দশম শ্রেণী ভূগোল: অধ্যায় – 3 ‘বারিমন্ডল’
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-১)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বারিমণ্ডল | প্রশ্ন সংখ্যা: ১-৯ | পূর্ণমান: ৩
১. সমুদ্রস্রোত ও সমুদ্রতরঙ্গের মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৭]
| বিষয় | সমুদ্রস্রোত (Ocean Current) | সমুদ্রতরঙ্গ (Ocean Wave) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | সমুদ্রের জলরাশির এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত প্রবাহকে সমুদ্রস্রোত বলে। | সমুদ্রের জলরাশির একই স্থানে ওঠানামা বা আন্দোলনকে সমুদ্রতরঙ্গ বলে। |
| ২. স্থান পরিবর্তন | এতে জলরাশির উল্লম্ব ও অনুভূমিক—উভয় প্রকার স্থান পরিবর্তন ঘটে। | এতে জলরাশির কেবল উল্লম্ব সরণ ঘটে, অনুভূমিক স্থান পরিবর্তন হয় না। |
| ৩. কারণ | নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর আবর্তন, উষ্ণতা ও লবণাক্ততার পার্থক্য এর কারণ। | মূলত বায়ুপ্রবাহের ঘর্ষণের ফলে এটি সৃষ্টি হয়। |
[attachment_0](attachment)
২. সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো। (৩টি কারণ) [মাধ্যমিক ২০১৮]
সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হলো:
- ১. নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: আয়ন বায়ু ও পশ্চিমা বায়ু সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলরাশিকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। এটিই স্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ।
- ২. পৃথিবীর আবর্তন: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত সোজাপথে না গিয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় (ফেরেলের সূত্র)।
- ৩. উষ্ণতার তারতম্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও হালকা জল বহিঃস্রোত রূপে মেরুর দিকে এবং মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষরেখার দিকে প্রবাহিত হয়।
৩. মগ্নচড়া (Bank) কীভাবে সৃষ্টি হয়? মগ্নচড়াগুলি বাণিজ্যিক মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত কেন?
সৃষ্টি: মেরু অঞ্চল থেকে আসা শীতল স্রোতের সাথে ভেসে আসা বিশাল হিমশৈলগুলি যখন উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে আসে, তখন সেগুলি গলে যায়। এর ফলে হিমশৈলে আবদ্ধ নুড়ি, পাথর ও বালি সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত হয়ে অগভীর সমুদ্রতলের বা মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে (যেমন- গ্র্যান্ড ব্যাংকস)।
মৎস্যক্ষেত্রের কারণ: মগ্নচড়াগুলি অগভীর হওয়ায় এখানে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনে এখানে প্রচুর **প্ল্যাঙ্কটন** (মাছের খাদ্য) জন্মায়। খাদ্যের লোভে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমাবেশ ঘটে, তাই এগুলি মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত।
৪. ভরা কোটাল (Spring Tide) ও মরা কোটাল (Neap Tide)-এর মধ্যে পার্থক্য লেখো। [মাধ্যমিক ২০১৯]
| বিষয় | ভরা কোটাল | মরা কোটাল |
|---|---|---|
| ১. তিথি | অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে ঘটে। | কৃষ্ণ ও শুক্ল পক্ষের অষ্টমী তিথিতে ঘটে। |
| ২. অবস্থান | চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী এক সরলরেখায় (সিজিগি) থাকে। | চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে সমকোণে ($90^\circ$) থাকে। |
| ৩. প্রাবল্য | এতে জোয়ারের জলস্ফীতি বা প্রাবল্য সর্বাধিক হয়। | এতে জোয়ারের জলস্ফীতি বা প্রাবল্য সবচেয়ে কম হয়। |
[attachment_1](attachment)
৫. জলবায়ুর ওপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাবগুলি লেখো।
সমুদ্রস্রোত উপকূলবর্তী অঞ্চলের জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে:
- উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ: উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হলে উপকূলের তাপমাত্রা বাড়ে (যেমন- উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে নরওয়ে উপকূল বরফমুক্ত থাকে)। শীতল স্রোত তাপমাত্রাকে কমিয়ে দেয়।
- বৃষ্টিপাত: উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে আসা বায়ু প্রচুর জলীয় বাষ্প ধারণ করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- মরুভূমি সৃষ্টি: শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে আসা শুষ্ক বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টি হয় না, ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মরুভূমি সৃষ্টি হয় (যেমন- কালাহারি, আটাকামা)।
৬. নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে ঘন কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্ঝা সৃষ্টি হয় কেন?
নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের কাছে দক্ষিণ দিক থেকে আসা উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং উত্তর দিক থেকে আসা শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলন ঘটে।
- কুয়াশা: এই দুই বিপরীতধর্মী স্রোতের মিলনে তাপমাত্রার ব্যাপক পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। উষ্ণ বায়ুর সংস্পর্শে শীতল বায়ু এসে ঘনীভূত হয়ে ঘন কুয়াশার (Fog) সৃষ্টি করে, যা জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়।
- ঝড়ঝঞ্ঝা: তাপমাত্রার এই তারতম্যের কারণে এখানে প্রায়ই প্রবল ঘূর্ণবাত ও ঝড়ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়।
৭. সিজিগি (Syzygy) কী? সংযোগ ও প্রতিযোগ অবস্থানের চিত্রসহ বর্ণনা দাও।
সিজিগি: যখন সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে, তখন সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় অবস্থানকে সিজিগি বলে। এটি দুই প্রকার:
- সংযোগ (Conjunction): অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে থাকে। অর্থাৎ সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর একই দিকে থাকে।
- প্রতিযোগ (Opposition): পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে থাকে। অর্থাৎ সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর বিপরীত দিকে থাকে।
এই উভয় অবস্থানেই ভরা কোটাল বা প্রবল জোয়ার হয়।
৮. সারাষাঁড়ির বান (Sariban) কী? এটি কেন হয়?
সংজ্ঞা: বর্ষাকালে ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের জল যখন হুগলি নদীর মোহনা দিয়ে প্রবল গর্জনে ও জলোচ্ছ্বাসে খাড়া দেওয়ালের মতো নদীর উজান দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে স্থানীয় ভাষায় সারাষাঁড়ির বান বলে।
কারণ: ১) নদীর মোহনা ফানেল আকৃতির হওয়ায় জোয়ারের জল কূল ছাপিয়ে যায়। ২) নদীতে বর্ষার জলের চাপ এবং জোয়ারের জলের সংঘাতের ফলে এই প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়। এটি ষাঁড়ের গর্জনের মতো শব্দ করে বলে এমন নাম।
[attachment_2](attachment)
৯. উষ্ণ স্রোত ও শীতল স্রোতের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।
| বিষয় | উষ্ণ স্রোত | শীতল স্রোত |
|---|---|---|
| ১. উৎস | নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়। | মেরু অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়। |
| ২. প্রবাহের ধরন | এটি সমুদ্রের উপরিভাগ দিয়ে বহিঃস্রোত রূপে প্রবাহিত হয়। | এটি সমুদ্রের গভীর দিয়ে অন্তঃস্রোত রূপে প্রবাহিত হয়। |
| ৩. প্রভাব | উপকূলের তাপমাত্রা বাড়ায় ও বৃষ্টিপাত ঘটায়। | উপকূলের তাপমাত্রা কমায় ও কুয়াশা সৃষ্টি করে। |
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-২)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বারিমণ্ডল | প্রশ্ন সংখ্যা: ১০-১৮ | পূর্ণমান: ৩
১০. জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির কারণগুলি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির প্রধান দুটি কারণ হলো:
- ১. মহাকর্ষীয় আকর্ষণ: চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণেই মূলত জোয়ার হয়। সূর্যের ভর চাঁদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি হলেও, চাঁদ পৃথিবীর অনেক কাছে (৩.৮৪ লক্ষ কিমি) অবস্থিত। তাই জোয়ার সৃষ্টিতে চাঁদের প্রভাব সূর্যের চেয়ে প্রায় ২.২ গুণ বেশি।
- ২. কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force): পৃথিবী নিজের মেরুদণ্ডের ওপর ঘোরার ফলে যে কেন্দ্রবিমুখ বা কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয়, তার প্রভাবে চাঁদের বিপরীত দিকের জলরাশি ছিটকে গিয়ে ফুলে ওঠে এবং গৌণ জোয়ার সৃষ্টি করে।
[attachment_0](attachment)
১১. অ্যাপোজী (Apogee) ও পেরিজি (Perigee) অবস্থানের পার্থক্য লেখো।
| বিষয় | পেরিজি (Perigee) | অ্যাপোজী (Apogee) |
|---|---|---|
| ১. দূরত্ব | পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় (প্রায় ৩,৫৬,০০০ কিমি)। | পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব সবচেয়ে বেশি হয় (প্রায় ৪,০৭,০০০ কিমি)। |
| ২. জোয়ারের প্রাবল্য | দূরত্ব কম থাকায় আকর্ষণ বেশি হয়, ফলে জোয়ারের জলস্ফীতি বা প্রাবল্য বাড়ে (প্রায় ২০%)। | দূরত্ব বেশি থাকায় আকর্ষণ কম হয়, ফলে জোয়ারের প্রাবল্য কমে। |
১২. দুটি মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট হয় কেন? [খুব গুরুত্বপূর্ণ]
পৃথিবী নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয়।
- পৃথিবী যখন একবার পূর্ণ আবর্তন করে (২৪ ঘণ্টায়), সেই সময়ে চাঁদ তার কক্ষপথে পৃথিবীর গতির দিকে প্রায় $১৩^\circ$ পথ এগিয়ে যায়।
- পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখাকে সেই এগিয়ে যাওয়া চাঁদের সামনে আবার ফিরে আসতে বাড়তি পথ ঘুরতে হয়, যার জন্য প্রায় ৫২ মিনিট সময় বেশি লাগে।
- তাই কোনো স্থানে একবার মুখ্য জোয়ার হওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট পর আবার মুখ্য জোয়ার হয়।
১৩. বান ডাকার (Tidal Bore) অনুকূল পরিবেশ বা শর্তগুলি লেখো।
সব নদীতে বান ডাকে না। বান ডাকার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলি প্রয়োজন:
- ফানেল আকৃতির মোহনা: নদীর মোহনা খুব প্রশস্ত বা ফানেল আকৃতির হতে হবে যাতে জোয়ারের জল সহজে ঢুকতে পারে কিন্তু বেরোতে বাধা পায়।
- জলের প্রাচুর্য: নদীতে জলের পরিমাণ ও স্রোত যথেষ্ট থাকতে হবে (সাধারণত বর্ষাকালে)।
- প্রবল জোয়ার: অমাবস্যা বা পূর্ণিমার ভরা কোটালের সময় জোয়ারের জলস্ফীতি বেশি হলে বান ডাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
১৪. উপসাগরীয় স্রোত (Gulf Stream) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
এটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিখ্যাত উষ্ণ স্রোত।
- উৎপত্তি ও গতিপথ: উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত মেক্সিকো উপসাগরে প্রবেশ করে ‘উপসাগরীয় স্রোত’ নাম নেয়। এরপর এটি উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ইউরোপের দিকে যায়।
- বৈশিষ্ট্য: এই স্রোতের জল গাঢ় নীল রঙের হয়, তাই একে ‘নীল স্রোত’ বলে।
- প্রভাব: এই উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে শীতকালেও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও নরওয়ের উপকূল বরফমুক্ত থাকে এবং বন্দরগুলি সচল থাকে।
১৫. কুরোশিয় স্রোত বা জাপান স্রোতের বর্ণনা দাও।
এটি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রধান উষ্ণ স্রোত।
- গতিপথ: উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের কাছে বাধা পেয়ে উত্তর দিকে ঘুরে জাপানের পূর্ব উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয়।
- নামকরণ: জাপানি ভাষায় ‘কুরোশিয়’ কথার অর্থ ‘কালো স্রোত’। এই স্রোতের জলের রং গাঢ় নীল বা কালচে হওয়ায় এই নাম।
- শাখা: এটি পরে সুসিমা স্রোত ও উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত নামে বিভক্ত হয়।
১৬. মুখ্য জোয়ার ও গৌণ জোয়ারের পার্থক্য কী?
| বিষয় | মুখ্য জোয়ার | গৌণ জোয়ার |
|---|---|---|
| ১. কারণ | চাঁদের প্রত্যক্ষ মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয়। | পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সৃষ্টি হয়। |
| ২. অবস্থান | পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের সামনে থাকে, সেখানে হয়। | মুখ্য জোয়ারের ঠিক বিপরীত বা প্রতিপাদ স্থানে হয়। |
| ৩. জলস্ফীতি | এতে জলস্ফীতির পরিমাণ বা বেগ বেশি হয়। | তুলনামূলকভাবে জলস্ফীতি কম হয়। |
১৭. মানবজীবনে বা অর্থনীতির ওপর জোয়ার-ভাটার তিনটি প্রভাব লেখো।
- নৌ-চলাচল: জোয়ারের সময় নদীর মোহনায় জলতল বাড়ে (যেমন- হুগলি নদী), ফলে বড় সমুদ্রগামী জাহাজগুলি সহজেই বন্দরে (কলকাতা/হলদিয়া) ঢুকতে পারে।
- মৎস্য আহরণ: জোয়ারের জলের সাথে প্রচুর মাছ নদী মোহনায় বা খাঁড়িতে ঢুকে পড়ে, যা জেলেদের জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করে।
- আবর্জনা অপসারণ: ভাটার টানে নদীর পলি ও শহরের আবর্জনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, ফলে নদীর মুখ পরিষ্কার থাকে।
১৮. সমুদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটার মধ্যে পার্থক্য লেখো।
| বিষয় | সমুদ্রস্রোত | জোয়ার-ভাটা |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | বায়ুপ্রবাহের দ্বারা সমুদ্রের জলরাশির একমুখী প্রবাহ। | মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সমুদ্রের জলের উল্লম্ব উত্থান-পতন। |
| ২. কারণ | নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, উষ্ণতা ও ঘনত্বের পার্থক্য। | চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ এবং কেন্দ্রাতিগ বল। |
| ৩. সময় | এটি সারা বছর ধরে অবিরাম ও নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়। | এটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর (দিনে দুবার) ঘটে। |
বিভাগ-ঘ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও বিস্তারিত সমাধান (পর্ব-৩)
বিষয়: ভূগোল | অধ্যায়: বারিমণ্ডল | প্রশ্ন সংখ্যা: ১৯-২৭ | পূর্ণমান: ৩
১৯. শৈবাল সাগর (Sargasso Sea) সৃষ্টির কারণ কী?
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ঘড়ির কাঁটার দিকে আবর্তিত ক্যানারি স্রোত, উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত এবং উপসাগরীয় স্রোতের একটি চক্রাকার আবর্তন বা **জাইর (Gyre)** সৃষ্টি হয়। এই আবর্তনের মাঝখানের বিশাল অঞ্চলের জল স্থির ও স্রোতহীন থাকে। ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে আগাছা ও শৈবাল জন্মায় এবং শৈবাল সাগরের সৃষ্টি হয়।
[attachment_0](attachment)
২০. হিমপ্রাচীর (Cold Wall) কী? এটি কীভাবে গঠিত হয়?
সংজ্ঞা: আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশে, শীতল সবুজ রঙের ল্যাব্রাডর স্রোত এবং উষ্ণ গাঢ় নীল রঙের উপসাগরীয় স্রোত পাশাপাশি বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়। এদের মাঝখানের স্পষ্ট সীমারেখাটিকে হিমপ্রাচীর বলে।
গঠন: দুই ভিন্ন ঘনত্বের ও উষ্ণতার জল সহজে মিশতে পারে না, তাই এদের মাঝে প্রাচীরের মতো বিভাজন রেখা দেখা যায়।
২১. মগ্নচড়া সৃষ্টিতে হিমশৈলের ভূমিকা কী?
মেরু অঞ্চল থেকে ভেসে আসা বিশাল বরফের চাঁই বা হিমশৈলগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে নুড়ি, পাথর, বালি ও পলি আটকে থাকে। উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে এলে এই হিমশৈলগুলি গলে যায় এবং তাদের মধ্যকার শিলাখণ্ডগুলি সমুদ্রের তলদেশে জমা হতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই সঞ্চয়ের ফলেই অগভীর মগ্নচড়া (যেমন- গ্র্যান্ড ব্যাংকস) গড়ে ওঠে।
২২. জোয়ার-ভাটার সুফলগুলি লেখো। (৩টি) [মাধ্যমিক ২০১৯]
- ১. নৌ-চলাচল: জোয়ারের সময় নদীর মোহনায় জলতল বেড়ে যায়, ফলে বড় সমুদ্রগামী জাহাজগুলি সহজেই বন্দরের ভেতরে ঢুকতে পারে (যেমন- কলকাতা ও লন্ডন বন্দর)।
- ২. আবর্জনা পরিষ্কার: ভাটার টানে নদীর পলি ও আবর্জনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, ফলে নদীর নাব্যতা বজায় থাকে এবং মোহনা পরিষ্কার থাকে।
- ৩. বিদ্যুৎ উৎপাদন: জোয়ারের জলের প্রবল তোড়কে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় (যেমন- সুন্দরবনের দুর্গাদুয়ানি খাঁড়ি)।
২৩. জোয়ার-ভাটার কুফলগুলি আলোচনা করো।
- ১. লোনা জল: প্রবল জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনা জল নদীর মাধ্যমে কৃষি জমিতে ঢুকে পড়ে, যা চাষাবাদের ক্ষতি করে।
- ২. পলি সঞ্চয়: জোয়ারের সাথে আসা বালি ও পলি নদীর মোহনায় জমে অনেক সময় নদীর নাব্যতা কমিয়ে দেয়।
- ৩. দুর্ঘটনা: ভরা কোটাল বা বান ডাকার সময় নদীতে নৌকাডুবি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
২৪. ভারত মহাসাগরের সমুদ্রস্রোতগুলি কীভাবে মৌসুমি বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়?
ভারত মহাসাগরের উত্তর ভাগের স্রোত সম্পূর্ণভাবে ঋতুভিত্তিক মৌসুমি বায়ুর দিক অনুসরণ করে।
- গ্রীষ্মকাল: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সোমালি স্রোতসহ অন্যান্য স্রোতগুলি ঘড়ির কাঁটার দিকে বা উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়।
- শীতকাল: উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে স্রোতগুলি দিক পরিবর্তন করে বিপরীত দিকে বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।
[attachment_1](attachment)
২৫. সংযোগ (Conjunction) ও প্রতিযোগ (Opposition) অবস্থানের চিত্রসহ তুলনা করো।
উভয় ক্ষেত্রেই সিজিগি অবস্থান তৈরি হয়, কিন্তু বিন্যাস আলাদা।
- সংযোগ (অমাবস্যা): পৃথিবী – চাঁদ – সূর্য (একই দিকে)। এখানে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল যুক্ত হয়ে প্রবলতম জোয়ার সৃষ্টি করে।
- প্রতিযোগ (পূর্ণিমা): চাঁদ – পৃথিবী – সূর্য (বিপরীত দিকে)। এখানে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীকে দুদিক থেকে টানে, তবে একে অপরের বিপরীতে থাকায় জোয়ারের প্রাবল্য সংযোগের চেয়ে সামান্য কম হয়।
২৬. বান ডাকা (Tidal Bore) ও সারাষাঁড়ির বানের পার্থক্য কী?
বান ডাকা: ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের জল নদীর মোহনা দিয়ে প্রবল বেগে প্রবেশ করে জলস্ফীতি ঘটানোকে সাধারণ অর্থে বান ডাকা বলে।
সারাষাঁড়ির বান: এটি বান ডাকারই একটি বিশেষ ও উগ্র রূপ। বর্ষাকালে হুগলি নদীতে অমাবস্যার ভরা কোটালে ষাঁড়ের গর্জনের মতো শব্দ করে যে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস (প্রায় ৫-৭ মিটার উঁচু) হয়, তাকেই নির্দিষ্টভাবে সারাষাঁড়ির বান বলে।
২৭. গ্র্যান্ড ব্যাংকস (Grand Banks) ও ডগার্স ব্যাংক (Dogger Bank)-এর গুরুত্ব লেখো।
এগুলি হলো পৃথিবীর বিখ্যাত মগ্নচড়া।
- গ্র্যান্ড ব্যাংকস: আটলান্টিক মহাসাগরের নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে অবস্থিত। এটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কড মাছ ধরার কেন্দ্র।
- ডগার্স ব্যাংক: উত্তর সাগরে অবস্থিত। এটিও বাণিজ্যিক মৎস্যশিকারের জন্য বিখ্যাত।
- উভয় স্থানেই প্ল্যাঙ্কটনের প্রাচুর্যের কারণে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, যা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) – বারিমণ্ডল (বিশ্লেষণ)
প্রশ্ন: সমুদ্রস্রোত ও সমুদ্রতরঙ্গের মূল পার্থক্য কী?
[attachment_0](attachment)
প্রশ্ন: নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে কেন ঘন কুয়াশা সৃষ্টি হয়?
প্রশ্ন: জোয়ার-ভাটার সময়ের ব্যবধান ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট হয় কেন?
[attachment_1](attachment)
প্রশ্ন: সিজিগি (Syzygy) অবস্থানে কী ঘটে?
প্রশ্ন: মগ্নচড়াগুলি কেন মৎস্য আহরণের জন্য বিখ্যাত?