দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় -5 বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন
বিষয়: ইতিহাস (অধ্যায় ৫) | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৫৬
১. চার্লস উইলকিন্স কে ছিলেন? তাঁকে ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয় কেন? [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর: চার্লস উইলকিন্স ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন লেখক ও মুদ্রণ বিশারদ।
ইউরোপে গুটেনবার্গ যেমন মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনি উইলকিন্স প্রথম ছেনি-কাটা বাংলা মুদ্রণ হরফ বা টাইপ তৈরি করে বাংলায় ছাপাখানার পথ প্রশস্ত করেন। তাই তাঁকে ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয়।
২. পঞ্চানন কর্মকার বিখ্যাত কেন? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর: পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন হুগলির একজন স্বর্ণশিল্পী। তিনি চার্লস উইলকিন্সকে বাংলা অক্ষর বা হরফ তৈরিতে সাহায্য করেন। তাঁর তৈরি করা মার্জিত ও সুন্দর বাংলা হরফেই দীর্ঘকাল বাংলা বই ছাপা হতো।
৩. শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কীভাবে একটি অগ্রণী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়?
✅ উত্তর: ১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি হরফ এবং উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এখান থেকে বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত এবং পাঠ্যপুস্তক সুলভে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৮০০-১৮৩২ সালের মধ্যে এখান থেকে প্রায় ২ লক্ষ ১২ হাজার বই ছাপা হয়, যা একে অগ্রণী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।
৪. ‘বটতলা সাহিত্য’ বলতে কী বোঝো?
✅ উত্তর: উনিশ শতকে কলকাতার চিৎপুর ও শোভাবাজারের বটতলা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সস্তা ও চটি বই ছাপার এক বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। এখান থেকে প্রকাশিত পৌরাণিক কাহিনী, পাঁচালি, ও লঘু রসাত্মক সাহিত্যগুলিকে একত্রে ‘বটতলা সাহিত্য’ বলা হয়। এটি ছিল গরিব ও অল্পশিক্ষিত মানুষের সাহিত্য।
৫. ‘এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ (A Grammar of the Bengal Language) গ্রন্থটির গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: ১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই। এর গুরুত্ব হলো—এই বইটিতেই প্রথম বাংলা হরফ বা অক্ষরের ব্যবহার করে মুদ্রণ করা হয়েছিল।
৬. উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী স্মরণীয় কেন? [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর: ১) তিনি ভারতে প্রথম ‘হাফ-টোন’ (Half-tone) ব্লক প্রিন্টিং পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যার ফলে বইয়ের ছবিগুলি উন্নত মানের হতো।
২) তিনি বিখ্যাত ছাপাখানা ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিশুসাহিত্য ও চিত্রশিল্পে বিপ্লব আনেন।
৭. ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’ (U. Ray and Sons) বিখ্যাত কেন?
✅ উত্তর: ১৮৯৫ সালে উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ছাপাখানা ছিল। এখান থেকেই প্রথম রঙিন ও সচিত্র বাংলা বই (যেমন- টুনটুনির বই, ছেলেদের রামায়ণ) এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। মুদ্রণ মানের দিক থেকে এটি ছিল আন্তর্জাতিক স্তরের।
৮. ছাপাখানার বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা কী ছিল?
✅ উত্তর: ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর জন্য প্রচুর পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজন ছিল। এই চাহিদা মেটাতে কলেজের নিজস্ব ছাপাখানা এবং শ্রীরামপুর প্রেস থেকে বহু বাংলা গদ্য ও ব্যাকরণ বই ছাপা হয়, যা মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ ঘটায়।
৯. গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য কে ছিলেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি প্রকাশক, সম্পাদক ও পুস্তক বিক্রেতা। তিনি ১৮১৬ সালে সচিত্র ‘অন্নদামঙ্গল’ প্রকাশ করেন এবং ১৮১৮ সালে ‘বাঙাল গেজেটি’ নামে একটি সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন।
১০. ‘বর্ণপরিচয়’ প্রকাশের গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: ১৮৫৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে। এই বইটির মাধ্যমেই বাংলা বর্ণমালার বিজ্ঞানসম্মত বিন্যাস ঘটে এবং এটি ছাপাখানার ব্যবসায়িক সাফল্যও এনে দেয়।
১১. উনিশ শতকে বাংলায় বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতে ছাপাখানার ভূমিকা কী ছিল?
✅ উত্তর: ছাপাখানার ফলে বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিত ও চিকিৎসার বই সুলভে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘দিগদর্শন’-এর মতো পত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ছাপা হতো, যা মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলে।
১২. লাইনোটাইপ (Linotype) কী? কে এটি বাংলায় তৈরি করেন?
✅ উত্তর: লাইনোটাইপ হলো একধরনের যান্ত্রিক কম্পোজ করার মেশিন, যা মুদ্রণকে অনেক দ্রুত ও সহজ করে দেয়। ১৯৩৫ সালে সুরেশচন্দ্র মজুমদার বাংলা অক্ষরের লাইনোটাইপ তৈরি করেন, যা আনন্দবাজার পত্রিকায় ব্যবহৃত হতো।
১৩. ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
✅ উত্তর: ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় ভালো মানের পাঠ্যপুস্তক রচনা করা এবং তা নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে বিতরণ করা।
১৪. হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং বলতে কী বোঝো?
✅ উত্তর: এটি এমন এক মুদ্রণ পদ্ধতি যেখানে আলোকচিত্র বা ফোটোগ্রাফকে ছোট ছোট বিন্দুতে (Dots) ভেঙে হুবহু ছাপানো যায়। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এই প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ আনেন, যার ফলে বইয়ে উন্নত মানের ছবি ছাপানো সম্ভব হয়।
১৫. মুদ্রণ শিল্পে বিদ্যাসাগরের অবদান কী?
✅ উত্তর: বিদ্যাসাগর কেবল লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সফল প্রকাশক। তিনি সংস্কৃত যন্ত্র (১৮৪৭) নামে একটি ছাপাখানা কেনেন। তাঁর লেখা ‘বর্ণপরিচয়’, ‘বোধোদয়’ লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়, যা বাংলা মুদ্রণ শিল্পকে ব্যবসায়িক ভিত্তি দেয়।
১৬. পঞ্চানন কর্মকার ও চার্লস উইলকিন্স-এর সম্পর্ক কী?
✅ উত্তর: চার্লস উইলকিন্স বাংলা অক্ষরের নকশা তৈরি করেছিলেন, আর পঞ্চানন কর্মকার সেই নকশা অনুযায়ী ছেনি কেটে ধাতব হরফ বা টাইপ তৈরি করেছিলেন। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টাতেই বাংলায় মুদ্রণ শিল্প শুরু হয়।
১৭. উইলিয়াম কেরি কেন বিখ্যাত?
✅ উত্তর: তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাইবেলের বাংলা অনুবাদ করেন এবং ‘ইতিহাসমালা’, ‘কথপোকথন’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করে বাংলা গদ্য ও মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন।
১৮. ছাপা বই শিক্ষার প্রসারে কী ভূমিকা নিয়েছিল?
✅ উত্তর: হাতে লেখা পুঁথির বদলে ছাপা বই সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ পায়। এতে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ ঘটে এবং জ্ঞান কেবল ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
১৯. ‘সন্দেশ’ পত্রিকার গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছোটদের জন্য ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটিতে উচ্চমানের রঙিন ছবি, বিজ্ঞান, গল্প ও ধাঁধা থাকত। শিশু-কিশোরদের মনন গঠনে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল অসামান্য।
২০. IACS বা ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর: ১৮৭৬ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল:
১) ভারতীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা করার সুযোগ করে দেওয়া।
২) পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞানের ওপর নিয়মিত বক্তৃতার আয়োজন করা।
২১. মহেন্দ্রলাল সরকার স্মরণীয় কেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তিনি ভারতে বিজ্ঞান চর্চার প্রসারের জন্য ‘IACS’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ভারতের প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার।
২২. বসু বিজ্ঞান মন্দির বা ‘বোস ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর: ১৯১৭ সালে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল:
১) উদ্ভিদ ও পদার্থবিদ্যা বিষয়ে বিশ্বমানের গবেষণা করা।
২) ভারতীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য একটি আধুনিক ও স্বদেশী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
২৩. জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE) কেন গঠিত হয়েছিল? [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করে সম্পূর্ণ দেশীয় নিয়ন্ত্রণে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়।
২৪. কারিগরি শিক্ষার বিকাশে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (BTI)-এর ভূমিকা কী?
✅ উত্তর: ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে BTI প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতীয় ছাত্রদের হাতে-কলমে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা দিত, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে। এটিই পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
২৫. কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (Science College) প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব লেখো।
✅ উত্তর: ১৯১৪ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার প্রথম পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র। সি.ভি. রমন, মেঘনাদ সাহা এখানে গবেষণা করেছেন।
২৬. বেঙ্গল কেমিক্যালস কে, কেন প্রতিষ্ঠা করেন?
✅ উত্তর: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৯০১ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল:
১) দেশীয় প্রযুক্তিতে ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করা।
২) বাঙালি যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া এবং শিল্পে স্বনির্ভরতা আনা।
২৭. জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের প্রাণ আছে তা কীভাবে প্রমাণ করেন?
✅ উত্তর: তিনি নিজের আবিষ্কৃত ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’ (Crescograph) ও ‘রেজোনেন্ট রেকর্ডার’ যন্ত্রের সাহায্যে দেখান যে, উদ্দীপনা (যেমন- আঘাত, তাপ, বিষ) প্রয়োগ করলে উদ্ভিদও প্রাণীর মতো সাড়া দেয়। এটি তাঁর ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে।
২৮. জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ব্যর্থ হলো কেন? (দুটি কারণ)
✅ উত্তর: ১) ঔপনিবেশিক সরকার এই ডিগ্রিকে চাকরির ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেয়নি, ফলে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
২) অর্থের অভাব এবং উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি।
২৯. তারকনাথ পালিত শিক্ষা বিস্তারে কী ভূমিকা নেন?
✅ উত্তর: তারকনাথ পালিত ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও শিক্ষানুরাগী। তিনি ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ এবং ‘কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ’ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সারা জীবনের উপার্জন ও সম্পত্তি দান করেছিলেন।
৩০. ‘ডন সোসাইটি’ (Dawn Society) কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়?
✅ উত্তর: ১৯০২ সালে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল:
১) ছাত্রসমাজকে স্বদেশী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা।
২) তাদের নৈতিক ও চারিত্রিক গঠন এবং দেশীয় শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা।
৩১. ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান শিক্ষার সমালোচনা করা হয় কেন?
✅ উত্তর: ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল কেবল কিছু দক্ষ কারিগর বা সহকারী তৈরি করা, যারা ব্রিটিশদের কাজে লাগবে। এখানে মৌলিক গবেষণা বা আবিষ্কারের কোনো সুযোগ ছিল না। তাই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা বিকল্প বিজ্ঞান চর্চায় উদ্যোগী হন।
৩২. রাসবিহারী ঘোষ স্মরণীয় কেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত আইনজীবী। তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদের (NCE) প্রথম সভাপতি ছিলেন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ স্থাপনে বিপুল অর্থ দান করেছিলেন।
৩৩. ‘History of Hindu Chemistry’ গ্রন্থের গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রচিত এই গ্রন্থে প্রাচীন ভারতে রসায়ন চর্চা ও ধাতুবিদ্যার যে উন্নত ঐতিহ্য ছিল, তা তিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। এটি ভারতীয়দের মনে আত্মগৌরব ফিরিয়ে আনে।
৩৪. গোলদিঘির গোলামখানা কাকে এবং কেন বলা হতো?
✅ উত্তর: জাতীয়তাবাদী নেতারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে ‘গোলদিঘির গোলামখানা’ বলতেন। কারণ, এই প্রতিষ্ঠান থেকে কেবল ব্রিটিশ প্রশাসনের অনুগত ও দাসসুলভ মনোভাবাপন্ন কেরানি তৈরি হতো, প্রকৃত মানুষ তৈরি হতো না।
৩৫. ফাদার ইউজিন ল্যাফো কেন বিখ্যাত?
✅ উত্তর: সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার ল্যাফো IACS প্রতিষ্ঠায় মহেন্দ্রলাল সরকারকে সাহায্য করেন এবং ছাত্রদের হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণায় উৎসাহিত করেন। জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর ছাত্র ছিলেন।
৩৬. সি. ভি. রমন স্মরণীয় কেন?
✅ উত্তর: তিনি IACS-এ গবেষণা করে আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত ‘রমন এফেক্ট’ (Raman Effect) আবিষ্কার করেন। এর জন্য ১৯৩০ সালে তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। তিনিই প্রথম এশীয় বিজ্ঞান নোবেল জয়ী।
৩৭. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি (Anti-Circular Society) কী?
✅ উত্তর: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের যোগদান আটকাতে সরকার ‘কার্লাইল সার্কুলার’ জারি করে। এর প্রতিবাদে এবং বহিষ্কৃত ছাত্রদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ সালে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি গঠন করেন।
৩৮. প্রমথনাথ বসু কে ছিলেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ। তিনি বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁরই পরামর্শে জামসেদজি টাটা জামশেদপুরে লৌহ-ইস্পাত কারখানা স্থাপন করেন।
৩৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা চিন্তার মূল কথা কী? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিক্ষা হতে হবে প্রকৃতির কোলে মুক্ত পরিবেশে, যা আনন্দদায়ক। তাঁর মতে, শিক্ষার লক্ষ্য হলো দেহ, মন ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ এবং প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সমন্বয় সাধন।
৪০. শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
✅ উত্তর: ১৮৬৩ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নির্জনে ঈশ্বর সাধনা এবং ধর্মালোচনার জন্য বোলপুরে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। পরে রবীন্দ্রনাথ এখানে তাঁর শিক্ষা ভাবনার প্রয়োগ ঘটাতে বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
৪১. ‘তোতাকাহিনী’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ কিসের সমালোচনা করেছেন?
✅ উত্তর: এই রূপক গল্পে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন ব্রিটিশ প্রবর্তিত মুখস্থ-নির্ভর ও যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে এই ব্যবস্থা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে হত্যা করে তাকে ‘তোতাপাখি’ বানিয়ে দেয়।
৪২. বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল? [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর: ১) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মিলন ঘটানো (“যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্”)।
২) পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে সঙ্গীত, নৃত্য, চারুকলা ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে সর্বাঙ্গীন মানুষ তৈরি করা।
৪৩. শ্রীনিকেতন কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়?
✅ উত্তর: ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ গ্রামোন্নয়ন ও কৃষকদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে শ্রীনিকেতন (Institute of Rural Reconstruction) প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে কৃষি, পশুপালন ও কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
৪৪. ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় কী?
✅ উত্তর: ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে মাত্র ৫ জন ছাত্র নিয়ে যে বিদ্যালয় শুরু করেন, তার নাম ছিল ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এখানে প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদলে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শিক্ষা দেওয়া হতো।
৪৫. ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন?
✅ উত্তর: এই প্রবন্ধে তিনি বলেন যে, ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে ভারতীয় ছাত্রদের অতিরিক্ত মানসিক চাপ পড়ে এবং আনন্দ নষ্ট হয়। তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দেন।
৪৬. বিশ্বভারতীতে ‘কলাভবন’ ও ‘সংগীতভবন’-এর গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় মানুষ সম্পূর্ণ হয় না। তাই তিনি চারুকলা শিক্ষার জন্য ‘কলাভবন’ (নন্দলাল বসুর নেতৃত্বে) এবং গান-নাচ শেখার জন্য ‘সংগীতভবন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
৪৭. ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে রবীন্দ্রনাথ কেন পছন্দ করতেন না?
✅ উত্তর: ১) এই শিক্ষা ছিল চারদেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ ও প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন।
২) এটি ছিল আনন্দহীন এবং কেবল চাকরির জন্য কেরানি তৈরির যন্ত্র।
৩) এটি মাতৃভাষার বদলে বিদেশি ভাষায় চাপিয়ে দেওয়া হতো।
৪৮. পাঠভবন ও শিক্ষা সত্রের পার্থক্য কী?
✅ উত্তর: পাঠভবন: এটি শান্তিনিকেতনের স্কুল বিভাগ, যেখানে মুক্ত পরিবেশে প্রথাগত ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
শিক্ষা সত্র: এটি শ্রীনিকেতনের অংশ, যেখানে গ্রামীণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হয়।
৪৯. রবীন্দ্রনাথ কেন তপোবন বিদ্যালয়ের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন?
✅ উত্তর: প্রাচীন ভারতের তপোবনে ছাত্ররা গুরুর সাথে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে শিক্ষা লাভ করত। এই সহজ, সরল ও পবিত্র জীবনযাপন এবং প্রকৃতির সাথে আত্মিক যোগ স্থাপনের আদর্শেই তিনি শান্তিনিকেতন গড়ে তোলেন।
৫০. বিশ্বভারতীর প্রতীক বা মূলমন্ত্র কী? এর অর্থ কী?
✅ উত্তর: বিশ্বভারতীর মূলমন্ত্র হলো—“যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্”।
এর অর্থ হলো—”যেখানে সারা বিশ্ব একটি নীড়ে বা পরিবারে মিলিত হয়।” এটি বিশ্বভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
৫১. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মরণীয় কেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং কৃষিবিজ্ঞানী। তিনি শান্তিনিকেতনের শ্রীনিকেতন বিভাগে কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে নেতৃত্ব দেন এবং বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য হন।
৫২. রবীন্দ্রনাথ কেন ক্লাসরুমের শিক্ষার বদলে প্রকৃতির কোলে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতেন?
✅ উত্তর: তিনি মনে করতেন প্রকৃতির সংস্পর্শে শিশুর মন সজীব ও কৌতূহলী থাকে। খোলা আকাশের নিচে গাছপালার মাঝে ক্লাস করলে শিশুরা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পায় এবং তাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ে।
৫৩. হলকর্ষণ উৎসব কী?
✅ উত্তর: শ্রীনিকেতনে কৃষি কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং ঋতুচক্রের সাথে সংযোগ রাখতে রবীন্দ্রনাথ ‘হলকর্ষণ’ (লাঙ্গল দেওয়া) উৎসব চালু করেন।
৫৪. পৌষ মেলা কেন শুরু হয়?
✅ উত্তর: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে দিনটিতে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন (৭ই পৌষ), সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং স্থানীয় গ্রামীণ মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে শান্তিনিকেতনে পৌষ মেলা শুরু হয়।
৫৫. কারিগরি শিক্ষার প্রসারে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের উদ্যোগ কী ছিল?
✅ উত্তর: জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বুঝেছিল যে কেবল সাহিত্য পড়লে দেশ এগোবে না। তাই তারা ১৯০৬ সালে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করে, যেখানে সাবান তৈরি, চর্মশিল্প, ও যন্ত্রপাতির কাজ শেখানো হতো।
৫৬. বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তার একটি মিল লেখো।
✅ উত্তর: উভয়েই মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লিখে এবং রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ (সংক্ষিপ্ত)
প্রশ্ন: চার্লস উইলকিন্সকে ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয় কেন?
✅ উত্তর: জোহানেস গুটেনবার্গ যেমন ইউরোপে আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তি চালু করেছিলেন, তেমনই চার্লস উইলকিন্স বাংলায় প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ছেনি কেটে বাংলা মুদ্রণ হরফ বা টাইপ তৈরি করেন। তাঁর এই উদ্ভাবনই বাংলা ছাপাখানার পথ প্রশস্ত করে, তাই তাঁকে ‘বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয়।
প্রশ্ন: জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE) কেন গঠিত হয়েছিল?
✅ উত্তর: ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার ছাত্রদের আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন দমনমূলক সার্কুলার জারি করে। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা স্কুল-কলেজ বর্জন করলে, তাদের জন্য স্বদেশী ধাঁচে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়।
প্রশ্ন: ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’ কেন বিখ্যাত?
✅ উত্তর: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ১৮৯৫ সালে এই বিখ্যাত ছাপাখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতে প্রথম ‘হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং’ প্রযুক্তির প্রবর্তক। এখান থেকে প্রকাশিত রঙিন ও সচিত্র বইগুলি বাংলা মুদ্রণ শিল্পের মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন: IACS বা ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভার গুরুত্ব কী?
✅ উত্তর: ১৮৭৬ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠিত IACS ছিল পরাধীন ভারতের প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার। এখানে গবেষণা করেই সি.ভি. রমন ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এটি ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
প্রশ্ন: বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
✅ উত্তর: ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল মন্ত্র ছিল “যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্”। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার মেলবন্ধন ঘটানো এবং বিশ্বমানবতার প্রসার ঘটানো।