দশম শ্রেণী বাংলা: বহুরূপী – সুবোধ ঘোষ

📘 প্রথম অধ্যায়: ‘বহুরূপী’ (গল্প: সুবোধ ঘোষ)


📖 লেখকের বিশ্লেষণ ও ভূমিকা

‘বহুরূপী’ গল্পটি লেখক **সুবোধ ঘোষের** একটি অনবদ্য সৃষ্টি। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র **হরিদা**। তিনি একজন অত্যন্ত গরীব মানুষ হলেও পেশায় বহুরূপী। দারিদ্র্যের সঙ্গে তাঁর জীবন সংগ্রাম চললেও, শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠতা এই গল্পের মূল বিষয়। হরিদা সমাজের চোখে ধরা দেন না, তিনি তাঁর শিল্পের মাধ্যমে মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসেন। তাঁর কাছে বহুরূপী সাজার উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন নয়, বরং **জীবনের এক আনন্দময় খেলা** এবং দর্শকদের মনে **আশ্চর্য অনুভূতি** জাগানো। জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে আসার ঘটনায় তাঁর এই আদর্শই প্রকাশ পেয়েছে।


🎯 ‘বহুরূপী’ গল্প থেকে সম্ভাব্য নম্বর বিভাজন (লিখিত)

এই গল্প থেকে সাধারণত নিম্নলিখিত নম্বর বিভাজন অনুযায়ী প্রশ্ন আসে:

প্রশ্নের ধরন মোট নম্বর অনুমানিক সংখ্যা
MCQ (১ নম্বর) ১টি
SAQ (১ নম্বর) ১টি (২টি প্রশ্নের মধ্যে একটি)
LAQ (৩ নম্বর) ১টি (২টি প্রশ্নের মধ্যে একটি)
LAQ (৫ নম্বর) ১টি (২টি প্রশ্নের মধ্যে একটি)

১. বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ): ২০টি প্রশ্ন (৪টি অপশন সহ)

নির্দেশিকা: সঠিক বিকল্পটি বেছে নাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১।

১. ‘বহুরূপী’ গল্পের লেখক কে?

  • ক) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
  • খ) সুবোধ ঘোষ
  • গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
  • ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

✅ উত্তর: খ

২. ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রধান চরিত্র কে?

  • ক) জগদীশবাবু
  • খ) অনাদি
  • গ) হরিদা
  • ঘ) ভবতোষ

✅ উত্তর: গ

৩. হরিদার রোজগারের প্রধান উপায় কী ছিল?

  • ক) কেরানিগিরি
  • খ) বহুরূপী সেজে রোজগার
  • গ) ভিক্ষা করা
  • ঘ) দোকানদারি

✅ উত্তর: খ

৪. হরিদা বাস করতেন?

  • ক) শহরে
  • খ) শহরের এক গলির ভেতরের ছোটো ঘরে
  • গ) গ্রামে
  • ঘ) বস্তিতে

✅ উত্তর: খ

৫. এক সন্ধ্যায় বাইজি সেজে হরিদার রোজগার হয়েছিল?

  • ক) প্রায় আট টাকা
  • খ) দশ টাকা
  • গ) আট টাকা দশ আনা
  • ঘ) সাত টাকা পাঁচ আনা

✅ উত্তর: গ

৬. হরিদা যে রূপটি ধরেছিল, তাতে পুলিশের লোক হাসে এবং…? [এখানে ‘সাজা’ রূপটি কী ছিল?]

  • ক) বাসস্ট্যান্ডের কাছে
  • খ) চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে বাউলের মতো
  • গ) চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছে পাগল
  • ঘ) জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী

✅ উত্তর: গ

৭. ‘অপূর্ব’ শব্দটি কার লেখা গল্পের নাম ছিল?

  • ক) সুবোধ ঘোষ
  • খ) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
  • গ) অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
  • ঘ) প্রেমেন্দ্র মিত্র

✅ উত্তর: খ

৮. হরিদার জীবনে সবচেয়ে বড় বহুরূপী সাজার ঘটনা কোনটি?

  • ক) বাইজি সাজা
  • খ) বিরাগী সাজা
  • গ) পাগল সাজা
  • ঘ) কাবুলিওয়ালা সাজা

✅ উত্তর: খ

৯. জগদীশবাবু বাড়িতে কীসের জন্য এসেছেন?

  • ক) চাকরির জন্য
  • খ) সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নেওয়ার জন্য
  • গ) পূজা করার জন্য
  • ঘ) জলযোগের জন্য

✅ উত্তর: খ

১০. হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশবাবুর বাড়িতে কতক্ষণ ছিলেন?

  • ক) প্রায় দুই ঘণ্টা
  • খ) কয়েক মিনিট
  • গ) প্রায় আধ ঘণ্টা
  • ঘ) এক ঘণ্টা

✅ উত্তর: গ

১১. হরিদা’র বাড়িতে প্রায় কতদিন ধরে রান্না হতো না?

  • ক) দুই দিন
  • খ) তিন দিন
  • গ) এক সপ্তাহ
  • ঘ) দশ দিন

✅ উত্তর: গ

১২. হরিদা বিরাগী সেজে ফিরলে লেখক তাকে কত টাকা দিতে চেয়েছিলেন?

  • ক) দুই টাকা
  • খ) এক টাকা
  • গ) চার আনা
  • ঘ) দু’আনা

✅ উত্তর: খ

১৩. হরিদা বিরাগী সেজে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তার মূল কথা কী ছিল?

  • ক) অর্থ উপার্জন করো
  • খ) জগতের সমস্ত কিছুই মায়া
  • গ) কঠোর পরিশ্রম করো
  • ঘ) সৎ পথে থেকো

✅ উত্তর: খ

১৪. হরিদা পাগল সেজে কোথায় গিয়েছিলেন?

  • ক) স্কুলের কাছে
  • খ) কোর্টের কাছে
  • গ) চকের বাসস্ট্যান্ডে
  • ঘ) বাজার এলাকায়

✅ উত্তর: গ

১৫. জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর বয়স কত ছিল?

  • ক) প্রায় হাজার বছর
  • খ) তার চেয়েও বেশি বলে মনে হয়
  • গ) দেড়শো বছর
  • ঘ) দুশো বছর

✅ উত্তর: ক

১৬. জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন কীভাবে?

  • ক) হাত দিয়ে নিয়েছিলেন
  • খ) কাঠের খড়মের ওপরের ধুলো নিয়েছিলেন
  • গ) নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন
  • ঘ) গামছা দিয়ে মুছে নিয়েছিলেন

✅ উত্তর: খ

১৭. হরিদা’র কাছে এক-একদিন কী হয়?

  • ক) রোজগার হয়
  • খ) ‘আর্নি’ হয়
  • গ) ‘অভাব’ হয়
  • ঘ) ‘খেলা’ হয়

✅ উত্তর: খ

১৮. হরিদা বিরাগী সেজে কার বাড়িতে গিয়েছিলেন?

  • ক) ভবতোষের বাড়িতে
  • খ) অনাদির বাড়িতে
  • গ) জগদীশবাবুর বাড়িতে
  • ঘ) গল্পের কথকের বাড়িতে

✅ উত্তর: গ

১৯. ‘আমরা সবাই তখনো হরিদার কথা শুনে হাসছি।’—কখন তারা হেসেছিল?

  • ক) বিরাগী সাজার পর
  • খ) বাইজি সাজার পর
  • গ) পাগল সাজার পর
  • ঘ) কোনোদিনই নয়

✅ উত্তর: গ

২০. ‘চমৎকার! চমৎকার! এ তো বেশ মজার ব্যাপার।’—কে এই কথা বলেছিল?

  • ক) ভবতোষ
  • খ) অনাদি
  • গ) গল্পের কথক
  • ঘ) হরিদা

✅ উত্তর: গ

২, ৩ ও ৪. অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (VSAQ): ৫৩টি প্রশ্ন

ক) শূন্যস্থান পূরণ করো (১৮টি)

নির্দেশিকা: সঠিক শব্দ বসিয়ে শূন্যস্থানগুলি পূরণ করো।

  • ১. হরিদা পুলিশ সেজে চকাবাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
  • ২. চমক সৃষ্টি করাই তো হরিদার বহুরূপী জীবনের পেশা।
  • ৩. সপ্তাহে একদিন বহুরূপী সেজে বাইরে বের হন হরিদা।
  • ৪. জগদীশ বাবুর বাড়িতে এক সন্ন্যাসী এসেছিলেন।
  • ৫. সন্ন্যাসীর বয়স হাজার বছরেরও বেশি।
  • ৬. হরিদার ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি কাঠের টুল।
  • ৭. বিরাগীর বেশে হরিদার হাতে ছিল একটি ঝোলা
  • ৮. জগদীশ বাবু বিরাগীকে একশো এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন।
  • ৯. হরিদা বাইজি সেজে বকশিশ পেয়েছিলেন আট টাকা দশ আনা।
  • ১০. বিরাগীর পোশাকটি ছিল গেরুয়া রঙের।
  • ১১. দয়ালবাবু লিচুবাগানের একটি সবুজ টিনের বাক্সতে হরিদার বিরাগী রূপের প্রথম দর্শনেই বিমুগ্ধ হয়েছিলেন।
  • ১২. হরিদার ঘরে একটি মাত্র কাঠের টুল ছিল।
  • ১৩. সন্ন্যাসীর ঠান্ডা, মিষ্টি হাসির ঝলক দেখা গিয়েছিল।
  • ১৪. বড় মানুষের ঠাটবাট দেখার জন্য ফাঁকি দিয়ে চলে এসেছিলেন হরিদা।
  • ১৫. হরিদার জীবনটা ছিল একটা নিয়মিত অভাবের চিত্র।
  • ১৬. আজ তোমাদের একটা ভয়ঙ্কর খবর দেব।
  • ১৭. বাসচালক কাশীনাথ হরিদার কান্ড দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
  • ১৮. বাসের সব যাত্রীরা হৈ-হৈ করে উঠল।

খ) সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করো (১৫টি)

নির্দেশিকা: বাক্যটি সত্য হলে (স) এবং মিথ্যা হলে (মি) লেখো।

  • ১. হরিদা বছরে একবার বহুরূপী সেজে বাইরে বের হন। (মি)
  • ২. হরিদার পেশাটি হলো ‘চমক’ সৃষ্টি করা। (স)
  • ৩. বাস ড্রাইভার কাশীনাথ হরিদার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। (স)
  • ৪. জগদীশ বাবু একজন কৃপণ ব্যক্তি। (মি)
  • ৫. জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী খুব দামি কাঠের খড়ম পরতেন। (মি)
  • ৬. বিরাগী সেজে হরিদা জগদীশ বাবুর দেওয়া টাকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। (স)
  • ৭. বিরাগীর বেশে হরিদার কপালে চন্দনের তিলক ছিল। (মি)
  • ৮. হরিদার ঘরে একটি কাঠের টুল ছাড়া আর কিছু ছিল না। (স)
  • ৯. বাইজি সেজে হরিদা আট টাকা পেয়েছিলেন। (মি)
  • ১০. বিরাগী জগদীশ বাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন। (মি)
  • ১১. গল্পকথকরা হরিদার রোজগার থেকে প্রত্যহ কিছু ভাগ পেতেন। (মি)
  • ১২. জগদীশ বাবু বিরাগীর জন্য ফলের ঝুড়ি এনেছিলেন। (মি)
  • ১৩. বহুরূপী গল্পে হরিদাকে একজন আত্মভোলা শিল্পী হিসেবে দেখানো হয়েছে। (স)
  • ১৪. শহরের বাসস্ট্যান্ডে হরিদা বিরাগী সেজে বাসযাত্রীদের ভয় দেখিয়েছিলেন। (মি)
  • ১৫. হরিদার জীবন ছিল ‘নিয়মিত’ অভাবের চিত্র। (স)

গ) এক বাক্যে উত্তর দাও (২০টি)

নির্দেশিকা: একটি সম্পূর্ণ বাক্যে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও।

১. ‘বহুরূপী’ গল্পের লেখকের নাম কী?

✅ উত্তর: ‘বহুরূপী’ গল্পের লেখকের নাম সুবোধ ঘোষ।

২. হরিদার পেশা কী ছিল?

✅ উত্তর: হরিদার পেশা ছিল ছদ্মবেশ ধারণ করে অর্থাৎ বহুরূপী সেজে মানুষকে আনন্দ দিয়ে অর্থ উপার্জন করা।

৩. হরিদা কোথায় বাস করতেন?

✅ উত্তর: হরিদা শহরের এক গলি পথে একটি ছোট ঘরে বাস করতেন।

৪. হরিদা সপ্তাহে কতদিন বহুরূপী সেজে বাইরে বের হন?

✅ উত্তর: হরিদা সপ্তাহে মাত্র একদিন বহুরূপী সেজে বাইরে বের হন।

৫. হরিদার উনানের হাড়িতে কী থাকে?

✅ উত্তর: হরিদার উনানের হাড়িতে মাঝে মাঝে শুধু জল ফোটে।

৬. হরিদা পুলিশ সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন?

✅ উত্তর: হরিদা পুলিশ সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলেন।

৭. জগদীশ বাবুর বাড়িতে কেন ভিড় জমেছিল?

✅ উত্তর: জগদীশ বাবুর বাড়িতে একজন উচ্চস্তরের সন্ন্যাসীর পদধূলি নেওয়ার জন্য ভিড় জমেছিল।

৮. জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী কত বছরের বেশি সন্ন্যাসী ছিলেন?

✅ উত্তর: জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী হাজার বছরেরও বেশি বয়স্ক সন্ন্যাসী ছিলেন।

৯. জগদীশ বাবু সন্ন্যাসীর জন্য কী এনেছিলেন?

✅ উত্তর: জগদীশ বাবু সন্ন্যাসীর জন্য কাঠের খড়ম এনেছিলেন।

১০. বিরাগী সেজে হরিদা কার বাড়িতে গিয়েছিলেন?

✅ উত্তর: বিরাগী সেজে হরিদা জগদীশ বাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন।

১১. বিরাগী জগদীশ বাবুর কাছে কত টাকা দান চেয়েছিলেন?

✅ উত্তর: বিরাগী জগদীশ বাবুর কাছে কোনো দান বা টাকা চাননি, বরং তিনি জগদীশ বাবুর দেওয়া একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

১২. বিরাগীর বেশে হরিদার হাতে কী ছিল?

✅ উত্তর: বিরাগীর বেশে হরিদার হাতে ছিল একটি ঝোলা ও একটি কম্বল।

১৩. হরিদা পুলিশ সেজে কত বকশিশ পেয়েছিলেন?

✅ উত্তর: হরিদা পুলিশ সেজে আট আনা বকশিশ পেয়েছিলেন।

১৪. ‘খেলাটা ভালো, কিন্তু একঘেয়ে’—কোন খেলাটি একঘেয়ে?

✅ উত্তর: অফিসের বড়বাবুর কেরানিগিরির খেলাটি হরিদার কাছে একঘেয়ে বলে মনে হয়েছিল।

১৫. বিরাগী জগদীশ বাবুকে কী উপদেশ দিয়েছিলেন?

✅ উত্তর: বিরাগী জগদীশ বাবুকে বলেছিলেন: “ধনজন যৌবন এ সবই ক্ষণস্থায়ী, মানুষের স্বরূপকে চিনে নেওয়া প্রয়োজন।”

১৬. হরিদা বাইজি সেজে কত টাকা রোজগার করেছিলেন?

✅ উত্তর: হরিদা বাইজি সেজে আট টাকা দশ আনা রোজগার করেছিলেন।

১৭. বিরাগী হরিদার ঢঙ, নকল কেন বলেছিলেন?

✅ উত্তর: হরিদা বিরাগী সেজেছিলেন, কিন্তু তিনি আসলে বিরাগী নন। তাই তাঁর বেশভূষা ও কথাগুলিকে তিনি ‘ঢঙ’ বা ‘নকল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

১৮. হরিদার কাছে কোনটি বেশি প্রিয়?

✅ উত্তর: হরিদার কাছে কেরানিগিরির চেয়ে বহুরূপী সেজে মানুষকে চমক দেওয়া বেশি প্রিয়।

১৯. জগদীশ বাবুর কোন কাজটি হরিদার মনে দাগ কেটেছিল?

✅ উত্তর: জগদীশ বাবুর বাড়িতে সন্ন্যাসীকে বিদেয় করার জন্য যে প্রচুর আয়োজন ও দানদক্ষিণা ছিল, সেই বড়লোকি ঠাটবাট হরিদার মনে দাগ কেটেছিল।

২০. হরিদা নিজের জীবনকে কীসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন?

✅ উত্তর: হরিদা নিজের জীবনকে একটা নাটক বা খেলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা তাঁকে বাঁধাধরা জীবন থেকে মুক্তি দেয়।


৫. সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৩): ১৫টি প্রশ্ন

প্রশ্ন ১. “হরিদার ঘরে শুধু জল ফোটে।”—এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর: এই মন্তব্যটি হরিদার জীবনের চরম দারিদ্র্য এবং অভাবকে ইঙ্গিত করে।

  • চরম দারিদ্র্য: ‘উনানের হাড়িতে শুধু জল ফোটে’—কথাটির অর্থ হলো হরিদার ঘরে দিনের পর দিন রান্না হয় না, অর্থাৎ চাল-ডাল কেনার মতো সামর্থ্য তাঁর নেই।
  • অভাবের সঙ্গে আপস: হরিদা অভাবকে মেনে নিয়েছেন, কিন্তু নিজের বহুরূপী শিল্পকে তিনি কখনোই সস্তা উপার্জনের মাধ্যম করেননি। এই জল ফোটা হলো তাঁর দারিদ্র্যের এক প্রতীকী চিত্র।
  • শিল্পীর আত্মমর্যাদা: অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি বাঁধাধরা কেরানিগিরি বেছে না নিয়ে স্বাধীনতা ও শিল্পকে আঁকড়ে ধরেছেন, যার ফলে তাঁর সংসারে শুধুই অভাব।

প্রশ্ন ২. “চমক সৃষ্টি করাই তো হরিদার বহুরূপী জীবনের পেশা।”—উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উক্তিটির মাধ্যমে হরিদার বহুরূপী জীবনের মূল উদ্দেশ্য এবং আদর্শকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

  • পেশার উদ্দেশ্য: হরিদার বহুরূপী পেশার মূল উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন নয়, বরং প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনে চমক আনা এবং মানুষকে ক্ষণিকের জন্য আনন্দ দেওয়া।
  • শিল্পীর মানসিকতা: তিনি এমন ছদ্মবেশ ধারণ করেন, যা দেখে সাধারণ মানুষ চমকে ওঠে এবং তাঁকে চিনতে পারে না। এতেই তিনি আনন্দ পান।
  • অর্থের চেয়ে শিল্প: তাঁর কাছে চমক সৃষ্টি এবং শিল্পীর স্বাধীনতার মূল্যই বেশি; তাই তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন ছদ্মবেশ ধারণ করেন, যাতে এই চমকের গুরুত্ব কমে না যায়।

প্রশ্ন ৩. ‘খেলাটা ভালো, কিন্তু একঘেয়ে।’—কোন্ খেলাকে কেন একঘেয়ে বলা হয়েছে?

উত্তর: হরিদা এই মন্তব্যের মাধ্যমে বাঁধাধরা কেরানিগিরির খেলাকে একঘেয়ে বলেছেন।

  • খেলাটি কী: এখানে ‘খেলা’ বলতে কেরানি বা অফিসের বড়বাবুর মতো প্রতিদিন একই কাজ করার জীবনকে বোঝানো হয়েছে।
  • একঘেয়ে হওয়ার কারণ: হরিদা স্বাধীনচেতা মানুষ। তিনি মনে করেন, প্রতিদিন একই কাজ করা, একই পোশাক পরা এবং একই রুটিন মেনে চলা হলো জীবনকে শিকল পরানো। এখানে কোনো বৈচিত্র্য বা স্বাধীনতা নেই।
  • বহুরূপীর পার্থক্য: হরিদার বহুরূপীর খেলা প্রতিদিন নতুন, চমকপ্রদ এবং স্বাধীন, তাই তিনি কেরানিগিরির একঘেয়ে বাঁধাধরা জীবন প্রত্যাখ্যান করেন।

প্রশ্ন ৪. হরিদার বাসস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।

উত্তর: হরিদার বাসস্থানের বর্ণনা তাঁর দারিদ্র্য এবং অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচায়ক।

  • স্থান: হরিদা শহরের এক গলির ভেতরের একটি ছোট ঘরে বাস করতেন।
  • সরলতা: ঘরটি ছিল একেবারে নিরাভরণ ও সাদামাটা।
  • সামগ্রী: ঘরের মাঝখানে একটি মাত্র কাঠের টুল ছিল, যা তাঁর দৈনন্দিন ব্যবহার্য আসবাবপত্র। এতে বোঝা যায়, তিনি ন্যূনতম চাহিদা নিয়েই জীবন কাটাতেন।

প্রশ্ন ৫. জগদীশ বাবুর বাড়িতে সন্ন্যাসী বা বিরাগীর প্রতি যে শ্রদ্ধার চিত্র দেখা যায়, তা আলোচনা করো।

উত্তর: জগদীশ বাবুর জীবনে ধর্মীয় মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল সীমাহীন, তবে তা ছিল মূলত অর্থ ও আড়ম্বরের মোড়কে।

  • আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন: তিনি সন্ন্যাসীর পদধূলি নেওয়ার জন্য বাড়িতে ভিড় জমাতেন এবং সন্ন্যাসীকে বিদায় দেওয়ার জন্য দামি উপহার ও প্রণামী দিতেন।
  • কাঠের খড়ম: জগদীশ বাবু একজন হাজার বছরেরও বেশি বয়সী সন্ন্যাসীর জন্য দামী কাঠের খড়ম এনে তাতে সোনার বোল লাগানো রুপোর কাজ করিয়ে দিয়েছিলেন।
  • টাকা দেওয়ার চেষ্টা: বিরাগী সেজে আসা হরিদার হাতেও তিনি একশো এক টাকার প্রণামী জোর করে দিতে চেয়েছিলেন। এই দান-দক্ষিণা তাঁর শ্রদ্ধার চেয়েও বেশি বড়লোকি ঠাটবাট প্রকাশ করে।

প্রশ্ন ৬. বিরাগী জগদীশ বাবুর দান প্রত্যাখ্যান করলেন কেন? বিরাগীর বক্তব্য কী ছিল?

উত্তর: বিরাগী রূপে হরিদা জগদীশ বাবুর দান করা একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মূলত তাঁর শিল্পের নীতি ও আধ্যাত্মিকতার আদর্শ বজায় রাখতে।

  • শিল্পীর নীতি: হরিদা ছদ্মবেশকে সস্তা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। বিরাগী সেজে তিনি যদি টাকা নেন, তবে সেই বেশের মর্যাদা নষ্ট হবে।
  • বিরাগীর বক্তব্য: বিরাগী বলেন, “আমি বিরাগী, রাগ বা আসক্তি আমার নেই। টাকা নিয়ে আমি কী করব? যিনি সকল কিছুর নিয়ন্তা, তিনি তো টাকা দেন না, শুধু আনন্দ দেন।”
  • অস্পৃশ্য ধন: বিরাগী জগদীশ বাবুকে বোঝান, ধন-সম্পদ ক্ষণস্থায়ী, তাই তিনি এসব স্পর্শ করেন না। এই প্রত্যাখ্যান হরিদার উচ্চ আদর্শের পরিচয় দেয়।

প্রশ্ন ৭. বাইজি সেজে হরিদার উপার্জন কেন কম হয়েছিল?

উত্তর: বাইজি সেজে হরিদার উপার্জন কম হওয়ার কারণ ছিল ছদ্মবেশের অপূর্ণতা এবং শহরের মানুষের অনাগ্রহ।

  • ছদ্মবেশের খুঁত: বাইজির বেশে তাঁর অঙ্গভঙ্গি বা সাজসজ্জায় হয়তো কিছুটা খুঁত ছিল, যা মানুষের চোখে সহজেই ধরা পড়েছিল।
  • দর্শকের মন: বাইজির সাজ দেখে সবাই হাসাহাসি করেছিল, ফলে কেউ সেভাবে বকশিশ দিতে উৎসাহিত হয়নি।
  • শিল্পের মর্যাদা: এটি বোঝায় যে হরিদার কিছু কিছু বহুরূপী সাজ মানুষের কাছে তাঁর আসল শিল্পের মর্যাদা আনতে পারেনি। তাই তাঁর রোজগার মাত্র আট টাকা দশ আনা হয়েছিল।

প্রশ্ন ৮. হরিদা সপ্তাহে মাত্র একদিন বহুরূপী সেজে বাইরে বের হন কেন?

উত্তর: হরিদা অভাবী হলেও বহুরূপী শিল্পকে এক বিশেষ মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন বাইরে বের হন।

  • চমক বজায় রাখা: হরিদা মনে করেন, প্রতিদিন একই কাজ করলে সেই কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাবে এবং চমক নষ্ট হবে।
  • শিল্পের মর্যাদা: যদি তিনি রোজগার বাড়াতে প্রতিদিন বের হন, তবে তাঁর শিল্প সস্তা হয়ে যাবে। বিরলতা বা অনিয়মিত উপস্থিতিই তাঁর শিল্পের মর্যাদা ধরে রাখে।
  • স্বাধীনতা: বাঁধাধরা জীবনের দাসত্ব না করে নিজের খেয়াল খুশি মতো একদিন বের হওয়ার মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তা ও স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে।

প্রশ্ন ৯. হরিদা কীভাবে পুলিশ সেজে বাসযাত্রীদের চমক দিয়েছিলেন?

উত্তর: চকের বাসস্ট্যান্ডে হরিদা পুলিশ সেজে বাসযাত্রী ও ড্রাইভারকে ভয় পাইয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন।

  • বেশভূষা: তিনি কোট-প্যান্ট-জুতো পরে, মাথায় টুপি ও হাতে লাঠি নিয়ে একজন সত্যিকারের পুলিশের মতো সেজেছিলেন।
  • ঘটনা: তিনি হঠাৎ বাস থামিয়ে একজন যাত্রীকে বিকেলের সময় মাস্টারি করে ফেরার অপরাধে ধরে জরিমানা করেন।
  • ফলাফল: তাঁর কঠোর চাহনি দেখে বাসযাত্রীরা ভয় পেয়ে যায়, কিন্তু যখন তারা জানতে পারে এটি হরিদার বহুরূপী খেলা, তখন সবাই হেসে ওঠে এবং চমক সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন ১০. “বড়লোকের কান্ড!”—কোন্ কান্ডের কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: ‘বড়লোকের কান্ড’ বলতে জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত এক উচ্চস্তরের সন্ন্যাসীর প্রতি তাঁর আতিথেয়তা ও আড়ম্বরপূর্ণ শ্রদ্ধাকে বোঝানো হয়েছে।

  • আয়োজন: হাজার বছরেরও বেশি বয়স্ক সন্ন্যাসীর থাকার জন্য তিনি বিরাট আয়োজন করেছিলেন।
  • উপহার: তিনি সন্ন্যাসীকে মহামূল্যবান জিনিস উপহার দিয়েছিলেন, যেমন—সোনার বোল লাগানো রুপোর কাজ করা কাঠের খড়ম।
  • উদ্দেশ্য: এই আতিথেয়তা তাঁর ভক্তি প্রকাশ করলেও, হরিদার চোখে তা ছিল মূলত জগদীশ বাবুর ধন-সম্পদ ও প্রভাব দেখানোর এক প্রকাশ।

প্রশ্ন ১১. বিরাগীর সাজ কেমন ছিল?

উত্তর: জগদীশ বাবুর বাড়িতে হরিদা যে বিরাগী সেজে এসেছিলেন, তার বর্ণনা ছিল সরলতা ও বৈরাগ্য মেশানো।

  • পোশাক: বিরাগীর পরনে ছিল একটি অতি সাধারণ ও সামান্য কম্বল।
  • বৈরাগ্যের চিহ্ন: গায়ে কোনো জামা ছিল না, ছিল একটি সাদা উত্তরীয় এবং হাতে একটি ঝোলা।
  • সন্ন্যাসীর প্রতীক: বিরাগীর রূপার আংটির ওপর একটি বড় বহ্মতেজ ঝলমল করছিল, যা তাঁর অলৌকিক রূপকে ফুটিয়ে তুলেছিল।

প্রশ্ন ১২. ‘এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে এমন এক একটা ঘটনা ঘটে’—কোন্ ঘটনার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: এখানে মূলত হরিদার ছদ্মবেশ ধারণ করে সাধারণ মানুষকে চমকে দেওয়ার ঘটনার কথা বলা হয়েছে।

  • ঘটনার স্বরূপ: হরিদা একদিন পুলিশ সেজে এসে বাসযাত্রীদের ভয় দেখিয়েছিলেন। আবার কখনও বাউল, কখনও কাপালিক সেজে শহরের একঘেয়ে জীবনে আকস্মিক চমক সৃষ্টি করতেন।
  • তাৎপর্য: এই ঘটনাগুলি সাধারণ মানুষের রুটিনমাফিক জীবনকে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে দেয় এবং তাদের মধ্যে কৌতূহল ও আনন্দ সৃষ্টি করে। এই চমক সৃষ্টি করাই হরিদার শিল্পী জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন ১৩. ‘কিন্তু হাসিটা আর মুখ থেকে বার হলো না।’—কার হাসি মুখ থেকে বার হলো না? কেন?

উত্তর: এই মন্তব্যে বাসযাত্রীদের হাসির কথা বলা হয়েছে।

  • ঘটনা: পুলিশ সেজে হরিদা যখন বাস থামিয়ে দেন এবং একজনকে মাস্টারি করে ফেরার অপরাধে জরিমানা করেন, তখন বাসযাত্রীরা প্রথমে ভয় পায়।
  • কারণ: যখন তারা জানতে পারে এটি হরিদার বহুরূপীর খেলা, তখন তাদের মনে হাসি এলেও, হরিদার নিখুঁত অভিনয় দেখে কেউ প্রথমে হাসতে পারেনি। হরিদার সেই গম্ভীর পুলিশি রূপ এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে সেই ভয় ও চমকের কারণে হাসি মুখ থেকে বের হতে পারেনি।

প্রশ্ন ১৪. ‘বাধা ধরা জীবন’ বলতে হরিদা কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর: ‘বাধা ধরা জীবন’ বলতে হরিদা সেই রুটিনমাফিক জীবনকে বুঝিয়েছেন, যেখানে স্বাধীনতা বা নতুনত্ব কিছু নেই।

  • স্বরূপ: কেরানিগিরি বা অফিসের বড়বাবুর মতো প্রতিদিনের একই কাজ, একই পোশাক এবং একই সময়ে ফেরা—এই একঘেয়ে জীবনই হলো তাঁর কাছে ‘বাধা ধরা জীবন’।
  • প্রতিবাদ: হরিদা এই ধরনের জীবনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভাব সত্ত্বেও তিনি বহুরূপী সেজে স্বাধীনতা এবং শিল্পের আনন্দকে বেছে নিয়েছেন।

প্রশ্ন ১৫. “এইবার একটা ভয়ের খবর দিতে পারি।”—খবরটি কী ছিল?

উত্তর: ‘ভয়ের খবর’ বলতে হরিদা তাঁর বন্ধুদের জানিয়েছিলেন যে, তিনি সেদিন সন্ধ্যায় বিরাগী সেজে জগদীশ বাবুর বাড়িতে যাবেন।

  • ভয়ের কারণ: হরিদার বন্ধু এবং গল্পের কথকরা জানত যে জগদীশ বাবু অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির এবং ধর্মীয় বিষয়ে খুব কড়া। হরিদা যদি সেখানে বিরাগী সেজে নাটক করেন, তবে জগদীশ বাবু রেগে যেতে পারেন বা হরিদাকে শাস্তি দিতে পারেন।
  • তাৎপর্য: এই ভয় সত্ত্বেও হরিদা ঝুঁকি নিয়েছিলেন কারণ তাঁর কাছে তাঁর শিল্প এবং চমক সৃষ্টি করাই মুখ্য ছিল।


৬. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান: ৫): ৮টি প্রশ্ন

প্রশ্ন ১. ‘বহুরূপী’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো। (গুরুত্বপূর্ণ)

উত্তর: ‘বহুরূপী’ কথাটির অর্থ হলো বহুরূপ ধারণকারী বা ছদ্মবেশী। সুবোধ ঘোষ রচিত এই গল্পটির নামকরণের মধ্য দিয়েই কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদার জীবনদর্শন ও পেশার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে।

  • ১. কেন্দ্রীয় চরিত্রের পেশা: গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা জীবনধারণের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে শহরে চমক সৃষ্টি করেন। তিনি কখনো বাইজি, কখনো পুলিশ, কখনো বাউল, আবার কখনো বিরাগী সেজেছেন।
  • ২. জীবনই শিল্প: হরিদার কাছে তাঁর বহুরূপী সাজ কেবল পেশা নয়, তা এক শিল্প। তিনি এই শিল্পের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাকে উপভোগ করেন এবং বাঁধাধরা জীবনের একঘেয়েমিকে অস্বীকার করেন।
  • ৩. বিরাগী রূপের তাৎপর্য: গল্পের চূড়ান্ত মোড় আসে যখন হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশ বাবুর বাড়িতে যান এবং লোভকে জয় করে প্রণামী প্রত্যাখ্যান করেন। এই বিরাগী রূপটিই তাঁর শিল্পের চূড়ান্ত প্রকাশ।
  • ৪. প্রতীকী তাৎপর্য: গল্পে বহুরূপী শব্দটি কেবল হরিদার পেশা নয়, এটি শিল্পের প্রতি তাঁর আদর্শবাদী মনোভাব এবং অভাবের সঙ্গে আপস না করার প্রতিবাদের প্রতীক।

উপসংহারে বলা যায়, গল্পটির আখ্যান, চরিত্রায়ণ এবং জীবনবোধ—সবকিছুই ‘বহুরূপী’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তাই নামকরণটি যথার্থ ও সার্থক।

প্রশ্ন ২. ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে হরিদার চরিত্র বিশ্লেষণ করো। (গুরুত্বপূর্ণ)

উত্তর: হরিদা হলেন গল্পের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর চরিত্রে একদিকে যেমন দারিদ্র্য, তেমনই অন্যদিকে শিল্পীর গভীর আদর্শবাদ বিদ্যমান।

  • ১. স্বাধীনচেতা শিল্পী: হরিদা বাঁধাধরা কেরানিগিরিকে প্রত্যাখ্যান করে ছদ্মবেশ ধারণের মতো অনিশ্চিত পেশা বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে চমক সৃষ্টি করাই মুখ্য, অর্থ উপার্জন নয়।
  • ২. চরম দারিদ্র্য: তিনি শহরের গলির মধ্যে ছোট ঘরে বাস করেন এবং তাঁর উনুনের হাড়িতে মাঝে মাঝে শুধু জল ফোটে—যা তাঁর চরম অভাবের চিত্র তুলে ধরে।
  • ৩. আদর্শবাদী ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন: জগদীশ বাবুর দেওয়া একশো এক টাকা প্রত্যাখ্যান করে তিনি প্রমাণ করেন যে শিল্প বা আদর্শের কাছে টাকা তুচ্ছ। বিরাগী সেজে তিনি টাকা নিতে পারেন না।
  • ৪. রসিকতা ও কৌতুকপ্রিয়: পুলিশ বা বাইজি সেজে তিনি কেবল মানুষকে চমক দেন না, একই সঙ্গে কৌতুক ও রসিকতার মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি দূর করেন।
  • ৫. জীবনবিমুখ দার্শনিক: তিনি বলেন, “সংসারে আর আসক্তি নেই”—যা তাঁর বৈরাগী মনোভাব এবং জীবনবোধের গভীরতাকে প্রমাণ করে।

সব মিলিয়ে, হরিদা হলেন এক আদর্শবাদী, স্বাধীনতা প্রিয়, এবং আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন শিল্পী, যিনি অভাবকে তুচ্ছ করে শিল্পকে প্রাধান্য দেন।

প্রশ্ন ৩. “তাতে আমার ঢঙ নষ্ট হয়ে যায়।”—কে, কাকে, কী প্রসঙ্গে একথা বলেছিলেন? উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। (গুরুত্বপূর্ণ)

উত্তর: উক্তিটি বিরাগী সেজে আসা হরিদা জগদীশ বাবুকে বলেছিলেন।

প্রসঙ্গ:

  • জগদীশ বাবুর বাড়িতে বিরাগী রূপে হরিদা প্রবেশ করলে, জগদীশ বাবু শ্রদ্ধাবশত তাঁকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান।
  • বিরাগী সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করলে, জগদীশ বাবু জোর করতে থাকলে বিরাগী বলেন—টাকা নিলে তাঁর বিরাগী সাজের **ঢঙ বা ভান** নষ্ট হয়ে যাবে।

তাৎপর্য:

  • শিল্পীর আদর্শ: হরিদা মনে করেন, তাঁর শিল্পকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম করলে শিল্পের মর্যাদা থাকে না। বিরাগী রূপে টাকা নিলে সেই শিল্পের পবিত্রতা ও আদর্শ নষ্ট হবে।
  • লোভ জয়: হরিদা ছিলেন চরম অভাবী, তবুও তিনি এত বড় অঙ্কের টাকা ফিরিয়ে দিলেন—যা তাঁর লোভ জয় করার ক্ষমতা এবং উচ্চ আত্মমর্যাদার প্রতীক।
  • সত্যের উপলব্ধি: এই উক্তির মধ্য দিয়ে হরিদা বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি যদিও নকল বিরাগী, কিন্তু সেই মুহূর্তের জন্য তিনি তাঁর শিল্পের সত্যটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চান।

প্রশ্ন ৪. ‘বড়লোকের কান্ড।’—কোন্ কান্ডের কথা বলা হয়েছে? হরিদার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কোন সত্য প্রকাশ পেয়েছে?

উত্তর:

উল্লিখিত কান্ড: এখানে জগদীশ বাবুর বাড়িতে আগত এক উচ্চস্তরের সন্ন্যাসীর প্রতি তাঁর আতিথেয়তা এবং আড়ম্বরপূর্ণ শ্রদ্ধাকে বোঝানো হয়েছে। সন্ন্যাসীর জন্য দামী উপহার, সোনার বোল লাগানো রুপোর কাজ করা কাঠের খড়ম ইত্যাদি ছিল সেই ‘কান্ড’।

প্রকাশিত সত্য:

  • আড়ম্বরের মোড়ক: হরিদার চোখে এই আতিথেয়তা কেবল ধর্মীয় ভক্তি ছিল না, বরং তা ছিল জগদীশ বাবুর ধন-সম্পদ ও প্রভাব দেখানোর এক অহংকারী প্রকাশ।
  • কৃত্রিমতা: হরিদা বোঝেন, ধনী মানুষ সহজে টাকা খরচ করে সন্ন্যাসীর কাছ থেকে আশীর্বাদ কিনতে চান, যা আসলে প্রকৃত ভক্তি নয়, বরং ভণ্ডামি।
  • দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি: হরিদা একজন বহুরূপী হয়েও এই ‘বড়লোকি কান্ডের’ কৃত্রিমতা বুঝতে পারেন এবং তাই তিনি বিরাগী সেজে সেই কৃত্রিমতাকে চ্যালেঞ্জ জানান।

প্রশ্ন ৫. হরিদা ও জগদীশ বাবুর জীবনবোধের পার্থক্য লেখো।

উত্তর: হরিদা ও জগদীশ বাবুর মধ্যে জীবনবোধের পার্থক্য গল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বৈশিষ্ট্য হরিদা (বিরাগী) জগদীশ বাবু
মূল দর্শন স্বাধীনতা, শিল্প এবং বৈরাগ্য। সম্পদ, আড়ম্বর এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা।
অর্থের স্থান অর্থ তাঁর কাছে শিল্পকে নষ্ট করার কারণ, তাই তিনি প্রণামী প্রত্যাখ্যান করেন। টাকা-পয়সা তাঁর কাছে ধর্ম বা শ্রদ্ধার মাপকাঠি।
জীবনযাত্রা অভাবী, বাঁধাধরা জীবনের বিরোধী। ধনী, প্রথাগত এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রা।
আত্মিকতা বিরাগী সেজে তিনি আসক্তি ত্যাগকে গুরুত্ব দেন। দান-দক্ষিণার মাধ্যমে তিনি পুণ্য কিনতে চান।

প্রশ্ন ৬. পুলিশ সেজে বাসস্ট্যান্ডে হরিদার কার্যকলাপের বর্ণনা দাও।

উত্তর: পুলিশ সেজে হরিদার কার্যকলাপ ছিল তাঁর বহুরূপী জীবনের অন্যতম চমকপ্রদ ঘটনা।

  • বেশ ও স্থান: হরিদা কোট-প্যান্ট-জুতো ও টুপি পরে পুলিশ সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি।
  • কান্ড: তিনি হঠাৎ একটি বাস থামিয়ে দেন এবং বাসযাত্রীদের আতঙ্কিত করে তোলেন। তিনি একজন যাত্রীকে মাস্টারি করে ফেরার অপরাধে জরিমানা করেন।
  • রহস্য উন্মোচন: তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে বাসচালক কাশীনাথ প্রথমে তাঁকে সত্যি পুলিশ ভেবেছিলেন। পরে হরিদা যখন হেসে ওঠেন, তখন সবাই বুঝতে পারে এটি তাঁর বহুরূপী খেলা।
  • প্রাপ্তি: এই চমক সৃষ্টির ফলস্বরূপ তিনি আট আনা বকশিশ পেয়েছিলেন। এই ঘটনাটি হরিদার নিখুঁত অভিনয় দক্ষতা প্রমাণ করে।

প্রশ্ন ৭. ‘অদৃষ্ট, কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।’—কোন্ ভুলের কথা বলা হয়েছে? অদৃষ্ট ক্ষমা করবে না কেন?

উত্তর:

উল্লিখিত ভুল: এখানে হরিদা বিরাগী সেজে জগদীশ বাবুর কাছ থেকে একশো এক টাকা প্রণামী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর বন্ধুরা মনে করেছিল, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে এত বড় অঙ্কের টাকা ফিরিয়ে দেওয়াটাই হরিদার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

অদৃষ্ট ক্ষমা করবে না কেন:

  • দারিদ্র্যের কারণে: হরিদা অত্যন্ত অভাবী ছিলেন। তাঁর বন্ধু ও গল্পকথকদের মনে হয়েছিল, এত কষ্টের মধ্যে এত বড় অঙ্কের টাকা নিলে তাঁর জীবনের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতো।
  • সুযোগের সদ্ব্যবহার: বন্ধুত্বের চোখে, জীবনে এমন সুযোগ বারবার আসে না। সেই সুযোগটি তিনি কেবল শিল্পের আদর্শের দোহাই দিয়ে হেলায় হারিয়েছেন।
  • নিয়তির বিধান: তাঁদের বিশ্বাস, নিয়তি বা অদৃষ্ট হয়তো এটাই শেষ সুযোগ দিয়েছিল, যা হরিদা গ্রহণ করেননি। ফলে বাকি জীবন তাঁকে আরও বেশি অভাবের মধ্যে কাটাতে হবে—এই ছিল বন্ধুদের ধারণা।

প্রশ্ন ৮. “সন্ন্যাসীর ঠান্ডা, মিষ্ট হাসির ঝলক দেখা গেল।”—কে কখন সন্ন্যাসী সেজেছিলেন? তাঁর এই হাসি কেন ঠান্ডা ও মিষ্ট ছিল?

উত্তর:

সন্ন্যাসী সেজেছিলেন: গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র **হরিদা** বিরাগী সেজেছিলেন। তিনি সন্ধ্যায় জগদীশ বাবুর বাড়িতে এই বেশ ধারণ করে যান।

হাসির কারণ: হরিদার হাসিটি ‘ঠান্ডা ও মিষ্ট’ হওয়ার কারণ—এই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা বা লোভ ছিল না।

  • ঠান্ডা হাসি: এই হাসিতে আসক্তিহীনতা বা বৈরাগ্যের ভাব ছিল। জগদীশ বাবুর দেওয়া টাকার লোভ তাঁকে স্পর্শ করেনি। টাকাকে তুচ্ছ করে তিনি যে আদর্শ বজায় রেখেছিলেন, তারই প্রতীক এই ঠান্ডা হাসি।
  • মিষ্ট হাসি: এই হাসিটি ছিল এক শিল্পীর সার্থকতার হাসি। তিনি বিরাগী সেজেও জগদীশ বাবুর মতো ধনী ও গম্ভীর মানুষকে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং তার চেয়েও বড় কথা, তিনি তাঁর শিল্পের চূড়ান্ত পরীক্ষাটি পাশ করতে পেরেছিলেন।
  • তাৎপর্য: এই হাসি হরিদার অভাবী জীবনের নয়, বরং তাঁর আদর্শবাদী শিল্পীসত্তার বিজয় ঘোষণা করে।

৭. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১. বহুরূপী গল্পটির লেখক কে?

উত্তর: বহুরূপী গল্পটির লেখক হলেন **সুবোধ ঘোষ**।

প্রশ্ন ২. হরিদার জীবনের পেশা কী ছিল?

উত্তর: হরিদার জীবনের পেশা ছিল ছদ্মবেশ ধারণ করে বা **বহুরূপী সেজে মানুষকে চমক দেওয়া**।

প্রশ্ন ৩. হরিদা কেন জগদীশ বাবুর দান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?

উত্তর: হরিদা **শিল্পের নীতি ও আদর্শ** বজায় রাখতে এবং বিরাগী বেশের মর্যাদা নষ্ট না করার জন্য দান করা টাকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

প্রশ্ন ৪. হরিদা সপ্তাহে মাত্র একদিন বাইরে বের হন কেন?

উত্তর: তিনি মনে করতেন, প্রতিদিন বের হলে তাঁর শিল্পের **’চমক’** নষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর কাছে শিল্পের মর্যাদা অর্থ উপার্জনের চেয়ে বেশি ছিল।


Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার