দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় -6 বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন দীর্ঘ প্রশ্নত্তোর
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-১৬ | পূর্ণমান: ৪
১. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের অংশগ্রহণ কম ছিল কেন? আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে ছাত্র ও মধ্যবিত্ত সমাজ ব্যাপকভাবে যোগ দিলেও কৃষকদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। এর কারণগুলি হলো:
- ১. কংগ্রেসের উদাসীনতা: কংগ্রেস বা স্বদেশী নেতারা কৃষকদের সমস্যা (খাজনা বৃদ্ধি, জমিদারি শোষণ) নিয়ে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেননি। তাঁদের আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক।
- ২. জমিদার তোষণ: স্বদেশী আন্দোলনের অনেক নেতাই ছিলেন জমিদার শ্রেণির। তাই তাঁরা কৃষকদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের শ্রেণি স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
- ৩. ধর্মীয় বিভাজন: পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ কৃষক ছিল মুসলমান। ব্রিটিশদের প্ররোচনায় এবং মোল্লা-মৌলবীদের প্রভাবে তারা এই আন্দোলনকে ‘হিন্দুদের আন্দোলন’ মনে করে দূরে সরে ছিল।
২. একা বা একতা আন্দোলনের (১৯২১) কারণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
অসহযোগ আন্দোলনের শেষদিকে যুক্তপ্রদেশে মাদারি পাশির নেতৃত্বে একা আন্দোলন শুরু হয়।
- কারণ: ১) জমিদার ও ঠিকাদাররা নির্ধারিত রাজস্বের চেয়ে ৫০% বেশি কর আদায় করত। ২) বিনা পারিশ্রমিকে কৃষকদের বেগার খাটানো হতো। ৩) কর দিতে না পারলে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো।
- বৈশিষ্ট্য: ১) আন্দোলনকারীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শপথ নিত যে তারা অন্যায্য কর দেবে না। ২) জমি থেকে উচ্ছেদ করলেও জমি ছাড়বে না। ৩) এই আন্দোলনে ছোট জমিদাররাও যোগ দিয়েছিল।
- এটি কংগ্রেসের অহিংস নীতির তোয়াক্কা না করে উগ্র রূপ ধারণ করেছিল।
৩. বারদৌলি সত্যাগ্রহের (১৯২৮) প্রতি জাতীয় কংগ্রেসের মনোভাব ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলিতে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে এই আন্দোলন হয়।
- কংগ্রেসের ভূমিকা: শুরুতে গান্ধীজি এই স্থানীয় আন্দোলন নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও, প্যাটেলের নেতৃত্বে এটি শক্তিশালী হলে কংগ্রেস পূর্ণ সমর্থন দেয়। এটি কংগ্রেসের অহিংস সত্যাগ্রহের আদর্শ উদাহরণ হয়ে ওঠে।
- গুরুত্ব: ১) সরকারের রাজস্ব কমানোর সিদ্ধান্ত কৃষকদের জয় সূচিত করে। ২) এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বল্লভভাই প্যাটেল জাতীয় নেতায় পরিণত হন এবং ‘সর্দার’ উপাধি পান। ৩) নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।
৪. ১৯২০-এর দশকে ভারতে কৃষক আন্দোলনের অগ্রগতির পরিচয় দাও (বাবা রামচন্দ্র ও জওহরলাল নেহরু)।
অসহযোগ আন্দোলনের সময় যুক্তপ্রদেশে (UP) কৃষক আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।
- বাবা রামচন্দ্র: তিনি ছিলেন একজন সন্ন্যাসী। তিনি অযোধ্যার কৃষকদের জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন এবং ১৯২০ সালে ‘অযোধ্যা কিসান সভা’ গঠন করেন। তিনি ধোপি-নাপিত বন্ধের ডাক দেন।
- জওহরলাল নেহেরু: তিনি গ্রামের কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ব্যথিত হন এবং তাদের আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর উদ্যোগে ‘আওয়ধ কিসান সভা’ গঠিত হয়।
- এই আন্দোলন শেষপর্যন্ত হিংসাত্মক হয়ে উঠলে সরকার তা দমন করে।
৫. সারা ভারত কিষাণ সভা (১৯৩৬) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি কী ছিল?
১৯৩৬ সালে লখনউতে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতীর সভাপতিত্বে এই সভা গঠিত হয়।
- উদ্দেশ্য: ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন কৃষক আন্দোলনগুলিকে এক ছাতার তলায় এনে সর্বভারতীয় রূপ দেওয়া এবং কৃষকদের অধিকার রক্ষা করা।
- কর্মসূচি: ১) জমিদারি প্রথার বিলোপ সাধন। ২) ভূমিহীন কৃষকদের জমি প্রদান। ৩) কৃষকদের ঋণের বোঝা কমানো। ৪) জলসেচের ব্যবস্থার উন্নতি করা।
৬. তেভাগা আন্দোলনের (১৯৪৬) কারণ ও গুরুত্ব লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
বাংলার দিনাজপুর, রংপুর ও মালদহ জেলায় বর্গাদাররা এই আন্দোলন শুরু করে।
- কারণ: ফ্লাউড কমিশন (১৯৪০) সুপারিশ করেছিল যে ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ (২/৩) পাবে কৃষক এবং এক ভাগ (১/৩) পাবে জমিদার। জমিদাররা তা মানতে না চাওয়ায় আন্দোলন শুরু হয়।
- গুরুত্ব: ১) এটি ছিল ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কৃষক আন্দোলন। ২) এতে হিন্দু, মুসলিম ও আদিবাসী কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ৩) নারীদের (যেমন- বিমলা মাজি) অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ৪) এর ফলেই পরবর্তীকালে বর্গাদার আইন পাস হয়।
৭. মোপলা বিদ্রোহের (১৯২১) চরিত্র বিশ্লেষণ করো। এটি কি সাম্প্রদায়িক ছিল?
কেরালার মালাবার উপকূলে মুসলিম মোপলা কৃষকরা হিন্দু জমিদার (জেনমি) ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
- কৃষক আন্দোলন: শুরুতে এটি ছিল জমিদারদের শোষণ, অতিরিক্ত কর এবং উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গরিব কৃষকদের সংগ্রাম।
- জাতীয়তাবাদী রূপ: অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের নেতারা এতে সমর্থন দিলে এটি ব্রিটিশ বিরোধী রূপ নেয়।
- সাম্প্রদায়িক মোড়: ব্রিটিশদের উসকানিতে এবং কিছু ধর্মীয় নেতার প্রভাবে শেষের দিকে আন্দোলনটি হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়।
৮. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা কী ছিল?
১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলনে শ্রমিকরা প্রথমবারের মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
- ধর্মঘট: ১৬ অক্টোবর (বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন) বাংলার বিভিন্ন চটকল, ছাপাখানা ও কারখানায় শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করে।
- রেল ধর্মঘট: ১৯০৬ সালে আসানসোল ও জামালপুরে রেলওয়ে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ধর্মঘট ব্রিটিশ প্রশাসনকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করে।
- নেতৃত্ব: অশ্বিনী কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুসুম রায়চৌধুরী প্রমুখ নেতারা শ্রমিকদের সংগঠিত করে ‘ইউনিয়ন’ গড়ে তোলেন।
৯. অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের বিবরণ দাও।
১৯২০-২২ সালে অসহযোগ আন্দোলনের আবহে শ্রমিক আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে।
- ধর্মঘটের জোয়ার: এই সময়ে ভারতে প্রায় ৪০০টি ধর্মঘট হয়। বোম্বাই, আমেদাবাদ, মাদ্রাজ ও কানপুরে সুতাকল শ্রমিকরা এবং জামশেদপুরে টাটা আয়রন ওয়ার্কসের শ্রমিকরা ধর্মঘট করে।
- রেল ধর্মঘট: ১৯২১ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলসের ভারত আগমনের প্রতিবাদে রেল ও পরিবহণ শ্রমিকরা সর্বাত্মক ধর্মঘট করে।
- সংগঠন: এই সময়েই (১৯২০) ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন AITUC প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে।
১০. নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
১৯২০ সালে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে AITUC গঠিত হয়।
- প্রেক্ষাপট: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও ছাঁটাইয়ের ফলে শ্রমিক অসন্তোষ চরমে পৌঁছায়। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭) শ্রমিকদের অনুপ্রাণিত করে। আই.এল.ও (ILO)-তে ভারতের প্রতিনিধি পাঠানোর জন্যও একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের প্রয়োজন ছিল।
- উদ্দেশ্য: ১) ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শ্রমিক সংগঠনগুলিকে এক ছাতার তলায় আনা। ২) শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া (মজুরি, কাজের সময়) পেশ করা। ৩) শ্রমিকদের জাতীয় আন্দোলনে শামিল করা।
১১. আইন অমান্য আন্দোলনের সময় শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা আলোচনা করো। এই সময় শ্রমিক আন্দোলন দুর্বল হলো কেন?
১৯৩০-এর দশকে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় শ্রমিকরা শোলাপুর, বোম্বাই ও কলকাতায় ধর্মঘট করে।
- ভূমিকা: শোলাপুরে শ্রমিকরা ব্রিটিশ শাসন অচল করে দেয় এবং কিছুদিন সমান্তরাল শাসন চালায়।
- দুর্বলতার কারণ: ১) ১৯২৯ সালের মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, ফলে নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়। ২) কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করে। ৩) জাতীয় কংগ্রেসও শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিল না।
১২. ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ (১৯২৯)-র প্রেক্ষাপট ও ফলাফল আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
প্রেক্ষাপট: ১৯২০-র দশকের শেষদিকে ভারতে কমিউনিস্ট ও শ্রমিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের ওপর কমিউনিস্টদের প্রভাব বাড়তে দেখে ব্রিটিশ সরকার ভীত হয়ে পড়ে এবং এই আন্দোলন দমন করতে ৩৩ জন বামপন্থী নেতাকে (মুজাফফর আহমেদ, ডাঙ্গে, স্প্র্যাট) গ্রেপ্তার করে মামলা শুরু করে।
ফলাফল:
- দীর্ঘ ৪ বছর বিচার চলার পর নেতাদের কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
- এর ফলে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
- তবে এই মামলার ফলে কমিউনিস্ট মতাদর্শ জাতীয় স্তরে পরিচিতি পায় এবং আন্তর্জাতিক মহলে (আইনস্টাইন, রোমা রোঁলা) প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
১৩. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি (WPP) কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? এর কার্যাবলী লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
১৯২৮ সালে কলকাতায় এই দল প্রতিষ্ঠিত হয়।
- উদ্দেশ্য: কংগ্রেসের ভেতরে থেকে বামপন্থী ভাবধারা প্রচার করা এবং শ্রমিক ও কৃষকদের দাবিদাওয়াকে জাতীয় আন্দোলনের মূল স্রোতে নিয়ে আসা। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন।
- কার্যাবলী: ১) সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে এই দল সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ২) বোম্বাই ও কলকাতার চটকল ও সুতাকল ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়। ৩) জমিদার প্রথার উচ্ছেদ ও ট্রেড ইউনিয়নের স্বীকৃতির দাবি তোলে।
১৪. মানবেন্দ্রনাথ রায় (M.N. Roy) স্মরণীয় কেন?
মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় বিপ্লবী।
- কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা: ১৯২০ সালে তিনি রাশিয়ার তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) প্রতিষ্ঠা করেন।
- মতাদর্শ প্রচার: ‘ভ্যানগার্ড’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ভারতে সাম্যবাদী ভাবধারা প্রচার করেন। তিনি লেনিনের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
- র্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম: জীবনের শেষপর্যায়ে তিনি মার্কসবাদ থেকে সরে এসে ‘নবমানবতাবাদ’ বা Radical Humanism-এর দর্শন প্রচার করেন এবং ‘রেডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ গঠন করেন।
১৫. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) শ্রমিকদের ভূমিকা উল্লেখ করো।
১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণি অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছিল।
- স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট: গান্ধীজি গ্রেপ্তার হওয়ার পর বোম্বাই, আমেদাবাদ, জামশেদপুর, কানপুর ও কলকাতার শ্রমিকরা টানা ধর্মঘট পালন করে। আমেদাবাদের সুতাকলগুলি প্রায় ৩ মাস বন্ধ ছিল।
- নাশকতা: শ্রমিকরা রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাম তার কাটা এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করার কাজে সক্রিয় অংশ নেয়।
- কমিউনিস্ট বিরোধিতা: যদিও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এই সময় ‘জনযুদ্ধ’ নীতির কারণে ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে দূরে ছিল, তবুও সাধারণ শ্রমিকরা দলের নির্দেশ অমান্য করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।
১৬. ভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের উত্থানের কারণগুলি কী ছিল?
- রুশ বিপ্লব (১৯১৭): রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব ভারতের যুবসমাজকে সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট করে।
- কংগ্রেসের সীমাবদ্ধতা: কংগ্রেস মূলত উচ্চবিত্ত ও জমিদারদের স্বার্থ দেখত। শ্রমিক-কৃষকদের দুর্দশা দূর করতে কংগ্রেসের ব্যর্থতা তাদের বামপন্থার দিকে ঠেলে দেয়।
- অর্থনৈতিক মন্দা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মহামন্দা (১৯২৯) সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে, যা তাদের বামপন্থী আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য করে।
১৭. ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও বামপন্থী আন্দোলনের সম্পর্কের বিবর্তন আলোচনা করো।
কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং পরিবর্তনশীল।
- সহযোগিতা: ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে বামপন্থীরা কংগ্রেসের ভেতরে থেকেই কাজ করত (যেমন- কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি)। জওহরলাল নেহেরু ও সুভাষচন্দ্র বসু বামপন্থীদের সমর্থন করতেন।
- মতভেদ: বামপন্থীরা চাইত শ্রমিক-কৃষকদের শ্রেণি সংগ্রামকে গুরুত্ব দিতে, কিন্তু গান্ধীজি ও দক্ষিণপন্থী নেতারা চাইতেন শ্রেণি সমন্বয়।
- বিচ্ছেদ: ১৯৪২-এ কমিউনিস্টরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করলে এবং ১৯৪৫-এ সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করলে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের দূরত্ব বাড়ে।
১৮. কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল (Congress Socialist Party) কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
১৯৩৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব প্রমুখ এই দল গঠন করেন।
- উদ্দেশ্য: কংগ্রেসের ভেতরে থেকে দলকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত করা।
- কৃষক-শ্রমিক স্বার্থ: কংগ্রেস যাতে কেবল জমিদার ও পুঁজিপতিদের দল না হয়ে ওঠে এবং শ্রমিক-কৃষকদের দাবিদাওয়াকে গুরুত্ব দেয়, তা নিশ্চিত করা।
- পূর্ণ স্বাধীনতা: ব্রিটিশদের সাথে কোনো আপস না করে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।
১৯. তেলেঙ্গানা আন্দোলনের (১৯৪৬-৫১) পটভূমি ও গুরুত্ব লেখো।
হায়দ্রাবাদের নিজাম শাসিত তেলেঙ্গানায় এই সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ হয়।
- পটভূমি: দেশমুখ বা জমিদারদের অকথ্য শোষণ, অতিরিক্ত কর এবং ‘বেট্টি’ বা বেগার প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকরা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে।
- গুরুত্ব: ১) বিদ্রোহীরা প্রায় ৩০০০ গ্রামে ‘গ্রামরাজ’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ১০ লক্ষ একর জমি কৃষকদের মধ্যে বিলি করে। ২) এই আন্দোলন হায়দ্রাবাদ রাজ্যকে ভারতের সাথে যুক্ত করতে এবং পরবর্তীকালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনে সাহায্য করে।
২০. ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি কী ছিল?
১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতির পদ ত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।
- উদ্দেশ্য: কংগ্রেসের ভেতরে থাকা সমস্ত বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা।
- কর্মসূচি: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালানো এবং পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা। তিনি সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে ভারত গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
২১. মুজাফফর আহমেদকে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ বলা হয় কেন?
মুজাফফর আহমেদ ছিলেন বাংলায় তথা ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্থপতি।
- সংগঠন: তিনি ১৯২৫ সালে লেবার স্বরাজ পার্টি এবং ১৯২৮ সালে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি গঠনে মুখ্য ভূমিকা নেন।
- সাংবাদিকতা: ‘নবযুগ’, ‘লাঙ্গল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি মার্কসবাদী আদর্শ প্রচার করেন।
- ত্যাগ: কানপুর ও মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় দীর্ঘ কারাবাস সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে আসেননি।
২২. ১৯০৮ সালে বোম্বাইতে শ্রমিক ধর্মঘটের গুরুত্ব কী ছিল?
১৯০৮ সালে লোকমান্য তিলককে রাজদ্রুহের অপরাধে ৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে বোম্বাইয়ের সুতাকল শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৬ দিন ধরে ধর্মঘট পালন করে।
- গুরুত্ব: এটি ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক ধর্মঘট। লেনিন এই ধর্মঘটকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন যে, “ভারতের শ্রমিক শ্রেণি রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক হয়ে উঠেছে।” এটি প্রমাণ করে যে শ্রমিকরা কেবল মজুরির জন্য নয়, দেশের জন্যও লড়তে জানে।
২৩. ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট (১৯২৬)-এর শর্ত ও প্রভাব কী ছিল?
ব্রিটিশ সরকার শ্রমিক আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই আইন পাস করে।
- শর্ত: ১) ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২) ইউনিয়নগুলির তহবিল রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না। ৩) অডিট রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
- প্রভাব: এর ফলে শ্রমিক সংগঠন করা সহজ হলেও, শ্রমিকদের রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। তবুও শ্রমিকরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখে।
২৪. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদানের মূল্যায়ন করো।
- পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি: ১৯২১ সালে বামপন্থীরাই (হাসরত মোহানি) প্রথম কংগ্রেসে পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাব এনেছিলেন।
- গণভিত্তি: বামপন্থীরা শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করে জাতীয় আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে পরিণত করেন।
- অর্থনৈতিক দাবি: তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জমিদারি প্রথা বিলোপ ও শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নকে যুক্ত করেছিলেন, যা আন্দোলনকে বাস্তবমুখী করেছিল।
২৫. রম্পা বিদ্রোহ (১৯২২-২৪) সম্পর্কে টীকা লেখো।
অসহযোগ আন্দোলনের সময় অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী উপত্যকার রম্পা অঞ্চলের উপজাতিরা আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে।
- কারণ: ব্রিটিশদের কঠোর অরণ্য আইন এবং ঠিকাদারদের শোষণ। আদিবাসীদের পোডু (ঝুম) চাষ ও বনজ সম্পদ সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয়।
- ঘটনা: সীতারাম রাজু নিজেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে দাবি করেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালান। ১৯২৪ সালে তাঁকে ধরে গুলি করে হত্যা করা হলে বিদ্রোহ থামে।
২৬. রশিদ আলি দিবস (১৯৪৬) কেন পালিত হয়? এর গুরুত্ব কী?
আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলিকে ব্রিটিশ আদালত ৭ বছরের কারাদণ্ড দিলে, তার প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম ছাত্র লিগ ও ছাত্র ফেডারেশন ধর্মঘটের ডাক দেয়। কলকাতায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ হয়।
- গুরুত্ব: এই আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলিম ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নামে। এটি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনায় সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ মুছে গেছে।
২৭. ‘লাঙ্গল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
- লাঙ্গল: কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত এই পত্রিকা ছিল ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’র মুখপত্র। এতে ‘সাম্যবাদী’ কবিতা এবং শ্রমিক-কৃষকদের দুর্দশার কথা ছাপা হতো।
- গণবাণী: মুজাফফর আহমেদ সম্পাদিত এই পত্রিকায় মার্কসবাদী তত্ত্ব সহজ বাংলায় প্রচার করা হতো। এই পত্রিকাতেই প্রথম ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
- উভয় পত্রিকা বামপন্থী ভাবধারা প্রসারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল।
২৮. চম্পারণ ও খেদা সত্যাগ্রহে গান্ধীজির ভূমিকা কী ছিল?
১) চম্পারণ (১৯১৭): বিহারের নীলকরদের ‘তিনকাঠিয়া’ প্রথার বিরুদ্ধে গান্ধীজি সত্যাগ্রহ করেন এবং সরকারকে তদন্ত কমিশন বসাতে বাধ্য করেন। এর ফলে তিনকাঠিয়া প্রথা রদ হয়।
২) খেদা (১৯১৮): গুজরাটে শস্যহানি সত্ত্বেও সরকার রাজস্ব আদায় করতে চাইলে গান্ধীজি কৃষকদের কর না দেওয়ার পরামর্শ দেন। শেষপর্যন্ত সরকার নতিস্বীকার করে এবং কেবল সামর্থ্যবানদের থেকে কর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২৯. মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন (১৯১৮)-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
বি. পি. ওয়াদিয়া প্রতিষ্ঠিত ‘মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন’ ছিল ভারতের প্রথম সুসংগঠিত ও আধুনিক ট্রেড ইউনিয়ন। এর আগে শ্রমিক আন্দোলন ছিল বিক্ষিপ্ত। এই সংগঠনটি নির্দিষ্ট চাঁদা, সদস্যপদ এবং নিয়মনীতির ভিত্তিতে চলত। এটি ভারতের অন্যান্য স্থানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে পথপ্রদর্শকের কাজ করে।
৩০. রেডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি কেন গঠিত হয়? এর দর্শন কী ছিল?
১৯৪০ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায় এই দল গঠন করেন।
- প্রেক্ষাপট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এম. এন. রায় ফ্যাসিবাদের (হিটলার-মুসোলিনি) বিরোধিতা করেন এবং মিত্রশক্তিকে সমর্থন করার পক্ষে ছিলেন, যা কংগ্রেস বা কমিউনিস্টদের নীতির বিরোধী ছিল।
- দর্শন: তাঁর দর্শন ছিল ‘র্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম’ বা নবমানবতাবাদ। তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদকে গুরুত্ব দিতেন।
৩১. ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী মহামন্দা ভারতের কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল?
- কৃষক: কৃষিপণ্যের দাম প্রায় ৫০% কমে যায়, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার রাজস্ব কমায়নি। ফলে কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে এবং জমি হারায়।
- শ্রমিক: কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু শ্রমিক ছাঁটাই হয় এবং মজুরি কমে যায়। এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ ও ধর্মঘট বৃদ্ধি পায়।
- এই পরিস্থিতি আইন অমান্য আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকদের যোগদানে ইন্ধন জোগায়।
৩২. বকস্ত আন্দোলন (Bakast Movement) কী?
মন্দার কারণে খাজনা দিতে না পারায় বিহারের জমিদাররা কৃষকদের জমি নিলাম করে নিজেদের খাস দখলে নিয়েছিল, যাকে ‘বকস্ত জমি’ বলা হতো। ১৯৩৭-৩৮ সালে স্বামী সহজানন্দের নেতৃত্বে কৃষকরা এই জমি ফেরতের দাবিতে যে আন্দোলন করে, তাকে বকস্ত আন্দোলন বলে। কংগ্রেস সরকার শেষপর্যন্ত আইন করে কৃষকদের কিছু জমি ফিরিয়ে দেয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন
প্রশ্ন: AITUC প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
প্রশ্ন: মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রশ্ন: মানবেন্দ্রনাথ রায় কেন স্মরণীয়?
প্রশ্ন: তেলেঙ্গানা আন্দোলনের গুরুত্ব কী?
প্রশ্ন: রশিদ আলি দিবস কেন পালিত হয়?