সপ্তম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় ৭: পরিবেশের সংকট, উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংরক্ষণ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন মান ৩ এবং ৫
অধ্যায় ৭: পরিবেশের সংকট ও সংরক্ষণ — ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (মান ৩/৫)
1. বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) কী? এর দুটি প্রধান কারণ এবং দুটি ফলাফল লেখো। (২+৩)
বিশ্ব উষ্ণায়ন: বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির (যেমন— $CO_2$, মিথেন, CFC) পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
কারণ:
১. জীবাশ্ম জ্বালানির দহন: কলকারখানা ও যানবাহনে প্রচুর পরিমাণে কয়লা ও পেট্রোল পোড়ানোর ফলে বাতাসে প্রচুর $CO_2$ মিশছে।
২. বনভূমি ধ্বংস: গাছপালা কেটে ফেলার ফলে বাতাসে $CO_2$-এর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, কারণ গাছ $CO_2$ শোষণ করে নেয়।
ফলাফল:
১. মেরু অঞ্চলের বরফ গলন: তাপমাত্রা বাড়ার ফলে দুই মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে, যার ফলে সমুদ্রের জলতল বেড়ে যাচ্ছে।
২. জলবায়ু পরিবর্তন: পৃথিবীর আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে, যার ফলে অতিবৃষ্টি, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে।
2. জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) হ্রাসের তিনটি প্রধান কারণ আলোচনা করো। (৩)
জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার বা বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণগুলি হলো:
১. বাসস্থান ধ্বংস: জনসংখ্যা বাড়ার ফলে বন জঙ্গল কেটে চাষের জমি ও ঘরবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। ফলে বন্যপ্রাণীরা তাদের থাকার জায়গা ও খাদ্য হারাচ্ছে।
২. চোরাশিকার: অর্থের লোভে একদল অসাধু মানুষ বাঘ, হাতি, গণ্ডার ইত্যাদি প্রাণীকে হত্যা করে তাদের চামড়া, দাঁত বা শিং বিদেশে পাচার করছে।
৩. পরিবেশ দূষণ: জল, মাটি ও বায়ু দূষণের ফলে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ টিকতে না পেরে মারা যাচ্ছে (যেমন— গঙ্গার শুশুক বা ডলফিন)।
3. ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে নিম ও বেলের ব্যবহার বা গুরুত্ব লেখো। (৩+২)
নিম (Neem):
১. ত্বকের রোগ: নিম পাতা ও ছাল শক্তিশালী জীবাণুনাশক। এটি একজিমা, চুলকানি ও খোসপাঁচড়া সারাতে দারুণ কাজ করে।
২. দাঁতের যত্ন: নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ও মাড়ি মজবুত হয় এবং মুখে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে না।
৩. কৃমি নাশক: নিম পাতার রস কৃমি নাশ করতে সাহায্য করে।
বেল (Bael):
১. পেটের রোগ: কাঁচা বেল পোড়া বা সিদ্ধ করে খেলে আমাশয় ও পেটের গোলমাল ভালো হয়।
২. কোষ্ঠকাঠিন্য: পাকা বেলের শরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
4. সুন্দরবনের পরিবেশগত সমস্যাগুলি কী কী? (৩)
সুন্দরবনের প্রধান সমস্যাগুলি হলো:
১. সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলতল বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের অনেক ছোট ছোট দ্বীপ (যেমন— ঘোড়ামারা, লোহাচরা) ডুবে যাচ্ছে।
২. মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে পড়ার ফলে কৃষিজমি ও মিষ্টি জলের পুকুর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা চাষবাস ও পানের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
৩. ম্যানগ্রোভ ধ্বংস: জ্বালানি ও আসবাবের জন্য নির্বিচারে সুন্দরী ও গরান গাছ কেটে ফেলার ফলে নদীর পাড় ভাঙছে এবং ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে।
5. জীববৈচিত্র্য বা Biodiversity-র গুরুত্ব লেখো। (৩)
আমাদের জীবনে ও পরিবেশে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম:
১. খাদ্যের উৎস: মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীরা খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। ধান, গম, মাছ, মাংস সব জীববৈচিত্র্য থেকেই আসে।
২. ওষুধের উৎস: বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ (সিঙ্কোনা, নিম, সর্পগন্ধা) থেকে আমরা জীবনদায়ী ওষুধ পাই।
৩. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা: প্রতিটি জীব খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত। জীববৈচিত্র্য ঠিক থাকলে তবেই পরিবেশে $O_2$ ও $CO_2$-এর ভারসাম্য এবং বৃষ্টিপাত ঠিক থাকে।
6. পিপলস বায়োডাইভারসিটি রেজিস্টার (PBR) কী? এর প্রয়োজনীয়তা কী? (২+৩)
PBR: পিপলস বায়োডাইভারসিটি রেজিস্টার বা PBR হলো একটি সরকারি নথি বা খাতা, যেখানে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্ত উদ্ভিদ, প্রাণী এবং তাদের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার লিপিবদ্ধ করা হয়।
প্রয়োজনীয়তা:
১. স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়।
২. কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে কিনা তা চিহ্নিত করা যায়।
৩. স্থানীয় ভেষজ উদ্ভিদের সনাতন ব্যবহার ও জ্ঞান সংরক্ষণ করা যায়।
7. আমলকী ও ঘৃতকুমারীর ঔষধি গুণাগুণ বর্ণনা করো। (২+৩)
আমলকী (Amla):
১. এটি ভিটামিন-সি এর সবচেয়ে ভালো উৎস। স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে।
২. কোষ্ঠকাঠিন্য ও অম্বল দূর করতে এবং চুলের গোড়া মজবুত করতে সাহায্য করে।
ঘৃতকুমারী (Aloe vera):
১. এর পাতার রস বা জেল পোড়া জায়গায় লাগালে জ্বালা কমে ও দ্রুত সারে।
২. পেট ঠান্ডা রাখতে এবং লিভারের কাজ ভালো করতে এর শরবত খাওয়া হয়।
৩. ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ করতে এটি ব্যবহার করা হয়।
8. মিষ্টি জলের সংকট বা অভাব কেন দেখা দিচ্ছে? (৩)
মিষ্টি জলের সংকটের কারণগুলি হলো:
১. ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার: চাষবাস ও কলকারখানার জন্য পাম্প দিয়ে মাটির নিচ থেকে অতিরিক্ত জল তুলে ফেলার ফলে জলস্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
২. জলাশয় ভরাট: পুকুর, খাল, বিল ভরাট করে বাড়িঘর তৈরির ফলে বৃষ্টির জল মাটির নিচে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
৩. জলের অপচয় ও দূষণ: দৈনন্দিন কাজে জলের অপচয় এবং নদীর জল নোংরা হওয়ার ফলে ব্যবহারযোগ্য জলের অভাব দেখা দিচ্ছে।
9. জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট (JFM) কী? এটি কীভাবে বন সংরক্ষণে সাহায্য করে? (২+৩)
JFM: জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট বা যৌথ বন ব্যবস্থাপনা হলো ভারত সরকারের একটি প্রকল্প, যেখানে বনদপ্তর ও স্থানীয় গ্রামের মানুষ যৌথভাবে বনজঙ্গল রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা প্রদান করে। ১৯৭১ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়ি অরণ্যে এটি প্রথম শুরু হয়।
ভূমিকা:
১. গ্রামবাসীরা বনকে চোরাশিকারি ও কাঠচোরদের হাত থেকে রক্ষা করে।
২. বিনিময়ে সরকার গ্রামবাসীদের বনের শুকনো কাঠ, পাতা, ফল ও মধু সংগ্রহের অধিকার দেয় এবং বন থেকে আয়ের একটি অংশ প্রদান করে। ফলে মানুষ বন ধ্বংস না করে বন রক্ষায় আগ্রহী হয়।
10. অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain) কী? এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি লেখো। (২+৩)
অ্যাসিড বৃষ্টি: বাতাসে মিশে থাকা সালফার ডাই-অক্সাইড ($SO_2$) ও নাইট্রোজেন অক্সাইড ($NO_x$) বৃষ্টির জলের সাথে বিক্রিয়া করে সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়ে। একে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
ক্ষতিকর প্রভাব:
১. মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং গাছের ক্ষতি হয়।
২. পুকুর বা নদীর জল আম্লিক হয়ে যাওয়ায় মাছ ও জলজ প্রাণীরা মারা যায়।
৩. মার্বেল পাথরের তৈরি সৌধ বা ভাস্কর্য (যেমন— তাজমহল) ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও হলুদ হয়ে যায় (স্টোন ক্যান্সার)।
11. তুলসী ও নয়নতারা গাছের ভেষজ গুণাগুণ লেখো। (৩+২)
তুলসী (Tulsi):
১. সর্দি, কাশি, গলাব্যথা ও জ্বরে তুলসী পাতার রস মধুর সাথে খেলে খুব উপকার পাওয়া যায়।
২. এটি কৃমি ও বায়ুনাশক হিসেবেও কাজ করে।
৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
নয়নতারা (Nayantara):
১. এর মূল ও পাতায় ভিনক্রিস্টিন ও ভিনব্লাস্টিন নামক উপক্ষার থাকে যা ব্লাড ক্যান্সার (লিউকেমিয়া) সারাতে ব্যবহৃত হয়।
২. এটি ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
12. গঙ্গার শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিন বিপন্ন হওয়ার কারণ কী? (৩)
গঙ্গার শুশুক বিপন্ন হওয়ার কারণগুলি হলো:
১. দূষণ: গঙ্গার জলে কলকারখানার বর্জ্য ও কৃষিক্ষেত্রের কীটনাশক মেশার ফলে জল বিষাক্ত হচ্ছে, যা শুশুকদের মৃত্যুর কারণ।
২. মাছ ধরার জাল: জেলেরা মাছ ধরার জন্য যে মিহি জাল (মনোফিলামেন্ট) ব্যবহার করে, তাতে অনেক সময় শুশুক আটকে গিয়ে শ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়।
৩. খাদ্যের অভাব: নদীতে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শুশুকরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না।
13. থানকুনি ও কালমেঘ গাছের ভেষজ গুণ আলোচনা করো। (২+৩)
থানকুনি (Thankuni):
১. আমাশয় ও পেটের গোলমাল সারাতে থানকুনি পাতা খুবই উপকারী।
২. এটি শিশুদের স্মৃতিশক্তি ও মেধা বাড়াতে সাহায্য করে।
কালমেঘ (Kalmegh):
১. লিভার বা যকৃতের দোষ সারাতে ও জন্ডিস রোগ নিরাময়ে কালমেঘ পাতার রস অব্যর্থ ওষুধ।
২. এটি রক্ত পরিষ্কার করে এবং কৃমি নাশ করতে সাহায্য করে।
14. বায়ুদূষণের ফলে মানুষের শরীরে কী কী রোগ হতে পারে? (৩)
বায়ুদূষণের ফলে সৃষ্ট প্রধান রোগগুলি হলো:
১. শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি (Asthma): ধুলোবালি ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসনালীর সমস্যা দেখা দেয়।
২. ব্রঙ্কাইটিস: ফুসফুসের বায়ুথলিতে প্রদাহ বা জ্বালা সৃষ্টি হয়।
৩. ফুসফুসের ক্যান্সার: যানবাহনের ধোঁয়ায় থাকা বিষাক্ত কণা (যেমন বেঞ্জিন) ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
৪. অ্যালার্জি: ধুলো ও পরাগরেণু থেকে চোখ ও ত্বকে অ্যালার্জি হয়।
15. পরিবেশ সংরক্ষণে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? (৩)
ছাত্রছাত্রীরা নিম্নলিখিত উপায়ে পরিবেশ রক্ষায় সাহায্য করতে পারে:
১. প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বর্জন করে পাটের বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা।
২. বিদ্যালয় ও বাড়ির আশেপাশে গাছ লাগানো এবং তাদের যত্ন নেওয়া।
৩. জল ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করা (যেমন— অকারণে ফ্যান-লাইট বা কল চালিয়ে না রাখা)।
৪. পরিবেশ দূষণের কুফল সম্পর্কে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করা।