অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 1: ইতিহাসের ধারণা, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় ১: ইতিহাসের ধারণা
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৩)

নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

1. জেমস মিল কীভাবে ভারতের ইতিহাসকে যুগ বিভাজন করেছেন? তাঁর এই বিভাজনের প্রধান ত্রুটি কী ছিল?

উত্তর দেখো
যুগ বিভাজন: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল তাঁর ‘A History of British India’ গ্রন্থে ভারতের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করেছেন— হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ এবং ব্রিটিশ যুগ।

যুগ বিভাজনের ত্রুটি: জেমস মিলের এই যুগ বিভাজনটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং ত্রুটিপূর্ণ। এর প্রধান ত্রুটিগুলি হলো:

  • ধর্মীয় ভিত্তি: তিনি কেবলমাত্র শাসকের ধর্মের ভিত্তিতে যুগ বিভাজন করেছিলেন, যা ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী।
  • ঐতিহাসিক বিকৃতি: প্রাচীন ভারতে শুধু হিন্দু নয়, বৌদ্ধ ও জৈন শাসকরাও ছিলেন। আবার মধ্যযুগেও বহু স্বাধীন হিন্দু রাজবংশ ছিল। মিল এই বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।
  • সাম্প্রদায়িকতা: তাঁর এই বিভাজন ভারতবাসীর মনে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বীজ বপন করেছিল।

2. আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে ‘সরকারি নথিপত্র’-এর গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
গুরুত্ব: আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো সরকারি নথিপত্র (যেমন- চিঠিপত্র, পুলিশ ও গোয়েন্দা রিপোর্ট, প্রশাসনিক নির্দেশিকা)। এগুলি থেকে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন নীতি, আইনকানুন, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।

সীমাবদ্ধতা: সরকারি নথিপত্রের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলি সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি। এই রিপোর্টগুলিতে প্রায়শই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কার্যকলাপকে ‘বিদ্রোহ’ বা ‘অপরাধ’ হিসেবে খাটো করে দেখানো হতো। তাই এই নথিপত্রগুলি ব্যবহারের সময় ঐতিহাসিকদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়।

3. আধুনিক ইতিহাস চর্চায় আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব কী? এগুলি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?

উত্তর দেখো
গুরুত্ব: সরকারি নথিপত্রে যে ইতিহাস শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে চাপা পড়ে যায়, তা অনেক সময় আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা (যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’, বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’) থেকে উঠে আসে। এগুলি থেকে সমকালীন সমাজের রীতিনীতি, রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনার এক জীবন্ত দলিল পাওয়া যায়।

সতর্কতা: আত্মজীবনী হলো ব্যক্তির নিজস্ব অনুভূতির প্রকাশ। তাই এতে অনেক সময় আত্মপক্ষ সমর্থন, অতিরঞ্জন বা ব্যক্তিগত আবেগ মিশে থাকে। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকদের অন্য প্রামাণ্য তথ্যের সাথে মিলিয়ে তবেই আত্মজীবনীর তথ্যগুলিকে গ্রহণ করা উচিত।

4. ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে ফটোগ্রাফ বা ছবির ব্যবহার কতটা যুক্তিযুক্ত?

উত্তর দেখো
ইতিহাস রচনার আধুনিক উপাদান হিসেবে ফটোগ্রাফ বা ছবির গুরুত্ব অপরিসীম।

  • বাস্তব প্রমাণ: ছবি থেকে সমসাময়িক কালের কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, সাধারণ মানুষের পোশাক ও জীবনযাত্রার চাক্ষুষ ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
  • লিখিত উপাদানের পরিপূরক: অনেক সময় সরকারি নথিতে যা লুকানো থাকে, একটি ছবি সেই প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জের ছবি সরকারি রিপোর্টের মিথ্যা দাবিকে ফাঁস করে দিতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, ছবিকেও অনেক সময় বিকৃত (Edited) করা হতে পারে বা ফটোগ্রাফার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কোণ থেকে ছবি তুলতে পারেন। তাই ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

5. জওহরলাল নেহ্‌রু তাঁর কন্যা ইন্দিরাকে যে চিঠিগুলি লিখেছিলেন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।

উত্তর দেখো
১৯২৮ সালের গ্রীষ্মকালে জওহরলাল নেহ্‌রু এলাহাবাদে এবং তাঁর দশ বছরের কন্যা ইন্দিরা মুসৌরিতে ছিলেন। সেই সময় তিনি কন্যাকে পৃথিবীর উৎপত্তি ও মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে ইংরেজিতে বেশ কিছু চিঠি লেখেন, যা পরে ‘Letters from a Father to his Daughter’ নামে প্রকাশিত হয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই চিঠিগুলিতে খুব সহজ ও সাবলীল ভাষায় পৃথিবীর জন্ম, আদিম মানুষের জীবনযাপন, ভাষা ও লিপির আবিষ্কার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গঠন এবং সভ্যতার বিবর্তনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। জটিল ঐতিহাসিক তথ্যকে কীভাবে গল্পের ছলে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, এই চিঠিগুলি তারই এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।

6. আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থটির গুরুত্ব কী?

উত্তর দেখো
বিপিনচন্দ্র পালের অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’ আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

  • পল্লি বাংলার চিত্র: এই গ্রন্থ থেকে উনিশ শতকের শেষভাগে শ্রীহট্টের (বর্তমান সিলেট) পল্লি বাংলার সমাজজীবন, সাধারণ মানুষের রীতিনীতি ও ধর্মবিশ্বাসের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায়।
  • ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাব: তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজে ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাব এবং রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের সঙ্গে তাদের সংঘাতের কথা এখানে ফুটে উঠেছে।
  • স্বদেশি আন্দোলন: বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং চরমপন্থী রাজনীতির উন্মেষের ঐতিহাসিক তথ্য এই বই থেকে জানা যায়।

7. ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’-র মূল্যায়ন করো।

উত্তর দেখো
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘জীবনস্মৃতি’ শুধুমাত্র একটি সাহিত্যিক আত্মজীবনী নয়, এটি সেকালের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।

  • ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল: এই গ্রন্থ থেকে উনিশ শতকের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের কঠোর নিয়মকানুন, শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায়।
  • স্বাদেশিকতার উন্মেষ: ‘হিন্দুমেলা’ বা ‘সঞ্জীবনী সভা’-র মতো গুপ্ত সমিতির কার্যকলাপ এবং তৎকালীন শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের মনে কীভাবে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটছিল, তার বাস্তব বিবরণ এই গ্রন্থে রয়েছে।
  • সমাজের রূপান্তর: পুরোনো চিন্তাধারা ভেঙে কীভাবে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বাঙালি সমাজ বদলাচ্ছিল, তার ঐতিহাসিক প্রমাণ এই গ্রন্থে সুরক্ষিত রয়েছে।

8. সরলাদেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থটি থেকে তৎকালীন ভারতের কী ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়?

উত্তর দেখো
সরলাদেবী চৌধুরানীর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আধুনিক ভারতের, বিশেষত নারীদের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য উপাদান।

  • নারী সমাজের জাগরণ: ঠাকুরবাড়ির রক্ষণশীল ঘেরাটোপ পেরিয়ে নারীদের বাইরে আসা, শিক্ষালাভ এবং তৎকালীন সমাজে নারীদের অবহেলিত অবস্থা থেকে উত্তরণের চিত্র এখানে পাওয়া যায়।
  • জাতীয়তাবাদী আন্দোলন: সরলাদেবী কীভাবে ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’, ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ ও ‘উদয়াদিত্য উৎসব’-এর মাধ্যমে বাংলার যুবসমাজের মনে শরীরচর্চা ও বীরপূজার মাধ্যমে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিলেন, তার রোমাঞ্চকর তথ্য এই বইয়ে রয়েছে।
  • স্বদেশি যুগে নারীদের ভূমিকা: বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বাংলার নারীদের সাহসিকতা এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে সরলাদেবীর যোগাযোগের নানা অজানা তথ্য এই গ্রন্থ থেকে জানা যায়।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার