অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 1.3

অধ্যায় 1.3: তাপ — ব্যাখ্যামূলক ও গাণিতিক প্রশ্ন (মান ৩)

1. ক্যালোরিমিতির মূলনীতিটি বিবৃত করো। এই নীতিটি কখন প্রযোজ্য হয় না? (২+১)

উত্তর:
মূলনীতি: ভিন্ন উষ্ণতার দুটি বস্তুকে পরস্পরের সংস্পর্শে আনলে, তাদের মধ্যে তাপের আদান-প্রদান ঘটে। উষ্ণ বস্তুটি তাপ বর্জন করে এবং শীতল বস্তুটি তাপ গ্রহণ করে। যদি তাপ অন্য কোনোভাবে নষ্ট না হয় এবং কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া না ঘটে, তবে—

উষ্ণ বস্তু কর্তৃক বর্জন করা তাপ = শীতল বস্তু কর্তৃক গ্রহণ করা তাপ

ব্যতিক্ৰম:
1. যদি বস্তু দুটির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে।
2. যদি বস্তুর উপাদানের কোনো ভৌত পরিবর্তন (যেমন গলন বা বাষ্পীভবন) ঘটে, তবে এই নীতি সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না (সেক্ষেত্রে লীন তাপের হিসেব আসে)।

2. গাণিতিক সমস্যা: 20°C উষ্ণতার 100 গ্রাম জলকে ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করতে মোট কত তাপ লাগবে? (জলের আপেক্ষিক তাপ = 1 cal/g·°C, বাষ্পীভবনের লীন তাপ = 540 cal/g)। (৩)

উত্তর:
এখানে দুটি ধাপে তাপ লাগবে:
ধাপ ১: 20°C জলকে 100°C ফুটন্ত জলে পরিণত করতে গৃহীত তাপ ($H_1$):
$H_1 = m \times s \times (t_2 – t_1)$
$H_1 = 100 \times 1 \times (100 – 20)$
$H_1 = 100 \times 80 = 8000$ cal।

ধাপ ২: 100°C ফুটন্ত জলকে 100°C বাষ্পে পরিণত করতে (লীন তাপ) প্রয়োজনীয় তাপ ($H_2$):
$H_2 = m \times L$
$H_2 = 100 \times 540 = 54000$ cal।

মোট তাপ: $H = H_1 + H_2 = 8000 + 54000 = 62000$ cal বা 62 kcal

3. জলের ব্যতিক্রান্ত প্রসারণ কী? জলজ প্রাণীদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব লেখো। (১+২)

উত্তর:
ব্যতিক্রান্ত প্রসারণ: সাধারণত তরলকে ঠান্ডা করলে আয়তন কমে। কিন্তু জলকে 4°C থেকে 0°C পর্যন্ত ঠান্ডা করলে আয়তন না কমে বরং বেড়ে যায়। একে জলের ব্যতিক্রান্ত প্রসারণ বলে।
গুরুত্ব: শীতপ্রধান দেশে পুকুরের ওপরের স্তরের জল জমে বরফ (0°C) হয়ে গেলেও, জলের ব্যতিক্রান্ত প্রসারণের জন্য নিচের স্তরের জল 4°C তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে (কারণ 4°C-এ জলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি, তাই ভারী জল নিচে থাকে)। এই তরল স্তরেই মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বেঁচে থাকে।

4. থার্মোফ্লাস্কের গঠন ও কার্যনীতি সংক্ষেপে লেখো। (৩)

উত্তর:
থার্মোফ্লাস্ক হলো কাঁচ বা স্টিলের তৈরি দুই দেওয়াল বিশিষ্ট একটি পাত্র।
1. পরিবহন ও পরিচলন রোধ: দুই দেওয়ালের মাঝখানের বাতাস বের করে বায়ুশূন্য করা হয়। ফলে পরিবহন ও পরিচলন পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালিত হতে পারে না।
2. বিকিরণ রোধ: দেওয়ালের ভেতরের দিকে রুপোর প্রলেপ দেওয়া থাকে। ফলে তাপ প্রতিফলিত হয়ে ভেতরেই থেকে যায়, বাইরে বেরোতে পারে না (বিকিরণ আটকায়)।
এভাবে তিনটি পদ্ধতিতে তাপ সঞ্চালন বন্ধ করে ফ্লাস্কের তরলকে দীর্ঘক্ষণ গরম বা ঠান্ডা রাখা হয়।

5. গাণিতিক সমস্যা: 50 গ্রাম ভরের একটি তামার বলকে 100°C উষ্ণতায় উত্তপ্ত করে 30°C উষ্ণতার 100 গ্রাম জলের মধ্যে ফেলা হলো। মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা কত হবে? (তামার আপেক্ষিক তাপ = 0.09 cal/g·°C)। (৩)

উত্তর:
ধরি, মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা = $t^{\circ}C$
তামার বল কর্তৃক বর্জিত তাপ = $50 \times 0.09 \times (100 – t) = 4.5(100 – t)$
জল কর্তৃক গৃহীত তাপ = $100 \times 1 \times (t – 30) = 100(t – 30)$

ক্যালোরিমিতির মূলনীতি অনুযায়ী,
বর্জিত তাপ = গৃহীত তাপ
$4.5(100 – t) = 100(t – 30)$
$450 – 4.5t = 100t – 3000$
$100t + 4.5t = 3000 + 450$
$104.5t = 3450$
$t = 3450 / 104.5 \approx 33.01^{\circ}C$
অতএব, মিশ্রণের চূড়ান্ত উষ্ণতা প্রায় 33°C

6. বাষ্পায়নের হার কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে? (যে-কোনো ৩টি) (৩)

উত্তর:
1. তরলের উপরিতলের ক্ষেত্রফল: তরলের উপরিভাগ যত চওড়া বা বিস্তৃত হবে, বাষ্পায়ন তত দ্রুত হবে (যেমন- গ্লাসের চেয়ে থালায় চা তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়)।
2. বায়ুপ্রবাহ: তরলের ওপর দিয়ে বায়ু চলাচল বাড়লে বাষ্পায়ন দ্রুত হয় (যেমন- ফ্যানের নিচে ঘাম তাড়াতাড়ি শুকায়)।
3. বায়ুর আর্দ্রতা: বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকলে (শুষ্ক বাতাস) বাষ্পায়ন তাড়াতাড়ি হয়, কিন্তু আর্দ্র বাতাসে বাষ্পায়ন দেরিতে হয়।

7. পাহাড়ে রান্না করতে দেরি হয় কেন? প্রেসার কুকার কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করে? (১.৫+১.৫)

উত্তর:
সমস্যা: পাহাড়ে বায়ুর চাপ কম থাকে। চাপ কমলে তরলের স্ফুটনাঙ্ক কমে যায়। তাই পাহাড়ে জল 100°C-এর অনেক কম তাপমাত্রায় ফুটতে শুরু করে। কম তাপমাত্রায় ফোটানোর ফলে চাল বা ডাল সেদ্ধ হতে অনেক বেশি সময় লাগে বা ভালো সেদ্ধ হয় না।
সমাধান: প্রেসার কুকারে আবদ্ধ বাষ্পের চাপে ভেতরের চাপ অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে জলের স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে প্রায় 120°C হয়। এই উচ্চ তাপমাত্রায় খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয়।

8. মাটির কলসির জল ঠান্ডা থাকে, কিন্তু ধাতব পাত্রের জল ঠান্ডা হয় না কেন? (৩)

উত্তর:
মাটির কলসির গায়ে অসংখ্য অণুবীক্ষণিক ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্র দিয়ে জল চুইয়ে কলসির বাইরে আসে এবং বাতাসের সংস্পর্শে বাষ্পীভূত হয়। বাষ্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় লীন তাপ জল কলসি ও তার ভেতরের জল থেকে সংগ্রহ করে, ফলে জল ঠান্ডা হয়।
অন্যদিকে, ধাতব পাত্রের গায়ে কোনো ছিদ্র থাকে না, তাই জল চুইয়ে বাইরে আসতে পারে না এবং বাষ্পায়নও হয় না। ফলে লীন তাপ শোষিত হয় না এবং জল ঠান্ডা হয় না।

9. গাণিতিক সমস্যা: 0°C উষ্ণতার 50 গ্রাম বরফকে 20°C উষ্ণতার জলে পরিণত করতে কত তাপ লাগবে? (৩)

উত্তর:
এখানে দুটি ধাপে তাপ প্রয়োজন:
1. অবস্থার পরিবর্তন: 0°C বরফ থেকে 0°C জল হতে তাপ লাগবে ($H_1$) = $m \times L$
$H_1 = 50 \times 80 = 4000$ cal।
2. উষ্ণতা বৃদ্ধি: 0°C জল থেকে 20°C জল হতে তাপ লাগবে ($H_2$) = $m \times s \times t$
$H_2 = 50 \times 1 \times (20 – 0) = 50 \times 20 = 1000$ cal।

মোট তাপ: $H = 4000 + 1000 = 5000$ ক্যালোরি।

10. রেললাইনের দুটি পাতের জোড়ার মুখে ফাঁক রাখা হয় কেন? ফাঁক না রাখলে কী অসুবিধা হতো? (২+১)

উত্তর:
কারণ: লোহা তাপের সুপরিবাহী এবং তাপে প্রসারিত হয়। গরমকালে সূর্যের তাপে এবং রেলগাড়ি চলার সময় চাকার ঘর্ষণে রেললাইন গরম হয়ে দৈর্ঘ্যে বেড়ে যায়। জোড়মুখে ফাঁক রাখা হয় যাতে লাইনের এই প্রসারণ বাধাপ্রাপ্ত না হয়।
অসুবিধা: যদি ফাঁক না রাখা হতো, তবে প্রসারণের জন্য জায়গা না পেয়ে লাইনের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হতো এবং লাইন বেঁকে যেত। এর ফলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

11. সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ু সৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করো। (৩)

উত্তর:
জলের আপেক্ষিক তাপ মাটির চেয়ে বেশি। তাই জল দেরিতে গরম হয় ও দেরিতে ঠান্ডা হয়, কিন্তু মাটি তাড়াতাড়ি গরম ও ঠান্ডা হয়।
সমুদ্রবায়ু (দিনে): দিনের বেলায় সূর্যের তাপে স্থলভাগ সমুদ্রের চেয়ে বেশি গরম হয়। ডাঙ্গার বাতাস গরম হয়ে ওপরে উঠে যায়, তখন সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস ডাঙ্গার দিকে ছুটে আসে।
স্থলবায়ু (রাতে): রাতে স্থলভাগ তাপ বর্জন করে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়, কিন্তু সমুদ্রের জল তখনো গরম থাকে। ফলে সমুদ্রের বাতাস গরম হয়ে ওপরে ওঠে এবং স্থলভাগের ঠান্ডা বাতাস সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়।

12. গরমকালে কুকুরের জিভ থেকে লালা পড়ে কেন? এটি কীভাবে তাদের সাহায্য করে? (৩)

উত্তর:
কুকুরের শরীরে ঘর্মগ্রন্থি খুব কম থাকে (প্রধানত পায়ের তলায়), তাই তারা ঘামতে পারে না। গরমকালে শরীর ঠান্ডা করার জন্য কুকুর জিভ বের করে হাঁপায় এবং লালা নিঃসরণ করে।
এই লালা যখন জিভ থেকে বাষ্পীভূত হয়, তখন বাষ্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় লীন তাপ জিভ থেকে শোষিত হয়। ফলে জিভ ঠান্ডা হয় এবং রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার