নবম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 3 উনবিংশ শতকের ইউরোপ: রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত 4 নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৩: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (পর্ব-১)

1. ভিয়েনা সম্মেলনের (১৮১৫) প্রধান নীতিগুলি আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ১৮১৫ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এক সম্মেলন আহূত হয়। এর প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন মেটারনিক।

[Image of Congress of Vienna 1815 painting]

প্রধান তিনটি নীতি:

  • ন্যায্য অধিকার নীতি: ফরাসি বিপ্লবের আগে ইউরোপের যে যে দেশে যে যে রাজবংশ রাজত্ব করত, তাদের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। যেমন—ফ্রান্সে বোরবন বংশ।
  • ক্ষতিপূরণ নীতি: নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেসব দেশের আর্থিক ও ভূখণ্ডগত ক্ষতি হয়েছিল, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। যেমন—অস্ট্রিয়াকে উত্তর ইতালির অংশ দেওয়া হয়।
  • শক্তিসাম্য নীতি: ভবিষ্যতে ফ্রান্স যাতে আর শক্তিশালী হয়ে ইউরোপের শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে, তার জন্য ফ্রান্সের সীমান্তে শক্তিশালী রাষ্ট্র (যেমন—প্রুশিয়া, নেদারল্যান্ডস) গঠন করা।

2. মেটারনিক ব্যবস্থা (Metternich System) বলতে কী বোঝো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ডিউক মেটারনিকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।

ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য:

  • পুরাতন তন্ত্র রক্ষা: মেটারনিক চেয়েছিলেন ইউরোপে প্রাক-বিপ্লব যুগের রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্র বজায় রাখতে। তিনি গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
  • দমনপীড়ন: ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য তিনি ‘কার্লসবাড ডিক্রি’ জারি করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং গুপ্তচর বৃত্তির মাধ্যমে তিনি ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেন।
  • স্থিতাবস্থা: তাঁর মূল নীতি ছিল—”Govern and change nothing” (শাসন করো কিন্তু কোনো পরিবর্তন কোরো না)।

ফলাফল: এই রক্ষণশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালের বিপ্লব সংঘটিত হয়।


3. জুলাই বিপ্লবের (১৮৩০) কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৩০ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সে বোরবন রাজা দশম চার্লসের বিরুদ্ধে যে বিপ্লব হয়, তা জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত।

কারণ:

  • চার্লসের স্বৈরাচার: রাজা দশম চার্লস ছিলেন চরম স্বৈরাচারী। তিনি অভিজাত ও যাজকদের বিশেষ সুবিধা ফিরিয়ে দেন এবং পলিগন্যাককে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।
  • চারটি অর্ডিন্যান্স: ২৬ জুলাই তিনি চারটি অর্ডিন্যান্স জারি করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন এবং ভোটাধিকার সংকুচিত করেন। এর ফলেই প্যারিসে বিপ্লব শুরু হয়।

গুরুত্ব: এর ফলে ফ্রান্সে বোরবন রাজবংশের চিরবিদায় ঘটে এবং লুই ফিলিপের নেতৃত্বে ‘অরলিয়েন্স রাজবংশ’ বা ‘জুলাই রাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়।


4. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের (১৮৪৮) কারণগুলি কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের পর লুই ফিলিপ ফ্রান্সের রাজা হন। কিন্তু ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় বিপ্লব হয়।

কারণ:

  • বুর্জোয়া তোষণ: লুই ফিলিপ কেবল ধনী বুর্জোয়াদের স্বার্থ দেখতেন। সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকদের প্রতি তিনি উদাসীন ছিলেন।
  • বৈদেশিক নীতিতে ব্যর্থতা: বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের সমস্যা সমাধানে তিনি ব্যর্থ হন, যা ফ্রান্সের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
  • গিজো-র নীতি: তাঁর প্রধানমন্ত্রী গিজো ছিলেন সংস্কার বিরোধী। তিনি ভোটাধিকার সম্প্রসারণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
  • অর্থনৈতিক সংকট: অনাবৃষ্টি ও শস্যহানি ফ্রান্সে তীব্র খাদ্য সংকট ও বেকারত্ব তৈরি করে, যা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।

5. ১৮৪৮ সালকে কেন ‘বিপ্লবের বছর’ (Year of Revolutions) বলা হয়?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৪৮ সালে কেবল ফ্রান্সে নয়, সমগ্র ইউরোপ জুড়ে বিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল।

কারণ ও বিস্তার:

  • ফ্রান্সে লুই ফিলিপের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, ইতালি, জার্মানি, হাঙ্গেরি—সর্বত্র জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী আন্দোলন শুরু হয়।
  • মেটারনিক তন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। মেটারনিক ইংল্যান্ডে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
  • একই বছরে এতগুলি দেশে (প্রায় ১৫টি) বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল বলে এই বছরটিকে ‘বিপ্লবের বছর’ বলা হয়।

6. ইতালির ঐক্য আন্দোলনে মাৎসিনি বা ম্যাৎসিনির (Mazzini) ভূমিকা আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: জোসেফ মাৎসিনিকে ইতালির ঐক্য আন্দোলনের ‘আত্মা’ বা ‘মস্তিষ্ক’ বলা হয়। তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক।

অবদান:

  • ইয়ং ইতালি দল: ১৮৩১ সালে তিনি ‘ইয়ং ইতালি’ (Young Italy) নামে একটি যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা।
  • আদর্শ প্রচার: তিনি প্রচার করেন যে, ইতালির মুক্তির জন্য বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন নেই, ইতালিবাসীর আত্মত্যাগই যথেষ্ট।
  • জাতীয়তাবাদ: তাঁর লেখনী ও বক্তৃতা ইতালির মানুষের মনে প্রবল জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে, যা পরে ক্যাভুর ও গ্যারিবল্ডির কাজকে সহজ করে দেয়।

7. ‘জোলভারাইন’ (Zollverein) সম্পর্কে টীকা লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: জার্মানির অর্থনৈতিক ঐক্য সাধনের উদ্দেশ্যে ১৮১৯ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে যে শুল্ক সংঘ গঠিত হয়, তাকে জোলভারাইন বলে।

বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব:

  • জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে শুল্ক প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়, ফলে অবাধ বাণিজ্য শুরু হয়।
  • এর ফলে জার্মানি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং প্রুশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।
  • ঐতিহাসিক কেটেলবি বলেন, “জোলভারাইন জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেছিল।”

8. কার্বোনারি (Carbonari) আন্দোলন সম্পর্কে কী জানো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ইতালির ঐক্য আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যে গুপ্ত সমিতিগুলি গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে কার্বোনারি ছিল অন্যতম। এর অর্থ ‘জ্বলন্ত কয়লা’।

লক্ষ্য ও কার্যকলাপ:

  • নেপলস রাজ্যে এর উদ্ভব হয়। কয়লা শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষেরা এর সদস্য ছিল।
  • তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিদেশি (অস্ট্রিয়া) শাসন থেকে ইতালিকে মুক্ত করা এবং নিয়মতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করা।
  • যদিও এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবুও এটি মাৎসিনির ‘ইয়ং ইতালি’ গঠনের পথ দেখায়।

9. ইউরোপীয় শক্তি সমবায় বা ‘কনসার্ট অফ ইউরোপ’ (Concert of Europe) কী?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ভিয়েনা সম্মেলনের পর ইউরোপে শান্তি বজায় রাখা এবং ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা প্রতিরোধ করার জন্য প্রধান চারটি শক্তি (অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রুশিয়া, ইংল্যান্ড) যে আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করে, তাকে ইউরোপীয় শক্তি সমবায় বলে।

উদ্দেশ্য:

  • ইউরোপে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা।
  • বিপ্লবী আন্দোলন দমন করা।
  • আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করা।

গুরুত্ব: এটি ছিল আধুনিক জাতিপুঞ্জের পূর্বসূরি। প্রায় ১০ বছর এটি ইউরোপে বড় যুদ্ধ আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।


10. ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট (Frankfurt Parliament) কেন ব্যর্থ হয়?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৪৮ সালে জার্মানির ঐক্য ও সংবিধান রচনার জন্য ফ্রাঙ্কফোর্ট শহরে একটি জাতীয় সভা বা পার্লামেন্ট বসে।

ব্যর্থতার কারণ:

  • রাজার প্রত্যাখ্যান: পার্লামেন্ট জার্মানির মুকুট প্রুশিয়ার রাজা চতুর্থ ফ্রেডরিক উইলিয়ামকে দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, “নর্দমা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মুকুট আমি নেব না।”
  • ঐক্যের অভাব: সদস্যদের মধ্যে চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের বিরোধ ছিল।
  • অস্ট্রিয়ার ভীতি: অস্ট্রিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের ভয়ে প্রুশিয়ার রাজা পিছিয়ে আসেন। ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে জার্মানির ঐক্যের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

11. পবিত্র চুক্তি (Holy Alliance) কী?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮১৫ সালে রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার ইউরোপে শান্তি রক্ষার জন্য একটি অভিনব প্রস্তাব দেন, যা ‘পবিত্র চুক্তি’ নামে পরিচিত।

বিষয়বস্তু: এতে বলা হয়, ইউরোপের রাজারা খ্রিস্টধর্মের ন্যায়, করুণা ও শান্তির আদর্শ মেনে প্রজাদের ‘সন্তানতুল্য’ শাসন করবেন এবং একে অপরকে ভ্রাতৃবৎ সাহায্য করবেন।

প্রতিক্রিয়া: অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া ও রাশিয়া এতে সই করলেও ইংল্যান্ড ও পোপ এটি প্রত্যাখ্যান করেন। মেটারনিক একে ‘শব্দাড়ম্বরপূর্ণ তুচ্ছতা’ (High sounding nothing) বলে উপহাস করেন। বাস্তবে এর কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল না।


12. লুই ফিলিপের পতনের কারণ কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা লুই ফিলিপ নিজেকে ‘নাগরিক রাজা’ বলতেন, কিন্তু ১৮৪৮ সালে তাঁকে সিংহাসন ছাড়তে হয়।

কারণ:

  • তিনি ছিলেন মূলত ধনীদের রাজা। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন।
  • তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং ইংল্যান্ড ঘেঁষা, যা ফরাসিদের দেশপ্রেমে আঘাত করে।
  • সংস্কারপন্থীরা ভোটাধিকার সম্প্রসারণের দাবি জানালে তিনি ও তাঁর মন্ত্রী গিজো তা কঠোরভাবে দমন করেন। এই অসন্তোষই ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ডেকে আনে।

13. ইতালির ঐক্য আন্দোলনে কাউন্ট ক্যাভুরের (Cavour) অবদান কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট ক্যাভুর ছিলেন ইতালির ঐক্য আন্দোলনের প্রধান স্থপতি। তাঁকে আন্দোলনের ‘মস্তিষ্ক’ বলা হয়।

অবদান:

  • কূটনীতি: তিনি বুঝতেন অস্ট্রিয়াকে বিতাড়িত না করলে ইতালির ঐক্য সম্ভব নয়। তাই তিনি ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সহানুভূতি অর্জন করেন।
  • প্লম্বিয়ার্স চুক্তি: ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সাথে গোপন চুক্তি করে তিনি অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।
  • সংযুক্তিকরণ: তাঁর কূটনীতির ফলেই লম্বার্ডি, পারমা, মডেনা ও টাস্কানি পিডমন্টের সাথে যুক্ত হয়।

14. গ্যারিবল্ডি (Garibaldi) ও তাঁর ‘লালকুর্তা বাহিনী’ সম্পর্কে টীকা লেখো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: জোসেফ গ্যারিবল্ডি ছিলেন ইতালির ঐক্য আন্দোলনের ‘তরবারি’। তিনি ছিলেন মাৎসিনির অনুগামী।

লালকুর্তা বাহিনী: তিনি এক হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করেন, যারা লাল রঙের জামা পরত বলে তাদের ‘লালকুর্তা বাহিনী’ (Red Shirts) বলা হতো।

সাফল্য: এই বাহিনী নিয়ে তিনি দক্ষিণ ইতালির সিসিলি ও নেপলস জয় করেন। তিনি চাইলে সেখানকার রাজা হতে পারতেন, কিন্তু দেশপ্রেমের টানে তিনি বিজিত অঞ্চল বিনা শর্তে রাজা ভিক্টর ইমানুয়েলের হাতে তুলে দেন।


15. বিসমার্কের ‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ (Blood and Iron Policy) বলতে কী বোঝো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: প্রুশিয়ার চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক বিশ্বাস করতেন যে, বক্তৃতা বা ভোটাভুটির মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য সম্ভব নয়।

নীতি: তিনি বলেন, “সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান বক্তৃতা বা সংখ্যাধিক্যের ভোটে হবে না, তা হবে একমাত্র রক্ত ও লৌহ নীতির দ্বারা।”

তাৎপর্য: এর অর্থ হলো—সামরিক শক্তি (‘লৌহ’) এবং যুদ্ধের (‘রক্ত’) মাধ্যমেই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এই নীতি প্রয়োগ করেই তিনি ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।


16. এমস টেলিগ্রাম (Ems Telegram) কী?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: বিসমার্ক ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ বাধানোর জন্য যে কূটকৌশল নিয়েছিলেন, তা এমস টেলিগ্রাম নামে পরিচিত।

ঘটনা: স্পেনের সিংহাসন নিয়ে প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়ামের সঙ্গে ফরাসি দূতের এমস নামক স্থানে আলোচনা হয়। রাজা টেলিগ্রাম করে বিসমার্ককে তা জানান।

বিকৃতি: বিসমার্ক সেই টেলিগ্রামটি এমনভাবে কাটছাঁট করে সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন যে, ফরাসিদের মনে হয় তাদের দূত অপমানিত হয়েছেন এবং প্রুশীয়দের মনে হয় তাদের রাজা অপমানিত হয়েছেন।

ফলাফল: এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ফ্রান্স প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে (সেডানের যুদ্ধ), যা বিসমার্ক চেয়েছিলেন।


17. সেডানের যুদ্ধের (১৮৭০) গুরুত্ব কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৭০ সালে ফ্রান্স ও প্রুশিয়ার মধ্যে সেডানের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটি ছিল জার্মানির ঐক্যের শেষ ধাপ।

ফলাফল ও গুরুত্ব:

  • এই যুদ্ধে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বন্দি হন।
  • ফ্রান্সে দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
  • ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধির মাধ্যমে দক্ষিণ জার্মানির রাজ্যগুলি প্রুশিয়ার সাথে যুক্ত হয় এবং জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়।
  • ১৮৭১ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে প্রথম উইলিয়াম জার্মানির সম্রাট ঘোষিত হন।

18. জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে কেন ‘মুক্তিদাতা জার’ (Tsar Liberator) বলা হয়?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ সালে এক যুগান্তকারী সংস্কারের মাধ্যমে রাশিয়ার কলঙ্কজনক ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটান।

মুক্তি ঘোষণা: তিনি ১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তি ঘোষণা’ (Edict of Emancipation) দ্বারা প্রায় ৪ কোটি ভূমিদাসকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেন।

অধিকার: ভূমিদাসরা স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা পায়, জমির মালিকানা পায় এবং প্রভুর অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়। এই মহান কাজের জন্য তাঁকে ‘মুক্তিদাতা জার’ বলা হয়।


19. ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৪-৫৬) কারণ কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রাশিয়ার সাথে তুরস্ক, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মিলিত শক্তির যুদ্ধ হয়, যা ক্রিমিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত।

কারণ:

  • রাশিয়ার আগ্রাসন: রাশিয়া তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বলকান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল (উষ্ণ জল নীতি)।
  • ধর্মীয় কারণ: প্যালেস্টাইনের পবিত্র স্থানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে গ্রিক চার্চ (রাশিয়া সমর্থিত) ও ল্যাটিন চার্চের (ফ্রান্স সমর্থিত) বিরোধ।
  • ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ভীতি: ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার প্রভাব বাড়লে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বাণিজ্যে ক্ষতি হবে, এই ভয়ে তারা তুরস্ককে সমর্থন করে।

20. বার্লিন কংগ্রেসের (১৮৭৮) গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: রুশ-তুর্কি যুদ্ধের পর সান-স্টেফানোর সন্ধি বাতিল করে বলকান সমস্যার সমাধানের জন্য ১৮৭৮ সালে বার্লিনে এক সম্মেলন হয়। এর সভাপতি ছিলেন বিসমার্ক।

গুরুত্ব:

  • বিসমার্ক নিজেকে ‘সৎ দালাল’ (Honest Broker) হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইউরোপে জার্মানির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন।
  • রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করা হয় এবং তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষার চেষ্টা করা হয়।
  • সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো ও রোমানিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
  • তবে এই ব্যবস্থা ছিল অস্থায়ী, যা আখেরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।

21. ‘পূর্বাঞ্চলীয় সমস্যা’ (Eastern Question) বলতে কী বোঝো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকে ইউরোপের ইতিহাসে তুরস্ক সাম্রাজ্যের পতন এবং বলকান অঞ্চলের সমস্যাকে কেন্দ্র করে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে ‘পূর্বাঞ্চলীয় সমস্যা’ বলে।

সমস্যার মূল বিষয়:

  • তুরস্ককে বলা হতো ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’ (Sick man of Europe)।
  • তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া বলকান অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল।
  • অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া রাশিয়ার অগ্রগতি রোধ করতে চেয়েছিল।
  • বলকান জাতিগুলোর (স্লাভ, গ্রিক) স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

22. বলকান জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে কী জানো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: তুরস্ক সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা বলকান অঞ্চলের খ্রিস্টান জাতিগুলি (গ্রিক, সার্ব, বুলগেরীয়) ঊনবিংশ শতকে স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন শুরু করে, তা বলকান জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত।

বৈশিষ্ট্য:

  • ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে এদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগে।
  • ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে তারা তুর্কি শাসনের অবসান ঘটাতে চায়।
  • রাশিয়া স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর নেতা হিসেবে এদের সমর্থন দেয় (প্যান-স্লাভ আন্দোলন), যা এই অঞ্চলের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

23. ইয়ং ইতালি (Young Italy) দলের উদ্দেশ্য কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ১৮৩১ সালে জোসেফ মাৎসিনি ফ্রান্সের মার্সাই শহরে ‘ইয়ং ইতালি’ দল প্রতিষ্ঠা করেন।

উদ্দেশ্য:

  • ইতালির যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে বিদেশি শাসন (অস্ট্রিয়া) থেকে দেশকে মুক্ত করা।
  • শিক্ষার প্রসার ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ জাগানো।
  • ইতালিতে একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

স্লোগান: মাৎসিনির স্লোগান ছিল—”ঈশ্বর, জনগণ ও ইতালি”।


24. ভিক্টর ইমানুয়েল (Victor Emmanuel II) কে ছিলেন? ইতালির ঐক্যে তাঁর ভূমিকা কী?

বিস্তারিত উত্তর

পরিচয়: ভিক্টর ইমানুয়েল ছিলেন পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার রাজা এবং ঐক্যবদ্ধ ইতালির প্রথম রাজা।

ভূমিকা:

  • তিনি ছিলেন উদারপন্থী ও জাতীয়তাবাদী। ইতালির মানুষ তাঁর নেতৃত্বেই ঐক্যের স্বপ্ন দেখেছিল।
  • তিনি ক্যাভুরকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন।
  • গ্যারিবল্ডি দক্ষিণ ইতালি জয় করে তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে তিনি সমগ্র ইতালির রাজায় পরিণত হন। তাঁর বিচক্ষণতাই ইতালির ঐক্য সম্ভব করেছিল।

25. গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধ (Greek War of Independence) সম্পর্কে কী জানো?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: বলকান অঞ্চলে অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গ্রিকদের স্বাধীনতা সংগ্রাম (১৮২১-১৮২৯) ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বৈশিষ্ট্য:

  • হেটাইরিয়া ফিলিকে: ওডেসায় প্রতিষ্ঠিত এই গুপ্ত সমিতি গ্রিকদের মধ্যে স্বাধীনতার মন্ত্র জাগিয়ে তোলে।
  • ইউরোপীয় সমর্থন: গ্রিসকে ‘ইউরোপীয় সভ্যতার জননী’ মনে করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলি গ্রিকদের সাহায্য করে। লর্ড বায়রন এতে প্রত্যক্ষ অংশ নেন।
  • ফলাফল: ১৮২৯ সালের অ্যাড্রিয়ানোপলের সন্ধি এবং ১৮৩২ সালের কনস্টান্টিনোপলের সন্ধির মাধ্যমে গ্রিস স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

26. রিসর্জিমেন্টো (Risorgimento) কী?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকে ইতালিতে যে নবজাগরণ বা বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ দেখা দেয়, তাকে ইতালীয় ভাষায় ‘রিসর্জিমেন্টো’ বা পুনরুত্থান বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • এটি ইতালিবাসীর মনে অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
  • কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিকরা লেখনীর মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ প্রচার করেন।
  • এই ভাবধারাই কার্বোনারি আন্দোলন এবং পরবর্তীতে মাৎসিনি ও ক্যাভুরকে ইতালির ঐক্যে অনুপ্রাণিত করেছিল।

27. স্যাডোয়ার যুদ্ধের (Battle of Sadowa, 1866) গুরুত্ব আলোচনা করো।

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: জার্মানির ঐক্যের পথে অস্ট্রিয়া ছিল প্রধান বাধা। তাই ১৮৬৬ সালে বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, যা স্যাডোয়ার যুদ্ধ বা অস্ট্রো-প্রুশীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।

গুরুত্ব:

  • অস্ট্রিয়ার পরাজয়: মাত্র সাত সপ্তাহের এই যুদ্ধে অস্ট্রিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
  • জার্মানি থেকে বহিষ্কার: প্রাগের সন্ধির মাধ্যমে অস্ট্রিয়া জার্মান রাষ্ট্রজোট থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
  • উত্তর জার্মানির ঐক্য: বিসমার্ক উত্তর জার্মানির রাজ্যগুলিকে প্রুশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করেন। এটি ছিল জার্মানি ঐক্যের দ্বিতীয় ধাপ।

28. ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধি (Treaty of Frankfurt, 1871)-র শর্ত ও ফলাফল কী ছিল?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর ১৮৭১ সালে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে এই অপমানজনক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

শর্ত ও ফলাফল:

  • ফ্রান্স তার সমৃদ্ধ অঞ্চল ‘আলসাস’ ও ‘লরেন’ জার্মানিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
  • ফ্রান্সকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
  • এই সন্ধি ফ্রান্সের মনে তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলে, যা ভবিষ্যতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

29. ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহ (Decembrist Revolt, 1825) কী?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: রাশিয়ায় জারতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত আন্দোলন ছিল ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহ।

ঘটনা: ১৮২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জার প্রথম নিকোলাসের সিংহাসন আরোহণের দিন একদল সেনা আধিকারিক ও উদারপন্থী অভিজাত এই বিদ্রোহ করে।

দাবি: তাদের দাবি ছিল সংবিধান প্রবর্তন এবং স্বৈরাচারী শাসনের অবসান।

ফলাফল: জার নিকোলাস কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করেন। নেতাদের ফাঁসি বা সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেওয়া হয়। ব্যর্থ হলেও এটি রুশ বিপ্লবের পথপ্রদর্শক ছিল।


30. রোমান্টিকতাবাদ (Romanticism) কীভাবে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়?

বিস্তারিত উত্তর

ভূমিকা: ঊনবিংশ শতকে শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনে যে আবেগপ্রবণ ও কল্পনাপ্রবণ ধারার সৃষ্টি হয়, তাকে রোমান্টিকতাবাদ বলে।

জাতীয়তাবাদে ভূমিকা:

  • যুক্তি বা বিজ্ঞানের বদলে এটি মানুষের আবেগ ও অনুভূতির ওপর জোর দেয়।
  • লোকগীতি, লোকনৃত্য, ভাষা ও অতীতের বীরত্বগাথা তুলে ধরে এটি সাধারণ মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে।
  • জার্মান দার্শনিক হার্ডার এবং পোল্যান্ডের সংগীতজ্ঞরা এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের বার্তা প্রচার করেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার