নবম শ্রেণি: ভূগোল অধ্যায় -2 পৃথিবীর গতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় ২: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ২)
1. ফেরেলের সূত্র (Ferrel’s Law) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত বায়ু ও সমুদ্রস্রোত সোজা পথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে নিজের গতিপথের ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। ১৮৫৯ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফেরেল এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলে একে ফেরেলের সূত্র বলা হয়।
2. কোরিওলিস বল (Coriolis Force) কী?
উত্তর দেখো
পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সৃষ্ট যে বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের সচল বস্তুগুলো (যেমন—বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত) তাদের মূল গতিপথ থেকে বিচ্যুত বা বিক্ষেপ লাভ করে, তাকে কোরিওলিস বল বলে। ১৮৩৫ সালে ফরাসি গণিতজ্ঞ জি.জি. কোরিওলিস এটি আবিষ্কার করেন। নিরক্ষরেখায় এই বলের মান শূন্য এবং মেরু অঞ্চলে সর্বাধিক।
[Image of Coriolis force effect on Earth]
3. অপসূর অবস্থান (Aphelion) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
পৃথিবীর পরিক্রমণ পথের আকৃতি উপবৃত্তাকার হওয়ার কারণে সারা বছর সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সমান থাকে না। ৪ জুলাই তারিখে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি হয় (প্রায় ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিমি)। পৃথিবীর এই অবস্থানকে অপসূর অবস্থান বলা হয়। এই সময় পৃথিবীর পরিক্রমণ বেগ সামান্য কমে যায়।
4. অনুষূর অবস্থান (Perihelion) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
৩ জানুয়ারি তারিখে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় (প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিমি)। পৃথিবীর এই অবস্থানকে অনুষূর অবস্থান বলা হয়। সূর্যের প্রবল আকর্ষণের কারণে এই সময় পৃথিবীর পরিক্রমণ বেগ সামান্য বেড়ে যায়।
5. ‘মহাবিষুব’ ও ‘জলবিষুব’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
মহাবিষুব: ২১ মার্চ তারিখে সূর্য বিষুবরেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে পৃথিবীর সর্বত্র দিন ও রাত্রি সমান হয়। একে মহাবিষুব (Vernal Equinox) বলে।
জলবিষুব: ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখেও সূর্য বিষুবরেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয় এবং পৃথিবীর সর্বত্র দিন ও রাত্রি সমান হয়। একে জলবিষুব (Autumnal Equinox) বলে।
6. অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার (Leap Year) কী?
উত্তর দেখো
পৃথিবী সূর্যকে পরিক্রমণ করতে সময় নেয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। কিন্তু আমরা হিসাবের সুবিধার জন্য ৩৬৫ দিনে ১ বছর ধরি। প্রতি বছর এই অতিরিক্ত ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড (প্রায় ৬ ঘণ্টা) সময় যোগ করে প্রতি ৪ বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের সাথে ১ দিন বাড়িয়ে ৩৬৬ দিনে বছর গণনা করা হয়। এই বছরটিকে অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার বলা হয়।
7. ছায়াবৃত্ত (Circle of Illumination) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
পৃথিবী গোলাকার হওয়ার কারণে সূর্যের আলো একই সময়ে পৃথিবীর অর্ধাংশে পড়ে এবং বাকি অর্ধাংশ অন্ধকার থাকে। যে কাল্পনিক বৃত্তাকার রেখা পৃথিবীর আলোকিত অংশ (দিন) ও অন্ধকার অংশকে (রাত্রি) পৃথক করে রাখে, তাকে ছায়াবৃত্ত বলা হয়। পৃথিবীর আবর্তনের সাথে সাথে ছায়াবৃত্ত সরে সরে যায়।
[Image of Circle of Illumination diagram]
8. ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ (Land of Midnight Sun) কাকে এবং কেন বলা হয়?
উত্তর দেখো
উত্তর গোলার্ধে ২১ জুন তারিখের আগে ও পরে নরওয়ের উত্তরে অবস্থিত হ্যামারফেস্ট বন্দর থেকে স্থানীয় সময় গভীর রাতেও (রাত ১২টার সময়) দিগন্তরেখায় সূর্যকে দেখা যায়। তাই নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয়। পৃথিবীর মেরুরেখার হেলানো অবস্থানের কারণে মেরু অঞ্চলে একটানা দিন থাকার সময় এমনটা ঘটে।
9. মেরুজ্যোতি (Aurora) কী?
উত্তর দেখো
মেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস রাত্রিকালীন সময়ে বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার স্তরে ভেসে আসা সৌরকণার সংঘর্ষে যে রামধনুর মতো বিচ্ছুরিত রঙিন আলোর ছটা দেখা যায়, তাকে মেরুজ্যোতি বা আরোরা বলে। উত্তর মেরুতে একে ‘সুমেরুপ্রভা’ এবং দক্ষিণ মেরুতে ‘কুমেরুপ্রভা’ বলা হয়।
10. আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি অনুভব করতে পারি না কেন?
উত্তর দেখো
১) আমাদের চারপাশের গাছপালা, ঘরবাড়ি, বায়ুমণ্ডল—সবকিছুই পৃথিবীর সাথে একই গতিতে ঘুরছে।
২) আমাদের তুলনায় পৃথিবীর আয়তন বিশাল।
৩) পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগ সুনির্দিষ্ট এবং এর কোনো ঝাঁকুনি নেই।
এইসব কারণে আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি অনুভব করতে পারি না।
11. কর্কটসংক্রান্তি (Summer Solstice) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
২১ জুন তারিখে সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার (২৩.৫° উত্তর) ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এই দিন উত্তর গোলার্ধে দিন সবচেয়ে বড় (১৪ ঘণ্টা) এবং রাত সবচেয়ে ছোট হয়। পৃথিবীর এই বিশেষ অবস্থানকে কর্কটসংক্রান্তি বলা হয়।
12. মকরসংক্রান্তি (Winter Solstice) কাকে বলে?
উত্তর দেখো
২২ ডিসেম্বর তারিখে সূর্য মকরক্রান্তি রেখার (২৩.৫° দক্ষিণ) ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এই দিন দক্ষিণ গোলার্ধে দিন সবচেয়ে বড় এবং উত্তর গোলার্ধে দিন সবচেয়ে ছোট হয়। পৃথিবীর এই বিশেষ অবস্থানকে মকরসংক্রান্তি বলা হয়।
13. ‘কক্ষপথ’ ও ‘কক্ষতল’-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর দেখো
কক্ষপথ (Orbit): পৃথিবী যে নির্দিষ্ট উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, সেই পথটিকে কক্ষপথ বলে।
কক্ষতল (Orbital Plane): কক্ষপথটি যে সমতলে অবস্থান করে, তাকে কক্ষতল বলে। পৃথিবীর মেরুরেখা এই কক্ষতলের সঙ্গে ৬৬ ১/২ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকে।
14. সৌরদিন ও নাক্ষত্র দিনের মধ্যে সময়ের পার্থক্য হয় কেন?
উত্তর দেখো
পৃথিবী নিজের অক্ষে আবর্তনের সাথে সাথে সূর্যের চারদিকেও একটু এগিয়ে যায় (প্রায় ১°)। ফলে কোনো নির্দিষ্ট দ্রাঘিমায় সূর্যকে আবার ফিরে পেতে পৃথিবীকে আবর্তনের পরেও আরও কিছুটা পথ (প্রায় ৪ মিনিট) ঘুরতে হয়। তাই সৌরদিন (২৪ ঘণ্টা), নাক্ষত্র দিনের (২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকেন্ড) চেয়ে ৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড বড় হয়।
15. সূর্যের উত্তরায়ন (Uttarayan) বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
২২ ডিসেম্বরের পর থেকে ২১ জুন পর্যন্ত—এই ৬ মাস ধরে সূর্য মকরক্রান্তি রেখা থেকে ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরে কর্কটক্রান্তি রেখার দিকে গমন করে। সূর্যের এই উত্তরমুখী আপাত গতিকে উত্তরায়ন বলা হয়।
16. পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকলে কী হতো?
উত্তর দেখো
পৃথিবী আবর্তন না করলে—
১) দিন-রাত্রি হতো না। সূর্যের দিকের অংশে চিরদিন এবং বিপরীত অংশে চিররাত থাকত।
২) তাপমাত্রার চরম তারতম্যে প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন হতো।
৩) জোয়ার-ভাটা হতো না।
৪) বায়ুপ্রবাহের দিক বিক্ষেপ ঘটত না।
17. ঋতু পরিবর্তন কেন হয়? (দুটি প্রধান কারণ)
উত্তর দেখো
ঋতু পরিবর্তনের প্রধান দুটি কারণ হলো:
১) পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি: সূর্যের চারদিকে ঘোরার ফলে সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থানের পরিবর্তন হয়।
২) মেরুরেখার হেলানো অবস্থান: মেরুরেখা ৬৬ ১/২ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে সূর্যরশ্মি লম্ব বা তির্যকভাবে পড়ে।
18. নিরক্ষীয় অঞ্চলে উষা ও গোধূলির স্থায়িত্ব কম কেন?
উত্তর দেখো
নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য সারা বছর লম্বভাবে ওঠে এবং লম্বভাবে অস্ত যায়। ফলে সূর্য খুব দ্রুত দিগন্তরেখার নিচে নেমে যায় (১৮° নিচে)। তাই এখানে সূর্যের আভা বেশিক্ষণ আকাশে স্থায়ী হতে পারে না, ফলে উষা ও গোধূলি খুব ক্ষণস্থায়ী হয়।
19. সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত বলতে কী বোঝো?
উত্তর দেখো
সুমেরুবৃত্ত: উত্তর গোলার্ধে ৬৬ ১/২ ডিগ্রি (৬৬.৫°) উত্তর অক্ষরেখাকে সুমেরুবৃত্ত বলে।
কুমেরুবৃত্ত: দক্ষিণ গোলার্ধে ৬৬ ১/২ ডিগ্রি (৬৬.৫°) দক্ষিণ অক্ষরেখাকে কুমেরুবৃত্ত বলে।
এই দুই রেখার পর থেকে মেরু পর্যন্ত অঞ্চলে বছরে অন্তত একদিন ২৪ ঘণ্টা দিন বা রাত থাকে।
20. শতাব্দীর বছরগুলি (যেমন ১৯০০, ২১০০) লিপ ইয়ার হয় না কেন?
উত্তর দেখো
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী, শতাব্দীর বছরগুলির ক্ষেত্রে (যাদের শেষে দুটি শূন্য আছে) কেবল ৪০০ দিয়ে ভাগ করা গেলেই তা লিপ ইয়ার হবে। কারণ ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডকে ৩৬৬ দিনে সমন্বয় করতে গিয়ে সামান্য কিছু সময় বেশি ধরা হয়ে যায়। এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য ১৯০০ বা ২১০০ সাল ৪ দিয়ে বিভাজ্য হলেও ৪০০ দিয়ে বিভাজ্য নয় বলে লিপ ইয়ার নয়।