীন শোষণই তাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
৩৫. ব্রিটিশ শাসনে কৃষক বিদ্রোহের মূল কারণগুলি কী ছিল? (সারসংক্ষেপ)
✅ উত্তর:
১) উচ্চ ভূমিরাজস্ব: ব্রিটিশদের প্রবর্তিত জমিদারি ও রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় কৃষকদের ওপর অত্যধিক করের বোঝা চাপানো হয়।
২) মহাজনি শোষণ: রাজস্ব মেটাতে কৃষকরা মহাজনদের কাছে ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হতো।
৩) বাণিজ্যিকরণ: খাদ্যশস্যের বদলে নীল, পাট, তুলোর মতো বাণিজ্যিক ফসল চাষে বাধ্য করায় কৃষকরা খাদ্যাভাবে পড়ত।
৪) জমিচ্যুতি: খাজনা দিতে না পারলে কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো।
৩৬. দুদু মিঞার ‘খিলাফত’ ব্যবস্থা কী ছিল?
✅ উত্তর:
দুদু মিঞা ফরাজি আন্দোলন পরিচালনার জন্য পূর্ববঙ্গকে কয়েকটি এলাকায় (Halqa) ভাগ করেন এবং প্রতিটি এলাকার দায়িত্ব একজন ‘খলিফা’র ওপর দেন। এই ব্যবস্থাকেই খিলাফত বলা হয়। এর মাধ্যমে তিনি একটি সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলেন এবং জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেন। এটি ব্রিটিশ শাসনের প্রতি এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ (বিশ্লেষণ)
প্রশ্ন: ব্রিটিশ সরকার কেন অরণ্য আইন পাস করেছিল?
✅ উত্তর: ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিশাল বনজ সম্পদকে নিজেদের বাণিজ্যের কাজে লাগাতে চেয়েছিল। বিশেষ করে রেললাইনের স্লিপার ও জাহাজ তৈরির জন্য প্রচুর কাঠের প্রয়োজন ছিল। তাই বনজ সম্পদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং রাজস্ব আদায় করতে তারা অরণ্য আইন পাস করে।
প্রশ্ন: সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান কারণ কী ছিল?
✅ উত্তর: সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক শোষণ। বহিরাগত মহাজন বা ‘দিকু’রা সাঁওতালদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে তাদের জমি কেড়ে নিত। ওজনে ঠকানো, নারীদের সম্মানহানি এবং ব্রিটিশদের রাজস্ব বৃদ্ধি সাঁওতালদের ‘হুল’ বা বিদ্রোহে নামতে বাধ্য করে।
প্রশ্ন: নীল বিদ্রোহ কেন সফল হয়েছিল?
✅ উত্তর: নীল বিদ্রোহের সাফল্যের পেছনে ছিল কৃষকদের অটুট ঐক্য এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা (“প্রাণ দেব তবু নীল বুনব না”)। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের (যেমন- হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র) জোরালো সমর্থন, যা সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
প্রশ্ন: তিতুমিরের আন্দোলন কি সাম্প্রদায়িক ছিল?
✅ উত্তর: তিতুমির ওয়াহাবি মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও তাঁর আন্দোলন সাম্প্রদায়িক ছিল না। এটি ছিল মূলত জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকদের সংগ্রাম। তাঁর প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুম মুসলমান হলেও তাঁর বাহিনীতে বহু হিন্দু কৃষকও যোগ দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন?
✅ উত্তর: এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং সংগঠনের দুর্বলতা। ভবানী পাঠক ও মজনু শাহের মৃত্যুর পর বিদ্রোহ পরিচালনা করার মতো কেউ ছিল না। তাছাড়া ব্রিটিশদের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আধুনিক অস্ত্রের সামনে তাদের চিরাচরিত অস্ত্র হার মেনেছিল।