দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় – ৪ সংঘবদ্ধতা
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১৪ | পূর্ণমান: ৪
১. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে কি ‘সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ’ (Feudal Revolt) বলা যায়? যুক্তিসহ আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্ত, জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে ‘সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করেছেন।
- নেতৃত্ব: এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাই, কুনওয়ার সিং, বেগম হযরত মহল প্রমুখ ক্ষমতাচ্যুত রাজা, রানি ও জমিদাররা। এঁরা সকলেই ছিলেন সামন্তপ্রভু।
- স্বার্থ: এঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের হটিয়ে নিজেদের হারানো রাজ্য, ক্ষমতা ও জমিদারি ফিরে পাওয়া। ভারতের স্বাধীনতা বা সাধারণ মানুষের মুক্তি এঁদের লক্ষ্য ছিল না।
- পুরনো ব্যবস্থা: এঁরা ব্রিটিশ শাসনের পরিবর্তে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে সামনে রেখে পুনরায় মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।
উপসংহার: তাই অনেকে একে মৃতপ্রায় সামন্ততন্ত্রের শেষ দীর্ঘশ্বাস বা সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ বলেন। তবে এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ একে গণবিদ্রোহের রূপ দিয়েছিল।
২. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে কি ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলা যায়? [মাধ্যমিক ২০১৮]
বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন।
- ব্যাপক অংশগ্রহণ: এই বিদ্রোহ কেবল সিপাহীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষক, কারিগর, জমিদার এবং সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসনের অবসানের লক্ষ্যে এতে যোগ দিয়েছিল।
- ব্রিটিশ উচ্ছেদ: বিদ্রোহীদের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি ব্রিটিশ শাসনকে সমূলে উচ্ছেদ করে স্বদেশী শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
- ঐক্য: হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই বিদ্রোহে লড়াই করেছিল।
উপসংহার: যদিও আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণা তখন ছিল না, তবুও ব্রিটিশ বিরোধী সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য একে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা অযৌক্তিক নয়।
৩. মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী? [মাধ্যমিক ২০১৯]
মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদে লর্ড ক্যানিং মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এর গুরুত্ব অপরিসীম:
- কোম্পানির অবসান: এর মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের হাতে যায়।
- স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল: ডালহৌসির কুখ্যাত স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের দত্তক পুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা: প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে সরকার ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না।
- চাকরি: জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় (যদিও তা বাস্তবে পালিত হয়নি)।
৪. জমিদার সভা (Landholders’ Society) গড়ে ওঠার উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী আলোচনা করো।
১৮৩৮ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও রাধাকান্ত দেবের উদ্যোগে কলকাতায় ‘জমিদার সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- উদ্দেশ্য: ১) বাংলার জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা। ২) ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে জমিদারদের দাবিদাওয়া আদায় করা। ৩) নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করার সরকারি নীতির বিরোধিতা করা।
- কার্যাবলী: এই সভা নিয়মতান্ত্রিক পথে আন্দোলন করত। তারা আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি পেশ করত।
- গুরুত্ব: এটিই ছিল ভারতের প্রথম সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ আন্দোলনের পথ দেখায়।
৫. ভারতসভা (Indian Association) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০২০]
১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু ‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর চারটি মূল উদ্দেশ্য ছিল:
- ১. জনমত গঠন: দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও সমস্যা সম্পর্কে শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা।
- ২. রাজনৈতিক ঐক্য: জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত ভারতবাসীকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ করা।
- ৩. হিন্দু-মুসলিম মৈত্রী: হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি ও মৈত্রী স্থাপন করা।
- ৪. গণ-আন্দোলন: আই.সি.এস (ICS) আন্দোলনের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে সাধারণ মানুষকে গণ-আন্দোলনে শামিল করা।
৬. উনিশ শতককে ‘সভা-সমিতির যুগ’ বলা হয় কেন? উদাহরণসহ লেখো।
ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনিশ শতককে ‘সভা-সমিতির যুগ’ (Age of Associations) বলেছেন।
- কারণ: ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহের পর ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করে লাভ নেই। তাই তারা নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য পাশ্চাত্য ধাঁচে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বা সভা-সমিতি গড়ে তুলতে শুরু করে।
- উদাহরণ: এই সময় একের পর এক সংগঠন তৈরি হয়—বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬), জমিদার সভা (১৮৩৮), ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১), হিন্দুমেলা (১৮৬৭) এবং ভারতসভা (১৮৭৬)।
- গুরুত্ব: এই সভা-সমিতিগুলিই পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি করে।
৭. ‘হিন্দুমেলা’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে ‘হিন্দুমেলা’ বা চৈত্রমেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
- উদ্দেশ্য: ১) ভারতীয় যুবকদের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও শরীরচর্চার আগ্রহ জাগানো। ২) দেশীয় শিল্প, সাহিত্য ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে আত্মনির্ভরতা গড়ে তোলা। ৩) হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য তুলে ধরা।
- গুরুত্ব: এই মেলা ভারতীয়দের মনে স্বদেশী ভাবধারা জাগিয়ে তোলে। এখানে দেশীয় পণ্য প্রদর্শনী, লাঠিখেলা ও দেশাত্মবোধক গান গাওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মেলার জন্য কবিতা লিখেছিলেন। এটি জাতীয়তাবাদের আঁতুড়ঘর ছিল।
৮. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব কেমন ছিল?
মহাবিদ্রোহের সময় বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ (ভদ্রলোক শ্রেণি) বিদ্রোহের বিরোধিতা করেছিল বা নীরব ছিল।
- কারণ: ১) তারা মনে করত ব্রিটিশ শাসন ভারতের আধুনিকীকরণের জন্য অপরিহার্য। ২) তারা ভয় পেত যে বিদ্রোহ সফল হলে আবার মুঘল বা মারাঠাদের মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ফিরে আসবে, যা প্রগতির পথে বাধা হবে।
- ভূমিকা: হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বা কিশোরীচাঁদ মিত্রের মতো বুদ্ধিজীবীরা বিদ্রোহের সমালোচনা করেন এবং ব্রিটিশদের জয় কামনা করেন। তাঁরা এই বিদ্রোহকে ‘সিপাহীদের বিশৃঙ্খলা’ বলে মনে করতেন।
৯. ইলবার্ট বিল বিতর্ক (Ilbert Bill Controversy) বলতে কী বোঝো? এর গুরুত্ব কী?
লর্ড রিপনের আইনসচিব ইলবার্ট প্রস্তাব দেন যে, ভারতীয় বিচারকরাও ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করতে পারবেন। এই বিলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়রা তীব্র আন্দোলন শুরু করে, যা ‘শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ’ বা ইলবার্ট বিল বিতর্ক নামে পরিচিত।
- ফলাফল: শেষপর্যন্ত বিলটি সংশোধন করা হয় এবং ভারতীয় বিচারকদের ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়।
- গুরুত্ব: এই ঘটনা ভারতীয়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের সমান চোখে দেখে না। এই অপমান থেকেই ভারতসভার নেতৃত্বে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে।
১০. আনন্দমঠ উপন্যাসটি কীভাবে জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহায্য করেছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) উপন্যাসটি ছিল বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা।
- দেশমাতৃকা: এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে ‘মা’ হিসেবে বন্দনা করেছেন। দেশসেবাকেই তিনি পরম ধর্ম বলে উল্লেখ করেছেন।
- বন্দেমাতরম: উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি পরাধীন ভারতে বিপ্লবীদের রণধ্বনিতে পরিণত হয়।
- সন্তান দল: উপন্যাসের দেশপ্রেমিক ‘সন্তান দল’-এর আত্মত্যাগ ও বীরত্ব যুবসমাজকে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। তাই একে ‘স্বদেশপ্রেমের বাইবেল’ বলা হয়।
১১. ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার পরিচয় দাও।
রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (১৯১০) উপন্যাসটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে এক বিশ্বজনীন ভারতের কথা বলে।
- চরিত্র: উপন্যাসের নায়ক গোরা ছিল একজন আইরিশ সন্তান, কিন্তু সে নিজেকে কট্টর হিন্দু ও ভারতীয় মনে করত।
- উপলব্ধি: শেষে গোরা জানতে পারে সে জন্মসূত্রে বিদেশি। তখন সে উপলব্ধি করে যে তার কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই—সে শুধুই একজন ভারতবাসী।
- বার্তা: রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে প্রকৃত জাতীয়তাবাদ কোনো ধর্ম বা বর্ণের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। সমস্ত ভারতবাসীর ঐক্য ও মিলনই হলো প্রকৃত ভারতধর্ম।
১২. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি আঁকেন।
- রূপকল্প: ছবিতে ভারতমাতাকে চার হাত বিশিষ্টা গৈরিক বসন পরিহিতা দেবী রূপে দেখানো হয়েছে। তাঁর চার হাতে রয়েছে—বেদ (শিক্ষা), ধানের শীষ (অন্ন), জপমালা (দীক্ষা/ধর্ম) এবং শ্বেতবস্ত্র (বাসস্থান)।
- তাৎপর্য: এটি কোনো প্রচলিত দেবীমূর্তি নয়, বরং এটি ছিল দেশমাতৃকার মানবিক রূপ। এই ছবিটি ভারতবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিল যে দেশমাতা তাঁর সন্তানদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও দীক্ষা দান করেন। এটি জাতীয়তাবাদের আইকন হয়ে ওঠে।
১৩. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রগুলি কীভাবে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনা করেছিল?
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের অসঙ্গতিগুলি তুলে ধরেন।
- বাবু সমাজ: তিনি ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি ‘বাবু’দের বিদ্রুপ করতেন, যারা দিনের বেলা সাহেবি কায়দা নকল করত আর রাতে মদ্যপান ও বাইজি নাচত।
- ব্রিটিশ তোষণ: ভারতীয়দের ব্রিটিশদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং দাসসুলভ মনোভাবকে তিনি কটাক্ষ করতেন।
- ঔপনিবেশিক শাসন: তাঁর ‘যাঁতাকল’, ‘অদ্ভুত লোক’ প্রভৃতি চিত্রে ব্রিটিশ শোষণ ও অবিচারের তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে।
[attachment_0](attachment)
১৪. ১৮৫৭-এর বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল? এনফিল্ড রাইফেলের টোটা নিয়ে বিতর্কটি লেখো।
মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ ছিল এনফিল্ড রাইফেলের প্রবর্তন।
- টোটা বিতর্ক: ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নতুন এনফিল্ড রাইফেল চালু হয়, যার কার্তুজ বা টোটা দাঁতে কেটে বন্দুকে ভরতে হতো।
- গুজব: গুজব ছড়ায় যে এই টোটার খোলে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো আছে। হিন্দু সিপাহীদের কাছে গরু পবিত্র এবং মুসলিমদের কাছে শূকর অপবিত্র।
- ফলাফল: উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীরা মনে করে যে ব্রিটিশরা তাদের ধর্ম নষ্ট করতে চাইছে। এই ধর্মীয় আঘাতেই মঙ্গল পাণ্ডে প্রথম বিদ্রোহ শুরু করেন।
১৫. ভারতসভার আন্দোলনগুলি (সিভিল সার্ভিস, অস্ত্র আইন) সংক্ষেপে লেখো।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারতসভা বেশ কিছু শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে:
- সিভিল সার্ভিস আন্দোলন: লর্ড লিটন আই.সি.এস পরীক্ষার বয়সসীমা ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করলে ভারতসভা এর বিরুদ্ধে সারা ভারত জুড়ে প্রতিবাদ করে এবং লালমোহন ঘোষকে ইংল্যান্ডে পাঠায়।
- অস্ত্র আইন বিরোধী: ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে বলা হয় ভারতীয়রা লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র রাখতে পারবে না, কিন্তু ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে এই নিয়ম ছিল না। ভারতসভা এই বৈষম্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
- ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট: দেশীয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধেও ভারতসভা আন্দোলন করেছিল।
১৬. মহারানির ঘোষণাপত্রে (১৮৫৮) ভারতীয়দের কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? সেগুলি কি পালিত হয়েছিল?
প্রতিশ্রুতি:
- স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হবে এবং দেশীয় রাজারা দত্তক পুত্র নিতে পারবেন।
- জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে।
- সরকার ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না।
বাস্তবায়ন: অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পালিত হয়নি। উচ্চপদস্থ চাকরিতে ভারতীয়দের নিয়োগে বাধা দেওয়া হতো এবং ব্রিটিশরা ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল। তাই একে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অধ্যায়’ বলা হয়।
১৭. মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
- পরিকল্পনার অভাব: বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সমন্বয় ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা নিজেদের স্বার্থে লড়েছিলেন।
- অস্ত্রশস্ত্র: ব্রিটিশদের হাতে ছিল আধুনিক এনফিল্ড রাইফেল ও উন্নত কামান, কিন্তু ভারতীয়দের সম্বল ছিল পুরনো গাদা বন্দুক, তলোয়ার ও বল্লম।
- জনসমর্থনের অভাব: শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, জমিদার শ্রেণি এবং দক্ষিণ ভারত ও পাঞ্জাবের সিপাহীরা এই বিদ্রোহে যোগ দেয়নি, বরং ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা: ব্রিটিশদের হাতে রেল ও টেলিграф ব্যবস্থা থাকায় তারা দ্রুত খবর ও সেনা পাঠাতে পেরেছিল।
১৮. ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দের জাতীয়তাবাদী ভাবধারা কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটি ছিল পরাধীন ভারতের জাগরণের মন্ত্র।
- আত্মবিশ্বাস: তিনি ভারতবাসীকে হীনম্মন্যতা ত্যাগ করে নিজেদের শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখতে বলেন। তাঁর আহ্বান ছিল—”হে ভারত ভুলিও না… তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।”
- সামাজিক ঐক্য: তিনি জাতিভেদ ভুলে সব ভারতবাসীকে এক হওয়ার ডাক দেন। তিনি বলেন, ভারতের মুচি, মেথর, চণ্ডাল—সবাই আমাদের রক্ত, আমাদের ভাই।
- স্বাধীনতা: তিনি পরাধীনতাকে পাপ বলে মনে করতেন এবং যুবসমাজকে শক্তি চর্চার মাধ্যমে দেশের মুক্তির জন্য প্রস্তুত হতে বলতেন।
১৯. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে কেন ‘ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়?
১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’ ছিল ভারতের প্রথম সংগঠন যা ব্রিটিশ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
- ১৮২৮ সালের আইনে সরকার নিষ্কর জমির ওপর কর বসালে এই সভা তার প্রতিবাদে টাউন হলে একটি বড় মিটিং করে।
- যদিও এটি খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি এবং এর কার্যকলাপ সীমিত ছিল, তবুও এটিই প্রথম দেখিয়েছিল যে সংঘবদ্ধভাবে সরকারের সমালোচনা করা যায়। তাই একে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়।
২০. জাতীয়তাবাদের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনির গুরুত্ব লেখো।
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ গানটি কেবল একটি গান ছিল না, এটি ছিল বিপ্লবীদের বীজমন্ত্র।
- দেশমাতৃকা: এই গানে দেশকে মা বা দেবী দুর্গা রূপে কল্পনা করা হয়েছে, যা দেশবাসীকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
- রণধ্বনি: ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে এবং পরবর্তী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে বিপ্লবীরা ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় বা পুলিশের লাঠির সামনে দাঁড়িয়ে এই ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি দিত।
- এটি ভারতের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়।
২১. ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে বিনায়ক দামোদর সাভারকার ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলেছেন কেন?
সাভারকার তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে এই বিদ্রোহের নতুন ব্যাখ্যা দেন।
- লক্ষ্য: তিনি বলেন, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি ব্রিটিশ শাসনকে উচ্ছেদ করে স্বদেশী স্বরাজ প্রতিষ্ঠা করা।
- গণজাগরণ: এটি কেবল সিপাহীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অযোধ্যা, কানপুর ও বিহারে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এতে যোগ দিয়েছিল।
- ঐক্য: হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল। তাই একে নিছক সিপাহী বিদ্রোহ না বলে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলাই যুক্তিযুক্ত।
২২. উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদের বিকাশে চিত্রশিল্পের (Painting) ভূমিকা কী ছিল?
চিত্রশিল্প জাতীয়তাবাদ প্রচারে এক শক্তিশালী মাধ্যম ছিল।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর: তাঁর ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি মুঘল ও রাজপুত শৈলী ফিরিয়ে এনে পাশ্চাত্য শিল্পের অন্ধ অনুকরণ বন্ধ করেন।
- গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর: তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলো ব্রিটিশ শাসন ও বাবু সমাজের ভণ্ডামি উন্মোচিত করে মানুষকে সচেতন করত।
- নন্দলাল বসু: তাঁর আঁকা ছবিগুলোতে (যেমন- সতী, সাবিত্রী) ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্য ফুটে উঠত, যা দেশবাসীকে গর্বিত করত।
২৩. জমিদার সভার সীমাবদ্ধতাগুলি কী কী ছিল?
জমিদার সভা ভারতের প্রথম দিককার রাজনৈতিক সংগঠন হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল:
- শ্রেণিস্বার্থ: এটি ছিল মূলত ধনী জমিদারদের সংগঠন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জমিদারি ও স্বার্থ রক্ষা করা, সাধারণ কৃষকদের স্বার্থ দেখা নয়।
- অনুগত: এরা ব্রিটিশ শাসনের বিরোধী ছিল না, বরং ব্রিটিশদের দয়ায় টিকে থাকায় বিশ্বাসী ছিল।
- সীমিত বিস্তার: কলকাতা ও তার আশেপাশের জমিদারদের মধ্যেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ মানুষের সাথে এর কোনো যোগ ছিল না।
২৪. ‘জাতীয় মেলা’ বা হিন্দুমেলার উদ্দেশ্যগুলি লেখো।
১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুমেলার উদ্দেশ্যগুলি ছিল:
- স্বদেশী ভাবধারা: দেশীয় পণ্য ব্যবহার এবং দেশীয় শিল্পের প্রসার ঘটানো। এখানে তাঁতবস্ত্র ও হস্তশিল্পের প্রদর্শনী হতো।
- জাতীয় ঐক্য: ভারতীয়দের মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলা।
- শরীরচর্চা: পরাধীনতার গ্লানি মোচনের জন্য যুবকদের লাঠিখেলা, কুস্তি ও শরীরচর্চায় উৎসাহ দেওয়া হতো।
- সংস্কৃতি চর্চা: দেশীয় গান, কবিতা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতি রক্ষা করা।
২৫. ১৮৫৭-এর বিদ্রোহের পর ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আসে?
মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন আনা হয়:
- ক্ষমতা হস্তান্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ রানির (পার্লামেন্টের) হাতে তুলে দেওয়া হয়।
- ভারত সচিব: ভারত শাসন পরিচালনার জন্য লন্ডনে ‘ভারত সচিব’ (Secretary of State for India) নামে একটি নতুন মন্ত্রী পদ সৃষ্টি করা হয়।
- ভাইসরয়: ভারতের গভর্নর জেনারেল পদটি বিলুপ্ত করে তাঁর পদমর্যাদা বাড়িয়ে ‘ভাইসরয়’ বা রাজপ্রতিনিধি করা হয়। লর্ড ক্যানিং হন প্রথম ভাইসরয়।
২৬. সিপাহী বিদ্রোহের ধর্মীয় কারণগুলি কী ছিল?
ব্রিটিশদের কিছু নীতি ও কাজ ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করেছিল:
- ধর্মান্তরকরণ: খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রকাশ্যে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের নিন্দা করত এবং ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত।
- আইন পাস: সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিবাহ আইন পাসকে গোঁড়া হিন্দুরা ধর্মনাশন বলে মনে করত।
- এনফিল্ড রাইফেল: টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মেশানোর ঘটনা হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীদের ধর্মীয় ভাবাবেগে চরম আঘাত হানে।
২৭. উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক সংগঠনগুলি গড়ে ওঠার কারণ কী ছিল?
১৮৫৭-এর পর ভারতীয়রা বুঝতে পারে যে বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহের চেয়ে সংঘবদ্ধ আন্দোলন বেশি কার্যকর। এর কারণ:
- পাশ্চাত্য শিক্ষা: ইংরেজি শিক্ষার ফলে ভারতীয়রা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।
- শোষণ ও বৈষম্য: ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণ, ইলবার্ট বিল বিতর্ক এবং অস্ত্র আইনের মতো বৈষম্যমূলক নীতি মানুষকে ক্ষুব্ধ করে।
- যোগাযোগ: রেল ও ডাক ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বিভিন্ন প্রদেশের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ ও ঐক্য গড়ে ওঠে।
২৮. মহাবিদ্রোহকে কি ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ বলা যায়? যুক্তিসহ লেখো।
ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক ব্রিটিশ নেতারা (যেমন ডিসরেলি) একে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন। কারণ:
- ব্যাপক বিস্তার: এই বিদ্রোহ কেবল বেরাকপুর বা মিরাটে সীমাবদ্ধ ছিল না। দিল্লি, অযোধ্যা, কানপুর, বিহার এবং মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল।
- জনগণের অংশগ্রহণ: সিপাহীদের সাথে তালুকদার, কৃষক, কারিগর এবং সাধারণ মানুষও এতে যোগ দিয়েছিল।
- লক্ষ্য: যদিও সবার স্বার্থ এক ছিল না, তবুও বিদেশি শাসন উচ্ছেদ করার একটি সাধারণ লক্ষ্য সবার মধ্যেই ছিল। তাই একে জাতীয় বিদ্রোহ বলা যেতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা
প্রশ্ন: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলা হয় কেন?
প্রশ্ন: শিক্ষিত বাঙালি সমাজ কেন মহাবিদ্রোহে যোগ দেয়নি?
প্রশ্ন: মহারানির ঘোষণাপত্রের (১৮৫৮) মূল গুরুত্ব কী?
প্রশ্ন: ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস কীভাবে জাতীয়তাবাদে সাহায্য করেছিল?
প্রশ্ন: ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?