নবম শ্রেণি: ভূগোল, অধ্যায় – 7 বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন উত্তর মান 3
অধ্যায় ৭: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (পর্ব-১)
১. উদাহরণসহ সম্পদের অর্থ ব্যাখ্যা করো।
বিস্তারিত উত্তর
সাধারণ অর্থে সম্পদ বলতে টাকা-পয়সা, সোনা-দানা বা জমি-জায়গাকে বোঝায়। কিন্তু অর্থনীতি ও ভূগোলে সম্পদের অর্থ অনেক ব্যাপক।
সংজ্ঞা: বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জিমারম্যানের মতে, “সম্পদ কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়, বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে কার্যকারিতা (Functionality) বা গুণ মানুষের অভাব মোচন করে এবং চাহিদা মেটায়, তাকেই সম্পদ বলে।”
উদাহরণ: খনিতে পড়ে থাকা কয়লা কেবলই একটি বস্তু বা ‘নিরপেক্ষ সামগ্রী’। কিন্তু মানুষ যখন প্রযুক্তি ও বুদ্ধি খাটিয়ে সেই কয়লা উত্তোলন করে তা থেকে তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজের চাহিদা মেটায়, তখনই সেই কয়লা ‘সম্পদ’-এ পরিণত হয়। অর্থাৎ, কয়লার তাপ উৎপাদন ক্ষমতাই হলো আসল সম্পদ।
২. সম্পদ সৃষ্টির উপাদান হিসেবে প্রকৃতির ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
বিস্তারিত উত্তর
সম্পদ সৃষ্টির তিনটি উপাদানের মধ্যে প্রকৃতি হলো অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এর ভূমিকাগুলি হলো:
- ভাণ্ডার: প্রকৃতি হলো সম্পদের আদি জননী বা ভাণ্ডার। সূর্যালোক, বায়ু, জল, মৃত্তিকা, খনিজ পদার্থ—সবই প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায়।
- কাঁচামাল যোগান: মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাঁচামাল (যেমন—কাঠ, খাদ্যশস্য, খনিজ) প্রকৃতিই যোগান দেয়।
- আশ্রয়স্থল: প্রকৃতি মানুষের বসবাসের স্থান এবং কর্মক্ষেত্র প্রদান করে।
এক কথায়, প্রকৃতি ছাড়া সম্পদ সৃষ্টির কোনো অস্তিত্বই থাকত না, কারণ প্রকৃতিই হলো সম্পদের আধার।
৩. সম্পদ সৃষ্টিতে মানুষের ভূমিকা উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
জিমারম্যানের মতে, মানুষ সম্পদ সৃষ্টিতে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে—একই সঙ্গে সে ‘স্রষ্টা’ এবং ‘ভোক্তা’।
- স্রষ্টা হিসেবে: মানুষ তার জ্ঞান, বুদ্ধি, শ্রম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির অকেজো বস্তু বা ‘নিরপেক্ষ সামগ্রী’কে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করে। যেমন—নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন।
- ভোক্তা হিসেবে: মানুষ সম্পদ সৃষ্টি করে এবং নিজেই তা ভোগ বা ব্যবহার করে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করে।
- ধ্বংসকারী হিসেবে: মানুষ অবৈজ্ঞানিক উপায়ে সম্পদ ব্যবহার করে সম্পদের বিনাশও ঘটায়।
৪. নিরপেক্ষ সামগ্রী থেকে সম্পদ কীভাবে সৃষ্টি হয়?
বিস্তারিত উত্তর
প্রকৃতিতে এমন অনেক বস্তু আছে যা মানুষের কোনো উপকারও করে না, ক্ষতিও করে না—এদের ‘নিরপেক্ষ সামগ্রী’ (Neutral Stuff) বলে। এই নিরপেক্ষ সামগ্রী মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্পর্শে সম্পদে পরিণত হয়।
প্রক্রিয়া:
- জ্ঞান ও প্রযুক্তি: মানুষ যখন কোনো নিরপেক্ষ বস্তুর উপযোগিতা আবিষ্কার করে।
- চাহিদা: যখন সেই বস্তুর চাহিদা তৈরি হয়।
উদাহরণ: একসময় খরস্রোতা নদীর জল বা জলপ্রপাত ছিল কেবলই নিরপেক্ষ সামগ্রী। কিন্তু মানুষ যখন টারবাইন আবিষ্কার করল এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করল, তখন সেই জলরাশিতে লুকিয়ে থাকা শক্তি সম্পদে পরিণত হলো।
৫. ‘জ্ঞান হলো সম্পদের প্রকৃত জননী’—কারণ ব্যাখ্যা করো।
বিস্তারিত উত্তর
মিচেল (Mitchell) বলেছিলেন, “মানুষের জ্ঞানই হলো সম্পদের প্রকৃত জননী” (Knowledge is the mother of all resources)। এর কারণগুলি হলো:
- আবিষ্কার: প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা অফুরন্ত পদার্থকে মানুষ তার জ্ঞান ও বুদ্ধির সাহায্যেই খুঁজে বের করে এবং তাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে।
- কার্যকারিতা বৃদ্ধি: জ্ঞানের মাধ্যমেই মানুষ বস্তুর নতুন নতুন ব্যবহার আবিষ্কার করে। যেমন—একসময় খনিজ তেলের ব্যবহার জানা ছিল না, কিন্তু আজ জ্ঞানের কারণে তা ‘তরল সোনা’।
- দক্ষতা: জ্ঞান মানুষের কর্মদক্ষতা বাড়ায়, যা সম্পদ সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করে। তাই জ্ঞান ছাড়া কোনো বস্তুই সম্পদে পরিণত হতে পারে না।
৬. সম্পদের কার্যকারিতা সর্বদা গতিশীল কেন?
বিস্তারিত উত্তর
সম্পদ কোনো স্থির ধারণা নয়, এর কার্যকারিতা সর্বদা পরিবর্তনশীল বা গতিশীল। কারণ:
- সময়ের পরিবর্তন: সময়ের সাথে সাথে মানুষের চাহিদা ও রুচি বদলায়, ফলে সম্পদের গুরুত্বও বদলায়।
- প্রযুক্তির উন্নতি: নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে পুরোনো অকেজো বস্তু সম্পদে পরিণত হয়। যেমন—দামোদর নদ একসময় ‘বাংলার দুঃখ’ ছিল, কিন্তু ডিভিসি (DVC) পরিকল্পনার ফলে তা এখন জলবিদ্যুৎ ও সেচের উৎস বা সম্পদে পরিণত হয়েছে।
- স্থানভেদে: এক জায়গায় যা সম্পদ, অন্য জায়গায় তা নিরপেক্ষ সামগ্রী হতে পারে। তাই বলা হয়, সম্পদের ধারণা সর্বদা প্রসারিত হয়।
৭. সম্পদের কার্যকারিতার নিয়ন্ত্রকগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
সম্পদ সৃষ্টি বা এর কার্যকারিতা প্রধানত তিনটি নিয়ন্ত্রকের ওপর নির্ভর করে:
- প্রকৃতি (Nature): প্রকৃতি কাঁচামাল যোগান দেয়। প্রকৃতির দান ছাড়া সম্পদ সৃষ্টি অসম্ভব।
- মানুষ (Man): মানুষের শ্রম, বুদ্ধি ও দৈহিক ক্ষমতা সম্পদকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে।
- সংস্কৃতি (Culture): মানুষের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামাজিক রীতিনীতিকে সংস্কৃতি বলে। উন্নত সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি ছাড়া প্রকৃতিদত্ত বস্তুকে সম্পদে রূপান্তর করা যায় না।
৮. সম্পদ সংরক্ষণ (Conservation of Resources) বলতে কী বোঝো?
বিস্তারিত উত্তর
সম্পদ সংরক্ষণ মানে সম্পদ ব্যবহার না করে জমিয়ে রাখা নয়।
সংজ্ঞা: সম্পদের অপচয় রোধ করে, বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদের ভাণ্ডার অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে সম্পদের যে সুপরিকল্পিত, বিজ্ঞানসম্মত এবং বিচক্ষণ ব্যবহার করা হয়, তাকেই সম্পদ সংরক্ষণ বলে।
এর মূল কথা হলো—সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার কিন্তু ন্যূনতম অপচয় (Rational use with minimum waste)।
৯. সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
সম্পদ সংরক্ষণের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- ভবিষ্যৎ সুরক্ষা: গচ্ছিত সম্পদ (যেমন- কয়লা, তেল) যাতে দ্রুত ফুরিয়ে না যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে সংকটে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
- ভারসাম্য রক্ষা: পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা। অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ পরিবেশ দূষণ ঘটায়।
- টেকসই উন্নয়ন: দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বজায় রাখা।
- বিকল্প সন্ধান: প্রচলিত সম্পদের ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প ও পুনর্ভব সম্পদের ব্যবহার বাড়ানো।
১০. ভারতে কয়লা উত্তোলনের প্রধান সমস্যাগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
ভারতে কয়লা উত্তোলনের প্রধান সমস্যাগুলি হলো:
- নিকৃষ্ট মান: ভারতের অধিকাংশ কয়লাই বিটুমিনাস বা লিগনাইট শ্রেণীর, যাতে ছাইয়ের পরিমাণ (Ash Content) অনেক বেশি (প্রায় ২০-৩০%), ফলে তাপ উৎপাদন ক্ষমতা কম।
- পরিবহন সমস্যা: খনি অঞ্চল থেকে শিল্পাঞ্চল দূরে হওয়ায় পরিবহন খরচ বেশি পড়ে।
- অগ্নিকাণ্ড ও ধস: খনির ভেতর স্বতঃস্ফূর্ত আগুন লাগা এবং ধস নামার ফলে প্রচুর কয়লা নষ্ট হয় এবং দুর্ঘটনা ঘটে।
- পুরানো পদ্ধতি: অনেক খনিতে এখনও অবৈজ্ঞানিক ও সনাতন পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হয়, যা উৎপাদনশীলতা কমায়।
১১. কীভাবে খনিজ তেলের উৎপত্তি হয়েছে?
বিস্তারিত উত্তর
খনিজ তেলের উৎপত্তি সম্পর্কে জৈব মতবাদটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
কোটি কোটি বছর আগে সমুদ্রের নিচে জমে থাকা অসংখ্য সামুদ্রিক উদ্ভিদ, প্রাণী ও শৈবালের দেহাবশেষ পলিস্তরের নিচে চাপা পড়ে যায়। ভূ-অভ্যন্তরের প্রচণ্ড চাপ (Pressure), তাপ (Heat) এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই দেহাবশেষগুলি বিযোজিত হয়ে হাইড্রোকার্বন যুক্ত তরল পদার্থ বা খনিজ তেলে পরিণত হয়। এটি পাললিক শিলাস্তরে জমা থাকে।
১২. ভারতের কোন কোন সমুদ্রগর্ভ থেকে খনিজ তেল তোলা হয়?
বিস্তারিত উত্তর
ভারতের স্থলভাগের তুলনায় সমুদ্রগর্ভ বা উপকূলীয় অঞ্চল থেকেই বেশি তেল পাওয়া যায়। প্রধান ক্ষেত্রগুলি হলো:
- বোম্বে হাই (Bombay High): আরব সাগরে মুম্বাই উপকূল থেকে ১৭৬ কিমি দূরে অবস্থিত। এটি ভারতের বৃহত্তম তৈলক্ষেত্র (৬৩% তেল এখান থেকে আসে)।
- বেসিন (Bassein): বোম্বে হাই-এর দক্ষিণে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ও তৈলক্ষেত্র।
- আলিয়াবেট (Aliabet): গুজরাটের ভাবনগরের কাছে খাম্বাত উপসাগরের একটি দ্বীপাঞ্চল।
- এছাড়া কৃষ্ণা-গোদাভরী বদ্বীপ উপকূল (রাভা তৈলক্ষেত্র) থেকেও তেল ও গ্যাস পাওয়া যায়।
১৩. জলবিদ্যুতের সুবিধা ও অসুবিধা উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
সুবিধা:
- অফুরন্ত ও সস্তা: এর কাঁচামাল (জল) বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং এটি পুনর্ভব। উৎপাদন খরচও কম।
- দূষণহীন: এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, কোনো ধোঁয়া বা বর্জ্য তৈরি করে না।
অসুবিধা:
- নির্মাণ ব্যয়: বাঁধ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির প্রাথমিক খরচ অত্যন্ত বেশি।
- বাস্তুচ্যুতি: বড় বাঁধ তৈরির ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়, বনভূমি নষ্ট হয় এবং বহু মানুষ ভিটেমাটি হারায় (যেমন- নর্মদা বাচাও আন্দোলন)।
১৪. পারমাণবিক বিদ্যুতের সুবিধা ও অসুবিধা উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
সুবিধা:
- অল্প উপাদানে বেশি শক্তি: সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
- পরিবহন সহজ: কাঁচামাল পরিমাণে কম লাগে বলে পরিবহন খরচ নেই বললেই চলে।
অসুবিধা:
- তেজস্ক্রিয় দূষণ: দুর্ঘটনা ঘটলে (যেমন- চেরনোবিল) তেজস্ক্রিয় বিকিরণে ভয়াবহ ক্ষতি হয় যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ নিরাপদভাবে নষ্ট করা বা পুঁতে রাখা খুব কঠিন ও ব্যয়সাধ্য।
১৫. উত্তর-পূর্ব ভারতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত হারে বাড়ছে কেন?
বিস্তারিত উত্তর
উত্তর-পূর্ব ভারত (অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়) জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ কারণ:
- বন্ধুর ভূপ্রকৃতি: হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় এখানকার নদীগুলির গতিবেগ ও স্রোত অত্যন্ত বেশি।
- প্রচুর বৃষ্টিপাত: চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামের মতো সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল এলাকা এখানে থাকায় নদীগুলোতে সারা বছর জল থাকে।
- ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা: ব্রহ্মপুত্র ও তার অসংখ্য উপনদী বিপুল জলরাশি বহন করে, যা জলবিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একে ভারতের ‘ভবিষ্যৎ শক্তি ভাণ্ডার’ বলা হয়।
১৬. সৌরশক্তির ব্যবহার উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে:
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: সোলার প্যানেলের সাহায্যে বিদ্যুৎ তৈরি করে গৃহস্থালি, অফিস ও রাস্তার আলো (Street Light) জ্বালানো হয়।
- সোলার কুকার: এর সাহায্যে রান্না করা হয়।
- সোলার হিটার: জল গরম করার কাজে ব্যবহৃত হয়।
- কৃষিকাজ: সৌর পাম্পের সাহায্যে জমি সেচ করা হয়।
- অন্যান্য: ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং কৃত্রিম উপগ্রহে শক্তির উৎস হিসেবে সৌরকোষ ব্যবহৃত হয়।
১৭. সৌরবিদ্যুতের সুবিধা ও অসুবিধা উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
সুবিধা:
- অফুরন্ত: সূর্যের আলো অফুরন্ত ও পুনর্ভব।
- পরিবেশবান্ধব: এটি ব্যবহারে কোনো দূষণ হয় না।
- রক্ষণাবেক্ষণ: একবার বসালে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুব কম।
অসুবিধা:
- প্রাথমিক খরচ: সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি বসানোর প্রাথমিক খরচ খুব বেশি।
- আবহাওয়া নির্ভর: মেঘলা দিনে বা রাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না।
- জায়গা: বড় প্রকল্প স্থাপনের জন্য প্রচুর জমির প্রয়োজন হয়।
১৮. বায়ুশক্তির উৎপাদন দ্রুত হারে বাড়ছে কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভারতে বায়ুশক্তির জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণগুলি হলো:
- বিশাল উপকূলরেখা: ভারতের প্রায় ৭৫০০ কিমি দীর্ঘ উপকূলরেখায় সারা বছর ধরে প্রবল বেগে বাতাস বয়, যা বায়ুশক্তির জন্য আদর্শ।
- স্বল্প খরচ: একবার উইন্ড মিল বসালে জ্বালানি খরচ নেই বললেই চলে।
- দূষণমুক্ত: এটি সম্পূর্ণ গ্রিন এনার্জি।
- সরকারি উদ্যোগ: সরকার বায়ুশক্তি উৎপাদনে ভর্তুকি ও উৎসাহ দিচ্ছে। ভারত বর্তমানে বায়ুশক্তিতে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অধিকার করে।
১৯. বায়ুশক্তি ব্যবহারের সুবিধা-অসুবিধা উল্লেখ করো।
বিস্তারিত উত্তর
সুবিধা:
- এটি একটি পুনর্ভব বা অফুরন্ত শক্তির উৎস।
- বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ কার্যেও এটি ব্যবহার করা যায়।
অসুবিধা:
- শব্দ দূষণ: বায়ুকল বা টারবাইন ঘোরার সময় প্রচুর শব্দ হয়।
- পাখিদের বিপদ: বায়ুকলের ডানার আঘাতে প্রচুর পাখি মারা যায়।
- অনিশ্চয়তা: বাতাসের গতিবেগ সব সময় সমান থাকে না।
২০. ভারতের কোন কোন অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়?
বিস্তারিত উত্তর
ভারতের বায়ুশক্তি উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় রাজ্যগুলি হলো:
- তামিলনাড়ু: এটি বায়ুশক্তি উৎপাদনে ভারতে প্রথম। মুপ্পান্ডাল ও কন্যাকুমারী অঞ্চল বিখ্যাত।
- গুজরাট: লম্বা (Lamba) ও কচ্ছ উপকূলে প্রচুর বায়ুকল রয়েছে।
- মহারাষ্ট্র: সাতারা জেলায় বায়ুশক্তি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
- কর্ণাটক ও রাজস্থান: জোধপুর ও জয়সলমীর অঞ্চলেও এর প্রসার ঘটেছে।
অধ্যায় ৭: ১০০% প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন (Bonus Set)
২১. প্রচলিত (Conventional) ও অপ্রচলিত (Non-conventional) শক্তির মধ্যে পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
| বিষয় | প্রচলিত শক্তি | অপ্রচলিত শক্তি |
|---|---|---|
| ১. ব্যবহার কাল | বহুকাল ধরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। | সাম্প্রতিককালে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং এখনও খুব সীমিত। |
| ২. উৎস | প্রধানত কয়লা, খনিজ তেল (জীবাশ্ম জ্বালানি)। | সূর্য, বায়ু, জোয়ারভাটা (প্রাকৃতিক প্রবাহ)। |
| ৩. পরিবেশ দূষণ | প্রচুর ধোঁয়া ও ছাই তৈরি করে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। | এটি পরিবেশবান্ধব (Eco-friendly) এবং দূষণহীন। |
| ৪. স্থায়িত্ব | এর ভাণ্ডার সীমিত এবং ক্ষয়শীল (অপুনর্ভব)। | এর ভাণ্ডার অফুরন্ত এবং নবীকরণযোগ্য (পুনর্ভব)। |
২২. তাপবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
বিস্তারিত উত্তর
| বিষয় | তাপবিদ্যুৎ | জলবিদ্যুৎ |
|---|---|---|
| ১. কাঁচামাল | কয়লা, খনিজ তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস (ব্যয়সাপেক্ষ)। | খরস্রোতা নদীর জল (বিনামূল্যে পাওয়া যায়)। |
| ২. দূষণ | কার্বন ডাইঅক্সাইড ও ছাই নির্গত হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়। | সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত পরিবেশবান্ধব শক্তি। |
| ৩. খরচ | নির্মাণ খরচ কম, কিন্তু উৎপাদন বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি। | নির্মাণ খরচ (বাঁধ তৈরি) খুব বেশি, কিন্তু উৎপাদন খরচ খুব কম। |
| ৪. অবস্থান | যে কোনো স্থানে স্থাপন করা যায়। | কেবলমাত্র নদী বা পাহাড়ি অঞ্চলেই স্থাপন করা সম্ভব। |
২৩. পুনর্ভব (Renewable) ও অপুনর্ভব (Non-renewable) সম্পদের পার্থক্য লেখো।
বিস্তারিত উত্তর
১. স্থায়িত্ব: পুনর্ভব সম্পদ অফুরন্ত এবং বারবার ব্যবহার করা যায় (যেমন- সূর্যালোক)। অপুনর্ভব সম্পদ সীমিত এবং একবার ব্যবহার করলে নিঃশেষ হয়ে যায় (যেমন- কয়লা)।
২. গঠনকাল: পুনর্ভব সম্পদ খুব দ্রুত বা প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় সৃষ্টি হয়। অপুনর্ভব সম্পদ সৃষ্টি হতে কোটি কোটি বছর সময় লাগে।
৩. প্রভাব: পুনর্ভব সম্পদ সাধারণত পরিবেশবান্ধব। অপুনর্ভব সম্পদ ব্যবহারে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
২৪. দক্ষিণ ভারতে জলাধারের সংখ্যা বেশি কেন? অথবা, দক্ষিণ ভারত জলবিদ্যুতে উন্নত কেন?
বিস্তারিত উত্তর
দক্ষিণ ভারতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে:
- বন্ধুর ভূপ্রকৃতি: দাক্ষিণাত্য মালভূমি কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত এবং এবড়োখেবড়ো। ফলে নদীগুলি খরস্রোতা হয় এবং অনেক জলপ্রপাত সৃষ্টি করে যা টারবাইন ঘোরানোর জন্য আদর্শ।
- জলাধার নির্মাণ: কঠিন শিলাস্তরের জন্য এখানে বড় বড় মজবুত বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা সহজ এবং সস্তা।
- বিকল্পের অভাব: দক্ষিণ ভারতে কয়লা খনি খুব কম থাকায় তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সীমিত, তাই তারা জলবিদ্যুতের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
২৫. ভারতে সৌরশক্তির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল কেন?
বিস্তারিত উত্তর
ভারতকে সৌরশক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ বলা হয় কারণ:
- ভৌগোলিক অবস্থান: ভারত ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে বছরে প্রায় ৩০০ দিন আকাশ মেঘমুক্ত থাকে এবং প্রচুর সূর্যরশ্মি পাওয়া যায়।
- বিপুল চাহিদা: ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে সৌরশক্তি সেরা বিকল্প।
- সরকারি উদ্যোগ: জওহরলাল নেহেরু ন্যাশনাল সোলার মিশন (JNNSM)-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচুর ভর্তুকি ও উৎসাহ দিচ্ছে।
২৬. খনিজ তেলের ব্যবহার বা গুরুত্ব আলোচনা করো।
বিস্তারিত উত্তর
আধুনিক সভ্যতায় খনিজ তেলের গুরুত্ব অপরিসীম:
- জ্বালানি: বাস, লরি, ট্রেন, বিমান ও জাহাজ চালাতে পেট্রোল, ডিজেল বা এভিয়েশন ফুয়েল অপরিহার্য।
- বিদ্যুৎ উৎপাদন: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়।
- শিল্পের কাঁচামাল: পেট্রোরসায়ন শিল্পের প্রধান কাঁচামাল (ন্যাপথা) খনিজ তেল থেকেই আসে। এছাড়া কৃত্রিম রবার, সার, প্লাস্টিক, রং তৈরিতে এর ব্যবহার ব্যাপক।
- লুব্রিকেন্ট: যন্ত্রপাতির ঘর্ষণ কমাতে পিচ্ছিলকারক তেল বা গ্রিজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২৭. বায়োগ্যাস (Biogas) উৎপাদনের সুবিধাগুলি কী কী?
বিস্তারিত উত্তর
গ্রামীণ ভারতে বায়োগ্যাস বা গোবর গ্যাস অত্যন্ত জনপ্রিয় কারণ:
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গ্রামের পচনশীল বর্জ্য, গোবর এবং আবর্জনা ব্যবহার করে এটি তৈরি হয়, ফলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকে।
- দূষণহীন জ্বালানি: এটি রান্নার কাজে এবং আলো জ্বালাতে ব্যবহৃত হয়, যা কোনো ধোঁয়া সৃষ্টি করে না।
- জৈব সার: গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট অংশ (Slurry) জমিতে উন্নত মানের নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
২৮. জলবিদ্যুৎকে ‘সাদা কয়লা’ (White Coal) বলা হয় কেন?
বিস্তারিত উত্তর
কালো কয়লা পুড়িয়ে যেমন তাপ ও শক্তি পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই বর্ণহীন বা সাদা জলরাশিকে কাজে লাগিয়েও প্রচুর বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করা যায়। কয়লার মতো এটিও শক্তির একটি প্রধান উৎস, কিন্তু এটি পরিবেশবান্ধব ও অফুরন্ত। জলের এই বিশেষ গুণের জন্যই জলবিদ্যুৎকে রূপক অর্থে ‘সাদা কয়লা’ বলা হয়।