অষ্টম শ্রেণী: পরিবেশ ও বিজ্ঞান, অধ্যায় – 7 : ‘অণুজীবের জগৎ’ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২

অধ্যায় 7: অণুজীবের জগৎ
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – 2 নম্বর)

1. অণুজীব বা মাইক্রোব (Microbes) কাদের বলা হয়? এদের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: যে সমস্ত জীব এতই ক্ষুদ্র যে তাদের খালি চোখে দেখা যায় না, যাদের দেখতে গেলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (Microscope) প্রয়োজন হয়, তাদের অণুজীব বা মাইক্রোব বলে।
বৈশিষ্ট্য: 1. এরা প্রায় যেকোনো পরিবেশেই (যেমন- বরফের নিচে, উষ্ণ প্রস্রবণে, মরুভূমিতে) বেঁচে থাকতে পারে। 2. প্রতিকূল পরিবেশে এরা নিজেদের চারপাশে শক্ত আবরণ (সিস্ট) তৈরি করে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

[Image comparing a virus to a living cell, showing the virus lacking cellular machinery]

2. ভাইরাসকে (Virus) জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয় কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: ভাইরাসের নিজস্ব কোনো কোশীয় গঠন বা বিপাকীয় ক্ষমতা নেই। এটি যখন অন্য কোনো জীবিত জীবের (Host) দেহের বাইরে থাকে, তখন এটি একটি জড় বস্তুর মতো আচরণ করে। কিন্তু যেই মাত্র এটি কোনো সজীব কোশের ভেতরে প্রবেশ করে, তখন সে সজীব কোশের উপাদান ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে এবং জীবের লক্ষণ প্রকাশ করে। যেহেতু এদের মধ্যে জীব ও জড়— উভয়েরই বৈশিষ্ট্য বর্তমান, তাই এদের জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী পর্যায়ের বস্তু বলা হয়।

3. উপকারী ব্যাকটেরিয়া কাকে বলে? একটি উদাহরণ ও তার কাজ লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া মানুষের বা পরিবেশের রোগ সৃষ্টি না করে বিভিন্নভাবে উপকার করে, তাদের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বলে।
উদাহরণ ও কাজ: ল্যাকটোব্যাসিলাস (Lactobacillus)। এর কাজ হলো দুধের শর্করাকে (ল্যাকটোজ) ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত করে দুধকে দইতে রূপান্তরিত করা।

4. বেকারি শিল্পে পাউরুটি বা কেক তৈরিতে ইস্ট (Yeast) কীভাবে সাহায্য করে?

উত্তর দেখো

উত্তর: পাউরুটি তৈরির ময়দার মণ্ডে ইস্ট মেশালে, ইস্ট ময়দায় থাকা শর্করাকে গেঁজিয়ে (Fermentation বা সন্ধান প্রক্রিয়ায়) অ্যালকোহল এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_2$) গ্যাস উৎপন্ন করে। এই উৎপন্ন হওয়া $CO_2$ গ্যাস ময়দার মণ্ড থেকে বুদবুদ আকারে বেরিয়ে আসার সময় মণ্ডটিকে ফুলিয়ে দেয় এবং পাউরুটি বা কেককে নরম ও ফাঁপা (Spongy) করে তোলে।

5. অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) কী? প্রথম অ্যান্টিবায়োটিকের নাম ও আবিষ্কারকের নাম লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: অ্যান্টিবায়োটিক: কিছু অণুজীব (যেমন- ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া) থেকে নিঃসৃত যে রাসায়নিক পদার্থ অন্য রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াদের বৃদ্ধি আটকে দেয় বা তাদের মেরে ফেলে রোগ নিরাময় করে, তাকে অ্যান্টিবায়োটিক বলে।
প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক: পেনিসিলিন (Penicillin)।
আবিষ্কারক: বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (Alexander Fleming)।

6. রাইজোবিয়াম (Rhizobium) ব্যাকটেরিয়া কীভাবে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে?

উত্তর দেখো

উত্তর: রাইজোবিয়াম হলো একটি মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া, যা মটর, ছোলা বা শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে অর্বুদ (Nodule) তৈরি করে বসবাস করে। এরা বাতাস থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন ($N_2$) গ্যাস শোষণ করে তাকে নাইট্রোজেন ঘটিত যৌগে পরিণত করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। এর ফলে মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ে এবং মাটির উর্বরতা প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

7. পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization) পদ্ধতি কী? এটি কেন করা হয়?

উত্তর দেখো

উত্তর: পদ্ধতি: যে পদ্ধতিতে তরল খাদ্যকে (প্রধানত দুধ) নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (যেমন $70^\circ C$-এ 15-30 সেকেন্ড বা $60^\circ C$-এ 30 মিনিট) গরম করে হঠাৎ খুব ঠান্ডা করে নেওয়া হয়, তাকে পাস্তুরাইজেশন বলে। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর এটি আবিষ্কার করেন।
কারণ: এই হঠাৎ গরম ও ঠান্ডা করার ফলে দুধের ভেতরে থাকা ক্ষতিকারক জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া মারা যায় এবং দুধ দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

8. বিয়োজক (Decomposers) কাদের বলা হয় এবং কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: পরিবেশে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাককে বিয়োজক বলা হয়।
কারণ: এরা উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ এবং বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থের ওপর পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলির জটিল জৈব উপাদানকে ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে মাটিতে বা পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়। এর ফলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকে এবং মাটির পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।

9. ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গি রোগের জীবাণু (Pathogen) এবং তাদের বাহকের (Vector) নাম লেখো।

উত্তর দেখো
রোগের নাম জীবাণুর নাম (Pathogen) বাহকের নাম (Vector)
ম্যালেরিয়া (Malaria) প্লাজমোডিয়াম (আদ্যপ্রাণী) স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা
ডেঙ্গি (Dengue) ডেঙ্গি ভাইরাস (ফ্ল্যাভি ভাইরাস) স্ত্রী এডিস মশা

10. খাদ্য সংরক্ষণে (Food preservation) নুন (Salt) এবং শর্করার (Sugar) ভূমিকা কী?

উত্তর দেখো

উত্তর: মাছ, মাংস, আচার বা জ্যাম-জেলির মতো খাবারে প্রচুর পরিমাণে নুন বা চিনির রস ব্যবহার করলে অভিস্রবণ (Osmosis) প্রক্রিয়ায় জীবাণুর (ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক) কোশ থেকে জল বেরিয়ে যায়। এর ফলে কোশটি চুপসে গিয়ে (প্লাজমোলাইসিস) জীবাণুটি মারা যায় এবং খাবার দীর্ঘদিন পচে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।

[Image comparing Fungi (like mushrooms or mold) which lack chlorophyll, and Algae which are green and photosynthetic]

11. ছত্রাক (Fungi) ও শৈবালের (Algae) মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
1. ক্লোরোফিলের উপস্থিতি: ছত্রাকের দেহে ক্লোরোফিল থাকে না, কিন্তু শৈবালের দেহে ক্লোরোফিল বর্তমান।
2. পুষ্টির ধরন: ক্লোরোফিল না থাকায় ছত্রাক নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না, এরা পরভোজী (মৃতজীবী বা পরজীবী)। অন্যদিকে, শৈবাল নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে, তাই এরা স্বভোজী।

12. মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী দুটি ভাইরাস ও দুটি ব্যাকটেরিয়ার নাম লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর:
রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস: 1. পোলিও ভাইরাস (পোলিও রোগ সৃষ্টি করে), 2. ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস (সর্দি-জ্বর সৃষ্টি করে)।
রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া: 1. ভিব্রিও কলেরি (কলেরা রোগ সৃষ্টি করে), 2. মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (যক্ষ্মা বা টিবি রোগ সৃষ্টি করে)।

13. অবায়বীয় অণুজীব (Anaerobic microbes) এবং বায়বীয় অণুজীব (Aerobic microbes) বলতে কী বোঝো?

উত্তর দেখো

উত্তর:
1. অবায়বীয় অণুজীব: যে সমস্ত অণুজীব বেঁচে থাকার জন্য বাতাসের মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না (অর্থাৎ অক্সিজেন ছাড়াই বাঁচতে পারে), তাদের অবায়বীয় অণুজীব বলে। (যেমন- টিটেনাস ব্যাকটেরিয়া)।
2. বায়বীয় অণুজীব: যে সমস্ত অণুজীব বাতাসের মুক্ত অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাদের বায়বীয় অণুজীব বলে।

14. টিকা বা ভ্যাকসিন (Vaccine) কী? এটি শরীরে কীভাবে কাজ করে?

উত্তর দেখো

উত্তর: ভ্যাকসিন: কোনো নির্দিষ্ট রোগের মৃত বা অত্যন্ত দুর্বল জীবাণু (বা জীবাণুর অংশ) যখন ওষুধ হিসেবে সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে ওই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা হয়, তখন তাকে টিকা বা ভ্যাকসিন বলে।
কাজ: দুর্বল জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ফলে ভবিষ্যতে ওই রোগের শক্তিশালী জীবাণু আক্রমণ করলে, শরীর আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় সহজেই তাকে ধ্বংস করতে পারে।

15. আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া (Protozoa) কাদের বলে? দুটি উদাহরণ দাও।

উত্তর দেখো

উত্তর: যে সমস্ত অণুজীব এককোষী, যাদের কোশে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে (ইউক্যারিওটিক) এবং যারা মূলত প্রাণীসুলভ পুষ্টি সম্পন্ন করে (অর্থাৎ নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না), তাদের আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া বলে।
উদাহরণ: 1. অ্যামিবা (Amoeba) এবং 2. প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium – ম্যালেরিয়ার জীবাণু)।


অধ্যায় 7: অণুজীবের জগৎ
(আরও 5টি প্রয়োগমূলক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – 2 নম্বর)

16. ব্যাকটেরিওফাজ (Bacteriophage) বা ফাজ ভাইরাস কাকে বলে? এর একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর দেখো

উত্তর: সংজ্ঞা: ‘ফাজ’ (Phage) কথার অর্থ হলো ভক্ষক বা যে খেয়ে ফেলে। যে সমস্ত ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার দেহে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত ওই ব্যাকটেরিয়াকেই ধ্বংস করে বা খেয়ে ফেলে, তাদের ব্যাকটেরিওফাজ বলে।
উদাহরণ: $T_2$ ফাজ, $T_4$ ফাজ। গঙ্গার জলে এই ব্যাকটেরিওফাজ থাকে বলেই গঙ্গার জল সহজে নষ্ট হয় না।

17. ডেঙ্গি বা সাধারণ সর্দিকাশির মতো ভাইরাসঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) ওষুধ কাজ করে না কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ মূলত ব্যাকটেরিয়ার কোশপ্রাচীর তৈরি হতে বাধা দেয় বা ব্যাকটেরিয়ার বিপাকীয় কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে তাদের মেরে ফেলে। কিন্তু ভাইরাসের নিজস্ব কোনো কোশীয় গঠন, কোশপ্রাচীর বা বিপাকীয় প্রক্রিয়া নেই। এরা সজীব কোশে ঢুকে সেই কোশের উপাদান ব্যবহার করে। তাই ভাইরাসকে মারার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো লক্ষ্যবস্তু থাকে না এবং এটি ভাইরাসের ওপর কোনো কাজ করতে পারে না।

18. লাইকেন (Lichen) কী? এটি মিথোজীবিতার (Symbiosis) কীরূপ উদাহরণ?

উত্তর দেখো

উত্তর: লাইকেন: শৈবাল এবং ছত্রাক যখন একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সহাবস্থান করে একটি নতুন উদ্ভিদদেহ গঠন করে, তখন তাকে লাইকেন বলে (যেমন গাছের ছালে দেখা যায়)।
মিথোজীবিতা: এটি মিথোজীবিতার একটি সুন্দর উদাহরণ। এখানে ছত্রাক মাটি থেকে জল ও খনিজ লবণ শোষণ করে শৈবালকে দেয়। আর শৈবাল তার ক্লোরোফিলের সাহায্যে সেই জল ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে এবং সেই খাদ্যের কিছু অংশ ছত্রাককে দেয়। ফলে দুজনেই উপকৃত হয়।

19. মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এমন দুটি স্বাধীনজীবী অণুজীবের নাম লেখো।

উত্তর দেখো

উত্তর: রাইজোবিয়াম উদ্ভিদের মূলে বাস করে, কিন্তু কিছু অণুজীব স্বাধীনভাবে মাটিতে বাস করেও বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এরকম দুটি স্বাধীনজীবী অণুজীব হলো:
1. অ্যাজোটোব্যাক্টর (Azotobacter) – স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়া।
2. অ্যানাবিনা (Anabaena) বা নস্টক – নীলাভ সবুজ শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া।

20. অণুজীবদের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে দেখার জন্য বিভিন্ন রঙের রঞ্জক (Stain) ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর দেখো

উত্তর: বেশিরভাগ অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া বা প্রোটোজোয়া) বর্ণহীন এবং প্রায় স্বচ্ছ হয়। তাই সাধারণ আলোর অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে এদের রাখলে ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে এদের আলাদা করে চেনা বা এদের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গাণু পরিষ্কার করে দেখা খুব কঠিন। রঞ্জক বা Stain (যেমন- মিথিলিন ব্লু, স্যাফ্রানিন) ব্যবহার করলে অণুজীবের নির্দিষ্ট কিছু অংশ সেই রং গ্রহণ করে রঙিন হয়ে ওঠে, ফলে তাদের আকার ও গঠন খুব স্পষ্ট দেখা যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার