অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায়– 2: ‘আঞ্চলিক শক্তির উত্থান’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3
অধ্যায় ২: আঞ্চলিক শক্তির উত্থান
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৩)
নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:
1. ফারুকশিয়ারের ফরমানের (1717) প্রধান শর্ত বা অধিকারগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
- বিনা শুল্কে বাণিজ্য: কোম্পানি বার্ষিক মাত্র 3,000 টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার ছাড়পত্র বা ‘দস্তক’ লাভ করে।
- ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা: কোম্পানির কোনো পণ্য চুরি গেলে বাংলার নবাব তা উদ্ধার করে দেবেন অথবা কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেবেন।
- জমিদারি ও টাকশাল: কোম্পানিকে কলকাতার আশেপাশে আরও 38টি গ্রাম কেনার অধিকার দেওয়া হয় এবং তারা মুর্শিদাবাদের নবাবের টাকশাল ব্যবহারের অনুমতি পায়।
2. ‘দস্তক’-এর অপব্যবহার কীভাবে বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে বিরোধের পটভূমি তৈরি করেছিল?
উত্তর দেখো
কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা অত্যন্ত লোভী হয়ে ওঠে এবং তারা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও এই দস্তকের অপব্যবহার শুরু করে। এর ফলে একদিকে দেশীয় বণিকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে এবং অন্যদিকে বাংলার নবাবের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হতে থাকে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এর তীব্র প্রতিবাদ করলে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর চরম সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
3. দাক্ষিণাত্যে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে কর্ণাটকের যুদ্ধের মূল কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
- বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা: ভারতের লাভজনক বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার কায়েম করা নিয়ে দুই ইউরোপীয় কোম্পানির মধ্যে তীব্র রেষারেষি ছিল।
- রাজনৈতিক আধিপত্য: মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদ ও কর্ণাটক রাজ্যের উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে উভয় কোম্পানি দুই ভিন্ন পক্ষকে সামরিক সমর্থন দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়াতে চেয়েছিল।
- ইউরোপীয় সংঘাত: ইউরোপে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যে রাজনৈতিক শত্রুতা ছিল, ভারতেও তার প্রভাব পড়েছিল।
4. নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজদের বিবাদের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
- দস্তকের অপব্যবহার: ইংরেজ কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তকের অপব্যবহার করে নবাবের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি করছিল।
- দুর্গ নির্মাণ: নবাবের নিষেধ অমান্য করে ইংরেজরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।
- কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: নবাবের অবাধ্য ও তছরুপকারী প্রজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে ইংরেজরা প্রচুর ধনসম্পদসহ কলকাতায় আশ্রয় দেয় এবং নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়।
5. ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) কী? এই ঘটনার ঐতিহাসিক ভিত্তি কতটা?
উত্তর দেখো
ঐতিহাসিক ভিত্তি: আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে এই ঘটনাটি ছিল চরম অতিরঞ্জিত এবং কাল্পনিক। এত ছোটো একটি ঘরে 146 জন মানুষকে আটকে রাখা কার্যত অসম্ভব। মূলত নবাবকে নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী প্রমাণ করে ইংরেজদের বাংলা দখলের ষড়যন্ত্রকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই মিথ্যে কাহিনি প্রচার করা হয়েছিল।
6. আলিনগরের সন্ধির (1757) প্রধান শর্ত ও তার গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর দেখো
শর্ত: এই সন্ধির মাধ্যমে নবাব ইংরেজদের সমস্ত বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা ও হারানো সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন। এছাড়া ইংরেজরা ক্ষতিপূরণ লাভ করে এবং কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ ও নিজস্ব মুদ্রা তৈরির অধিকার পায়।
গুরুত্ব: এই সন্ধির ফলে বাংলার নবাবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা চরমভাবে খর্ব হয় এবং ইংরেজরা বাংলায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়।
7. ‘পলাশীর লুণ্ঠন’ (Plunder of Plassey) বলতে কী বোঝায়? বাংলার অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়েছিল?
উত্তর দেখো
প্রভাব: এই সীমাহীন লুণ্ঠনের ফলে বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। রাজকোষ শূন্য হয়ে যায় এবং সাধারণ কৃষক ও কারিগররা চরম দারিদ্র্যের মুখে এসে দাঁড়ায়।
8. নবাব মীরকাশিম কেন রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেছিলেন?
উত্তর দেখো
- ইংরেজদের প্রভাব মুক্ত হওয়া: মুর্শিদাবাদে ইংরেজদের গোয়েন্দাগিরি এবং প্রশাসনের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। মীরকাশিম স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার জন্যই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।
- সামরিক প্রস্তুতি: মুঙ্গেরে তিনি ইউরোপীয় ধাঁচে নিজের সামরিক বাহিনীকে নতুন করে সংগঠিত করতে শুরু করেন এবং গোপনে আধুনিক অস্ত্র ও কামান তৈরির কারখানাও স্থাপন করেন।
9. বক্সারের যুদ্ধের (1764) প্রধান কারণগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
- বাণিজ্যিক শুল্ক নিয়ে বিবাদ: ইংরেজ কর্মচারীদের দস্তকের অপব্যবহার রোধ করতে মীরকাশিম ভারতীয় বণিকদেরও বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার দেন। ইংরেজরা এই সাম্য মেনে নিতে পারেনি।
- স্বাধীন সামরিক নীতি: মীরকাশিমের রাজধানী মুঙ্গেরে স্থানান্তর এবং ইউরোপীয় কায়দায় সেনাবাহিনী ও অস্ত্র কারখানা তৈরি ইংরেজদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
- বিনা শুল্কের বাণিজ্য নিয়ে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের পাটনা, কাটোয়া ও গিরিয়ায় ছোটোখাটো সংঘর্ষ হয়, যা শেষ পর্যন্ত বক্সারের চূড়ান্ত যুদ্ধের রূপ নেয়।
10. দেওয়ানি লাভ (1765) কীভাবে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি পরিবর্তন করেছিল?
উত্তর দেখো
- আইনি বৈধতা: দেওয়ানি লাভের ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার একটি নিছক বণিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি বাংলার আইনসম্মত শাসকে পরিণত হয়।
- অর্থনৈতিক শোষণ: বাংলার বিপুল রাজস্ব কোম্পানির হস্তগত হয়। কোম্পানি এই টাকা দিয়েই ভারতের অন্যান্য অংশে যুদ্ধ চালাতে এবং ইংল্যান্ডে বিপুল সম্পদ পাচার করতে শুরু করে, ফলে বাংলার অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ে।
11. রবার্ট ক্লাইভ প্রবর্তিত ‘দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা’-র (Dual Government) মূল বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটিগুলি কী ছিল?
উত্তর দেখো
- বৈশিষ্ট্য: এই ব্যবস্থায় শাসন ক্ষমতা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়। কোম্পানির হাতে আসে লাভজনক দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা (দায়িত্বহীন ক্ষমতা)। আর নবাবের হাতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারের মতো ব্যয়বহুল দায়িত্ব (ক্ষমতাহীন দায়িত্ব)।
- ত্রুটি: এই ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি ছিল চরম দায়িত্বহীনতা। বাংলার মানুষের ভালো-মন্দের দিকে না কোম্পানি নজর দিত, না নবাবের কিছু করার ক্ষমতা ছিল। ফলে নায়েব-দেওয়ানদের নির্মম অত্যাচারে বাংলার কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।
12. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (1770) কেন ঘটেছিল? বাংলার জনজীবনে এর কী প্রভাব পড়েছিল?
উত্তর দেখো
প্রভাব: এই মন্বন্তরে না খেতে পেয়ে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় এক কোটি) মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়, বিস্তীর্ণ আবাদি জমি জঙ্গলে পরিণত হয় এবং বাংলার অর্থনীতি এক চরম সংকটের মুখে এসে দাঁড়ায়।
13. 1773 খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্ট (Regulating Act) পাসের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো。
উত্তর দেখো
গুরুত্ব: এই আইনের ফলেই প্রথমবার ভারতে কোম্পানির শাসনের ওপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইনি নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার গভর্নরকে ‘গভর্নর জেনারেল’ পদে উন্নীত করা হয় এবং বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিকে তাঁর অধীনে আনা হয়, যা ভারতে কেন্দ্রীয় ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করে।
14. পিটের ভারত শাসন আইন (1784) কেন প্রণয়ন করা হয়েছিল? এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর দেখো
বৈশিষ্ট্য: এই আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল লন্ডনে একটি ৬ সদস্যের ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল’ (Board of Control) গঠন। কোম্পানির সমস্ত রাজনৈতিক, সামরিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত কাজের চরম নিয়ন্ত্রক হিসেবে এই বোর্ডকে ক্ষমতা দেওয়া হয়।
15. লর্ড ওয়েলেসলির ‘অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি’-র (Subsidiary Alliance) প্রধান শর্তগুলি কী কী ছিল?
উত্তর দেখো
- এই নীতি গ্রহণকারী দেশীয় রাজাকে নিজ রাজ্যে একদল ব্রিটিশ সৈন্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন রাখতে হতো এবং তাদের ব্যয়ভার বহন করতে হতো।
- রাজার দরবারে একজন ব্রিটিশ ‘রেসিডেন্ট’ থাকতেন।
- কোম্পানির বিনা অনুমতিতে রাজা অন্য কোনো রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ বা সন্ধি করতে পারতেন না, অর্থাৎ তাঁর স্বাধীন বৈদেশিক নীতি পুরোপুরি কোম্পানির হাতে চলে যেত।
16. লর্ড ডালহৌসির ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) কীভাবে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিল?
উত্তর দেখো
- এই নীতি অনুযায়ী, কোম্পানির আশ্রিত কোনো দেশীয় রাজা নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে, তিনি কোনো দত্তক পুত্র গ্রহণ করতে পারতেন না।
- রাজার মৃত্যুর পর সেই রাজ্যটি স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়ে যেত।
এই নির্মম নীতির সাহায্যে ডালহৌসি খুব দ্রুত সাতারা, সম্বলপুর, ঝাঁসি, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য দখল করে ভারতের মানচিত্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বহুগুণ বাড়িয়েছিলেন।
17. মহীশূরের শাসক টিপু সুলতান কীভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন?
উত্তর দেখো
- সামরিক সংস্কার: তিনি ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে নিজের সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় কায়দায় আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করে তোলেন।
- অস্ত্র নির্মাণ: মহীশূরে তিনি উন্নত মানের কামান ও বন্দুক তৈরির কারখানা স্থাপন করেন এবং রকেট প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেন।
- বৈদেশিক সাহায্য: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তিনি ফ্রান্স, তুরস্ক এবং আফগানিস্তানের মতো বিদেশি শক্তিগুলির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।
18. রঞ্জিত সিং-এর মৃত্যুর পর কীভাবে শিখ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং ব্রিটিশরা পাঞ্জাব দখল করে?
উত্তর দেখো
শিখ সেনাবাহিনী (খালসা) প্রবল বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করলেও, প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে (1845-46) সেনাপতি লাল সিং ও তেজ সিং-এর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে শিখরা পরাজিত হয় এবং লাহোরের সন্ধি করতে বাধ্য হয়। পরে দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে (1848-49) শিখদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে এবং লর্ড ডালহৌসি সমগ্র পাঞ্জাবকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।