বিভাগ-গ: সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (প্রতিটি প্রশ্নের মান – ২)
বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত | প্রশ্ন সংখ্যা: ২৬
১. ১৯৪৭ সালের পর ভারতের সামনে প্রধান দুটি সমস্যা কী ছিল?
✅ উত্তর: ১) উদ্বাস্তু সমস্যা: দেশভাগের ফলে পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে ভারতে চলে আসে, তাদের পুনর্বাসন দেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
২) দেশীয় রাজ্যের সংযুক্তি: ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫৬২টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা।
২. ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ (Instrument of Accession) বা ভারতভুক্তি দলিল বলতে কী বোঝো? [মাধ্যমিক ২০১৭]
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য যে নির্দিষ্ট আইনি দলিলে স্বাক্ষর করতে হতো, তাকে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ বলে। এই দলিলে স্বাক্ষর করে রাজারা প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতের হাতে তুলে দিতেন।
৩. সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বলা হয় কেন? [মাধ্যমিক ২০১৯]
✅ উত্তর: স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল অত্যন্ত দৃঢ়তা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ৫৬২টি বিচ্ছিন্ন দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করেন। ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তাঁর এই ইস্পাতকঠিন ভূমিকার জন্য তাঁকে ‘লৌহমানব’ বলা হয়।
৪. মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ (Mountbatten Plan) কী?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ভাগের যে পরিকল্পনা পেশ করেন, তাকে মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ বা ‘৩ জুন পরিকল্পনা’ বলে। এই পরিকল্পনা অনুসারেই ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডমিনিয়ন গঠিত হয়।
৫. জুনাগড় রাজ্যটি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
✅ উত্তর: জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চাইলে প্রজারা বিদ্রোহ করে। ভারতীয় সেনা জুনাগড় ঘিরে ফেলে এবং নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান। এরপর ১৯৪৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে সেখানকার মানুষ ভারতের পক্ষে রায় দেয় এবং ১৯৪৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
৬. ‘রাজাকার’ (Razakars) কারা ছিল?
✅ উত্তর: হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলি খানের মদতপুষ্ট এক উগ্র সাম্প্রদায়িক আধা-সামরিক বাহিনী ছিল রাজাকার। কাসেম রিজভির নেতৃত্বে এই বাহিনী হায়দ্রাবাদের সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাত এবং ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করত।
৭. ‘অপারেশন পোলো’ (Operation Polo) কী?
✅ উত্তর: হায়দ্রাবাদের নিজাম ভারতের সাথে যোগ দিতে অস্বীকার করলে এবং রাজাকারদের অত্যাচার বাড়লে, ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদে যে পুলিশি অভিযান চালায়, তার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন পোলো’। এর ফলে হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
৮. কাশ্মীর সমস্যার উদ্ভব কীভাবে হয়?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কারোর সাথেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করলে তিনি ভারতের সাহায্য চান এবং ভারতভুক্তি দলিলে সই করেন। কিন্তু ততক্ষণে পাকিস্তান কাশ্মীরের কিছু অংশ দখল করে নেয় (আজাদ কাশ্মীর), যা নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত।
৯. নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি বা দিল্লি চুক্তি (১৯৫০) কেন স্বাক্ষরিত হয়? [মাধ্যমিক ২০১৮]
✅ উত্তর: ১৯৫০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উদ্বাস্তু সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এবং দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
১০. ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়েছিল?
✅ উত্তর: স্বাধীনতার পর দক্ষিণ ভারতসহ বিভিন্ন প্রান্তে ভাষার ভিত্তিতে আলাদা রাজ্য গঠনের দাবি প্রবল হয়। এই দাবির যৌক্তিকতা বিচার করে রাজ্যগুলির সীমানা নতুন করে নির্ধারণের জন্য ফজল আলির নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয়।
১১. পট্টি শ্রীরামালু কে ছিলেন? তিনি কেন স্মরণীয়? [মাধ্যমিক ২০২০]
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন একজন গান্ধীবাদী তেলেগু নেতা। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে তেলেগু ভাষাভাষী মানুষের জন্য পৃথক ‘অন্ধ্রপ্রদেশ’ রাজ্য গঠনের দাবিতে তিনি ৫৮ দিন অনশন করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুই ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনকে ত্বরান্বিত করে।
১২. ‘উদবস্তু’ (Refugee) বলতে কী বোঝো?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে বা পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়ে পাকিস্তান (পূর্ব ও পশ্চিম) থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণভয়ে ভারতে চলে আসে এবং যাদের নিজস্ব কোনো আশ্রয় ছিল না, তাদের উদবস্তু বলা হয়।
১৩. রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬) অনুযায়ী ভারতকে কীভাবে ভাগ করা হয়?
✅ উত্তর: ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন অনুযায়ী ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলিকে মূলত ভাষার ভিত্তিতে ১৪টি রাজ্য (যেমন- পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মাদ্রাজ) এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
১৪. দেশীয় রাজ্য বলতে কী বোঝো? উদাহরণ দাও।
✅ উত্তর: ব্রিটিশ শাসনাধিনে ভারতে এমন কিছু রাজ্য ছিল যেগুলি সরাসরি ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত হতো না, বরং দেশীয় রাজা বা নবাবরা ব্রিটিশদের অধীনতা মেনে নিয়ে শাসন করতেন। এদের দেশীয় রাজ্য বলা হতো।
উদাহরণ: কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, মহীশুর।
১৫. মেমনন বা ভি. পি. মেনন কে ছিলেন?
✅ উত্তর: তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব এবং ‘স্টেটস ডিপার্টমেন্ট’ বা দেশীয় রাজ্য দপ্তরের সচিব। সর্দার প্যাটেলের ডানহাত হিসেবে তিনি দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের সাথে যুক্ত করার কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৬. ‘আজাদ কাশ্মীর’ (POK) কী?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করে যে অংশটি দখল করে নেয় এবং যা আজও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আছে, তাকে পাকিস্তান ‘আজাদ কাশ্মীর’ বলে। ভারত একে ‘পাক অধিকৃত কাশ্মীর’ (PoK) বলে।
১৭. পেপসু (PEPSU) কী?
✅ উত্তর: PEPSU-র পুরো নাম ‘Patiala and East Punjab States Union’। ১৯৪৮ সালে পাঞ্জাবের ৮টি দেশীয় রাজ্য (পাতিয়ালা, জিন্দ, নাভা ইত্যাদি) নিয়ে এই ইউনিয়ন গঠিত হয়। পরে ১৯৫৬ সালে এটি পাঞ্জাব রাজ্যের সাথে মিশে যায়।
১৮. ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
✅ উত্তর: এই দিন ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় এবং ভারত একটি ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
১৯. জে.ভি.পি (JVP) কমিটি কী?
✅ উত্তর: ১৯৪৮ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি খতিয়ে দেখার জন্য কংগ্রেস জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল এবং পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। এঁদের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে একে JVP কমিটি বলা হয়। এই কমিটি ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করেছিল।
২০. চন্দননগর কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়?
✅ উত্তর: চন্দননগর ছিল ফরাসি উপনিবেশ। ১৯৪৯ সালে গণভোটের মাধ্যমে চন্দননগরের মানুষ ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেয়। ১৯৫৪ সালে এটি আইনত ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরে পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশে পরিণত হয়।
২১. গোয়া কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত হয়?
✅ উত্তর: ১৯৪৭-এর পরেও গোয়া পর্তুগিজদের দখলে ছিল। তারা গোয়া ছাড়তে না চাইলে ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে গোয়া অভিযান করে এবং ১৯ ডিসেম্বর গোয়াকে মুক্ত করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে।
২২. দেশভাগ জনিত উদবস্তু সমস্যার প্রতিফলনে রচিত দুটি গ্রন্থের নাম লেখো।
✅ উত্তর: ১) দক্ষিণারঞ্জন বসুর ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’।
২) অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’।
(এছাড়াও প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়াপাতার নৌকো’, খুশবন্ত সিং-এর ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’)।
২৩. সরকারি ভাষা আইন (১৯৬৩) সম্পর্কে কী জানো?
✅ উত্তর: এই আইন অনুযায়ী হিন্দিকে ভারতের সরকারি ভাষা (Official Language) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলির সুবিধার্থে ইংরেজিকেও অনির্দিষ্টকালের জন্য সহযোগী সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
২৪. পুনর্বাসনের যুগ (Era of Rehabilitation) বলতে কোন সময়কে বোঝায়?
✅ উত্তর: ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম দশ-পনেরো বছর ধরে সরকারকে লক্ষ লক্ষ উদবস্তুর বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। এই সময়কালকে (১৯৪৭-১৯৬৪) পুনর্বাসনের যুগ বলা হয়।
২৫. ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত ভাষা কয়টি ও কী কী (অষ্টম তফশিল)?
✅ উত্তর: বর্তমানে ভারতের সংবিধানে ২২টি ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শুরুতে এটি ছিল ১৪টি। হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলেগু, মারাঠি প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত।
২৬. সিকিম কবে ও কীভাবে ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়?
✅ উত্তর: ১৯৭৫ সালে সিকিমের জনগণ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। এরপর সংবিধানের ৩৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে সিকিম ভারতের ২২তম পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে যুক্ত হয়।