নবম শ্রেণি: ইতিহাস অধ্যায় – 2 বিপ্লবী আদর্শ নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য ও জাতীয়বাদ, ৮ নম্বরের প্রশ্নোত্তর

অধ্যায় ২: নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্য – রচনাধর্মী প্রশ্ন (মান – ৮)

প্রশ্ন ১: নেপোলিয়নের অভ্যন্তরীণ সংস্কারগুলি আলোচনা করো। (বিশেষত ‘কোড নেপোলিয়ন’-এর ওপর গুরুত্ব দিয়ে)

ভূমিকা: নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কেবল একজন দিগবিজয়ী বীরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ প্রশাসক ও সংস্কারক। তিনি গর্ব করে বলতেন, “আমার ৪০টি যুদ্ধজয়ের কাহিনী ওয়াটারলুর যুদ্ধে মুছে যেতে পারে, কিন্তু আমার আইনবিধি বা সিভিল কোড আমাকে চিরজীবী করে রাখবে।” প্রথম কনসাল হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন।

১. কোড নেপোলিয়ন বা আইনবিধি প্রবর্তন:

নেপোলিয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘কোড নেপোলিয়ন’ (Code Napoleon) প্রবর্তন (১৮০৪)। বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। নেপোলিয়ন ৪ জন বিশিষ্ট আইনজীবীর সহায়তায় ২২৮৭টি ধারা সংবলিত এই আইনবিধি রচনা করেন। এর তিনটি অংশ ছিল—দেওয়ানি, ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক আইন।

  • আইনি সাম্য: এই আইনের দ্বারা আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়।
  • সামন্ততন্ত্রের বিলোপ: জন্মগত ও বংশগত বিশেষ অধিকার বাতিল করা হয় এবং যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়।
  • সম্পত্তি ও পরিবার: ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়। তবে নারীদের অধিকার খর্ব করে তাদের স্বামীর অধীনস্থ করা হয়।

২. অর্থনৈতিক সংস্কার:

ফ্রান্সের দেউলিয়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে তিনি ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে ‘ব্যাংক অফ ফ্রান্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কর আদায় ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করেন এবং স্টক এক্সচেঞ্জ বা শেয়ার বাজার স্থাপন করেন। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি রাস্তাঘাট ও সৌধ নির্মাণের মতো পূর্তকার্য শুরু করেন।

৩. শিক্ষা সংস্কার:

নেপোলিয়ন বিশ্বাস করতেন, “রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি হলো শিক্ষা।” তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে চার্চের প্রভাবমুক্ত করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনেন।

• প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারে তিনি যথাক্রমে কমিউন স্কুল ও লাইসিয়াম (Lyceum) প্রতিষ্ঠা করেন।

• সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা তদারকির জন্য ১৮০৮ সালে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রান্স’ গঠন করেন।

৪. ধর্মীয় সংস্কার (কনকর্ড্যাট):

বিপ্লবের সময় চার্চের সাথে রাষ্ট্রের যে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, তা মেটানোর জন্য ১৮০১ সালে তিনি পোপ সপ্তম পায়াসের সাথে ‘কনকর্ড্যাট’ বা ধর্মমীমাংসা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর ফলে ফ্রান্সে ক্যাথলিক ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু চার্চ রাষ্ট্রের অধীনস্থ থাকে।

উপসংহার: নেপোলিয়নের এই সংস্কারগুলো ফ্রান্সকে মধ্যযুগীয় বিশৃঙ্খলা থেকে আধুনিক যুগে উন্নীত করেছিল। ঐতিহাসিক ফিশার তাই যথার্থই বলেছেন, “তিনি ছিলেন বিপ্লবের সন্তান।”


প্রশ্ন ২: মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা কী? এই প্রথা কেন ব্যর্থ হয়েছিল? (৩+৫)

ভূমিকা: ট্রাফালগারের নৌযুদ্ধে (১৮০৫) ইংল্যান্ডের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন যে, সমুদ্রপথে ইংল্যান্ডকে হারানো অসম্ভব। তাই তিনি ইংল্যান্ডকে ভাতে মারার জন্য বা তার অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য যে অর্থনৈতিক অবরোধ নীতি গ্রহণ করেন, তাকে ‘মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা’ (Continental System) বলা হয়।

অবরোধ প্রথার প্রয়োগ:

ইংল্যান্ডকে জব্দ করার জন্য নেপোলিয়ন ১৮০৬ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যে বার্লিন ডিক্রি, ওয়ারশ ডিক্রি, মিলান ডিক্রি এবং ফনটেনব্লু ডিক্রি জারি করেন। এর মূল কথা ছিল—ইউরোপের কোনো বন্দরে ব্রিটিশ জাহাজ বা পণ্য ঢুকতে পারবে না। ইংল্যান্ডও এর পাল্টা হিসেবে ‘অর্ডারস ইন কাউন্সিল’ জারি করে।

ব্যর্থতার কারণসমূহ:

নেপোলিয়নের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায় এবং ব্যর্থ হয়। এর কারণগুলি হলো:

  • ১. নৌবাহিনীর দুর্বলতা: ইংল্যান্ডের শক্তিশালী নৌবাহিনীর তুলনায় ফ্রান্সের নৌবাহিনী ছিল নগণ্য। ফ্রান্সের পক্ষে ইউরোপের বিশাল উপকূলরেখা পাহারা দেওয়া এবং ব্রিটিশ চোরাচালান বন্ধ করা অসম্ভব ছিল।
  • ২. বিকল্প পণ্যের অভাব: ইউরোপবাসী ব্রিটিশ পণ্য (যেমন—বস্ত্র, চিনি, কফি, জুতো)-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফরাসি শিল্প-কারখানাগুলি ইংল্যান্ডের বিকল্প হিসেবে এই বিপুল চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। ফলে দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া হয় এবং সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
  • ৩. মিত্রশক্তির অসহযোগিতা: পর্তুগাল, স্পেন, রাশিয়া এবং পোপের রাজ্য এই প্রথা মানতে অস্বীকার করে। ফলে নেপোলিয়নকে জোর করে এই প্রথা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধে জড়াতে হয় (যেমন—স্পেন ও রাশিয়া আক্রমণ), যা তাঁর পতন ডেকে আনে।
  • ৪. ইংল্যান্ডের নতুন বাজার: ইউরোপের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও ইংল্যান্ড এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করে অর্থনীতি সচল রাখে।

উপসংহার: ঐতিহাসিকদের মতে, মহাদেশীয় অবরোধ ছিল নেপোলিয়নের এক ‘হিমালয় সদৃশ ভুল’। ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করতে গিয়ে তিনি নিজের সাম্রাজ্যকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।


প্রশ্ন ৩: নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতনের কারণগুলি আলোচনা করো।

ভূমিকা: উল্কার মতো যার উত্থান হয়েছিল, ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁর পতনও হয়েছিল নাটকীয়ভাবে। যে নেপোলিয়ন একসময় সমগ্র ইউরোপকে পদানত করেছিলেন, তাঁর পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছিল।

১. ব্যক্তিগত ও চারিত্রিক ত্রুটি:

নেপোলিয়নের অসীম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অহংকার তাঁকে বাস্তবজ্ঞানহীন করে তুলেছিল। তিনি নিজের বিচারবুদ্ধিকেই চূড়ান্ত মনে করতেন এবং সেনাপতি বা মন্ত্রীদের পরামর্শ গ্রাহ্য করতেন না। শেষের দিকে তাঁর শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছিল।

২. মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা:

ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করার জন্য নেওয়া এই নীতি বুমেরাং হয়ে ফরাসি অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে দেয়। এর ফলে ইউরোপের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা তাঁর ঘোর বিরোধী হয়ে ওঠে।

৩. জাতীয়তাবাদের জাগরণ:

নেপোলিয়ন যে জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে ফ্রান্সে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই জাতীয়তাবোধই পরবর্তীকালে ইউরোপের অন্যান্য দেশে (স্পেন, প্রুশিয়া, ইতালি, জার্মানি) তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে ওঠে। মানুষ ফরাসি আধিপত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।

৪. সামরিক বিপর্যয় (স্পেন ও রাশিয়া):

  • স্পেনীয় ক্ষত: স্পেনের উপদ্বীপের যুদ্ধে (১৮০৮-১৩) দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সের বিপুল অর্থ ও প্রায় ৩ লক্ষ সৈন্য নষ্ট হয়। নেপোলিয়ন নিজেই স্বীকার করেন, “স্পেনীয় ক্ষতই আমাকে ধ্বংস করেছে।”
  • রাশিয়া অভিযান (১৮১২): রাশিয়ার ‘পোড়ামাটি নীতি’ এবং ভয়াবহ শীতের কবলে পড়ে নেপোলিয়নের ৬ লক্ষ সৈন্যের ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ ধ্বংস হয়ে যায়। এটিই ছিল তাঁর কফিনে শেষ পেরেক।

৫. ইংল্যান্ডের ভূমিকা:

ইংল্যান্ডের অপরাজেয় নৌবাহিনী এবং অফুরন্ত ধনসম্পদ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে বারবার ইউরোপীয় শক্তিজোট গড়তে সাহায্য করেছিল।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নেপোলিয়ন ইতিহাসের গতিধারার বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে সমগ্র ইউরোপের ওপর ফরাসি আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর পতনের মূল কারণ ছিল তাঁর নিজের তৈরি করা ব্যবস্থা এবং সীমাহীন সাম্রাজ্যলিপ্সা।


প্রশ্ন ৪: নেপোলিয়নকে কি ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলা যায়, নাকি তিনি ছিলেন ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’? যুক্তিসহ আলোচনা করো।

ভূমিকা: ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের সম্পর্ক নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রবল বিতর্ক রয়েছে। কেউ তাঁকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ (Child of Revolution), আবার কেউ তাঁকে ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’ (Destroyer of Revolution) বলেন। প্রকৃত সত্য সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝখানে।

যুক্তি: নেপোলিয়ন ‘বিপ্লবের সন্তান’

  • উত্থান: বিপ্লব না হলে কর্সিকা দ্বীপের এক সাধারণ পরিবারের সন্তানের পক্ষে ফ্রান্সের সম্রাট হওয়া অসম্ভব ছিল। বিপ্লব যে ‘মেধার স্বীকৃতি’ দিয়েছিল, নেপোলিয়ন ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
  • সাম্য প্রতিষ্ঠা: তিনি বিপ্লবের প্রধান আদর্শ ‘সাম্য’কে তাঁর ‘কোড নেপোলিয়ন’-এর মাধ্যমে আইনি রূপ দেন। তিনি সামন্ততন্ত্র ও জন্মগত সুযোগ-সুবিধা চিরতরে বিলোপ করেন।
  • বিপ্লব রক্ষা: ১৭৯৯ সালে ফ্রান্স যখন গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি আক্রমণে বিপর্যস্ত, তখন তিনি শক্ত হাতে ফ্রান্সকে রক্ষা করেন এবং বিপ্লবীদের বাজেয়াপ্ত করা জমির মালিকানা কৃষকদের হাতে নিশ্চিত করেন।

যুক্তি: নেপোলিয়ন ‘বিপ্লবের ধ্বংসকারী’

  • গণতন্ত্র হত্যা: বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নেপোলিয়ন ১৮০৪ সালে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে পুনরায় রাজতন্ত্র ও স্বৈরাচার ফিরিয়ে আনেন।
  • স্বাধীনতা হরণ: তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন, গুপ্তচর নিয়োগ করেন এবং বিনা বিচারে আটকের ব্যবস্থা চালু করেন—যা বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা’র আদর্শের পরিপন্থী ছিল।
  • নারীর অধিকার খর্ব: কোড নেপোলিয়নে নারীদের মর্যাদা কমিয়ে পুরুষের অধীনস্থ করা হয়, যা বিপ্লবের উদারনৈতিক চেতনার বিরোধী ছিল।

মূল্যায়ন ও উপসংহার: ঐতিহাসিক ডেভিড থমসন মনে করেন, নেপোলিয়ন বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু স্বাধীনতার আদর্শ বর্জন করেছিলেন। তিনি বিপ্লবকে ধ্বংস করেননি, বরং বিপ্লবের অরাজকতা দূর করে তাকে স্থিতিশীল রূপ দিয়েছিলেন। তাই বলা যায়, “তিনি বিপ্লবকে ধ্বংস করে বিপ্লবকে রক্ষা করেছিলেন।”

প্রশ্ন ৫: নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতা লাভের পটভূমি আলোচনা করো। তিনি কীভাবে ফ্রান্সের সম্রাট হন? (৫+৩)

ভূমিকা: নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। কর্সিকা দ্বীপের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি নিজ যোগ্যতা ও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সের সম্রাট পদে আসীন হন।

ক্ষমতা লাভের পটভূমি:

  • ১. ডাইরেক্টরি শাসনের ব্যর্থতা: ১৭৯৫-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্সে ডাইরেক্টরি শাসন চলেছিল। এই শাসকরা ছিলেন অযোগ্য ও দুর্নীতিপরায়ণ। দেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ফরাসি জনগণ এই অরাজকতা থেকে মুক্তি চাইছিল।
  • ২. বিদেশি আক্রমণের ভয়: এই সময় অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড ও রাশিয়ার মতো শক্তিবর্গ ফ্রান্সকে ঘিরে ফেলেছিল। ফ্রান্সকে রক্ষা করার জন্য একজন শক্তিশালী সেনাপতির প্রয়োজন ছিল।
  • ৩. নেপোলিয়নের সামরিক সাফল্য: ইতালি ও মিশরের যুদ্ধে নেপোলিয়নের অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে ফরাসি জনগণের কাছে ‘জাতীয় বীর’-এ পরিণত করে। জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে একমাত্র নেপোলিয়নই ফ্রান্সকে বাঁচাতে পারেন।

সম্রাট হওয়ার পথ (১৮ ব্রুমেয়ার থেকে ১৮০৪):

১৮ ব্রুমেয়ারের ঘটনা: ১৭৯৯ সালে মিশর থেকে ফিরে ৯ নভেম্বর (১৮ ব্রুমেয়ার) নেপোলিয়ন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ডাইরেক্টরি শাসন উচ্ছেদ করেন।
কনসুলেট শাসন: তিনি ‘কনসুলেট’ নামে এক নতুন শাসনতন্ত্র চালু করেন এবং নিজেকে ‘ফার্স্ট কনসাল’ বা প্রধান শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রথমে ১০ বছরের জন্য এবং পরে ১৮০২ সালে আজীবনের জন্য তিনি কনসাল হন।
সম্রাট ঘোষণা: অবশেষে ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে সিনেটের প্রস্তাবক্রমে এবং গণভোটের মাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘ফরাসি সম্রাট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ২ ডিসেম্বর তিনি নটরডেম গির্জায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে রাজমুকুট পরিধান করেন।


প্রশ্ন ৬: জার্মানি ও ইতালির পুনর্গঠনে নেপোলিয়নের ভূমিকা আলোচনা করো। (৪+৪)

ভূমিকা: নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে ইউরোপের মানচিত্র পরিবর্তন করলেও, পরোক্ষভাবে তিনি জার্মানি ও ইতালির ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন এই দুই দেশের নবজাগরণের অগ্রদূত।

জার্মানির পুনর্গঠনে ভূমিকা:

  • ক্ষুদ্র রাজ্য বিলোপ: নেপোলিয়নের আগে জার্মানি প্রায় ৩০০টি ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। নেপোলিয়ন এদের অনেকগুলোকে বিলুপ্ত করে বা একীভূত করেন।
  • রাইন রাষ্ট্রসংঘ: ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ১৬টি জার্মান রাজ্য নিয়ে ‘কনফেডারেশন অফ দ্য রাইন’ বা রাইন রাষ্ট্রসংঘ গঠন করেন।
  • জাতীয়তাবাদ: তিনি সেখানে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করেন এবং সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটান। এর ফলে জার্মানদের মধ্যে একতার ভাব জাগে, যা পরে বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্যে সাহায্য করে।

ইতালির পুনর্গঠনে ভূমিকা:

  • রাজনৈতিক ঐক্য: নেপোলিয়নের আগে ইতালি ছিল কেবল একটি ‘ভৌগোলিক সংজ্ঞা’। নেপোলিয়ন ইতালির খণ্ড-বিখণ্ড রাজ্যগুলোকে জয় করে ‘সিজালপাইন রিপাবলিক’ এবং পরে ‘ইতালি রাজ্য’ (Kingdom of Italy) গঠন করেন।
  • প্রশাসনিক সংস্কার: তিনি ইতালিতে একই ধরণের আইন (কোড নেপোলিয়ন) ও শাসনব্যবস্থা চালু করেন। সামন্তপ্রথা ও চার্চের বিশেষ অধিকার বাতিল করেন।
  • নবজাগরণ: ফরাসি শাসনের ফলে ইতালিবাসীর মনে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম হয়, তাই পরবর্তীকালে ইতালির ঐক্য আন্দোলন বা ‘রিসর্জিমেন্টো’র ভিত্তি তৈরি করে।

উপসংহার: নেপোলিয়ন হয়তো নিজের স্বার্থেই এই পুনর্গঠন করেছিলেন, কিন্তু অজান্তেই তিনি জার্মানি ও ইতালির আধুনিকীকরণের স্থপতি হয়ে উঠেছিলেন।

শিক্ষার্থীদের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) — নেপোলিয়ন ও তাঁর সাম্রাজ্য

👑 নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কে ছিলেন?

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের একজন মহান সেনাপতি এবং পরবর্তীকালে ফ্রান্সের সম্রাট (১৮০৪-১৮১৪, ১৮১৫)। তিনি তাঁর সামরিক প্রতিভা দিয়ে ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন এবং আধুনিক ফ্রান্সের নির্মাতা হিসেবে পরিচিত।

📜 ‘কোড নেপোলিয়ন’ (Code Napoleon) কী?

১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে যে সুসংবদ্ধ আইনবিধি প্রবর্তন করেন, তাকে ‘কোড নেপোলিয়ন’ বলা হয়। এর মাধ্যমে তিনি আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করেন এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রথা বাতিল করেন। একে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলা হয়।

🚫 মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা কেন চালু করা হয়েছিল?

ইংল্যান্ডকে যুদ্ধে হারাতে না পেরে নেপোলিয়ন তাদের অর্থনীতি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন। তিনি ইউরোপের দেশগুলিতে ব্রিটিশ পণ্য কেনা-বেচা নিষিদ্ধ করেন। ইংল্যান্ডকে ভাতে মারার এই অর্থনৈতিক অবরোধ নীতিই হলো মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা (Continental System)।

⚔️ নেপোলিয়নের জীবনের শেষ যুদ্ধ কোনটি?

নেপোলিয়নের জীবনের শেষ যুদ্ধ হলো ওয়াটারলুর যুদ্ধ (১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ)। এই যুদ্ধে তিনি ডিউক অফ ওয়েলিংটনের নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হন এবং তাঁকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।

🤔 নেপোলিয়নকে কেন ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলা হয়?

ফরাসি বিপ্লব মেধার যে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তার ফলেই সাধারণ পরিবার থেকে এসে নেপোলিয়ন সম্রাট হতে পেরেছিলেন। এছাড়া তিনি বিপ্লবের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শকে রক্ষা করেছিলেন এবং সামন্ততন্ত্রের বিনাশ ঘটিয়েছিলেন। তাই তাঁকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলা হয়।

❄️ নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

১৮১২ সালে রাশিয়ার প্রবল শীত, খাদ্য সংকট এবং রুশ বাহিনীর ‘পোড়ামাটি নীতি’ (পিছু হটার সময় নিজেদের সম্পদ ধ্বংস করা)-র ফলে নেপোলিয়নের বিশাল গ্র্যান্ড আর্মি ধ্বংস হয়ে যায়।

‘শতদিবসের রাজত্ব’ কী?

১৮১৫ সালে এলবা দ্বীপের নির্বাসন থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে ফিরে এসে নেপোলিয়ন ২০ মার্চ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত প্রায় ১০০ দিন শাসন করেছিলেন। ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত অধ্যায়কে ‘শতদিবসের রাজত্ব’ বলা হয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার