নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 1 গ্রহরূপে পৃথিবী, 3 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
অধ্যায় ১: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৩)
1. পৃথিবীর আকৃতিকে ‘জিওয়ড’ (Geoid) বলা হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পৃথিবী পুরোপুরি গোল নয়, আবার কমলালেবুর মতো চ্যাপ্টাও নয়। পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীরই মতো। একেই ‘জিওয়ড’ বলা হয়। এর কারণগুলি হলো—
- ১. অভিগত গোলক: নিজের অক্ষের ওপর প্রবল বেগে আবর্তনের ফলে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে পৃথিবীর মাঝখানটা (নিরক্ষীয় অঞ্চল) কিছুটা স্ফীত এবং দুই মেরুপ্রদেশ কিছুটা চাপা।
- ২. অমসৃণ পৃষ্ঠদেশ: পৃথিবীর ওপর কোথাও মাউন্ট এভারেস্টের মতো সুউচ্চ পর্বত (৮৮৪৮ মি.) আবার কোথাও মারিয়ানা খাতের মতো গভীর সমুদ্রখাত (১১০৩৪ মি.) রয়েছে। এই প্রায় ২০ কিমি উচ্চতার পার্থক্যের জন্য পৃথিবী পৃষ্ঠ মসৃণ গোলক হতে পারে না।
- ৩. স্বতন্ত্র রূপ: মহাবিশ্বে অন্য কোনো জ্যামিতিক আকারের (যেমন—গোলক বা উপবৃত্ত) সঙ্গে পৃথিবীর আকৃতির ১০০ ভাগ মিল নেই। তাই বলা হয়, “পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীরই মতো” বা ‘Geoid’ (Earth shaped)।
2. পৃথিবীকে একমাত্র ‘বাসযোগ্য গ্রহ’ বা ‘জীবন্ত গ্রহ’ বলা হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: সৌরজগতের ৮টি গ্রহের মধ্যে একমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণের অস্তিত্ব আছে। তাই একে ‘জীবন্ত গ্রহ’ বলা হয়। এর কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
- ১. কাম্য উষ্ণতা: সূর্য থেকে পৃথিবী এমন এক আদর্শ দূরত্বে (গড় ১৫ কোটি কিমি) অবস্থিত যে এখানকার গড় তাপমাত্রা ১৫° সে.। এই তাপমাত্রা জীবকুলের বেঁচে থাকার জন্য আদর্শ।
- ২. জলের উপস্থিতি: পৃথিবীর ৭১% অংশ জলভাগ। একমাত্র পৃথিবীতেই জল তরল অবস্থায় পাওয়া যায়, যা প্রাণের প্রধান উৎস। তাই একে ‘নীল গ্রহ’ও বলা হয়।
- ৩. বায়ুমণ্ডলের আবরণ: পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য একে ঘিরে বায়ুমণ্ডলের চাদর রয়েছে। এতে শ্বাসকার্যের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং উদ্ভিদের খাদ্যের জন্য নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।
- ৪. ওজোন স্তর: বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে জীবকুলকে রক্ষা করে।
3. জিপিএস (GPS)-এর ব্যবহার বা গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: জিপিএস বা ‘গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম’ হলো কৃত্রিম উপগ্রহ ভিত্তিক একটি আধুনিক প্রযুক্তি, যা বর্তমান বিশ্বে অপরিহার্য। এর প্রধান ব্যবহারগুলি হলো—
[Image of GPS satellites orbiting Earth]
- ১. অবস্থান নির্ণয়: জিপিএস-এর সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের যেকোনো স্থানের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা নিখুঁতভাবে জানা যায়।
- ২. দিক নির্ণয় ও পরিবহন: বিমান, জাহাজ এবং বর্তমানে সড়কপথে গাড়ি চালানোর সময় সঠিক রাস্তা ও দিক নির্ণয়ের জন্য জিপিএস (যেমন—Google Maps) ব্যবহৃত হয়।
- ৩. প্রতিরক্ষা ও উদ্ধারকার্য: যুদ্ধের সময় সঠিক লক্ষ্যে আঘাত হানতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দুর্গত মানুষদের সঠিক অবস্থান জানতে জিপিএস সাহায্য করে।
- ৪. মানচিত্র নির্মাণ: বর্তমানে জিপিএস-এর সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
4. পৃথিবীর গোলাকৃতির প্রমাণ হিসেবে ‘বেডফোর্ড লেভেলের পরীক্ষা’টি বর্ণনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পৃথিবী যে সমতল নয় বরং গোলাকার, তা প্রমাণ করার জন্য ১৮৭০ সালে বিজ্ঞানী এ. আর. ওয়ালেস একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন, যা ‘বেডফোর্ড লেভেল পরীক্ষা’ নামে পরিচিত।
পরীক্ষা পদ্ধতি:
- ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড খালের জল খুব শান্ত। ওয়ালেস সেই খালের ওপর ১ মাইল ব্যবধানে তিনটি লাঠি বা খুঁটি জলের ওপর একই উচ্চতায় সরলরেখায় পুঁতে দেন।
- এরপর তিনি একটি শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে খুঁটি তিনটিকে পর্যবেক্ষণ করেন।
পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত: দূরবীনে দেখা যায় যে, মাঝখানের খুঁটিটি অন্য দুই পাশের খুঁটির চেয়ে কিছুটা উঁচুতে অবস্থান করছে। পৃথিবী যদি সমতল হতো, তবে তিনটি খুঁটি একই সরলরেখায় দেখা যেত। যেহেতু পৃথিবী গোলাকার, তাই বক্রতার কারণে মাঝের খুঁটিটি উঁচু মনে হয়েছিল।
5. অন্তস্থ গ্রহ ও বহিঃস্থ গ্রহের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: সূর্য থেকে দূরত্ব এবং গঠনের ওপর ভিত্তি করে সৌরজগতের গ্রহগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। নিচে এদের পার্থক্য দেওয়া হলো:
| বিষয় | অন্তস্থ গ্রহ (Inner Planet) | বহিঃস্থ গ্রহ (Outer Planet) |
|---|---|---|
| অবস্থান | এরা সূর্যের কাছাকাছি অবস্থিত। (বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল)। | এরা সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। (বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন)। |
| গঠন | এরা মূলত শিলা ও ধাতু দ্বারা গঠিত কঠিন গ্রহ (পার্থিব গ্রহ)। | এরা মূলত গ্যাস (হাইড্রোজেন, হিলিয়াম) ও বরফ দ্বারা গঠিত (গ্যাসীয় দৈত্য)। |
| আকার | এদের আকার ও আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট। | এদের আকার ও আয়তন অনেক বিশাল। |
6. প্লুটোকে এখন আর গ্রহ বলা হয় না কেন? অথবা, বামন গ্রহের বৈশিষ্ট্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU) প্রাগ সম্মেলনে গ্রহের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী প্লুটোকে ‘কৌলীন্য গ্রহ’ বা প্রধান গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ‘বামন গ্রহ’ (Dwarf Planet) বলা হয়। এর কারণগুলি হলো—
[Image of Pluto compared to Earth and Moon]
- ১. অসম্পূর্ণ কক্ষপথ: গ্রহ হওয়ার প্রধান শর্ত হলো নিজের কক্ষপথ থেকে অন্য মহাজাগতিক বস্তুকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা। কিন্তু প্লুটোর ভর এতই কম যে সে তা পারে না।
- ২. কক্ষপথের ছেদ: প্লুটো নিজের কক্ষপথে ঘোরার সময় নেপচুনের কক্ষপথকে ছেদ করে, যা কোনো প্রধান গ্রহ করে না।
- ৩. আকার ও গঠন: প্লুটোর আকার এতটাই ছোট (চাঁদের চেয়েও ছোট) যে একে গ্রহ হিসেবে গণ্য করা কঠিন।
7. যত উপরে ওঠা যায়, দিগন্তরেখার বিস্তৃতি তত বাড়ে কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: আকাশ ও পৃথিবী বা সমুদ্র যে বৃত্তাকার রেখায় মিশেছে বলে মনে হয়, তাকে দিগন্তরেখা বলে। উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে এর পরিধি বাড়তে থাকে।
কারণ:
- ১. পৃথিবীর বক্রতা: পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কারণে ভূপৃষ্ঠের কোনো নিচু স্থানে দাঁড়ালে দৃষ্টির প্রসার খুব বেশি দূর যায় না, পৃথিবীর বাঁক তাতে বাধা দেয়।
- ২. দৃষ্টির কোণ: আমরা যখন উঁচুতে উঠি (যেমন—পাহাড়ের চূড়ায় বা বিমানে), তখন আমাদের চোখের সাথে দিগন্তরেখার কোণ বাড়ে। ফলে আমরা পৃথিবীর বক্রতার আরও বেশি অংশ দেখতে পাই।
- উদাহরণ: এই কারণেই বাতিঘরের (Lighthouse) আলো অনেক উঁচুতে রাখা হয় যাতে জাহাজের নাবিকরা অনেক দূর থেকে তা দেখতে পান।
8. নক্ষত্র ও গ্রহের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: মহাকাশের জ্যোতিষ্কগুলিকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নক্ষত্র ও গ্রহ হিসেবে ভাগ করা হয়। নিচে এদের প্রধান পার্থক্যগুলি দেওয়া হলো:
| বিষয় | নক্ষত্র (Star) | গ্রহ (Planet) |
|---|---|---|
| আলো ও উত্তাপ | এদের নিজস্ব আলো ও উত্তাপ আছে। (যেমন—সূর্য)। | এদের নিজস্ব আলো বা উত্তাপ নেই, এরা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয়। (যেমন—পৃথিবী)। |
| মিটমিট করা | এরা আকাশে মিটমিট করে জ্বলে। | এরা স্থির আলো দেয়, মিটমিট করে না। |
| অবস্থান | মহাকাশে এদের পারস্পরিক স্থান পরিবর্তন হয় না। | এরা নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরে বলে এদের স্থান পরিবর্তন হয়। |
9. ম্যাগেলান কীভাবে প্রমাণ করেন যে পৃথিবী গোলাকার?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পর্তুগিজ নাবিক ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান প্রথম সমুদ্রপথে পৃথিবী পরিক্রমণ করে হাতে-কলমে প্রমাণ করেন যে পৃথিবী গোলাকার।
অভিযান: ১৫১৯ সালে তিনি স্পেন থেকে পাঁচটি জাহাজ নিয়ে ক্রমাগত পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি দিক পরিবর্তন না করে কেবল পশ্চিম দিকেই এগিয়ে চলেন।
সিদ্ধান্ত: প্রায় তিন বছর পর ১৫২২ সালে তাঁর জাহাজ ‘ভিক্টোরিয়া’ আবার স্পেনে সেই একই বন্দরে ফিরে আসে যেখান থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল। পৃথিবী সমতল হলে তিনি কিনারায় পৌঁছে যেতেন, কিন্তু গোলাকার বলেই একদিক থেকে যাত্রা শুরু করে আবার সেই স্থানেই ফিরে এসেছিলেন।
10. পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস মেরু ব্যাসের চেয়ে বড় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস (১২,৭৫৭ কিমি) মেরু ব্যাসের (১২,৭১৪ কিমি) চেয়ে প্রায় ৪৩ কিমি বড়। এর কারণ হলো পৃথিবীর আবর্তন গতি।
কারণ ব্যাখ্যা:
- পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর প্রবল বেগে (ঘণ্টায় প্রায় ১৬৭০ কিমি) ঘুরছে।
- এই আবর্তনের ফলে পৃথিবীর মধ্যভাগে বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রবল কেন্দ্রাতিগ বলের (Centrifugal Force) সৃষ্টি হয়।
- এই বলের প্রভাবে পৃথিবীর মাঝখানটা বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার প্রবণতা দেখায় এবং ফুলে ওঠে। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলে এই গতিবেগ শূন্য থাকায় তা কিছুটা ভেতরে ঢুকে যায় বা চাপা হয়। এই কারণেই নিরক্ষীয় ব্যাস বড় হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
অধ্যায় ১: গ্রহরূপে পৃথিবী | নবম শ্রেণী ভূগোল