দশম শ্রেণী ইতিহাস: অধ্যায় -৮ উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত

বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)

বিষয়: ইতিহাস | অধ্যায়: উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৮ | পূর্ণমান:


১. স্বাধীনতার পর দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির সমস্যা এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা আলোচনা করো। (৩+৫)

উত্তর:

ভূমিকা: ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও তার অখণ্ডতা বিপন্ন ছিল। ভারতের সীমানার মধ্যে ৫৬২টি ছোট-বড় দেশীয় রাজ্য ছিল, যারা ব্রিটিশদের অধীনতা মুক্ত হয়ে স্বাধীন থাকার বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।

সমস্যা:

  • ভৌগোলিক অখণ্ডতা: দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের পেটের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তারা ভারতভুক্ত না হলে ভারতের মানচিত্র খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত।
  • নিরাপত্তা বিঘ্নিত: সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলি (যেমন কাশ্মীর, যোধপুর) পাকিস্তানের সাথে যোগ দিলে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতো।
  • যোগাযোগ ব্যবস্থা: রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।

সর্দার প্যাটেলের ভূমিকা:

ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এই সমস্যার সমাধান করেন।

  • দেশীয় রাজ্য দপ্তর গঠন: তিনি ১৯৪৬ সালের ২৭ জুন ‘দেশীয় রাজ্য দপ্তর’ (States Department) গঠন করেন এবং ভি. পি. মেননকে সচিব নিয়োগ করেন।
  • কূটনীতি: তিনি রাজাদের দেশপ্রেমের আহ্বান জানান এবং রাজন্যভাতা বা ‘প্রিভি পার্স’ (Privy Purse) ও সম্মান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
  • ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন: তিনি রাজাদের সামনে একটি চুক্তিপত্র রাখেন, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতের হাতে তুলে দিতে বলা হয়। ১৫ আগস্টের আগেই জুনাগড়, কাশ্মীর ও হায়দ্রাবাদ বাদে প্রায় সব রাজ্য এতে সই করে।
  • কঠোর পদক্ষেপ: যে সব রাজ্য সহজে রাজি হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশি ও সামরিক পদক্ষেপ নেন (যেমন- হায়দ্রাবাদে অপারেশন পোলো)।

উপসংহার: তাঁর এই লৌহকঠিন দৃঢ়তার জন্যই ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়। তাই তাঁকে ‘ভারতের লৌহমানব’ বা ‘ভারতের বিসমার্ক’ বলা হয়।

২. কাশ্মীর সমস্যা কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? এই সমস্যার বর্তমান পরিস্থিতি কী? (৫+৩)

উত্তর:

ভূমিকা: কাশ্মীর সমস্যা হলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদের মূল কারণ। এর সূত্রপাত হয় ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার ঠিক পরেই।

সমস্যার উদ্ভব:

  • রাজার দোটানা: কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ছিলেন হিন্দু, কিন্তু প্রজা ছিল মুসলিম গরিষ্ঠ। তিনি ভারত বা পাকিস্তান কারোর সাথেই যোগ না দিয়ে কাশ্মীরকে ‘সুইজারল্যান্ড’-এর মতো স্বাধীন রাখতে চেয়েছিলেন।
  • পাক আক্রমণ: পাকিস্তানের মদতে উপজাতি হানাদার বাহিনী এবং পাক সেনা ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর কাশ্মীর আক্রমণ করে এবং দ্রুত শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে।
  • ভারতভুক্তি: বিপদ দেখে হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ভারতের শর্ত মেনে তিনি ২৬ অক্টোবর ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’ দলিলে সই করেন। ফলে কাশ্মীর আইনত ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়।
  • যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতি: ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে গিয়ে হানাদারদের পিছু হঠায়। কিন্তু পূর্ণ মুক্তির আগেই বিষয়টি রাষ্ট্রপুঞ্জে (UNO) যায় এবং ১৯৪৮ সালে যুদ্ধবিরতি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও আজাদ কাশ্মীর:

  • যুদ্ধবিরতির সময় কাশ্মীরের যে অংশ পাকিস্তানের দখলে ছিল, তা আজও তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। পাকিস্তান একে ‘আজাদ কাশ্মীর’ বলে, আর ভারত বলে ‘পাক অধিকৃত কাশ্মীর’ (PoK)।
  • বাকি অংশ (জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ) ভারতের অন্তর্ভুক্ত।
  • কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ হয়েছে এবং এটি আজও একটি জ্বলন্ত আন্তর্জাতিক সমস্যা।

৩. হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়? (বিস্তারিত আলোচনা করো) (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: হায়দ্রাবাদ ছিল ভারতের বৃহত্তম ও সম্পদশালী দেশীয় রাজ্য। এর শাসক নিজাম উসমান আলি খান ভারতের পেটের ভেতর থেকেও পাকিস্তানের সাথে যোগ দেওয়ার বা স্বাধীন থাকার ষড়যন্ত্র করছিলেন।

অন্তর্ভুক্তির প্রেক্ষাপট:

  • নিজামের মনোভাব: নিজাম ভারতের সাথে ‘স্থিতাবস্থা চুক্তি’ (Standstill Agreement) করলেও তলে তলে অস্ত্র সংগ্রহ করছিলেন এবং পাকিস্তানের সাহায্য চাইছিলেন।
  • রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার: নিজামের মদতপুষ্ট কাসেম রিজভির নেতৃত্বে উগ্র সাম্প্রদায়িক ‘রাজাকার বাহিনী’ রাজ্যের হিন্দু প্রজা এবং কংগ্রেস কর্মীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার, খুন ও লুঠতরাজ শুরু করে।
  • কমিউনিস্ট আন্দোলন: তেলেঙ্গানা অঞ্চলে কৃষকরা নিজামের শোষণের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।

অপারেশন পোলো (Operation Polo):

  • পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সর্দার প্যাটেল কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল জে. এন. চৌধুরীর নেতৃত্বে হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করে।
  • এই পুলিশি অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন পোলো’।
  • মাত্র ৫ দিনের লড়াইয়ের পর ১৮ সেপ্টেম্বর নিজাম আত্মসমর্পণ করেন।

উপসংহার: ১৯৪৯ সালে হায়দ্রাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা দূর হয়।

৪. দেশভাগের ফলে উদ্ভূত উদ্বাস্তু সমস্যার প্রকৃতি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আলোচনা করো। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের করুণ পরিণতি ছিল উদ্বাস্তু সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে প্রাণভয়ে এপার-ওপার করতে বাধ্য হয়।

সমস্যার প্রকৃতি (পাঞ্জাব বনাম বাংলা):

  • পশ্চিম সীমান্ত (পাঞ্জাব): এখানে লোকবিনিময় ছিল আকস্মিক এবং ভয়াবহ দাঙ্গাপূর্ণ। প্রায় এককালীনভাবে হিন্দু-শিখরা ভারতে এবং মুসলিমরা পাকিস্তানে চলে যায়। ফলে সমস্যাটি ছিল তীব্র কিন্তু স্বল্পস্থায়ী। সরকার এখানে জমি ও সম্পত্তির বিনিময়ে পুনর্বাসন দিতে পেরেছিল।
  • পূর্ব সীমান্ত (বাংলা): এখানে দাঙ্গা কম হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে হিন্দুরা বছরের পর বছর ধরে ধাপে ধাপে ভারতে আসতে থাকে। এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত জমি না থাকায় এখানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।

পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ও সরকারের ভূমিকা:

  • ত্রাণ শিবির: সরকার স্কুল, কলেজ ও তাঁবু খাটিয়ে ত্রাণ শিবির খোলে। সেখানে খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
  • কলোনি স্থাপন: বিভিন্ন পতিত জমিতে, বিশেষ করে কলকাতার আশেপাশে জবরদখল কলোনি গড়ে ওঠে। সরকার পরে এগুলিকে নিয়মিত করে।
  • দণ্ডকারণ্য ও আন্দামান: স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক উদ্বাস্তুকে মধ্যপ্রদেশের দণ্ডকারণ্য ও আন্দামানে পাঠানো হয়, যা অনেক সময় বিতর্কের সৃষ্টি করে।

উপসংহার: উদ্বাস্তু সমস্যা সদ্য স্বাধীন ভারতের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিল, যার রেশ আজও রাজনীতিতে দেখা যায়।

৫. ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের আন্দোলন ও তার ফলাফল আলোচনা করো। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: ভারত একটি বহুভাষী দেশ। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশের জন্য ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবি ওঠে।

আন্দোলনের ধাপসমূহ:

  • কমিশন গঠন: ১৯৪৮ সালে ‘ধর কমিশন’ এবং ‘JVP কমিটি’ ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের বিরোধিতা করে। এতে দক্ষিণ ভারতে ক্ষোভ বাড়ে।
  • অন্ধ্র আন্দোলন: মাদ্রাজ প্রদেশ থেকে তেলেগু ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে পোট্টি শ্রীরামালু ১৯৫২ সালে ৫৮ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন।
  • প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য: শ্রীরামালুর মৃত্যুর পর ব্যাপক আন্দোলনের চাপে ১৯৫৩ সালে সরকার অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠন করতে বাধ্য হয়।

রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন ও আইন:

  • পরিস্থিতি বিচার করতে ১৯৫৩ সালে ফজল আলির নেতৃত্বে ‘রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন’ (SRC) গঠিত হয়।
  • এই কমিশনের সুপারিশে ১৯৫৬ সালে ‘রাজ্য পুনর্গঠন আইন’ পাস হয়।

ফলাফল:

  • ১৯৫৬ সালে ভারতকে ১৪টি ভাষাভিত্তিক রাজ্য ও ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
  • পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালে বোম্বাই ভেঙে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট এবং ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাব ভেঙে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা গঠিত হয়।

৬. জুনাগড় রাজ্যটি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়? বিস্তারিত লেখো। (৮)

উত্তর:

ভূমিকা: জুনাগড় ছিল গুজরাতের কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের একটি দেশীয় রাজ্য। এর ভারতভুক্তি ছিল নাটকীয়।

সংকটের সূচনা:

  • জুনাগড়ের শাসক বা নবাব মহবত খান ছিলেন মুসলিম, কিন্তু প্রজাদের ৮০ শতাংশ ছিল হিন্দু।
  • ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নবাব পাকিস্তানের সাথে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করেন, যা ভারতের অখণ্ডতার পরিপন্থী ছিল।

জনগণের বিদ্রোহ:

  • জুনাগড়ের জনগণ নবাবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
  • স্থানীয় নেতা সামলদাস গান্ধীর নেতৃত্বে ‘আরজি হুকুমত’ বা অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় এবং তারা জুনাগড় অভিযান শুরু করে।

ভারতভুক্তি:

  • বিদ্রোহের চাপে এবং ভারতীয় সেনা জুনাগড় ঘিরে ফেললে নবাব পাকিস্তানে পালিয়ে যান।
  • ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জুনাগড়ের দেওয়ান ভারতের কাছে প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন।
  • ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে গণভোট (Plebiscite) হয়। ৯৯% মানুষ ভারতের পক্ষে রায় দেয়।
  • ১৯৪৯ সালের ২০ জানুয়ারি জুনাগড় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

৭. নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি (দিল্লি চুক্তি) ১৯৫০-এর প্রেক্ষাপট ও শর্তগুলি আলোচনা করো। এটি কি উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল? (৫+৩)

উত্তর:

প্রেক্ষাপট: ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ প্রাণভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে নেহেরু ও লিয়াকত আলি খান দিল্লিতে বৈঠকে বসেন।

চুক্তির শর্তাবলী:

  • উভয় দেশ সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে।
  • উদ্বাস্তুরা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চাইলে তাদের সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হবে।
  • জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ বা বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে।
  • অপহৃতা নারীদের উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

মূল্যায়ন: এই চুক্তি সাময়িকভাবে দাঙ্গা ও উত্তেজনা কমিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের আগমন পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গের বাস্তুহারা মানুষদের ক্ষোভ প্রশমনে এই চুক্তি খুব একটা সফল হয়নি বলে অনেকে মনে করেন (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর প্রতিবাদে মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করেন)।

৮. স্বাধীনতার পর ভারতে ফরাসি ও পর্তুগিজ উপনিবেশগুলির সংযুক্তি কীভাবে ঘটেছিল? (চন্দননগর ও গোয়ার উদাহরণসহ) (৪+৪)

উত্তর:

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লেও ফরাসি ও পর্তুগিজরা তাদের উপনিবেশগুলি ছাড়েনি।

ক) ফরাসি উপনিবেশ (চন্দননগর ও পণ্ডিচেরি):

  • ফরাসিরা কিছুটা নমনীয় ছিল। ১৯৪৯ সালে চন্দননগরে গণভোট হয় এবং মানুষ ভারতের পক্ষে বিপুল ভোট দেয়। ১৯৫৪ সালে এটি ভারতের সাথে যুক্ত হয়।
  • অন্যান্য ফরাসি উপনিবেশ (পণ্ডিচেরি, কারাইকাল, মাহে, ইয়ানম) কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ১৯৫৪ সালে ভারত সরকারের হাতে আসে। ১৯৬২ সালে এগুলি আইনত ভারতের অংশ হয়।

খ) পর্তুগিজ উপনিবেশ (গোয়া, দমন, দিউ):

  • পর্তুগিজরা কোনোভাবেই গোয়া ছাড়তে রাজি ছিল না। তারা শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালায়।
  • অবশেষে ভারত সরকার সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৬১ সালের ১৭-১৮ ডিসেম্বর ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে ভারতীয় সেনা গোয়ায় প্রবেশ করে।
  • ১৯ ডিসেম্বর পর্তুগিজ গভর্নর আত্মসমর্পণ করেন এবং ৪৫০ বছরের পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে গোয়া ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত (রচনাধর্মী)


প্রশ্ন: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দেশীয় রাজ্য সংযুক্তিতে ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: সর্দার প্যাটেল ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ৫৬২টি বিচ্ছিন্ন দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করার অসাধ্য সাধন করেন। তিনি রাজাদের ভারতভুক্তি দলিলে সই করান এবং জুনাগড় বা হায়দ্রাবাদের মতো অবাধ্য রাজ্যগুলির বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেন। তাঁর এই দৃঢ়তার জন্যই ভারত খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

প্রশ্ন: কাশ্মীর সমস্যা কীভাবে তৈরি হয়?

উত্তর: ১৯৪৭ সালে রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান—কারোর সাথেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। সেই সুযোগে পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করে। তখন হরি সিং ভারতের সাহায্য চেয়ে ভারতভুক্তি দলিলে সই করেন। ভারতীয় সেনা কাশ্মীর রক্ষা করলেও পাকিস্তান কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ (PoK) দখল করে রাখে, যা আজও বিবাদের কারণ।

প্রশ্ন: হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত হয়?

উত্তর: হায়দ্রাবাদের নিজাম ভারতের সাথে যোগ দিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁর রাজাকার বাহিনী প্রজাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। শেষপর্যন্ত ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সর্দার প্যাটেল সেনা পাঠিয়ে (অপারেশন পোলো) হায়দ্রাবাদ দখল করেন এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন।

প্রশ্ন: উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে সরকারের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: দেশভাগের ফলে আসা বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুর জন্য সরকার ত্রাণ শিবির, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তাদের থাকার জন্য বিভিন্ন কলোনি তৈরি করা হয় এবং দণ্ডকারণ্যের মতো পুনর্বাসন প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি উদ্বাস্তুদের নিজস্ব সংগ্রামও পুনর্বাসনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার