অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় 1.4: আলো, ব্যাখ্যামূলক ও চিত্রসহ প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 1.4: আলো (Light)
(ব্যাখ্যামূলক ও চিত্রসহ প্রশ্নোত্তর – 3 নম্বর)

1. আলোর প্রতিফলনের (Reflection of light) সূত্র দুটি লেখো এবং চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: আলোর প্রতিফলনের দুটি সূত্র হলো:

প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলকের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে অবস্থান করে।
দ্বিতীয় সূত্র: আপতন কোণ (i) এবং প্রতিফলন কোণের (r) মান সর্বদা সমান হয়। অর্থাৎ, ∠i = ∠r

চিত্রের ব্যাখ্যা: চিত্রে একটি সমতল দর্পণ বা আয়না দেখানো হয়েছে। দর্পণের ওপর যে আলোকরশ্মি এসে পড়ছে তাকে আপতিত রশ্মি এবং যে রশ্মিটি দর্পণ থেকে ফিরে যাচ্ছে তাকে প্রতিফলিত রশ্মি বলে। আপতন বিন্দুতে দর্পণের ওপর একটি লম্ব বা অভিলম্ব টানা হয়েছে। আপতিত রশ্মি অভিলম্বের সাথে যে কোণ (i) করে, প্রতিফলিত রশ্মিও অভিলম্বের সাথে ঠিক একই কোণ (r) করে দর্পণ থেকে ফিরে যায়।

2. আলোর প্রতিসরণ (Refraction of light) কাকে বলে? এর সূত্র দুটি বিবৃত করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: প্রতিসরণ: আলোকরশ্মি যখন একটি স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য একটি ভিন্ন ঘনত্বের স্বচ্ছ মাধ্যমে তীর্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতলে আলোর গতিপথের অভিমুখ পরিবর্তিত হয় বা আলোকরশ্মি বেঁকে যায়। আলোর দিক পরিবর্তনের এই ঘটনাকেই আলোর প্রতিসরণ বলে।

প্রতিসরণের সূত্রাবলি:
প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমের বিভেদতলের ওপর অঙ্কিত অভিলম্ব সর্বদা একই সমতলে থাকে।
দ্বিতীয় সূত্র (স্নেলের সূত্র): দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর ক্ষেত্রে, আপতন কোণের সাইন (sine) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইন (sine)-এর অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক হয়।

3. আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) কাকে বলে? এটি ঘটার দুটি প্রধান শর্ত লেখো।

[Image illustrating critical angle and total internal reflection as light moves from a denser medium to a rarer medium]

উত্তর দেখো

উত্তর: আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন: আলোকরশ্মি যখন ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে যাওয়ার সময়, ঘন মাধ্যমে আপতন কোণের মান মাধ্যমদ্বয়ের সংকট কোণের (Critical angle) চেয়ে বড় হয়, তখন আলোকরশ্মি দ্বিতীয় মাধ্যমে (লঘু মাধ্যমে) প্রতিসৃত না হয়ে, দুই মাধ্যমের বিভেদতল থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়ে আবার প্রথম মাধ্যমে (ঘন মাধ্যমে) ফিরে আসে। আলোর এই ঘটনাকে আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন বলে।

শর্তাবলি:
1. আলোকরশ্মিকে সর্বদা ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমের দিকে যেতে হবে।
2. ঘন মাধ্যমে আপতন কোণের মান মাধ্যম দুটির সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে হবে।

4. মরুভূমিতে মরীচিকা (Mirage) সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক কারণ চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: মরুভূমিতে মরীচিকা সৃষ্টির মূল কারণ হলো আলোর আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন

গ্রীষ্মকালে মরুভূমির বালি প্রচণ্ড গরম হয়ে যায়। ফলে বালির ঠিক ওপরের বায়ুস্তর সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত ও হালকা (লঘু মাধ্যম) হয় এবং ওপরের দিকের বায়ুস্তর ক্রমশ অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও ঘন (ঘন মাধ্যম) থাকে।
কোনো দূরবর্তী গাছ বা আকাশ থেকে আসা আলোকরশ্মি যখন ঘন বায়ুস্তর থেকে ক্রমশ লঘু বায়ুস্তরের দিকে এগোতে থাকে, তখন প্রতিসরণের দরুন রশ্মি অভিলম্ব থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায়। এভাবে একসময় আপতন কোণের মান বায়ুস্তর দুটির সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। তখন ওই আলোকরশ্মির আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে এবং তা ওপরের দিকে বেঁকে দর্শকের চোখে পৌঁছায়।
দর্শক ওই প্রতিফলিত রশ্মিকে পেছনের দিকে বর্ধিত করলে গাছের বা আকাশের একটি উল্টো ও অসদ প্রতিবিম্ব বালির ওপর দেখতে পান। একেই মনে হয় যেন সেখানে কোনো জলাশয় আছে, যা আসলে একটি দৃষ্টিবিভ্রম বা মরীচিকা।

5. পেরিস্কোপ (Periscope) যন্ত্রের গঠন ও কার্যপ্রণালী সংক্ষেপে বর্ণনা করো। এর একটি ব্যবহার লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
গঠন ও কার্যপ্রণালী: পেরিস্কোপ মূলত একটি লম্বা Z-আকৃতির নল, যার দুই প্রান্তে দুটি সমতল দর্পণ বা আয়না লাগানো থাকে। আয়না দুটি নলের অক্ষের সাথে 45° কোণে এবং পরস্পরের সাথে সমান্তরালভাবে বসানো থাকে।
কোনো উঁচু বা আড়াল থাকা বস্তু থেকে আলোকরশ্মি নলের ওপরের খোলা মুখ দিয়ে প্রবেশ করে প্রথম আয়নায় 45° আপতন কোণে পড়ে এবং 45° প্রতিফলন কোণে প্রতিফলিত হয়ে নলের ভেতর দিয়ে সোজা নিচের দিকে নেমে আসে। এরপর সেই আলোকরশ্মি নিচের দ্বিতীয় আয়নায় আবার 45° কোণে আপতিত হয়ে প্রতিফলিত হয় এবং দর্শকের চোখে পৌঁছায়। ফলে দর্শক আড়ালে বা নিচে থেকেও ওপরের বস্তুটিকে দেখতে পান।

ব্যবহার: সাবমেরিন থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে থাকা শত্রু জাহাজ বা অন্য কোনো বস্তুর গতিবিধি নিরাপদে পর্যবেক্ষণ করার জন্য পেরিস্কোপ ব্যবহার করা হয়।

6. সমতল দর্পণে একটি বিন্দু উৎসের অসদ প্রতিবিম্ব কীভাবে গঠিত হয় তা চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
প্রতিবিম্ব গঠন: ধরি, একটি সমতল দর্পণের সামনে একটি বিন্দু উৎস (Object) রাখা আছে। ওই বিন্দু থেকে অসংখ্য আলোকরশ্মি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে দুটি আপতিত রশ্মি দর্পণের ওপর পড়লে, তারা প্রতিফলনের সূত্র (আপতন কোণ = প্রতিফলন কোণ) মেনে দর্পণ থেকে প্রতিফলিত হয়ে দর্শকের চোখে পৌঁছায়।
এই প্রতিফলিত রশ্মি দুটিকে যদি পেছনের দিকে কাল্পনিকভাবে বর্ধিত করা হয়, তবে মনে হয় যেন তারা দর্পণের পেছনের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে আসছে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুটিই হলো ওই বিন্দু উৎসের অসদ প্রতিবিম্ব (Virtual Image)। এটি অসদ কারণ আলোকরশ্মিগুলি বাস্তবে ওই বিন্দুতে মিলিত হয় না, কেবল মিলিত হচ্ছে বলে মনে হয়।

7. ক্যালিডোস্কোপ (Kaleidoscope) যন্ত্রের গঠন ও কার্যপ্রণালী সংক্ষেপে বর্ণনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
গঠন: ক্যালিডোস্কোপ হলো সমতল দর্পণের বহুমুখী প্রতিফলনের নীতিতে তৈরি একটি মজার খেলনা। এতে একই মাপের 3 টি আয়তাকার সমতল দর্পণকে 60° কোণে যুক্ত করে একটি ফাঁপা প্রিজম বা সমবাহু ত্রিভুজের মতো আকার দেওয়া হয়। এই দর্পণ-প্রিজমটিকে একটি পিচবোর্ডের নলের ভেতর ঢোকানো হয়। নলের এক প্রান্তে একটি ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা থাকে এবং অন্য প্রান্তে দুটি কাঁচের মাঝে কিছু রঙিন কাঁচের বা প্লাস্টিকের টুকরো রাখা হয়।
কার্যপ্রণালী: ছিদ্র দিয়ে ভেতরের দিকে তাকালে, রঙিন টুকরোগুলির আলো 3 টি দর্পণে বারবার প্রতিফলিত হয়। এর ফলে টুকরোগুলির অসংখ্য প্রতিবিম্ব তৈরি হয় এবং একটি সুন্দর, প্রতিসম জ্যামিতিক নকশা (Symmetrical pattern) দেখা যায়। যন্ত্রটি ঘোরালে টুকরোগুলির অবস্থান পাল্টে যায় এবং প্রতিবার নতুন নতুন নকশা তৈরি হয়।

8. একটি আয়তাকার কাঁচের স্ল্যাবের (Glass slab) মধ্য দিয়ে আলোর প্রতিসরণ চিত্রসহ আলোচনা করো। আপতিত রশ্মি ও নির্গত রশ্মির অভিমুখ কেমন হয়?

উত্তর দেখো

উত্তর:
প্রতিসরণ প্রক্রিয়া: যখন একটি আলোকরশ্মি বাতাস (লঘু মাধ্যম) থেকে কাঁচের স্ল্যাবে (ঘন মাধ্যম) তীর্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন প্রথম প্রতিসরণের ফলে রশ্মিটি অভিলম্বের দিকে কিছুটা বেঁকে যায়। এরপর কাঁচের ভেতর দিয়ে গিয়ে রশ্মিটি যখন কাঁচ (ঘন মাধ্যম) থেকে আবার বাতাসে (লঘু মাধ্যম) বেরিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় প্রতিসরণের ফলে সেটি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়।
রশ্মির অভিমুখ: আয়তাকার কাঁচের স্ল্যাবের দুই বিপরীত পৃষ্ঠ সমান্তরাল হওয়ায়, প্রথম পৃষ্ঠে আলো যতটা অভিলম্বের দিকে বাঁকে, দ্বিতীয় পৃষ্ঠে ঠিক ততটাই অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। এর ফলে আপতিত রশ্মি এবং নির্গত (Emergent) রশ্মি পরস্পর সমান্তরাল থাকে। তবে আলোকরশ্মি তার মূল পথ থেকে কিছুটা সরে যায়, যাকে পার্শ্বসরণ (Lateral shift) বলে।

9. সদ বিম্ব (Real image) ও অসদ বিম্বের (Virtual image) মধ্যে প্রধান তিনটি পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর দেখো

উত্তর: সদ বিম্ব ও অসদ বিম্বের মধ্যে তিনটি মূল পার্থক্য হলো:

1. রশ্মির মিলন: কোনো বিন্দু উৎস থেকে আসা আলোকরশ্মি প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত হওয়ার পর যদি সত্যিই অন্য কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে সদ বিম্ব গঠিত হয়। কিন্তু আলোকরশ্মি যদি বাস্তবে মিলিত না হয়ে অন্য কোনো বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, তবে অসদ বিম্ব গঠিত হয়।
2. পর্দায় গঠন: সদ বিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় (যেমন—ক্যামেরা বা সিনেমার পর্দায় তৈরি ছবি)। কিন্তু অসদ বিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না, এটি কেবল চোখে দেখা যায় (যেমন—আয়নায় আমাদের প্রতিবিম্ব)।
3. প্রকৃতি: সদ বিম্ব সর্বদা বস্তুর সাপেক্ষে উল্টো (অবশীর্ষ) হয়। অন্যদিকে, অসদ বিম্ব সর্বদা বস্তুর সাপেক্ষে সোজা (সমশীর্ষ) হয়।

10. আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) ও সাধারণ প্রতিফলনের (Regular Reflection) মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ও সাধারণ প্রতিফলনের পার্থক্য:

1. শর্ত: আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনের জন্য আলোকে সর্বদা ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমের দিকে যেতে হয় এবং আপতন কোণকে সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে হয়। কিন্তু সাধারণ প্রতিফলনের জন্য মাধ্যমের ঘনত্বের কোনো শর্ত নেই এবং এটি যেকোনো আপতন কোণেই ঘটতে পারে।
2. প্রতিফলক পৃষ্ঠ: সাধারণ প্রতিফলনের জন্য একটি অস্বচ্ছ ও মসৃণ পৃষ্ঠের (যেমন—আয়না) প্রয়োজন। অন্যদিকে, আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন দুটি স্বচ্ছ মাধ্যমের বিভেদতলে (যেমন—কাঁচ ও বায়ু) ঘটে।
3. আলোর তীব্রতা: সাধারণ প্রতিফলনে কিছু পরিমাণ আলো শোষিত বা প্রতিসৃত হয়, তাই প্রতিফলিত আলোর উজ্জ্বলতা কমে যায়। কিন্তু আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলনে 100% আলোই প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, তাই কোনো শক্তির অপচয় হয় না এবং আলো অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার