নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 3 ‘ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়’ ৩ নম্বরের প্রশ্নত্তোর
অধ্যায় ৩: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান – ৩)
১. অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার মধ্যে পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পৃথিবীপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা উভয়েরই গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এদের গঠন ও বৈশিষ্ট্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে:
| বিষয় | অক্ষরেখা (Latitudes) | দ্রাঘিমারেখা (Longitudes) |
|---|---|---|
| ১. আকৃতি | অক্ষরেখাগুলি হলো পূর্ণবৃত্তাকার রেখা (কেবল মেরুবিন্দু বাদে)। | দ্রাঘিমারেখাগুলি হলো অর্ধবৃত্তাকার রেখা (উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত)। |
| ২. দৈর্ঘ্য | নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে অক্ষরেখাগুলির পরিধি ক্রমশ কমতে থাকে। অর্থাৎ অসমান দৈর্ঘ্যের হয়। | প্রতিটি দ্রাঘিমারেখার দৈর্ঘ্য সমান হয়। |
| ৩. অবস্থান | এগুলি পরস্পর সমান্তরালভাবে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। | এগুলি উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এবং দুই মেরু বিন্দুতে মিলিত হয় (সমান্তরাল নয়)। |
| ৪. গুরুত্ব | প্রধানত জলবায়ু বা তাপমণ্ডল নির্ণয়ে সাহায্য করে। | প্রধানত সময় নির্ণয়ে সাহায্য করে। |
২. ৮২°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমাকে ভারতের ‘প্রমাণ দ্রাঘিমা’ ধরা হয়েছে কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ভারত একটি বিশাল দেশ। এর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মধ্যে সময়ের পার্থক্য যাতে প্রশাসনিক কাজে বাধা সৃষ্টি না করে, তার জন্য একটি নির্দিষ্ট দ্রাঘিমাকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে। এর কারণগুলি হলো:
- ১. দেশব্যাপী সময়ের সমতা: ভারতের পশ্চিমে গুজরাট এবং পূর্বে অরুণাচল প্রদেশের মধ্যে দ্রাঘিমার পার্থক্য প্রায় ৩০°। ফলে স্থানীয় সময়ের পার্থক্য হয় প্রায় ২ ঘণ্টা (৩০ × ৪ মিনিট = ১২০ মিনিট)। এই সময়ের জটিলতা এড়াতে দেশের মাঝখানের একটি সময়কে বেছে নেওয়া জরুরি ছিল।
- ২. কেন্দ্রীয় অবস্থান: ৮২°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখাটি ভারতের প্রায় মাঝখান দিয়ে (এলাহাবাদ বা প্রয়াগরাজ ও কোকনদের ওপর দিয়ে) বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এই রেখার সময়কে সারা দেশের সময় ধরলে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় প্রান্তের মানুষের সুবিধা হয়।
- ৩. আন্তর্জাতিক নিয়ম: আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রমাণ দ্রাঘিমা সাধারণত ৭°৩০’ বা তার গুণিতক হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে গ্রিনিচের সময়ের সাথে তার পার্থক্য আধ ঘণ্টার (৩০ মিনিট) গুণিতক হয়। ৮২°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমা এই শর্ত পূরণ করে (গ্রিনিচ থেকে ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট এগিয়ে)।
৩. স্থানীয় সময় ও প্রমাণ সময়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: সময় গণনার দুটি প্রধান পদ্ধতি হলো স্থানীয় সময় এবং প্রমাণ সময়। নিচে এদের পার্থক্য আলোচনা করা হলো:
| বিষয় | স্থানীয় সময় (Local Time) | প্রমাণ সময় (Standard Time) |
|---|---|---|
| ১. নির্ণয়ের ভিত্তি | আকাশে সূর্যের সর্বোচ্চ অবস্থান বা মধ্যাহ্ন সূর্যের অবস্থান দেখে এটি নির্ণয় করা হয়। | দেশের মাঝখান দিয়ে যাওয়া একটি নির্দিষ্ট দ্রাঘিমারেখার স্থানীয় সময় অনুযায়ী এটি নির্ণয় করা হয়। |
| ২. পরিবর্তনশীলতা | প্রতি ১° দ্রাঘিমার পার্থক্যে স্থানীয় সময় ৪ মিনিট করে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ প্রতিটি দ্রাঘিমায় এটি আলাদা। | সমগ্র দেশে বা একটি নির্দিষ্ট টাইম জোনে এই সময় একই থাকে, বদলায় না। |
| ৩. ব্যবহারিক গুরুত্ব | দৈনন্দিন জীবনের নির্দিষ্ট স্থানে কাজকর্মের জন্য এটি ব্যবহৃত হলেও প্রশাসনিক কাজে অসুবিধা ঘটায়। | রেল, বিমান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। |
৪. আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা কেন বাঁকানো হয়েছে? এর গুরুত্ব কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: ১৮০° দ্রাঘিমারেখাকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা ধরা হলেও এটি সর্বত্র সোজা নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এটি বেশ কয়েক জায়গায় বাঁকানো হয়েছে।
বাঁকানোর কারণ:
- আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অতিক্রম করলেই ১ দিনের পার্থক্য হয়ে যায় (তারিখ ও বার বদলে যায়)।
- যদি এই রেখাটি কোনো স্থলভাগ বা একই দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে যেত, তবে একই দেশের বা একই দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে বার ও তারিখ নিয়ে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো।
- উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব সাইবেরিয়া, অ্যালিউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি, টঙ্গা প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জকে এড়িয়ে একই সময়ের মধ্যে রাখার জন্য রেখাটিকে যথাক্রমে পূর্ব বা পশ্চিমে বাঁকিয়ে জলভাগের ওপর দিয়ে টানা হয়েছে।
গুরুত্ব:
- এই রেখার সাহায্যে সমগ্র পৃথিবীর তারিখ ও বারের সুনির্দিষ্ট হিসাব রক্ষা করা হয়।
- বিমান ও জাহাজ চলাচলের সময় নাবিকরা এই রেখা পার হলে তাদের লগবুকের তারিখ সংশোধন করে নেন, ফলে সময়ের সঠিক হিসাব থাকে।
৫. নিরক্ষরেখা ও মূলমধ্যরেখার মধ্যে পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: নিরক্ষরেখা হলো প্রধান অক্ষরেখা এবং মূলমধ্যরেখা হলো প্রধান দ্রাঘিমারেখা। এদের পার্থক্যগুলি নিম্নরূপ:
| বিষয় | নিরক্ষরেখা (Equator) | মূলমধ্যরেখা (Prime Meridian) |
|---|---|---|
| ১. বিস্তৃতি | এটি পূর্ব-পশ্চিমে পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে। | এটি উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত। |
| ২. গোলার্ধ বিভাজন | এটি পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ভাগ করেছে। | এটি পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে। |
| ৩. জ্যামিতিক রূপ | এটি একটি পূর্ণবৃত্ত বা মহাবৃত্ত। | এটি একটি অর্ধবৃত্ত। |
| ৪. মান | এর মান ০° অক্ষাংশ। | এর মান ০° দ্রাঘিমাংশ। |
৬. উষ্ণমণ্ডলে সারা বছর উষ্ণতা বেশি এবং হিমমণ্ডলে সারা বছর উষ্ণতা কম থাকার কারণ কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি ও মেরুরেখার হেলানো অবস্থানের জন্য সূর্যরশ্মির পতন কোণের তারতম্য ঘটে, যা তাপমাত্রার পার্থক্য সৃষ্টি করে।
ক) উষ্ণমণ্ডলে উষ্ণতা বেশি হওয়ার কারণ:
- লম্ব সূর্যরশ্মি: নিরক্ষরেখা থেকে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারা বছর লম্বভাবে বা প্রায় লম্বভাবে পড়ে।
- অল্প বায়ুস্তর ভেদ: লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সূর্যরশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের কম স্তর ভেদ করে আসতে হয়, ফলে তাপ খুব কম শোষিত হয় এবং ভূপৃষ্ঠ বেশি উত্তপ্ত হয়।
খ) হিমমণ্ডলে উষ্ণতা কম হওয়ার কারণ:
- অতি তির্যক সূর্যরশ্মি: মেরু অঞ্চলে সূর্যরশ্মি অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ে। ফলে সূর্যরশ্মি অনেক বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তাপের প্রখরতা কমে যায়।
- দীর্ঘ বায়ুস্তর ভেদ: তির্যক রশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের পুরু স্তর ভেদ করে আসতে হয়, ফলে প্রচুর তাপ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বরফাবৃত থাকায় এখানে তাপের প্রতিফলন (Albedo) বেশি ঘটে, তাই উষ্ণতা হিমাঙ্কের নিচে থাকে।
৭. দ্রাঘিমারেখার বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
দ্রাঘিমারেখার বৈশিষ্ট্য:
- অর্ধবৃত্তাকার: প্রতিটি দ্রাঘিমারেখা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত একেকটি অর্ধবৃত্ত।
- অসমান দূরত্ব: দুটি দ্রাঘিমারেখার মধ্যে দূরত্ব নিরক্ষরেখায় সবচেয়ে বেশি (১১১ কিমি) এবং মেরুর দিকে ক্রমশ কমে বিন্দুতে পরিণত হয়।
- দৈর্ঘ্য সমান: পৃথিবীর সব দ্রাঘিমারেখার দৈর্ঘ্য সমান।
- সর্বোচ্চ মান: দ্রাঘিমার সর্বোচ্চ মান ১৮০°।
গুরুত্ব:
- অবস্থান নির্ণয়: কোনো স্থান মূলমধ্যরেখা থেকে কতটা পূর্বে বা পশ্চিমে অবস্থিত তা জানতে দ্রাঘিমা প্রয়োজন।
- সময় নির্ণয়: দ্রাঘিমার পার্থক্যে সময়ের পার্থক্য হয় (১° = ৪ মিনিট)। এর সাহায্যেই স্থানীয় সময় ও প্রমাণ সময় নির্ণয় করা হয়।
৮. ভূপৃষ্ঠে কোনো স্থানের অবস্থান কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা: বিশাল পৃথিবীর বুকে কোনো স্থানের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করার জন্য ভূজালক (Earth Grid) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
পদ্ধতি:
- ১. অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখার ছেদবিন্দু: গ্লোব বা মানচিত্রের ওপর পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত অক্ষরেখা এবং উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত দ্রাঘিমারেখাগুলি পরস্পরকে লম্বভাবে ছেদ করে।
- ২. স্থানাঙ্ক নির্ণয়: কোনো নির্দিষ্ট স্থানটি ঠিক কোন অক্ষরেখা (অক্ষাংশ) এবং কোন দ্রাঘিমারেখার (দ্রাঘিমাংশ) সংযোগস্থলে অবস্থিত, তা বের করা হয়।
- উদাহরণ: কলকাতার অবস্থান হলো ২২°৩৪’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ছেদবিন্দুতে। অর্থাৎ কলকাতা নিরক্ষরেখার উত্তরে এবং মূলমধ্যরেখার পূর্বে অবস্থিত।
৯. অক্ষরেখার প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
অক্ষরেখাগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
- পূর্ণবৃত্ত ও সমান্তরাল: প্রতিটি অক্ষরেখা (দুই মেরু বিন্দু ছাড়া) এক একটি পূর্ণবৃত্ত এবং এরা পরস্পর সমান্তরাল। কেউ কাউকে ছেদ করে না।
- অসমান দৈর্ঘ্য: নিরক্ষরেখা (০°) হলো বৃহত্তম অক্ষরেখা। নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে গেলে অক্ষরেখাগুলির পরিধি বা দৈর্ঘ্য ক্রমশ কমতে থাকে। মেরুতে গিয়ে এগুলি বিন্দুতে পরিণত হয় (৯০°)।
- দিক নির্দেশ: অক্ষরেখাগুলি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত থাকে, কিন্তু এগুলি উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ নির্দেশ করে।
১০. অক্ষরেখার গুরুত্ব বা ব্যবহার লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
ভূগোলে অক্ষরেখার গুরুত্ব অপরিসীম:
- ১. অবস্থান নির্ণয়: কোনো স্থান নিরক্ষরেখা থেকে কতটা উত্তরে বা দক্ষিণে অবস্থিত, তা জানা যায়।
- ২. জলবায়ু ও তাপমণ্ডল নির্ণয়: সূর্যরশ্মির পতন কোণ অক্ষাংশ ভেদে আলাদা হয়। তাই অক্ষরেখার সাহায্যে পৃথিবীকে উষ্ণমণ্ডল, নাতিশীতোষ্ণমণ্ডল ও হিমমণ্ডলে ভাগ করা যায়।
- ৩. দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য: উচ্চ অক্ষাংশে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের পার্থক্য বেশি এবং নিম্ন অক্ষাংশে কম—এটি অক্ষরেখা থেকেই বোঝা যায়।
১১. নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল (Temperate Zone) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
অবস্থান: উভয় গোলার্ধে ২৩.৫° (কর্কটক্রান্তি/মকরক্রান্তি) থেকে ৬৬.৫° (সুমেরুবৃত্ত/কুমেরুবৃত্ত) অক্ষরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল বলে।
বৈশিষ্ট্য ও উষ্ণতা মাঝারি হওয়ার কারণ:
- এই অঞ্চলে সূর্যরশ্মি একেবারে লম্বভাবেও পড়ে না, আবার মেরু অঞ্চলের মতো অত্যন্ত তির্যকভাবেও পড়ে না।
- সূর্যরশ্মি মাঝারিভাবে তির্যক হওয়ায় এখানে খুব বেশি গরমও হয় না, আবার খুব বেশি ঠান্ডাও থাকে না।
- তাই এখানে সারা বছর মনোরম বা নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে।
[Image of Temperate Zone on Earth]
১২. নিরক্ষরেখা বরাবর হাঁটলে সময়ের পরিবর্তন হয়, কিন্তু মূলমধ্যরেখা বরাবর হাঁটলে জলবায়ুর পরিবর্তন হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ক) নিরক্ষরেখা বরাবর হাঁটা (পূর্ব-পশ্চিমে):
নিরক্ষরেখা ধরে পূর্ব বা পশ্চিমে হাঁটলে আমরা দ্রাঘিমার পরিবর্তন করি। যেহেতু দ্রাঘিমা পরিবর্তনের সাথে সাথে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন হয়, তাই স্থানীয় সময়ের পরিবর্তন ঘটে (১° = ৪ মিনিট)। কিন্তু অক্ষাংশ একই থাকে (০°), তাই জলবায়ু মোটামুটি একই থাকে।
খ) মূলমধ্যরেখা বরাবর হাঁটা (উত্তর-দক্ষিণে):
মূলমধ্যরেখা ধরে উত্তর বা দক্ষিণে হাঁটলে আমরা অক্ষাংশের পরিবর্তন করি (নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে)। অক্ষাংশ বদলালে সূর্যরশ্মির পতন কোণ বদলায় (লম্ব থেকে তির্যক)। ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটে এবং জলবায়ুর পরিবর্তন হয় (উষ্ণ থেকে শীতল)। কিন্তু দ্রাঘিমা একই থাকে (০°), তাই সময়ের পরিবর্তন হয় না।
১৩. আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (IDL) গুরুত্ব অপরিসীম:
- ১. বার ও তারিখের বিভ্রান্তি দূর করা: পৃথিবী গোল হওয়ার কারণে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে যেতে থাকলে সময়ের গরমিল হয়। এই রেখাটি সারা বিশ্বে বার ও তারিখের সামঞ্জস্য বজায় রাখে।
- ২. আন্তর্জাতিক যোগাযোগ: বিমান চলাচল, সামুদ্রিক জাহাজ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সঠিক তারিখ বজায় রাখতে এই রেখা সাহায্য করে।
- ৩. নাবিকদের সুবিধা: প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রমকারী নাবিকরা এই রেখা পার হলেই লগবুকের তারিখ সংশোধন করে নেন (পশ্চিমে গেলে ১ দিন কমান, পূর্বে এলে ১ দিন বাড়ান)।
১৪. ১৮০° দ্রাঘিমাকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা ধরা হলো কেন?
বিস্তারিত উত্তর
১৮০° দ্রাঘিমাকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণগুলি হলো:
- ১. একই রেখা: ১৮০° পূর্ব এবং ১৮০° পশ্চিম দ্রাঘিমা বাস্তবে একই রেখা।
- ২. সর্বোচ্চ সময়ের পার্থক্য: মূলমধ্যরেখা (০°) থেকে উভয় দিকে ১৮০° গেলে সময়ের পার্থক্য হয় ১২ ঘণ্টা করে মোট ২৪ ঘণ্টা বা ১ দিন। তাই তারিখ পরিবর্তনের জন্য এটিই উপযুক্ত স্থান।
- ৩. জলভাগের অবস্থান: এই রেখাটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে গেছে। এখানে খুব কম স্থলভাগ রয়েছে। ফলে তারিখ পরিবর্তন নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।
১৫. কলকাতার স্থানীয় সময় ও ভারতের প্রমাণ সময়ের মধ্যে পার্থক্য কেন হয়? ব্যাখ্যা করো।
বিস্তারিত উত্তর
কারণ:
- ভারতের প্রমাণ সময় (IST) নির্ণয় করা হয় ৮২°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমার ভিত্তিতে।
- কিন্তু কলকাতা অবস্থিত ৮৮°৩০’ পূর্ব দ্রাঘিমায়।
- উভয়ের মধ্যে দ্রাঘিমার পার্থক্য = ৮৮°৩০’ – ৮২°৩০’ = ৬°।
গণনা:
১° দ্রাঘিমার পার্থক্যে সময়ের পার্থক্য হয় ৪ মিনিট।
সুতরাং, ৬° পার্থক্যে সময় হবে = ৬ × ৪ = ২৪ মিনিট।
যেহেতু কলকাতা ভারতের প্রমাণ দ্রাঘিমার পূর্বে অবস্থিত, তাই কলকাতার স্থানীয় সময় ভারতের প্রমাণ সময়ের চেয়ে ২৪ মিনিট এগিয়ে থাকে। কিন্তু প্রশাসনিক সুবিধার জন্য কলকাতায় প্রমাণ সময় (IST) মেনে চলা হয়।
১৬. মহাবৃত্ত (Great Circle) সম্পর্কে টিকা লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
সংজ্ঞা: যে কাল্পনিক বৃত্তের কেন্দ্র ও পৃথিবীর কেন্দ্র একই বিন্দুতে অবস্থান করে এবং যা পৃথিবীকে দুটি সমান গোলার্ধে ভাগ করে, তাকে মহাবৃত্ত বলে।
উদাহরণ:
- অক্ষরেখাগুলির মধ্যে একমাত্র নিরক্ষরেখা (০°) হলো মহাবৃত্ত।
- যেকোনো দুটি বিপরীত দ্রাঘিমারেখা (যেমন—০° ও ১৮০°, বা ৯০° পূর্ব ও ৯০° পশ্চিম) যুক্ত করলে একটি মহাবৃত্ত তৈরি হয়।
ব্যবহার: মহাবৃত্ত হলো ভূপৃষ্ঠের দুটি স্থানের মধ্যে ক্ষুদ্রতম দূরত্ব। তাই বিমান ও জাহাজ চলাচলের সময় জ্বালানি ও সময় বাঁচাতে মহাবৃত্তের পথ অনুসরণ করা হয়।
১৭. প্রতিপাদ স্থান (Antipodes) ও তার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
সংজ্ঞা: ভূপৃষ্ঠের কোনো বিন্দুর ঠিক বিপরীতে পৃথিবীর কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে অঙ্কিত ব্যাস অপর প্রান্তে যে বিন্দুতে ছেদ করে, তাকে প্রথম বিন্দুর প্রতিপাদ স্থান বলে।
বৈশিষ্ট্য:
- অক্ষাংশ: দুটি স্থানের অক্ষাংশের মান একই থাকে কিন্তু গোলার্ধ বিপরীত হয় (যেমন—২০° উত্তর হলে প্রতিপাদ হবে ২০° দক্ষিণ)।
- দ্রাঘিমা: দুটি স্থানের দ্রাঘিমার যোগফল ১৮০° হয় এবং গোলার্ধ বিপরীত হয়।
- সময়: দুটি স্থানের সময়ের পার্থক্য সর্বদা ১২ ঘণ্টা হয়।
- ঋতু: একটি স্থানে গ্রীষ্মকাল হলে প্রতিপাদ স্থানে শীতকাল হয় (বিপরীত ঋতু)।
অধ্যায় ৩: গাণিতিক সমাধান (Numerical Problems)
🧮 অঙ্ক করার গোল্ডেন রুলস (Golden Rules)
- সূত্র ১: ১° দ্রাঘিমার পার্থক্যে সময়ের পার্থক্য = ৪ মিনিট।
- সূত্র ২: ১’ (মিনিট) দ্রাঘিমার পার্থক্যে সময়ের পার্থক্য = ৪ সেকেন্ড।
- সূত্র ৩: পূর্ব দিকে গেলে সময় বাড়ে (যোগ করতে হয়)।
- সূত্র ৪: পশ্চিম দিকে গেলে সময় কমে (বিয়োগ করতে হয়)।