নবম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় – 6, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর ৮ নম্বরের প্রশ্নত্তোর

অধ্যায় ৬: রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৮)

প্রশ্ন ১: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।

ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ২১ বছর পর ১৯৩৯ সালে বিশ্ববাসী আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। এই যুদ্ধের কারণগুলি ছিল বহুমুখী। ঐতিহাসিক ই.এইচ. কার-এর মতে, ১৯১৯ সালের ভার্সাই সন্ধির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল।

১. ভার্সাই সন্ধির ত্রুটি ও জার্মানির অসন্তোষ:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর যে অপমানজনক ভার্সাই সন্ধি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল এই যুদ্ধের প্রধান কারণ। জার্মানির ভূখণ্ড দখল, বিশাল ঋণের বোঝা এবং নিরস্ত্রীকরণ—জার্মান জাতিকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। হিটলার এই ক্ষোভকেই কাজে লাগিয়েছিলেন।

২. একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসন (ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ):

জার্মানিতে হিটলার (নাৎসিবাদ), ইতালিতে মুসোলিনি (ফ্যাসিবাদ) এবং জাপানে তোজোর নেতৃত্বে উগ্র সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করা হয়।

• জাপান মাঞ্চুরিয়া দখল করে (১৯৩১)।

• ইতালি আবিসিনিয়া দখল করে (১৯৩৫)।

• হিটলার ভার্সাই সন্ধি অমান্য করে রাইনল্যাণ্ড, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া গ্রাস করেন।

৩. গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির তোষণ নীতি:

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সাম্যবাদের ভয়ে হিটলার ও মুসোলিনিকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য ‘তোষণ নীতি’ গ্রহণ করে। মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে তারা হিটলারের অন্যায় দাবি মেনে নেয়। এই দুর্বলতা হিটলারকে আরও বেপরোয়া করে তোলে এবং তিনি পোল্যান্ড আক্রমণের সাহস পান।

৪. জাতিপুঞ্জ বা লিগ অফ নেশনসের ব্যর্থতা:

লিগ অফ নেশনস শক্তিশালী দেশগুলির আগ্রাসন থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। জাপান, ইতালি ও জার্মানি যখন ইচ্ছে লিগ ত্যাগ করে এবং অন্য দেশ দখল করতে থাকে, তখন লিগ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

৫. পরস্পরবিরোধী জোট গঠন:

বিশ্ব রাজনীতি দুটি সশস্ত্র শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে গড়ে ওঠে ‘অক্ষশক্তি’ (জার্মানি, ইতালি, জাপান) এবং অন্যদিকে ‘মিত্রশক্তি’ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)। এই দুই জোটের দ্বন্দ্ব যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে।

৬. প্রত্যক্ষ কারণ:

হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ বন্দর ও পোলিশ করিডর দাবি করলে পোল্যান্ড তা প্রত্যাখ্যান করে। এর জেরে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে এবং ৩ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ভার্সাই সন্ধির অসমতা, একনায়কদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং গণতন্ত্রের দুর্বলতা—সব মিলিয়েই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধ্বংসলীলাটি সংঘটিত হয়েছিল।


প্রশ্ন ২: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল বা গুরুত্ব আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরানো এক ঘটনা। এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

১. ব্যাপক ধ্বংসলীলা ও প্রাণহানি:

এই যুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রাণ হারায়, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল অসামরিক সাধারণ মানুষ। ইউরোপ ও এশিয়ার বহু শহর (যেমন—হিরোশিমা, নাগাসাকি, বার্লিন, লন্ডন) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল অপরিসীম।

২. ফ্যাসিবাদের পতন ও গণতন্ত্রের জয়:

এই যুদ্ধের ফলে জার্মানির নাৎসিবাদ, ইতালির ফ্যাসিবাদ এবং জাপানের উগ্র সামরিকতন্ত্রের পতন ঘটে। একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বে গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার জয় ঘোষিত হয়।

৩. শক্তির ভরকেন্দ্রের পরিবর্তন ও দুই মহাশক্তি:

যুদ্ধের আগে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ছিল বিশ্বশক্তি। কিন্তু যুদ্ধের ফলে তারা অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পরিবর্তে বিশ্ব রাজনীতিতে দুটি নতুন ‘সুপার পাওয়ার’ বা মহাশক্তির উত্থান ঘটে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) এবং সোভিয়েত রাশিয়া (USSR)।

৪. ঠান্ডা লড়াইয়ের সূচনা:

যুদ্ধের পর আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে আদর্শগত সংঘাত শুরু হয়। পৃথিবী দুটি ব্লকে ভাগ হয়ে যায়—পুঁজিবাদী ব্লক ও সমাজতান্ত্রিক ব্লক। এর ফলে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী ‘ঠান্ডা লড়াই’ বা স্নায়ুযুদ্ধ।

৫. ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান (বি-ঔপনিবেশায়ন):

ইউরোপীয় শক্তিগুলি দুর্বল হয়ে পড়ায় এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলিতে স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র হয়। এর ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়।

৬. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠন:

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ’ (UNO) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও বিশ্বশান্তি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।

উপসংহার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোনো বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল, যার প্রভাব আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিদ্যমান।


প্রশ্ন ৩: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UNO) গঠনের পটভূমি ও উদ্দেশ্য আলোচনা করো।

ভূমিকা: লিগ অফ নেশনসের ব্যর্থতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বনেতাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনে ১৯৪৫ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা রাষ্ট্রসংঘ গঠিত হয়।

[Image of UNO logo and flags]

গঠনের পটভূমি:

  • ১. আটলান্টিক চার্টার (১৯৪১): মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আটলান্টিক মহাসাগরে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন।
  • ২. মস্কো ও তেহরান সম্মেলন (১৯৪৩): এই সম্মেলনগুলিতে মিত্রশক্তির নেতারা (স্টালিন, রুজভেল্ট, চার্চিল) সংস্থা গঠনের বিষয়ে একমত হন।
  • ৩. ডামবার্টন ওকস সম্মেলন (১৯৪৪): এই সম্মেলনে জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করা হয়।
  • ৪. সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন (১৯৪৫): অবশেষে ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে জাতিপুঞ্জের সনদে স্বাক্ষর করেন এবং ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতিপুঞ্জের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ:

জাতিপুঞ্জের সনদের ১ নং ধারায় এর উদ্দেশ্যগুলি বর্ণিত হয়েছে—

  • ১. শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আগ্রাসী শক্তিকে দমন করা।
  • ২. বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
  • ৩. সহযোগিতা: আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য একে অপরকে সহযোগিতা করা।
  • ৪. মানবাধিকার রক্ষা: জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা।
  • ৫. কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা: এই উদ্দেশ্যগুলি সফল করার জন্য বিভিন্ন দেশের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা।

উপসংহার: লিগ অফ নেশনসের চেয়ে জাতিপুঞ্জ অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রোধে এবং মানবাধিকার রক্ষায় এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

প্রশ্ন ৪: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের (UNO) সাফল্য ও ব্যর্থতা আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯৪৫ সালে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সাত দশকের পথচলায় এর সাফল্য ও ব্যর্থতা—উভয়ই রয়েছে।

সাফল্যসমূহ:

  • ১. তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রোধ: জাতিপুঞ্জের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে দেয়নি। কোরিয়া যুদ্ধ, সুয়েজ সংকট, কিউবা সংকট প্রভৃতি ক্ষেত্রে এটি মধ্যস্থতা করে বড় যুদ্ধ এড়াতে পেরেছে।
  • ২. বি-ঔপনিবেশায়ন: এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলিকে স্বাধীনতা অর্জনে জাতিপুঞ্জ সক্রিয় সাহায্য করেছে। এর অছি পরিষদ পরাধীন অঞ্চলগুলিকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে।
  • ৩. মানবাধিকার রক্ষা: ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ‘মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা’ জাতিপুঞ্জের এক ঐতিহাসিক দলিল। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
  • ৪. জনকল্যাণমূলক কাজ: এর বিশেষ সংস্থাগুলি (WHO, UNICEF, UNESCO) মহামারী রোধ, শিশু ও নারী কল্যাণ, শিক্ষা বিস্তার এবং পরিবেশ রক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছে।

ব্যর্থতাসমূহ:

  • ১. বৃহৎ শক্তির আধিপত্য: নিরাপত্তা পরিষদে ৫টি স্থায়ী সদস্যের ‘ভেটো’ ক্ষমতার কারণে অনেক সময় ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়েছে। আমেরিকা বা রাশিয়া নিজেদের স্বার্থে ভেটো দিয়ে অনেক ভালো প্রস্তাব বাতিল করেছে।
  • ২. নিজস্ব বাহিনীর অভাব: জাতিপুঞ্জের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী নেই। শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য তাকে সদস্য দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি করে।
  • ৩. আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে ব্যর্থতা: কাশ্মীর সমস্যা, প্যালেস্টাইন সমস্যা বা সাম্প্রতিককালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সমাধানে জাতিপুঞ্জ পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

উপসংহার: সমস্ত ব্যর্থতা সত্ত্বেও বলা যায়, জাতিপুঞ্জ ছাড়া বর্তমান বিশ্ব অকল্পনীয়। এটি না থাকলে বিশ্ব হয়তো আরও আগেই ধ্বংস হয়ে যেত। এটি “মানবজাতির শেষ আশা” হিসেবে আজও টিকে আছে।


প্রশ্ন ৫: ঠান্ডা লড়াইয়ের (Cold War) উদ্ভব ও এর প্রাথমিক পর্যায় আলোচনা করো।

ভূমিকা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না হলেও আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, তাকে ঠান্ডা লড়াই বলে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এটি বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

উদ্ভব বা কারণ:

  • ১. আদর্শগত সংঘাত: আমেরিকা ছিল পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক, আর রাশিয়া ছিল সমাজতন্ত্রী ও একনায়কতান্ত্রিক। এই দুই বিপরীত মেরুর সহাবস্থান অসম্ভব ছিল।
  • ২. পারস্পরিক অবিশ্বাস: যুদ্ধের সময় আমেরিকা গোপনে পরমাণু বোমা তৈরি করায় রাশিয়া ক্ষুব্ধ হয়। আবার রাশিয়া পূর্ব ইউরোপে লাল ফৌজ মোতায়েন রাখায় আমেরিকা ভীত হয়।
  • ৩. ফুলটন বক্তৃতা: ১৯৪৬ সালে চার্চিলের ‘লৌহ যবনিকা’ তত্ত্ব পাশ্চাত্যের দেশগুলিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেয়।

প্রাথমিক পর্যায় ও বিস্তার:

  • ১. ট্রুম্যান নীতি ও মার্শাল পরিকল্পনা (১৯৪৭): আমেরিকা গ্রিস, তুরস্ক ও পশ্চিম ইউরোপকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে কমিউনিজমের প্রভাব থেকে দূরে রাখার নীতি নেয়।
  • ২. বার্লিন অবরোধ (১৯৪৮): রাশিয়া পশ্চিম বার্লিনে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দিলে আমেরিকা আকাশপথে রসদ সরবরাহ করে (Berlin Airlift)। এটি ছিল ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রথম বড় সংঘাত।
  • ৩. সামরিক জোট গঠন: আমেরিকা ১৯৪৯ সালে ‘ন্যাটো’ (NATO) গঠন করে। এর জবাবে রাশিয়া ১৯৫৫ সালে ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact) গঠন করে। বিশ্ব দুটি সশস্ত্র শিবিরে ভাগ হয়ে যায়।
  • ৪. কোরিয়া যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩): উত্তর কোরিয়া (রাশিয়া সমর্থিত) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার (আমেরিকা সমর্থিত) যুদ্ধ ঠান্ডা লড়াইকে এশিয়ায় ছড়িয়ে দেয়।

উপসংহার: ঠান্ডা লড়াই বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তবে ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকিয়ে রাখতেও সক্ষম হয়েছিল (Balance of Terror)।


প্রশ্ন ৬: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের কারণ ও প্রভাব আলোচনা করো।

ভূমিকা: ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হলেও আমেরিকা প্রথম দিকে নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালের ঘটনাপ্রবাহ আমেরিকাকে যুদ্ধে টেনে আনে, যা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়।

আমেরিকার যোগদানের কারণ:

  • ১. গণতন্ত্র রক্ষা: মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের পতন হলে বিশ্বে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে এবং আমেরিকার নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে।
  • ২. লেন্ড-লিজ আইন: আমেরিকা নিরপেক্ষ থেকেও ‘গণতন্ত্রের অস্ত্রভাণ্ডার’ হিসেবে মিত্রশক্তিকে অস্ত্র ও রসদ দিয়ে সাহায্য করছিল, যা অক্ষশক্তিকে ক্ষুব্ধ করে।
  • ৩. জাপানের আগ্রাসন: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্য বিস্তার আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হানে। আমেরিকা জাপানের ওপর তেল ও লোহা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।
  • ৪. পার্ল হারবার আক্রমণ: ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটি ধ্বংস করলে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধে আমেরিকার প্রভাব:

  • ১. মিত্রশক্তির শক্তি বৃদ্ধি: আমেরিকার বিশাল জনবল, অর্থ ও আধুনিক অস্ত্র মিত্রশক্তিকে এক নতুন জীবন দান করে।
  • ২. শিল্প ও উৎপাদন: আমেরিকার শিল্পক্ষমতা এতই বেশি ছিল যে তারা অক্ষশক্তির চেয়ে অনেক দ্রুত বিমান, ট্যাঙ্ক ও জাহাজ তৈরি করতে পারত।
  • ৩. পরমাণু বোমা: আমেরিকার তৈরি পরমাণু বোমাই শেষ পর্যন্ত জাপানের পতন এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটায়।

উপসংহার: আমেরিকার যোগদান ছাড়া মিত্রশক্তির পক্ষে হিটলার ও জাপানের মতো শক্তিশালী শত্রুকে পরাজিত করা হয়তো অসম্ভব ছিল।

শিক্ষার্থীদের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল?

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ বন্দর ও পোলিশ করিডর দাবি করে আক্রমণ করেন। এই পোল্যান্ড আক্রমণ-ই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ।

🚢 পার্ল হারবার ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান আমেরিকার পার্ল হারবার নৌঘাঁটি ধ্বংস করে। এর ফলেই আমেরিকা সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় এবং মিত্রশক্তির শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

🎖️ ডি-ডে (D-Day) বা মুক্তি দিবস কী?

১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রশক্তি ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে সফলভাবে অবতরণ করে জার্মানির দখল থেকে ইউরোপকে মুক্ত করার অভিযান শুরু করে। এটিই ইতিহাসে ডি-ডে নামে পরিচিত।

☢️ হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে কবে বোমা ফেলা হয়?

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমাতে (‘লিটল বয়’) এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে (‘ফ্যাট ম্যান’) আমেরিকা পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে।

🌍 সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UNO) কেন গঠিত হয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ না হয় এবং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকে, সেই উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়।

❄️ ঠান্ডা লড়াই (Cold War) বলতে কী বোঝায়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না হলেও আমেরিকা (পুঁজিবাদী) এবং রাশিয়ার (সমাজতান্ত্রিক) মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও স্নায়ুযুদ্ধ চলেছিল, তাকেই ঠান্ডা লড়াই বলে।

🛑 ভেটো (Veto) ক্ষমতা কী?

এটি নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের (আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চিন) বিশেষ ক্ষমতা। কোনো সদস্য যদি কোনো প্রস্তাবে ‘ভেটো’ দেয়, তবে সেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার