দশম শ্রেণী ভূগোল: অধ্যায় – 2 ‘বায়ুমন্ডল’
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বায়ুমণ্ডল | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-২০ | পূর্ণমান: ৫
১. বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার তারতম্য অনুযায়ী প্রধান স্তরগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও। (চিত্রসহ) [মাধ্যমিক ২০১৭, ২০১৯]
ভূমিকা: উষ্ণতার তারতম্য অনুসারে বায়ুমণ্ডলকে প্রধানত ৬টি স্তরে ভাগ করা যায়। নিচে প্রধান স্তরগুলির বর্ণনা দেওয়া হলো:
- ১. ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere): এটি ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তর (গড় উচ্চতা ১২-১৮ কিমি)। এখানে প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে ৬.৪°C হারে উষ্ণতা কমে। ঝড়, বৃষ্টি, মেঘ এখানে সৃষ্টি হয় বলে একে ‘ক্ষুব্ধমণ্ডল’ বলে।
- ২. স্ট্রাটোস্ফিয়ার (Stratosphere): ট্রপোস্ফিয়ারের ওপরে ৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে উচ্চতা বাড়লে উষ্ণতা বাড়ে। মেঘ বা ঝড় না থাকায় একে ‘শান্তমণ্ডল’ বলে। ওজোন স্তর এখানেই থাকে।
- ৩. মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere): ৫০-৮০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি বায়ুমণ্ডলের শীতলতম স্তর (প্রায় -৯৩°C)। এখানে উল্কাপিণ্ড পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
- ৪. থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere): ৮০-৫০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ে। এর নিচের অংশকে আয়নোস্ফিয়ার বলে, যেখান থেকে বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়।
- ৫. এক্সোস্ফিয়ার ও ম্যাগনেটোস্ফিয়ার: এর ওপরের স্তরগুলি ক্রমশ মহাকাশে মিশে গেছে।
[attachment_0](attachment)
২. ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তরের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
ক) ট্রপোস্ফিয়ার:
- বৈশিষ্ট্য: এটি সবচেয়ে ঘন স্তর। বায়ুমণ্ডলের ৭৫% গ্যাসীয় উপাদান ও প্রায় সমস্ত জলীয় বাষ্প ও ধূলিকণা এখানেই থাকে। উচ্চতা বাড়লে উষ্ণতা কমে।
- গুরুত্ব: এই স্তরেই আমরা শ্বাসকার্য চালাই। বৃষ্টিপাত, ঋতু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার সমস্ত ঘটনা এখানেই ঘটে, যা জীবজগতের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
খ) স্ট্রাটোস্ফিয়ার:
- বৈশিষ্ট্য: এখানে জলীয় বাষ্প নেই বললেই চলে। ২০-৩৫ কিমি উচ্চতায় ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (ওজোনস্ফিয়ার)।
- গুরুত্ব: ১) ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীকে রক্ষা করে। ২) ঝড়-বৃষ্টি না থাকায় এই স্তরের মধ্য দিয়ে জেট বিমান চলাচল করে।
৩. বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রক বা তারতম্যের প্রধান তিনটি কারণ ব্যাখ্যা করো। [মাধ্যমিক ২০১৮]
পৃথিবীর সব স্থানে তাপমাত্রা সমান হয় না। এর প্রধান তিনটি কারণ হলো:
- ১. অক্ষাংশ (Latitude): নিরক্ষরেখায় সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে, তাই সেখানে উষ্ণতা সবচেয়ে বেশি। মেরুর দিকে সূর্যরশ্মি ক্রমশ তির্যকভাবে পড়ে, ফলে তাপ কম হয়। অক্ষাংশ বাড়লে উষ্ণতা কমে।
- ২. উচ্চতা (Altitude): ট্রপোস্ফিয়ারে প্রতি ১ কিমি উচ্চতা বৃদ্ধিতে ৬.৪°C হারে তাপমাত্রা কমে। তাই একই অক্ষাংশে অবস্থিত হলেও সমভূমির (যেমন- শিলিগুড়ি) চেয়ে পার্বত্য অঞ্চল (যেমন- দার্জিলিং) বেশি শীতল হয়।
- ৩. স্থলভাগ ও জলভাগের বন্টন: স্থলভাগ জলভাগের চেয়ে দ্রুত গরম এবং দ্রুত ঠান্ডা হয়। তাই সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে জলবায়ু সমভাবাপন্ন থাকে (যেমন- মুম্বাই), কিন্তু সমুদ্র থেকে দূরের স্থানে জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হয় (যেমন- দিল্লি)।
৪. বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) কী? এর তিনটি প্রধান প্রভাব আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
সংজ্ঞা: গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির ($CO_2, CH_4, CFC$) ঘনত্ব বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
প্রভাব:
- ১. মেরু অঞ্চলের বরফ গলন: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আন্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাচ্ছে, যা বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে।
- ২. সমুদ্র জলতল বৃদ্ধি: বরফ গলা জল সমুদ্রে মিশে জলতল বাড়াচ্ছে। এর ফলে মালদ্বীপ, সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলি মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
- ৩. আবহাওয়ার পরিবর্তন: সুপার সাইক্লোন, খরা, দাবানল এবং অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। কৃষিকাজ ও শস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
[attachment_1](attachment)
৫. পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়গুলির সাথে নিয়ত বায়ুপ্রবাহের সম্পর্ক চিত্রসহ আলোচনা করো। [খুবই গুরুত্বপূর্ণ]
বায়ুচাপ বলয়গুলির অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই নিয়ত বায়ু প্রবাহিত হয়। বায়ু সর্বদা উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে বয়।
- আয়ন বায়ু (Trade Winds): কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আয়ন বায়ু বলে (উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব)।
- পশ্চিমা বায়ু (Westerlies): কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে দুই মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে পশ্চিমা বায়ু বলে (দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম)।
- মেরু বায়ু (Polar Winds): দুই মেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে অত্যন্ত শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে মেরু বায়ু বলে।
[attachment_2](attachment)
৬. চিত্রসহ পৃথিবীর প্রধান বায়ুচাপ বলয়গুলির বর্ণনা দাও।
পৃথিবীতে মোট ৭টি বায়ুচাপ বলয় আছে:
- ১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়: ৫° উত্তর থেকে ৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ। এখানে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে বলে বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়।
- ২-৩. কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়: উভয় গোলার্ধে ২৫°-৩৫° অক্ষাংশ। ওপর থেকে শীতল বায়ু নিচে নেমে এখানে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে।
- ৪-৫. মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়: উভয় গোলার্ধে ৬০°-৭০° অক্ষাংশ। পৃথিবীর আবর্তনের ফলে এখান থেকে বায়ু ছিটকে যায়, তাই নিম্নচাপ হয়।
- ৬-৭. মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়: দুই মেরু অঞ্চলে (৮০°-৯০°) অত্যধিক ঠান্ডার কারণে বায়ু ভারী হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে।
[attachment_3](attachment)
৭. ক্রান্তীয় মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তি ও ভারতের জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব আলোচনা করো।
উৎপত্তি: স্থলভাগ ও জলভাগের অসম উষ্ণতা এবং চাপের পার্থক্যের কারণে মৌসুমি বায়ুর সৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মকালে ভারতের ওপর নিম্নচাপ এবং ভারত মহাসাগরে উচ্চচাপ থাকায় সমুদ্র থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশ করে।
প্রভাব:
- বৃষ্টিপাত: ভারতের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৯০% এই বায়ুর প্রভাবে ঘটে। এটি কৃষি ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
- উষ্ণতা হ্রাস: গ্রীষ্মের শেষে এই বায়ুর আগমনে তাপমাত্রা কমে এবং আরামদায়ক আবহাওয়া সৃষ্টি হয়।
- ঋতু পরিবর্তন: মৌসুমি বায়ুর আগমন (বর্ষা) ও প্রত্যাগমন (শরৎ/শীত) ভারতের ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ করে।
৮. স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ুর সৃষ্টির কারণ চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।
সমুদ্রবায়ু (Sea Breeze): দিনের বেলা সূর্যতাপে স্থলভাগ জলভাগের চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়। ফলে স্থলভাগে নিম্নচাপ এবং সমুদ্রে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। তাই দিনের বেলায় (বিকেলে) সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে যে বায়ু বয়, তাকে সমুদ্রবায়ু বলে।
স্থলবায়ু (Land Breeze): রাতে স্থলভাগ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয় (উচ্চচাপ), কিন্তু সমুদ্রের জল তখনও গরম থাকে (নিম্নচাপ)। তাই রাতে (মূলত ভোরে) স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে যে বায়ু বয়, তাকে স্থলবায়ু বলে।
[attachment_4](attachment)
৯. ঘূর্ণবাত (Cyclone) ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের (Anticyclone) মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো। (৫)
| বিষয় | ঘূর্ণবাত | প্রতীপ ঘূর্ণবাত |
|---|---|---|
| ১. কেন্দ্রের চাপ | কেন্দ্রে গভীর নিম্নচাপ এবং বাইরে উচ্চচাপ থাকে। | কেন্দ্রে উচ্চচাপ এবং বাইরে নিম্নচাপ থাকে। |
| ২. বায়ুর দিক | বায়ু বাইরে থেকে কেন্দ্রের দিকে কুন্ডলাকারে ছুটে আসে। | বায়ু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়। |
| ৩. আবহাওয়া | আকাশ মেঘলা থাকে, ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয় (দুর্যোগপূর্ণ)। | আকাশ মেঘমুক্ত থাকে এবং শান্ত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে। |
| ৪. স্থায়িত্ব | এটি ক্ষণস্থায়ী কিন্তু বিধ্বংসী। | এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং শান্ত প্রকৃতির। |
১০. পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণগুলি (বায়ুপ্রবাহ, উষ্ণতা, লবণাক্ততা) আলোচনা করো। (এটি বারিমণ্ডলের সাথেও যুক্ত, কিন্তু বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে ঘটে)
- ১. নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ হলো বায়ুপ্রবাহ। আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু সমুদ্রের জলরাশিকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।
- ২. উষ্ণতার পার্থক্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ জল হালকা হয়ে পৃষ্ঠপ্রবাহরূপে মেরুর দিকে যায় এবং মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃপ্রবাহরূপে নিরক্ষরেখার দিকে আসে।
- ৩. লবণাক্ততার পার্থক্য: বেশি লবণাক্ত জল ভারী হওয়ায় নিচে ডুবে যায় এবং কম লবণাক্ত জল ওপরে ভেসে ওঠে, এর ফলে স্রোতের সৃষ্টি হয়।
- ৪. পৃথিবীর আবর্তন: কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
বিভাগ-ঙ: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-২)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বায়ুমণ্ডল | প্রশ্ন সংখ্যা: ১১-২০ | পূর্ণমান: ৫
১১. পরিচলন বৃষ্টিপাত (Convectional Rainfall) কীভাবে সংঘটিত হয়? পৃথিবীর কোন অঞ্চলে এই বৃষ্টিপাত বেশি হয়? (চিত্রসহ) [মাধ্যমিক ২০১৮]
গঠন প্রক্রিয়া:
- প্রখর সূর্যতাপে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন জলাশয় থেকে জল বাষ্পীভূত হয় এবং স্থলভাগ উত্তপ্ত হয়।
- এই উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু হালকা হয়ে সোজা ওপরের দিকে উঠে যায় (পরিচলন স্রোত)।
- ওপরে উঠে বায়ু প্রসারিত ও শীতল হয়। তখন ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় জলীয় বাষ্প জলকণায় পরিণত হয়ে কিউমুলোলিম্বাস মেঘ সৃষ্টি করে।
- শেষে বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়।
অঞ্চল: এই বৃষ্টিপাত মূলত নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর ধরে দেখা যায়। এখানে প্রতিদিন বিকেলে এই বৃষ্টি হয় বলে একে ‘4 O’clock Rain’ বলে।
[attachment_0](attachment)
১২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic Rainfall) কীভাবে ঘটে? বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করো। (চিত্রসহ) [মাধ্যমিক ২০১৯]
গঠন প্রক্রিয়া:
- সমুদ্র থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু প্রবাহপথে কোনো পর্বত বা উচ্চভূমিতে বাধা পেলে, তা পর্বতের গা বেয়ে ওপরে উঠতে বাধ্য হয়।
- ওপরে ওঠার ফলে বায়ু প্রসারিত ও শীতল হয় এবং সম্পৃক্ত হয়ে ঘনীভূত হয়।
- তখন পর্বতের বাধার দিকের ঢালে বা প্রতিবাত ঢালে (Windward Side) প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। একে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি বলে।
বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল: বায়ু যখন পর্বতের অপর পাশের ঢাল বা অনুবাত ঢাল (Leeward Side) দিয়ে নিচে নামে, তখন তাতে জলীয় বাষ্প কমে যায় এবং উষ্ণতা বাড়ায় ঘনীভবন হয় না। ফলে সেখানে বৃষ্টি খুব কম হয়। এই অঞ্চলকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে (যেমন- পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব ঢালে পুনে বা দাক্ষিণাত্য মালভূমি)।
[attachment_1](attachment)
১৩. ঘূর্ণবাত বৃষ্টিপাত (Cyclonic Rainfall) কীভাবে হয়? ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাতের বৃষ্টির পার্থক্য কী?
প্রক্রিয়া: নিম্নচাপ কেন্দ্রে চারপাশ থেকে ছুটে আসা বায়ু কুণ্ডলাকারে ওপরে উঠে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে যে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তাকে ঘূর্ণবাত বৃষ্টি বলে।
পার্থক্য:
- ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত: এতে প্রবল ঝড় ও বজ্রবিদ্যুৎসহ অল্প সময়ে মুষলধারে বৃষ্টি হয় (যেমন- সাইক্লোন)।
- নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত: এতে উষ্ণ ও শীতল বায়ুপুঞ্জের মিলনে (Frontal Rain) দীর্ঘ সময় ধরে ঝিরঝire বৃষ্টি হয়।
১৪. মৌসুমি বায়ুর সাথে জেট বায়ুর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো। (৫)
মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমন বা ফিরে যাওয়া মূলত জেট স্ট্রিম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
- গ্রীষ্মকাল (আগমন): গ্রীষ্মকালে তিব্বত মালভূমি অত্যধিক গরম হয়ে যায়। এর ফলে সেখানে ‘ক্রান্তীয় পুবালি জেট’ (Tropical Easterly Jet) সৃষ্টি হয়। এই জেট বায়ু ওপরের স্তরে উচ্চচাপ তৈরি করে এবং ভারতের ভূখণ্ডের ওপর নিম্নচাপকে শক্তিশালী করে, যা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে ভারতের দিকে টেনে আনে।
- শীতকাল (প্রত্যাগমন): শীতকালে হিমালয়ের দক্ষিণে ‘উপক্রান্তীয় পশ্চিমী জেট’ (Sub-tropical Westerly Jet) অবস্থান করে। এটি উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুকে ভারত থেকে বিদায় নিতে সাহায্য করে এবং ভূমধ্যসাগর থেকে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বয়ে আনে।
১৫. ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের (Mediterranean Climate) অবস্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
অবস্থান: উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের ৩০°-৪৫° অক্ষাংশের মধ্যে মহাদেশগুলির পশ্চিম ভাগে এই জলবায়ু দেখা যায় (যেমন- ইতালি, ফ্রান্স, ক্যালিফোর্নিয়া)।
বৈশিষ্ট্য:
- শুষ্ক গ্রীষ্মকাল: গ্রীষ্মকালে এখানে আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয় যা শুষ্ক থাকে, তাই বৃষ্টি হয় না। আকাশ পরিষ্কার ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল থাকে।
- আর্দ্র শীতকাল: শীতকালে সূর্য দক্ষিণায়নের ফলে পশ্চিমা বায়ু এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে শীতকালে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
- ফল চাষ: এই জলবায়ু ফলের (আঙুর, জলপাই, কমলালেবু) চাষের জন্য বিখ্যাত।
১৬. নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলের (Equatorial Climate) বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। [মাধ্যমিক ২০২০]
বৈশিষ্ট্য:
- উষ্ণতা: এখানে সারা বছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়, তাই বার্ষিক গড় উষ্ণতা ২৭°C থাকে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় সমান এবং ঋতু পরিবর্তন হয় না।
- বৃষ্টিপাত: প্রতিদিন বিকেলে পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২০০-৩০০ সেমি।
- আর্দ্রতা: বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা সারা বছর খুব বেশি থাকে, ফলে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়।
- উদ্ভিদ: অত্যধিক তাপ ও বৃষ্টির জন্য এখানে চিরহরিৎ বা চিরসবুজ অরণ্য (সেলভা) গড়ে উঠেছে।
১৭. মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের (Monsoon Climate) প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই জলবায়ু দেখা যায়।
- ঋতু পরিবর্তন: এখানে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত—এই চারটি ঋতুর স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়।
- বিপরীতমুখী বায়ু: গ্রীষ্মকালে সমুদ্র থেকে স্থলে (আর্দ্র) এবং শীতকালে স্থল থেকে সমুদ্রে (শুষ্ক) বায়ু প্রবাহিত হয়।
- বৃষ্টিপাত: বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮০-৯০% কেবল বর্ষাকালেই (জুন-সেপ্টেম্বর) হয়। বৃষ্টিপাত অনিয়মিত ও অনিশ্চিত।
- উদ্ভিদ: এখানে মূলত পর্ণমোচী বা পাতাঝরা অরণ্য দেখা যায়।
১৮. এল নিনো (El Nino) ও লা নিনা (La Nina)-র প্রভাব বিশ্ব জলবায়ুতে কীরূপ? (তুলনামূলক আলোচনা)
| বিষয় | এল নিনো | লা নিনা |
|---|---|---|
| ১. প্রকৃতি | প্রশান্ত মহাসাগরের পেরু উপকূলে সৃষ্ট উষ্ণ সমুদ্রস্রোত। | একই স্থানে সৃষ্ট শীতল সমুদ্রস্রোত (এল নিনোর বিপরীত)। |
| ২. ভারতের ওপর প্রভাব | এর প্রভাবে ভারতে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয় এবং খরা দেখা দেয়। | এর প্রভাবে মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী হয় এবং ভারতে বন্যা বা অতিবৃষ্টি হয়। |
| ৩. বিশ্বব্যাপী প্রভাব | পেরু ও চিলিতে বন্যা হয়, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা হয়। | পেরুতে খরা হয়, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় বন্যা হয়। |
১৯. বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কী প্রভাব পড়ছে? (৫)
জলবায়ুর ওপর প্রভাব:
- আবহাওয়ার পরিবর্তন: খরা, বন্যা, সাইক্লোন ও দাবানলের তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়ছে।
- ঋতু পরিবর্তন: ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, শীতকাল ছোট হচ্ছে এবং গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হচ্ছে।
জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব:
- বাসস্থান বিনাশ: মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় পেঙ্গুইন ও মেরু ভাল্লুকের অস্তিত্ব বিপন্ন।
- প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস: সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ায় প্রবাল প্রাচীরগুলি সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে (Coral Bleaching), যা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে।
- কৃষি ক্ষতি: শস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে।
২০. বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার স্তরের উচ্চতা নিরক্ষীয় অঞ্চলে বেশি এবং মেরু অঞ্চলে কম কেন? ল্যাপস রেট ও বৈপরীত্য উত্তাপের সম্পর্ক কী? (৩+২)
ট্রপোস্ফিয়ারের উচ্চতা: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে, তাই বায়ু খুব উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে অনেক ওপরে (প্রায় ১৮ কিমি) উঠে যায়। ফলে ট্রপোস্ফিয়ার এখানে বিস্তৃত। কিন্তু মেরু অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাতাস ভারী হয়ে নিচে নেমে থাকে, তাই সেখানে এর উচ্চতা কম (প্রায় ৮ কিমি)।
ল্যাপস রেট ও বৈপরীত্য উত্তাপ: স্বাভাবিক ল্যাপস রেট অনুযায়ী উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা কমে। কিন্তু বৈপরীত্য উত্তাপে এই নিয়ম উল্টে যায়, অর্থাৎ উচ্চতা বাড়লে তাপমাত্রা বাড়ে। এটি ল্যাপস রেটের ঠিক বিপরীত বা নেতিবাচক ল্যাপস রেট।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বায়ুমণ্ডল (রচনাধর্মী)
প্রশ্ন: বিশ্ব উষ্ণায়নের তিনটি প্রধান প্রভাব কী?
২) জলতল বৃদ্ধি: সমুদ্রের জলস্তর বাড়ায় সুন্দরবনের মতো নিচু এলাকাগুলি ডুবে যাচ্ছে।
৩) আবহাওয়া পরিবর্তন: ঘূর্ণিঝড়, খরা ও অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে।
[attachment_0](attachment)
প্রশ্ন: মৌসুমি বায়ুর ওপর জেট স্ট্রিমের প্রভাব কী?
প্রশ্ন: পরিচলন বৃষ্টিপাত কেন নিরক্ষীয় অঞ্চলে বেশি হয়?
প্রশ্ন: এল নিনো (El Nino) কী?
প্রশ্ন: বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার স্তরের গুরুত্ব কী?