অষ্টম শ্রেণী: বিজ্ঞান ও পরিবেশ, অধ্যায় 1.1 বল ও চাপ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নত্তোর মান 3
অধ্যায় 1.1: বল ও চাপ
(রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)
1. তরলের চাপ কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এবং কীভাবে?
উত্তর দেখো
উত্তর: স্থির তরলের অভ্যন্তরে কোনো বিন্দুতে তরলের চাপ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
1. তরলের গভীরতা (h): তরলের মুক্তপৃষ্ঠ থেকে বিন্দুর গভীরতা যত বাড়ে, তরলের চাপ তত বাড়ে। অর্থাৎ, চাপ গভীরতার সমানুপাতিক।
2. তরলের ঘনত্ব (d): তরলের ঘনত্ব যত বেশি হয়, ওই তরলের চাপও তত বেশি হয়। যেমন—জলের চেয়ে পারদের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় একই গভীরতায় পারদের চাপ বেশি।
3. অভিকর্ষজ ত্বরণ (g): অভিকর্ষজ ত্বরণের মান বাড়লে তরলের চাপ বাড়ে।
(গাণিতিক রূপ: তরলের চাপ = h × d × g)
2. প্লবতা কাকে বলে? বস্তুর ভাসন ও নিমজ্জনের শর্তগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: প্লবতা: কোনো বস্তুকে স্থির তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করলে তরল বা গ্যাস বস্তুর ওপর লম্বভাবে যে ঊর্ধ্বমুখী বল প্রয়োগ করে, তাকে প্লবতা বলে।
ভাসন ও নিমজ্জনের শর্ত: ধরি, বস্তুর ওজন = W এবং প্লবতা বল = U।
1. W > U (নিমজ্জন): বস্তুর ওজন প্লবতার চেয়ে বেশি হলে বস্তুটির ওপর লব্ধি বল নিচের দিকে কাজ করে। ফলে বস্তুটি তরলে সম্পূর্ণ ডুবে যায়। (এক্ষেত্রে বস্তুর ঘনত্ব তরলের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়)।
2. W = U (সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় ভাসন): বস্তুর ওজন ও প্লবতা সমান হলে বস্তুটি তরলের যেকোনো স্থানে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় ভাসবে।
3. W < U (আংশিক নিমজ্জিত অবস্থায় ভাসন): বস্তুর ওজন প্লবতার চেয়ে কম হলে বস্তুটি তরলে আংশিক ডুবে ভাসবে।
3. লোহার তৈরি একটি ছোট পেরেক জলে ডুবে যায়, কিন্তু লোহার তৈরি বিশাল জাহাজ জলে ভাসে কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: কোনো বস্তু তরলে ভাসবে না ডুববে তা নির্ভর করে বস্তুর ওজন এবং বস্তুর ওপর তরলের প্লবতা বলের ওপর।
লোহার পেরেকের আয়তন খুব কম, তাই পেরেকটি জলে ফেললে যে পরিমাণ জল অপসারণ করে তার ওজন (অর্থাৎ প্লবতা) পেরেকের নিজস্ব ওজনের চেয়ে কম হয়। ফলে পেরেকটি জলে ডুবে যায়।
অন্যদিকে, বিশাল জাহাজের ভেতরটা ফাঁপা থাকে, ফলে এর গড় আয়তন অনেক বেশি হয়। জাহাজটি জলে ভাসার সময় তার নিমজ্জিত অংশ দ্বারা অপসারিত জলের ওজন (প্লবতা), জাহাজ ও তার যাত্রীদের মোট ওজনের সমান হয়। আর্কিমিডিসের নীতি অনুযায়ী বস্তুর ওজন এবং প্লবতা সমান হলে বস্তুটি ভাসে, তাই লোহার বিশাল জাহাজ জলে ভাসে।
4. ঘর্ষণ বল কাকে বলে? দৈনন্দিন জীবনে ঘর্ষণের দুটি সুবিধা ও দুটি অসুবিধা লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘর্ষণ বল: একটি বস্তু যখন অন্য একটি বস্তুর তলের সংস্পর্শে থেকে গতিশীল হয় বা গতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে, তখন বস্তু দুটির স্পর্শতলে গতির বিরুদ্ধে যে বাধাজনিত বলের সৃষ্টি হয়, তাকে ঘর্ষণ বল বলে।
সুবিধা:
1. রাস্তা ও জুতোর তলার মধ্যে ঘর্ষণ থাকে বলেই আমরা নিরাপদে হাঁটতে পারি, পিছলে পড়ে যাই না।
2. ঘর্ষণের জন্যই দেশলাই কাঠির বারুদ জ্বলে ওঠে এবং আমরা কাগজে কলম দিয়ে লিখতে পারি।
অসুবিধা:
1. যন্ত্রপাতির চলন্ত অংশগুলির মধ্যে ঘর্ষণের ফলে যন্ত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
2. ঘর্ষণের কারণে তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে প্রচুর শক্তির অপচয় ঘটে।
5. ঘনত্ব কাকে বলে? এর গাণিতিক রূপ ও SI একক লেখো। “পারদের ঘনত্ব 13.6 g/cc” বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘনত্ব: কোনো পদার্থের একক আয়তনের ভরকে ওই পদার্থের ঘনত্ব বলে।
• গাণিতিক রূপ: ঘনত্ব (d) = বস্তুর ভর (m) ÷ বস্তুর আয়তন (v)।
• SI একক: কিলোগ্রাম/ঘনমিটার (kg/m³)।
“পারদের ঘনত্ব 13.6 g/cc” এর অর্থ: এর অর্থ হলো, 1 ঘন সেন্টিমিটার (1 cc) আয়তনের পারদের ভর 13.6 গ্রাম। অথবা বলা যায়, পারদ সমআয়তনের জলের চেয়ে 13.6 গুণ বেশি ভারী (যেহেতু জলের ঘনত্ব 1 g/cc)।
অধ্যায় 1.1: বল ও চাপ
(প্রয়োগমূলক ও গাণিতিক প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)
6. ভোঁতা ছুরির চেয়ে ধারালো ছুরিতে সহজে ফল বা সবজি কাটা যায় কেন? / উটেরা মরুভূমির বালির ওপর দিয়ে সহজে হাঁটতে পারে কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: আমরা জানি, চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল। অর্থাৎ, একই পরিমাণ বল প্রয়োগ করলেও ক্ষেত্রফল কম হলে চাপ বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষেত্রফল বেশি হলে চাপ কমে যায়।
• ধারালো ছুরির ক্ষেত্রে: ধারালো ছুরির প্রান্তের ক্ষেত্রফল ভোঁতা ছুরির চেয়ে অনেক কম হয়। ফলে একই পরিমাণ বল প্রয়োগ করলে ধারালো ছুরি দিয়ে ফলের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে, তাই সহজে কাটা যায়।
• উটের ক্ষেত্রে: উটের পায়ের পাতা চওড়া হওয়ায় ক্ষেত্রফল বেশি হয়। ফলে উটের শরীরের ভারী ওজনের জন্য বালির ওপর যে চাপ পড়ে, তা তুলনামূলকভাবে কম হয় এবং উটের পা বালিতে সহজে বসে যায় না।
7. একটি পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করো যে, তরলের গভীরতা বাড়লে তরলের পার্শ্বচাপ বৃদ্ধি পায়।
উত্তর দেখো
উত্তর: পরীক্ষা: একটি লম্বা প্লাস্টিকের বোতল নেওয়া হলো। বোতলের গায়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পরপর তিনটি সমান মাপের ছিদ্র করা হলো। এবার ছিদ্রগুলো আঙুল দিয়ে বা সেলোটেপ দিয়ে আটকে বোতলটি জল দিয়ে পূর্ণ করা হলো।
পর্যবেক্ষণ: সেলোটেপ খুলে দিলে দেখা যাবে, সবচেয়ে ওপরের ছিদ্র দিয়ে জল সবচেয়ে কাছে পড়ছে। মাঝখানের ছিদ্রের জল আরেকটু দূরে এবং সবচেয়ে নিচের ছিদ্র দিয়ে জল সবচেয়ে বেশি বেগে অনেক দূরে গিয়ে পড়ছে।
সিদ্ধান্ত: নিচের ছিদ্রটির গভীরতা সবচেয়ে বেশি, তাই সেখানে জলের পার্শ্বচাপও সবচেয়ে বেশি। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে তরলের গভীরতা বাড়লে তরলের চাপ বৃদ্ধি পায়।
8. ঘর্ষণ কমানোর এবং বাড়ানোর দুটি করে উপায় লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ঘর্ষণ কমানোর উপায়:
1. যন্ত্রপাতির চলন্ত অংশে পিচ্ছিলকারক পদার্থ বা লুব্রিক্যান্ট (যেমন—তেল বা গ্রিজ) ব্যবহার করলে ঘর্ষণ কমে যায়।
2. সাইকেল, ফ্যান বা গাড়ির চাকায় বল-বিয়ারিং (Ball bearing) ব্যবহার করে ঘর্ষণ কমানো যায়।
ঘর্ষণ বাড়ানোর উপায়:
1. গাড়ির টায়ার যাতে রাস্তায় পিছলে না যায়, তার জন্য টায়ারের ওপর খাঁজ কাটা হয়।
2. খেলাধুলার সময় দৌড়ানোর সুবিধার জন্য খেলোয়াড়দের জুতোর তলায় স্পাইক বা কাঁটা লাগানো থাকে।
9. গাণিতিক প্রশ্ন: একটি বস্তুর ওজন 100 নিউটন এবং বস্তুটি যে তলের ওপর আছে তার ক্ষেত্রফল 5 বর্গমিটার। বস্তুটির দ্বারা তলের ওপর প্রযুক্ত চাপের পরিমাণ নির্ণয় করো।
উত্তর দেখো
উত্তর:
দেওয়া আছে,
প্রযুক্ত বল (বস্তুর ওজন) = 100 নিউটন
তলের ক্ষেত্রফল = 5 বর্গমিটার (m²)
আমরা জানি,
চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল
চাপ = 100 ÷ 5
চাপ = 20
অতএব, বস্তুটির দ্বারা তলের ওপর প্রযুক্ত চাপের পরিমাণ 20 পাস্কাল (বা 20 N/m²)।
10. গাণিতিক প্রশ্ন: 10 কেজি ভরের একটি বস্তুকে পৃথিবীতে মাপা হলে স্প্রিং তুলায় কত পাঠ (Reading) দেখাবে? বস্তুটিকে চাঁদে নিয়ে গেলে তার ভরের কী পরিবর্তন হবে?
উত্তর দেখো
উত্তর:
দেওয়া আছে, বস্তুর ভর = 10 কেজি।
আমরা জানি, 1 কেজি ভরের বস্তুকে পৃথিবী প্রায় 9.8 নিউটন বল দিয়ে টানে।
তাহলে, 10 কেজি ভরের বস্তুর ওজন = 10 × 9.8 = 98 নিউটন।
যেহেতু স্প্রিং তুলা বস্তুর ওজন মাপে, তাই স্প্রিং তুলায় পাঠ দেখাবে 98 নিউটন।
দ্বিতীয় অংশ: বস্তুটিকে চাঁদে নিয়ে গেলে তার ওজনের পরিবর্তন হবে, কিন্তু ভরের কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ ভর হলো বস্তুতে উপস্থিত পদার্থের পরিমাণ, যা স্থান পরিবর্তনে পাল্টায় না। তাই চাঁদেও বস্তুটির ভর 10 কেজিই থাকবে।