সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় ৬: পরিবেশের সজীব উপাদানের গঠনগত বৈচিত্র্য ও কার্যগত প্রক্রিয়া ৩ নম্বরের ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর

অধ্যায় ৬: সজীব উপাদানের গঠনগত বৈচিত্র্য — ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান ৩/৫)

1. একটি আদর্শ ফুল (যেমন জবা) -এর বিভিন্ন অংশের বর্ণনা দাও।

[Image of parts of a hibiscus flower diagram labeled]

উত্তর:
একটি আদর্শ ফুলের চারটি প্রধান স্তবক থাকে:
১. বৃত্তি (Calyx): ফুলের বাইরের সবুজ রঙের স্তবক। এটি কুঁড়ি অবস্থায় ফুলকে রোদ-বৃষ্টি ও পোকার হাত থেকে রক্ষা করে। এর প্রতিটি অংশকে বৃত্তাংশ বলে।
২. দলমণ্ডল (Corolla): এটি সাধারণত রঙিন হয়। এর প্রতিটি অংশকে পাপড়ি বা দলাংশ বলে। এটি পোকাদের আকর্ষণ করে পরাগযোগে সাহায্য করে।
৩. পুংস্তবক (Androecium): এটি ফুলের তৃতীয় স্তবক এবং পুংজনন অঙ্গ। এর প্রতিটি অংশকে পুংকেশর বলে। পুংকেশরের মাথায় পরাগধানী থাকে যেখানে পরাগরেণু উৎপন্ন হয়।
৪. স্ত্রীস্তবক (Gynoecium): এটি ফুলের কেন্দ্রে থাকে। এর তিনটি অংশ— গর্ভাশয় বা ডিম্বাশয়, গর্ভদণ্ড এবং গর্ভমুণ্ড। ডিম্বাশয়ের ভেতরে ডিম্বক থাকে যা পরে বীজে পরিণত হয়।

2. স্ব-পরাগযোগ ও ইতর পরাগযোগের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর:

বিষয় স্ব-পরাগযোগ ইতর পরাগযোগ
সংজ্ঞা একই ফুলের মধ্যে বা একই গাছের দুটি ফুলের মধ্যে ঘটে। একই প্রজাতির দুটি ভিন্ন গাছের ফুলের মধ্যে ঘটে।
বাহক সাধারণত বাহকের প্রয়োজন হয় না। বাহক (বায়ু, জল, পতঙ্গ) ছাড়া সম্ভব নয়।
নতুন বৈশিষ্ট্য নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্ভিদ উৎপন্ন হয় না। নতুন ও উন্নত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়।

3. মূলের রূপান্তর বলতে কী বোঝো? মূলো ও সুন্দরী গাছের মূলের রূপান্তর আলোচনা করো।

উত্তর:
মূল যখন তার স্বাভাবিক কাজ (জল শোষণ ও ধরে রাখা) ছাড়া অন্য কোনো বিশেষ কাজ (যেমন খাদ্য সঞ্চয় বা শ্বাসকার্য) করার জন্য নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে, তখন তাকে মূলের রূপান্তর বলে।
মূলো (সঞ্চয়ী মূল): মূলোর প্রধান মূলটি খাদ্য সঞ্চয় করে মোটা ও রসালো হয়। একে মূলাকৃতি মূল বলে।
সুন্দরী (শ্বাসমূল): সুন্দরবনের লবণাক্ত মাটিতে বাতাস চলাচল কম থাকে। তাই অক্সিজেন নেওয়ার জন্য সুন্দরী গাছের মূলের কিছু শাখা মাটির ওপরে উঠে আসে। এদের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। একে শ্বাসমূল বা নিউমাটোফোর বলে।

4. বীজের অঙ্কুরোদ্গম কত প্রকার ও কী কী? চিত্রসহ উদাহরণ দাও।

উত্তর:
অঙ্কুরোদ্গম প্রধানত দুই প্রকার:
১. মৃদভেদী অঙ্কুরোদ্গম (Epigeal): যে অঙ্কুরোদ্গমে বীজপত্রটি মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসে।
উদাহরণ: কুমড়ো, তেঁতুল, রেড়ি।
২. মৃদবর্তী অঙ্কুরোদ্গম (Hypogeal): যে অঙ্কুরোদ্গমে বীজপত্রটি মাটির নিচেই থেকে যায়, কেবল ভ্রূণমুকুল উপরে উঠে আসে।
উদাহরণ: ছোলা, মটর, ধান, আম।

5. পাতার বিভিন্ন অংশের কাজগুলি লেখো।

উত্তর:
১. ফলক (Leaf Blade): এটি পাতার চ্যাপ্টা সবুজ অংশ। এর প্রধান কাজ হলো সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করা এবং বাষ্পমোচনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জল বের করে দেওয়া।
২. বৃন্ত বা বোঁটা (Petiole): এটি ফলককে কাণ্ডের সাথে যুক্ত রাখে এবং ফলকে জল ও খনিজ লবণ পৌঁছে দেয়।
৩. পত্রমূল (Leaf Base): এটি পাতার সেই অংশ যা কাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকে। এটি পাতাকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

6. কাণ্ডের তিনটি প্রধান কাজ এবং দুটি বিশেষ কাজ (রূপান্তর) উল্লেখ করো।

উত্তর:
প্রধান কাজ:
১. ডালপালা, পাতা, ফুল ও ফল ধারণ করা।
২. মূল দ্বারা শোষিত জল পাতায় পৌঁছে দেওয়া।
৩. পাতায় তৈরি খাদ্য সারা দেহে ছড়িয়ে দেওয়া।
বিশেষ কাজ (রূপান্তর):
১. খাদ্য সঞ্চয়: আলুর স্ফীতকন্দ বা আদার রাইজোম খাদ্য সঞ্চয় করে।
২. বংশবিস্তার: কচুরিপানার খর্বধাবক বা আলুর চোখ থেকে নতুন চারাগাছ জন্মায়।

7. ব্যাপন ও অভিস্রবণের গুরুত্ব লেখো।

উত্তর:
ব্যাপনের গুরুত্ব:
১. উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ এবং অক্সিজেন বর্জন করে ব্যাপন প্রক্রিয়ায়।
২. ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পতঙ্গদের আকর্ষণ করে।
অভিস্রবণের গুরুত্ব:
১. উদ্ভিদ মূলরোম দিয়ে মাটি থেকে জল শোষণ করে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায়।
২. কাণ্ড ও পাতাকে সতেজ ও খাড়া রাখতে সাহায্য করে।

8. একটি আদর্শ ফলের (যেমন আম) গঠন বর্ণনা করো।

উত্তর:
নিষেকের পর ডিম্বাশয়টি ফলে পরিণত হয়। আমের মতো রসালো ফলের ত্বক বা ফলত্বক (Pericarp) তিনটি স্তরে বিভক্ত:
১. বহিস্ত্বক (Epicarp): এটি ফলের বাইরের পাতলা চামড়ার মতো অংশ (কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে হলুদ)।
২. মধ্যত্বক (Mesocarp): এটি রসালো ও শাঁসালো অংশ যা আমরা খাই।
৩. অন্তঃত্বক (Endocarp): এটি ফলের ভেতরের শক্ত অংশ বা আঁটি, যা বীজকে রক্ষা করে।

9. অঙ্কুরোদ্গমের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলি কী কী? একটি পরীক্ষার সাহায্যে দেখাও যে অঙ্কুরোদ্গমে জলের প্রয়োজন।

উত্তর:
শর্তাবলী: জল, বাতাস (অক্সিজেন) এবং উপযুক্ত তাপমাত্রা।
পরীক্ষা: দুটি পাত্র নেওয়া হলো। একটিতে শুকনো ছোলা এবং অন্যটিতে ভেজানো ছোলা রাখা হলো। দু-তিনদিন পর দেখা যাবে শুকনো ছোলা থেকে অঙ্কুর বের হয়নি, কিন্তু ভেজানো ছোলা থেকে অঙ্কুর বের হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য জল একান্ত প্রয়োজন।

10. পাতার রূপান্তর হিসেবে ‘পত্র-আকর্ষ’ এবং ‘পত্রকণ্টক’-এর বর্ণনা দাও।

উত্তর:
পত্র-আকর্ষ (Leaf Tendril): মটর গাছের মতো দুর্বল কাণ্ডের উদ্ভিদে সম্পূর্ণ পাতা বা পাতার কিছু অংশ স্প্রিং-এর মতো সরু সুতোয় পরিণত হয়। একে পত্র-আকর্ষ বলে। এটি কোনো অবলম্বনকে জড়িয়ে ধরে গাছকে উপরে উঠতে সাহায্য করে।
পত্রকণ্টক (Leaf Spine): ফণীমনসা বা ক্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদে বাষ্পমোচন কমানোর জন্য পাতাগুলি সরু ও শক্ত কাঁটায় রূপান্তরিত হয়। এটি পশুপাখির হাত থেকে গাছকে রক্ষাও করে।

11. উদ্ভিদের বংশবিস্তারে ফুলের ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর:
ফুল হলো উদ্ভিদের প্রধান জনন অঙ্গ।
১. ফুলের পুংস্তবক পরাগরেণু এবং স্ত্রীস্তবক ডিম্বক তৈরি করে।
২. পরাগযোগের মাধ্যমে পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়।
৩. এরপর নিষেক ঘটে এবং ডিম্বাশয়টি ফলে ও ডিম্বকটি বীজে পরিণত হয়।
৪. এই বীজ মাটিতে পড়লে অনুকূল পরিবেশে অঙ্কুরিত হয়ে নতুন চারাগাছ বা অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি করে। এভাবে ফুল বংশবিস্তারে সাহায্য করে।

12. গুচ্ছিত ফল ও যৌগিক ফলের উদাহরণসহ সংজ্ঞা দাও।

উত্তর:
গুচ্ছিত ফল (Aggregate Fruit): যখন একটি ফুলের অনেকগুলি মুক্ত গর্ভপত্র থাকে এবং প্রতিটি গর্ভপত্র থেকে একটি করে ছোট ফল তৈরি হয়ে একগুচ্ছ ফল গঠন করে, তাকে গুচ্ছিত ফল বলে।
উদাহরণ: আতা, স্ট্রবেরি, ছাতিম।
যৌগিক ফল (Multiple Fruit): যখন কোনো মঞ্জরিদণ্ডের সবকটি ফুল মিলে একটিমাত্র বড় ফলে পরিণত হয়, তখন তাকে যৌগিক ফল বলে।
উদাহরণ: আনারস, কাঁঠাল, বট।

অধ্যায় ৬: সজীব উপাদানের গঠনগত বৈচিত্র্য — অতিরিক্ত ৪টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন

13. পতঙ্গপরাগী ও বায়ুপরাগী ফুলের বৈশিষ্ট্যের তুলনা করো।

উত্তর:

বৈশিষ্ট্য পতঙ্গপরাগী ফুল (যেমন- আম, জবা) বায়ুপরাগী ফুল (যেমন- ধান, গম)
বর্ণ ও আকার ফুল বড়, উজ্জ্বল রঙিন ও দর্শনীয় হয়। ফুল ছোট, অনুজ্জ্বল এবং বর্ণহীন হয়।
গন্ধ ও মকরন্দ সুগন্ধ এবং মিষ্টি রস বা মকরন্দ থাকে। কোনো গন্ধ বা মকরন্দ থাকে না।
পরাগরেণু পরাগরেণু আঠালো ও কণ্টকযুক্ত হয় (পোকায় আটকে যাওয়ার জন্য)। পরাগরেণু খুব হালকা, মসৃণ ও প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।

14. একটি পরীক্ষার সাহায্যে ‘ব্যাপন’ প্রক্রিয়াটি বুঝিয়ে দাও।

উত্তর:
উপকরণ: একটি কাঁচের গ্লাস, জল এবং কালির দোয়াত বা ড্রপার।
পরীক্ষা: কাঁচের গ্লাসটি জল দিয়ে ভর্তি করা হলো। এবার ড্রপারের সাহায্যে এক ফোঁটা লাল বা নীল কালি জলের ওপর সাবধানে ফেলে দেওয়া হলো।
পর্যবেক্ষণ: কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে কালির ফোঁটাটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং একসময় সম্পূর্ণ গ্লাসের জল রঙিন হয়ে গেছে।
সিদ্ধান্ত: কালির অণুগুলি বেশি ঘনত্ব থেকে কম ঘনত্বের (জলের) দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এটিই ব্যাপন।

15. একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের মূল, পাতা ও বীজের তুলনামূলক আলোচনা করো।

উত্তর:

বিষয় একবীজপত্রী (যেমন- ধান, কলা) দ্বিবীজপত্রী (যেমন- আম, ছোলা)
মূল গুচ্ছমূল বা অস্থানিক মূল থাকে। প্রধান মূল বা স্থানিক মূল থাকে।
পাতা (শিরাবিন্যাস) সমান্তরাল শিরাবিন্যাস দেখা যায়। জালিকাকার শিরাবিন্যাস দেখা যায়।
বীজ একটিমাত্র বীজপত্র থাকে। দুটি বীজপত্র থাকে।

16. উদ্ভিদের নিষেক এবং ফল ও বীজ গঠনের প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর:
১. পরাগযোগ: প্রথমে পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে পড়ে।
২. জনননালী গঠন: পরাগরেণু থেকে একটি সরু নালী (পরাগনালী) বের হয়ে গর্ভদণ্ড ভেদ করে ডিম্বাশয়ে পৌঁছায়।
৩. নিষেক: পরাগনালীর মধ্য দিয়ে পুংজনন কোষ ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করে এবং ডিম্বকের ভেতরের স্ত্রীজনন কোষের (ডিম্বাণু) সাথে মিলিত হয়। একে নিষেক বলে।
৪. ফল ও বীজ গঠন: নিষেকের পর ডিম্বাশয়টি বৃদ্ধি পেয়ে ‘ফলে’ পরিণত হয় এবং ভেতরের ডিম্বকটি ‘বীজে’ পরিণত হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার