দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় -5 বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ রচনাধর্মী প্রশ্নত্তোর
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১০ | পূর্ণমান: ৮
১. মানুষ, প্রকৃতি ও শিক্ষার সমন্বয় বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। (শান্তিনিকেতন ভাবনা) [মাধ্যমিক ২০১৮, ২০২০]
✅ উত্তর:ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গতানুগতিক ও যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হতে হবে আনন্দময় এবং প্রকৃতির কোলে মুক্ত পরিবেশে। তাঁর এই ভাবনার বাস্তব রূপায়ণ হলো শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী।
শিক্ষা চিন্তার মূল বৈশিষ্ট্য:
- প্রকৃতির সান্নিধ্য: রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতির কোলেই শিশুর দেহ ও মনের সঠিক বিকাশ ঘটে। চারদেওয়ালের বদ্ধ ক্লাসরুমের বদলে তিনি গাছতলায় খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি বলতেন, “প্রকৃতিই হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।”
- অবাধ স্বাধীনতা ও আনন্দ: তিনি মনে করতেন কড়া শাসন ও ভয়ের পরিবেশে শিক্ষা হয় না। শিক্ষার জন্য চাই অবাধ স্বাধীনতা। তাঁর ‘তোতাকাহিনী’ গল্পে এই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষার সমালোচনা করা হয়েছে।
- সৃজনশীলতা ও কর্মমুখী শিক্ষা: কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; গান, নাচ, ছবি আঁকা, নাটক এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তিনি ছাত্রছাত্রীদের সর্বাঙ্গীন বিকাশে জোর দিতেন।
- মাতৃভাষা: তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশি ভাষায় নয়, মাতৃভাষাই হলো শিক্ষার প্রকৃত বাহন। (“শিক্ষার হেরফের” প্রবন্ধ)।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা (১৯২১):
তাঁর এই ভাবনার চূড়ান্ত রূপ হলো বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এর মূলমন্ত্র ছিল “যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্” (যেখানে সারা বিশ্ব একটি নীড়ে মিলিত হয়)। এখানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।
উপসংহার: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তা ছিল আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
২. উনিশ শতকের বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ সংক্ষেপে আলোচনা করো। (৫+৩) [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর:ভূমিকা: উনিশ শতকের বাংলায় নবজাগরণের হাত ধরে কেবল সাহিত্য নয়, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষারও ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। এই উদ্যোগে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়।
বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশ:
- ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS): ১৮৭৬ সালে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল পরাধীন ভারতের প্রথম নিজস্ব বিজ্ঞান গবেষণাগার। সি.ভি. রমন এখানেই গবেষণা করে নোবেল পান।
- কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ: ১৯১৪ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ এখানে গবেষণা করেন।
- বসু বিজ্ঞান মন্দির: ১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা উদ্ভিদ ও পদার্থবিদ্যার আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার হয়ে ওঠে।
কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:
- শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ: সরকারি উদ্যোগে ১৮৫৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় (তখন নাম ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ), যা কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা নেয়।
- বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI): স্বদেশী আন্দোলনের সময় ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় প্রযুক্তিতে ছাত্রদের কারিগরি বিদ্যা শেখানো। প্রমথনাথ বসু ছিলেন এর প্রথম অধ্যক্ষ। এটিই পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
৩. বাংলায় ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা করো। এই প্রসঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকা কী ছিল? (৫+৩) [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর:ছাপাখানার ব্যবসায়িক উদ্যোগ:
উনিশ শতকে ছাপাখানা কেবল জ্ঞানচর্চার মাধ্যম ছিল না, এটি একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়।
- বটতলা প্রকাশনা: কলকাতার চিৎপুর ও শোভাবাজারের বটতলা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সস্তা বই ছাপার বিশাল বাজার গড়ে ওঠে। রামায়ণ, মহাভারত, পঞ্জিকা ও লঘু সাহিত্য গ্রামীণ ও গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
- গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য: তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি প্রকাশক ও বই বিক্রেতা। তিনি ফেরিওয়ালাদের মাধ্যমে বই বিক্রির প্রথা চালু করেন।
- বিদ্যাসাগর: তিনি ১৮৪৭ সালে ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ প্রেস কিনেছিলেন। তাঁর লেখা পাঠ্যপুস্তকগুলি (বর্ণপরিচয়, বোধোদয়) বিপুল পরিমাণে বিক্রি হতো, যা মুদ্রণ শিল্পকে বাণিজ্যিক ভিত্তি দেয়।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকা:
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা মুদ্রণ শিল্পকে বিশ্বমানের করে তোলেন।
- ১৮৯৫ সালে তিনি ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি ভারতে প্রথম ‘হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং’ পদ্ধতি চালু করেন, যার ফলে বইয়ে নিখুঁত ও রঙিন ছবি ছাপানো সম্ভব হয়।
- তাঁর প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকা মুদ্রণ মানের দিক থেকে ছিল অতুলনীয়।
৪. জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE)-এর উদ্যোগ ও ব্যর্থতার কারণগুলি আলোচনা করো। (৫+৩)
✅ উত্তর:উদ্যোগ ও কার্যাবলী:
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শিক্ষা বর্জন করার ডাক দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৯০৬ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠিত হয়।
- উদ্দেশ্য: দেশীয় নিয়ন্ত্রণে ও আদর্শে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা।
- প্রতিষ্ঠান স্থাপন: এর অধীনে ১৯০৬ সালে ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ’ (অধ্যক্ষ অরবিন্দ ঘোষ) এবং ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (অধ্যক্ষ প্রমথনাথ বসু) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মাতৃভাষা: এখানে শিক্ষার মাধ্যম ছিল বাংলা ভাষা।
ব্যর্থতার কারণ:
- চাকরির অভাব: ঔপনিবেশিক সরকার এই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে এখান থেকে পাস করা ছাত্রদের সরকারি চাকরি বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল না।
- আর্থিক সংকট: রাজা-জমিদারদের দানে এটি চলত। কিন্তু সরকারের ভয়ে অনেকেই দান বন্ধ করে দেন, ফলে অর্থাভাব দেখা দেয়।
- মধ্যবিত্তের অনীহা: বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করতে চায়নি।
- রাজনৈতিক দলাদলি: নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণেও এর কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
৫. ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা এবং তাঁর শান্তিনিকেতন ভাবনার স্বাতন্ত্র্য আলোচনা করো। (৪+৪)
✅ উত্তর:ঔপনিবেশিক শিক্ষার সমালোচনা:
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধ ও ‘তোতাকাহিনী’ গল্পে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন।
- যান্ত্রিকতা: তিনি স্কুলকে ‘আণ্ডামানের জেলখানা’ বা ‘কলের কারখানা’ বলতেন। সেখানে শিশুদের জোর করে বিদ্যা গেলানো হতো, যা তাদের মনকে পঙ্গু করে দিত।
- ভাষা: ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দেওয়ায় শিশুরা বিষয়বস্তু না বুঝেই মুখস্থ করত, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারত না।
- বিচ্ছিন্নতা: এই শিক্ষা ছাত্রকে তার সমাজ ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘নকল ইংরেজ’-এ পরিণত করত।
শান্তিনিকেতন ভাবনার স্বাতন্ত্র্য:
- প্রকৃতি ও মানুষ: তিনি শান্তিনিকেতনে গাছতলায় ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করেন, যাতে শিশুরা প্রকৃতির সাথে মিশে থাকতে পারে।
- আনন্দময় শিক্ষা: তিনি খেলাধুলা, গান, ছবি আঁকার মাধ্যমে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলেছিলেন।
- পল্লী উন্নয়ন: শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাকে গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যুক্ত করেছিলেন, যা ছিল এক অনন্য উদ্যোগ।
৬. বিজ্ঞান গবেষণায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ (Bose Institute)-এর উদ্যোগ ও অবদান আলোচনা করো। (৮)
✅ উত্তর:প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য:
১৯১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য খ্যাতি এবং সমস্ত সঞ্চিত অর্থ এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দান করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—”For the advancement of science and diffusion of knowledge” (বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও জ্ঞানের প্রসার)।
গবেষণা ও অবদান:
- আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা: এটিই ছিল ভারতের প্রথম গবেষণা কেন্দ্র যেখানে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, মাইক্রোবায়োলজি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে আন্তঃবিভাগীয় (Interdisciplinary) গবেষণা হতো।
- উদ্ভিদ ও প্রাণ: জগদীশচন্দ্র বসু এখানে তাঁর আবিষ্কৃত ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে এবং তারা উত্তেজনায় সাড়া দেয়।
- বেতার তরঙ্গ: এখানে অতিক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ (Microwave) নিয়েও গবেষণা হয়।
- স্বদেশী ভাবধারা: এটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় উদ্যোগে তৈরি, যা পরাধীন ভারতের বিজ্ঞানীদের গবেষণার সুযোগ করে দেয়।
উপসংহার: আজও এটি ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
৭. বিজ্ঞান চর্চায় ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ (IACS)-এর ভূমিকা কী ছিল? (৮)
✅ উত্তর:ভূমিকা: ১৮৭৬ সালে বিখ্যাত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার কলকাতার বৌবাজারে IACS বা ‘ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম নিজস্ব বিজ্ঞান গবেষণাগার।
অবদান ও কার্যাবলী:
- গবেষণার সুযোগ: পরাধীন ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার কোনো সুযোগ ছিল না। IACS ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সেই সুযোগ করে দেয়। মহেন্দ্রলাল চেয়েছিলেন এটি যেন লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের মতো হয়।
- বিখ্যাত বিজ্ঞানী: জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীলরতন সরকার এখানে নিয়মিত ক্লাস নিতেন এবং গবেষণা করতেন।
- নোবেল জয়: এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেই ১৯৩০ সালে সি. ভি. রমন পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান (‘রমন এফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য)।
- জনপ্রিয়করণ: এখানে নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতার আয়োজন করা হতো, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা জাগিয়ে তোলে।
৮. বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের অবদান আলোচনা করো। এটি কীভাবে গণশিক্ষার প্রসার ঘটায়? (৫+৩)
✅ উত্তর:শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের অবদান:
১৮০০ সালে উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড (শ্রীরামপুর ত্রয়ী) এই প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।
- উন্নত প্রযুক্তি: পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি উন্নত মানের বাংলা হরফ এবং কাঠের বদলে লোহার প্রেস ব্যবহারের ফলে ছাপার মান উন্নত হয়।
- বিপুল প্রকাশনা: ১৮০০-১৮৩২ সালের মধ্যে এখান থেকে ৪৫টি ভাষায় প্রায় ২ লক্ষ ১২ হাজার বই ছাপা হয়। এর মধ্যে বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক ছিল প্রধান।
- সাংবাদিকতা: ১৮১৮ সালে এখান থেকেই ‘দিকদর্শন’ ও ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়ে বাংলা সাংবাদিকতার সূচনা করে।
গণশিক্ষায় ভূমিকা:
- সুলভ বই: হাতে লেখা পুঁথি ছিল অত্যন্ত দামি। মিশন প্রেস থেকে সস্তায় হাজার হাজার বই ছাপা হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে যায়।
- পাঠ্যপুস্তক: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও অন্যান্য স্কুলের পাঠ্যবই এখান থেকেই ছাপা হতো, যা শিক্ষার প্রসারে অপরিহার্য ছিল।
৯. কারিগরি শিক্ষার বিকাশে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ (BTI)-এর ভূমিকা ও গুরুত্ব আলোচনা করো। (৮)
✅ উত্তর:প্রতিষ্ঠা ও পটভূমি: ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শিক্ষা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের জন্য ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের উদ্যোগে BTI প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভূমিকা ও কার্যাবলী:
- বিকল্প শিক্ষা: ব্রিটিশদের অধীনস্থ শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিকল্প হিসেবে ভারতীয় ছাত্রদের কারিগরি শিক্ষা দেওয়াই ছিল এর লক্ষ্য।
- পাঠ্যক্রম: এখানে যন্ত্রকৌশল, রাসায়নিক প্রযুক্তি, সাবান তৈরি, চর্মশিল্প, রঞ্জনবিদ্যা, সেরামিক প্রভৃতি হাতে-কলমে শেখানো হতো যাতে ছাত্ররা স্বাবলম্বী হতে পারে।
- নেতৃত্ব: বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ প্রমথনাথ বসু এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন।
- রূপান্তর: ১৯২৮ সালে এটি যাদবপুর কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
গুরুত্ব: এটি ছিল ভারতের প্রথম জাতীয় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
১০. কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (Calcutta Science College) প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও গুরুত্ব লেখো। (৪+৪)
✅ উত্তর:প্রতিষ্ঠার ইতিহাস:
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৪ সালে বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এর প্রধান রূপকার ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
- দানশীলতা: বিখ্যাত আইনজীবী তারকনাথ পালিত এবং রাসবিহারী ঘোষ তাঁদের বিপুল সম্পত্তি ও অর্থ (প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা) এই কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন।
- শর্ত: তাঁদের দানের শর্ত ছিল যে, এই কলেজে কেবল ভারতীয় অধ্যাপকরাই পড়াবেন এবং গবেষণা করবেন। ব্রিটিশদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
গুরুত্ব ও অবদান:
- স্নাতকোত্তর শিক্ষা: এটিই ছিল ভারতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্নাতকোত্তর (M.Sc) পঠনপাঠন ও গবেষণার প্রথম পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র।
- বিখ্যাত বিজ্ঞানী: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সি. ভি. রমন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা এখানে অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন।
- স্বদেশী বিজ্ঞান: ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য ছাড়াই কেবল ভারতীয়দের দানে ও উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, যা ছিল ‘বিকল্প বিজ্ঞান চর্চা’র শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বিকল্প চিন্তা (রচনাধর্মী)
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তার মূল কথা কী?
✅ উত্তর: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন শিক্ষা হতে হবে প্রকৃতির কোলে মুক্ত ও আনন্দময় পরিবেশে। চারদেওয়ালের বদ্ধ শিক্ষার বদলে তিনি মানুষ ও প্রকৃতির সংযোগের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর এই আদর্শেই শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন: বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
✅ উত্তর: ১৯০৬ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের জন্য BTI প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতীয় ছাত্রদের হাতে-কলমে প্রযুক্তিগত শিক্ষা দিত। এটিই পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
প্রশ্ন: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী মুদ্রণ শিল্পে কী বিপ্লব এনেছিলেন?
✅ উত্তর: তিনি ভারতে প্রথম ‘হাফ-টোন ব্লক প্রিন্টিং’ প্রযুক্তি চালু করেন, যা বইয়ে উন্নত মানের রঙিন ছবি ছাপানো সম্ভব করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’ এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকা বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিল।