দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ৪ সংঘবদ্ধতা

বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা | প্রশ্ন সংখ্যা:


১. উনিশ শতককে ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলা হয় কেন? [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর: ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে, বিশেষত বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই সময় বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা, ভারতসভা, হিন্দুমেলা প্রভৃতি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। তাই ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল এই সময়কে ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলেছেন।

২. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কি ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ বলা যায়?

উত্তর: রজনীপাম দত্ত এবং সুরেন্দ্রনাথ সেনের মতো ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত রাজা, রানি ও জমিদাররা (যেমন- নানাসাহেব, ঝাঁসির রানি), যারা পুরনো শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁরা একে ‘সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া’ বা বিদ্রোহ বলেছেন।

৩. মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৯]

উত্তর: ১) ভারতবাসীর মন থেকে কোম্পানির কুশাসনের ক্ষোভ দূর করা এবং তাদের আশ্বস্ত করা।
২) ভারতীয় রাজন্যবর্গ এবং প্রজা সাধারণের আনুগত্য অর্জন করে ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করা।

৪. ইলবার্ট বিল (Ilbert Bill) বিতর্কের গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১) এই বিলের মাধ্যমে ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করার অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে ইউরোপীয়রা তীব্র বিরোধিতা করে।
২) এই ঘটনা ভারতীয়দের চোখে ব্রিটিশদের জাতিগত বিদ্বেষের স্বরূপ উন্মোচিত করে এবং তাদের সংঘবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়।

৫. জমিদার সভা (Landholders’ Society) গঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]

উত্তর: ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
১) জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের সমস্যাগুলি সরকারের কাছে তুলে ধরা।
২) ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাজনৈতিক দাবিদাওয়া পেশ করা।

৬. ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের যুগে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক। এই চিত্রে ভারতমাতাকে চার হাত বিশিষ্টা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, বেদ, ধান, মালা ও জপমালা ধারিণী দেবী রূপে দেখানো হয়েছে, যা ভারতীয় সংস্কৃতি ও স্বনির্ভরতার বার্তা দেয়।

৭. ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস কীভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে উদ্দীপ্ত করেছিল?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশমাতৃকার বন্দনা এবং সন্তান দলের আত্মত্যাগের কাহিনী বর্ণিত আছে। উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি বিপ্লবীদের মন্ত্র হয়ে ওঠে। এটি ভারতবাসীকে পরাধীনতার গ্লানি মুছে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করতে শেখায়।

৮. হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠার দুটি উদ্দেশ্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০২০]

উত্তর: ১) ভারতীয় যুবকদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের সঞ্চার করা।
২) দেশীয় শিল্প, সাহিত্য ও শরীরচর্চার প্রসার ঘটানো এবং দেশবাসীকে স্বাবলম্বী করে তোলা।

৯. ভারতসভার (Indian Association) দুটি প্রধান কাজ উল্লেখ করো।

উত্তর: ১) আই.সি.এস (ICS) পরীক্ষার বয়সসীমা কমানোর প্রতিবাদে এবং ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে সারা ভারত জুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলা।
২) হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য স্থাপন এবং কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা।

১০. ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?

উত্তর: অনেক ইংরেজ ঐতিহাসিক (জন লরেন্স, সিলি) একে কেবল সিপাহীদের অসন্তোষ বা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলেছেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, কেবল সিপাহীরা নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ (কৃষক, কারিগর, জমিদার) এতে যোগ দিয়েছিল। তাই একে শুধুই সিপাহী বিদ্রোহ বলা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

১১. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনা করেছিলেন?

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুনের মাধ্যমে তৎকালীন বাবু সমাজের বিলাসিতা, ব্রাহ্মণদের ভণ্ডামি এবং ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচারকে তীক্ষ্ণভাবে সমালোচনা করতেন। তাঁর ‘যাঁতাকল’, ‘অদ্ভুত লোক’ প্রভৃতি চিত্রে এই প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে।

১২. ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে বিবেকানন্দের কোন বার্তা পাওয়া যায়?

উত্তর: এই গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে দুর্বলতা ত্যাগ করে শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “হে ভারত ভুলিও না, নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।” এটি সামাজিক সাম্য ও জাতীয়তাবাদের বার্তা দেয়।

১৩. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে কেন প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়?

উত্তর: ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সভার মাধ্যমেই প্রথম বাঙালিরা সংঘবদ্ধভাবে ব্রিটিশ সরকারের নিষ্কর জমির ওপর কর বসানোর প্রতিবাদ করেছিল। যদিও এর কার্যকাল ছিল ক্ষণস্থায়ী, তবুও এটিই ছিল ভারতের প্রথম সাংগঠনিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ।

১৪. মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কেমন ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৭]

উত্তর: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ সাধারণত ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল বা নীরব ছিল। তারা মনে করত ব্রিটিশ শাসন ভারতের আধুনিকীকরণের জন্য জরুরি এবং বিদ্রোহীরা প্রগতিবিরোধী। তাই তারা বিদ্রোহে যোগ দেয়নি।

১৫. ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ কী বার্তা দিয়েছেন?

উত্তর: ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা করেছেন। উপন্যাসের শেষে গোরা উপলব্ধি করে যে, সে হিন্দু নয়, আইরিশ সন্তান। তার কাছে ভারতবর্ষের কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই—সে কেবলই ভারতবাসী। এটি বিশ্বমানবতার বার্তা দেয়।

১৬. নানা সাহেব ও লক্ষ্মীবাই স্মরণীয় কেন?

উত্তর: ১) নানা সাহেব: কানপুরে সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং পেশোয়া পদের দাবি জানান।
২) রানি লক্ষ্মীবাই: ঝাঁসিতে নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশদের স্বত্ববিলোপ নীতির বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহিদ হন।

১৭. ভারত শাসন আইন (১৮৫৮)-এর গুরুত্ব লেখো।

উত্তর: ১) এই আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের (ভিক্টোরিয়া) হাতে ন্যস্ত হয়।
২) গভর্নর জেনারেল পদটি বিলুপ্ত করে ‘ভাইসরয়’ পদের সৃষ্টি হয়।

১৮. দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন (Vernacular Press Act) কী ছিল?

উত্তর: ১৮৭৮ সালে লর্ড লিটন এই আইন পাস করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলির কণ্ঠরোধ করা। বলা হয়, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কিছু ছাপা হলে সেই পত্রিকার প্রেস ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

১৯. অস্ত্র আইন (Arms Act) ১৮৭৮-এর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

উত্তর: এই আইনে বলা হয় যে ভারতীয়রা বিনা লাইসেন্সে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পারবে না, কিন্তু ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটবে না। এই বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে ভারতসভা এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।

২০. রাজনারায়ণ বসু কে ছিলেন?

উত্তর: তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা এবং হিন্দু মেলার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলায় জাতীয়তাবাদের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁকে ‘ঋষি’ বলা হতো।

২১. মঙ্গল পাণ্ডে কেন বিদ্রোহ করেছিলেন?

উত্তর: এনফিল্ড রাইফেলের টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে—এই সংবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যারাকপুর সেনানিবাসের সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডে ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ ব্রিটিশ অফিসারকে গুলি করেন এবং বিদ্রোহের সূচনা করেন।

২২. সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন? (দুটি কারণ)

উত্তর: ১) পরিকল্পনার অভাব: বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।
২) অস্ত্রশস্ত্র: ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুক ও কামানের সামনে সিপাহীদের পুরনো আমলের অস্ত্র টিকতে পারেনি।

২৩. জাতীয় সম্মেলন (National Conference)-এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১৮৮৩ সালে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সম্মেলন, যা পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি করে।

২৪. জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝো?

উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের ঐক্যের ভিত্তিতে যে একাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের সৃষ্টি হয়, এবং যা তাদের অন্য জাতি থেকে পৃথক সত্তা দান করে, তাকে জাতীয়তাবাদ বলে।

২৫. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতা চিত্রটি কেন বিখ্যাত?

উত্তর: এই ছবিটি ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীক। এটি কোনো দেবীমূর্তি ছিল না, বরং এটি ছিল দেশমাতৃকার মানবিক রূপ। ছবির মাধ্যমে তিনি স্বদেশী ভাবধারা এবং ভারতের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছিলেন।

২৬. বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘ঋষি’ বলা হয় কেন?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর লেখনীর মাধ্যমে (বিশেষ করে আনন্দমঠ) দেশবাসীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি দেশকে ‘মা’ হিসেবে কল্পনা করে বন্দনা করেছিলেন। তাঁর এই দূরদৃষ্টি ও দেশপ্রেমের জন্য অরবিন্দ ঘোষ তাঁকে ‘ঋষি’ আখ্যা দেন।

২৭. জমিদার সভা ও ভারতসভার মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?

উত্তর: ১) সদস্য: জমিদার সভার সদস্যরা ছিলেন মূলত ধনী জমিদার শ্রেণি। ভারতসভার সদস্য ছিলেন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সাধারণ মানুষ।
২) লক্ষ্য: জমিদার সভার লক্ষ্য ছিল জমিদারদের স্বার্থরক্ষা। ভারতসভার লক্ষ্য ছিল সর্বভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

২৮. ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে বিনায়ক দামোদর সাভারকার কী বলেছেন?

উত্তর: বিপ্লবী সাভারকার তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করতেন এটি নিছক সিপাহীদের ক্ষোভ ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের সংগ্রাম।

২৯. ‘নেশন ইন মেকিং’ গ্রন্থটি কে রচনা করেন এবং কেন?

উত্তর: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে তিনি ভারতের রাজনৈতিক জাগরণ, ভারতসভার কার্যকলাপ এবং জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এটি তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ।

৩০. ‘হিন্দু’ মেলা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর: ১) হিন্দুমেলা ছিল মূলত উচ্চবিত্ত হিন্দু নেতাদের দ্বারা পরিচালিত, সাধারণ মানুষের সাথে এর যোগ কম ছিল।
২) এর নাম ও কার্যকলাপে হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য থাকায় মুসলমান সমাজ এতে অংশ নেয়নি।

৩১. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে দক্ষিণ ভারত কেন শান্ত ছিল?

উত্তর: দক্ষিণ ভারতে রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের অবস্থা উত্তর ভারতের মতো খারাপ ছিল না। তাছাড়া দক্ষিণ ভারতের সিপাহীরা ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিল এবং সেখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ছিল।

৩২. জাতীয়তাবাদের বিকাশে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের ভণ্ডামি এবং বাঙালি বাবু সমাজের দাসসুলভ মনোভাবকে বিদ্রুপ করতেন। এই কার্টুনগুলো মানুষকে হাসানোর পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন করত।

৩৩. ‘মহারানির ঘোষণাপত্র’ (১৮৫৮)-এ কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল?

উত্তর: ১) দেশীয় রাজাদের দত্তক পুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে (স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল)।
২) জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
৩) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না।

৩৪. উনিশ শতকের শেষার্ধকে কেন ‘জাতীয়তাবাদের উন্মেষের যুগ’ বলা হয়?

উত্তর: এই সময়েই বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি (যেমন ভারতসভা) গড়ে ওঠে এবং সাহিত্য (আনন্দমঠ), চিত্রশিল্প (ভারতমাতা) ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশপ্রেমের জোয়ার আসে। ইলবার্ট বিল বিতর্ক ও অস্ত্র আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।

৩৫. সিপাহী বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?

উত্তর: এনফিল্ড রাইফেলের টোটা ব্যবহারের প্রবর্তন। গুজব ছিল যে এই টোটার খোলে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে, যা দাঁতে কেটে বন্দুক ভরতে হতো। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীদের ধর্মে আঘাত লাগে।

৩৬. মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কী পরিবর্তন আনা হয়?

উত্তর: ১) ভারতীয় সিপাহীর সংখ্যা কমিয়ে ইউরোপীয় সৈন্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়।
২) গোলন্দাজ বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয়দের হাতে রাখা হয়।
৩) জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে সিপাহীদের আলাদা রেজিমেন্টে ভাগ করে দেওয়া হয় (যেমন- গোর্খা, শিখ)।

৩৭. ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের এই গানটি দেশমাতৃকার বন্দনা। স্বদেশী আন্দোলনের সময় এই গানটি এবং ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি বিপ্লবীদের মন্ত্রে পরিণত হয়। এটি ভারতীয়দের মধ্যে অখণ্ড জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগিয়ে তোলে।

৩৮. নবগোপাল মিত্র কে ছিলেন?

উত্তর: তিনি ছিলেন হিন্দুমেলার প্রধান উদ্যোক্তা। তাঁকে ‘ন্যাশনাল মিত্র’ বলা হতো কারণ তিনি ন্যাশনাল পেপার, ন্যাশনাল স্কুল, ন্যাশনাল থিয়েটার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং স্বদেশী ভাবধারার প্রচার করেছিলেন।

৩৯. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে শিক্ষিত বাঙালি সমাজ কেন যোগ দেয়নি?

উত্তর: শিক্ষিত বাঙালিরা মনে করত ব্রিটিশ শাসন ভারতের উন্নতির জন্য প্রয়োজন। তারা ভয় পেত যে বিদ্রোহ সফল হলে আবার সেই মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ফিরে আসবে, যা প্রগতির পথে বাধা হবে।

৪০. ভারতসভার সাথে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক কী ছিল?

উত্তর: ভারতসভা ছিল কংগ্রেসের পূর্বসূরি। ১৮৮৩ সালে ভারতসভা যে ‘জাতীয় সম্মেলন’ আয়োজন করে, তার আদর্শেই ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়। ১৮৮৬ সালে ভারতসভা কংগ্রেসের সাথে মিশে যায়।

৪১. সাহিত্য ও চিত্রশিল্প কীভাবে জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহায্য করে?

উত্তর: সাহিত্য (যেমন- আনন্দমঠ, গোরা) মানুষের মনে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ভাব জাগায়। চিত্রশিল্প (যেমন- ভারতমাতা, ব্যঙ্গচিত্র) দেশের ঐতিহ্য ও ব্রিটিশ শোষণের চিত্র তুলে ধরে মানুষকে ভিজুয়ালি সচেতন করে। উভয়ই জাতীয়তাবাদের প্রসারে শক্তিশালী মাধ্যম।

৪২. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কি কেবল সিপাহীদের বিদ্রোহ ছিল?

উত্তর: না। বিদ্রোহ শুরু করেছিল সিপাহীরা ঠিকই, কিন্তু শীঘ্রই এতে অযোধ্যা, কানপুর, বিহারের সাধারণ মানুষ, কৃষক ও তালুকদাররা যোগ দেয়। এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল, তাই একে শুধুই সিপাহী বিদ্রোহ বলা যায় না।

৪৩. ইলবার্ট বিল প্রত্যাহারের পর ভারতবাসীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

উত্তর: শ্বেতাঙ্গদের আন্দোলনের চাপে লর্ড রিপন ইলবার্ট বিল সংশোধন বা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলে ভারতবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়। তারা বুঝতে পারে যে ব্রিটিশ শাসনে তারা কখনোই সমান অধিকার পাবে না। এই ক্ষোভ থেকেই ভারতসভার নেতৃত্বে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে।

৪৪. জমিদার সভা ও বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার মধ্যে মিল কোথায়?

উত্তর: উভয়ই ছিল উনিশ শতকের প্রথমার্ধে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠন। উভয়েরই লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে দাবিদাওয়া পেশ করা এবং ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলা হয় কেন?

উত্তর: বিনায়ক দামোদর সাভারকারের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করে ভারতকে স্বাধীন করার প্রথম ব্যাপক ও সশস্ত্র প্রচেষ্টা। এতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ ও সিপাহীরা লড়েছিল, তাই এটি প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ।

প্রশ্ন: ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির তাৎপর্য কী?

উত্তর: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা এই চিত্রটি দেশমাতৃকাকে দেবীরূপে কল্পনা করে। তাঁর চার হাতে থাকা বেদ, ধান, জপমালা ও বস্ত্র—ভারতের শিক্ষা, অন্ন, ধর্ম ও বাসের প্রতীক। এটি স্বদেশী যুগে জাতীয়তাবাদের আইকন হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেশপ্রেমকে ধর্মের স্তরে উন্নীত করেন। এই উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি বিপ্লবীদের রণধ্বনি ছিল। তাই একে স্বদেশপ্রেমের বাইবেল বলা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার