অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 3 ঔপনিবেশিক কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর মান 5
অধ্যায় ৩: ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনকে সুসংগঠিত করতে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘সিভিল সার্ভিস’ এবং ‘পুলিশি ব্যবস্থা’-র পরিচয় দাও।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে সুদৃঢ় ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য লর্ড কর্নওয়ালিস প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তিনি মূলত সিভিল সার্ভিস বা অসামরিক প্রশাসন এবং পুলিশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করেছিলেন।
সিভিল সার্ভিস (Civil Service) ব্যবস্থা:
- দুর্নীতি দমন: কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং ঘুষ নেওয়ার ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কর্নওয়ালিস ব্যক্তিগত বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেন এবং কর্মচারীদের বেতন বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি করে প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করার চেষ্টা করেন।
- দক্ষ আমলাতন্ত্র: রাজস্ব আদায় এবং শাসনকার্য পরিচালনার জন্য তিনি একদল দক্ষ, শিক্ষিত ও সৎ আধিকারিক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। যদিও তিনি ভারতীয়দের অবিশ্বাস করতেন, তাই সমস্ত উচ্চপদে কেবল ইউরোপীয়দেরই নিয়োগ করা হতো।
পুলিশি ব্যবস্থা (Police System):
- জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস: আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল জমিদারদের হাতে। কর্নওয়ালিস জমিদারদের হাত থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সরকারি পুলিশ বাহিনী গঠন করেন।
- দারোগা ব্যবস্থা: তিনি প্রতিটি জেলাকে কয়েকটি থানায় (Thana) বিভক্ত করেন। প্রতিটি থানার দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন পুলিশ আধিকারিকের ওপর, যাকে ‘দারোগা’ বলা হতো। দারোগাদের কাজের তদারকির জন্য জেলার ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপসংহার: লর্ড কর্নওয়ালিসের এই সংস্কারগুলির ফলে ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনের একটি শক্ত ভিত তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী প্রায় দেড়শো বছর ব্রিটিশ শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
2. বিচার বিভাগের সংস্কারে ওয়ারেন হেস্টিংস এবং লর্ড কর্নওয়ালিসের ভূমিকা আলোচনা করো। ‘কর্নওয়ালিস কোড’ কী?
উত্তর দেখো
ভূমিকা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর বাংলার প্রাচীন বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। তাই ওয়ারেন হেস্টিংস এবং পরবর্তীকালে লর্ড কর্নওয়ালিস একটি নতুন ও সুসংগঠিত বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
ওয়ারেন হেস্টিংসের সংস্কার:
- তিনি 1772 খ্রিস্টাব্দে প্রতিটি জেলায় দুটি করে আদালত স্থাপন করেন— একটি দেওয়ানি আদালত (রাজস্ব ও সম্পত্তির বিবাদের জন্য) এবং একটি ফৌজদারি আদালত (চুরি, ডাকাতি, খুনের মতো অপরাধের জন্য)।
- নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য কলকাতায় ‘সদর দেওয়ানি আদালত’ এবং ‘সদর নিজামত আদালত’ প্রতিষ্ঠা করেন।
লর্ড কর্নওয়ালিসের সংস্কার ও কর্নওয়ালিস কোড:
- কর্নওয়ালিস কোড (1793): লর্ড কর্নওয়ালিস কোম্পানির দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়) এবং বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেন। তিনি আইন ও বিচার সংক্রান্ত যে একটি নতুন, সুসংগঠিত এবং লিখিত বিধিমালার সংকলন তৈরি করেন, তাকেই ‘কর্নওয়ালিস কোড’ বলা হয়।
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: এই কোডের ফলে জেলা কালেক্টরদের হাত থেকে বিচারের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। জেলায় ব্রিটিশ বিচারক নিয়োগ করা হয় এবং নিম্ন আদালতে বিচারের জন্য ‘মুনসেফ’ ও ‘সদর আমিন’ নামে ভারতীয় বিচারকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
- আইনের শাসন: তিনি ‘আইনের শাসন’ বা Rule of Law প্রতিষ্ঠা করেন, যার অর্থ হলো প্রশাসন সবার ঊর্ধ্বে নয় এবং আইনের চোখে সকলেই সমান।
উপসংহার: হেস্টিংস ও কর্নওয়ালিসের এই যুগান্তকারী সংস্কারগুলির ফলেই ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য ধাঁচের বিচারব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল, যা বর্তমান ভারতের বিচারব্যবস্থারও আদি রূপ।
3. প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব (Orientalist-Anglicist controversy) বলতে কী বোঝায়? ‘মেকলে মিনিট’ কীভাবে এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছিল?
উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1813 সালের সনদ আইনে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বার্ষিক 1 লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু এই টাকা ভারতীয়দের কোন শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে ব্রিটিশ জনশিক্ষা কমিটির (GCPI) সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদের সৃষ্টি হয়, যা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত।
দ্বন্দ্বের স্বরূপ:
- প্রাচ্যবাদী (Orientalists): এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক প্রমুখ মনে করতেন যে, এই বরাদ্দকৃত অর্থ ভারতের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় শিক্ষা অর্থাৎ সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি শিক্ষার প্রসারেই ব্যয় করা উচিত।
- পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists): অন্যদিকে লর্ড মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ, স্যান্ডার্স প্রমুখ জোরালো দাবি করেন যে, এই অর্থ কেবল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করতে হবে।
মেকলে মিনিট (Macaulay Minute, 1835) ও দ্বন্দ্বের অবসান:
- 1835 সালের 2 ফেব্রুয়ারি জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে প্রাচ্য শিক্ষার তীব্র সমালোচনা করে একটি প্রস্তাব পেশ করেন, যা ‘মেকলে মিনিট’ নামে পরিচিত।
- তিনি যুক্তি দেন যে, ইউরোপীয় জ্ঞানের তুলনায় প্রাচ্যের জ্ঞান নিতান্তই তুচ্ছ। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল অনুগত ভারতীয় তৈরি করা যারা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচিতে ও চিন্তাধারায় ইংরেজ হবে।
- গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মেকলের এই যুক্তি মেনে নেন এবং 1835 সালের 7 মার্চ সরকারি নির্দেশিকা জারি করে ঘোষণা করেন যে, সরকারের শিক্ষা তহবিলের সমস্ত অর্থ কেবল পাশ্চাত্য বা ইংরেজি শিক্ষার প্রসারেই ব্যয় করা হবে।
উপসংহার: মেকলে মিনিটের ফলেই দীর্ঘস্থায়ী এই শিক্ষা দ্বন্দ্বের পাকাপাকি অবসান ঘটে এবং ভারতে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের সরকারি নীতি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।
4. চার্লস উডের ডেসপ্যাচ (Wood’s Despatch, 1854) কী? ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রধান সুপারিশ ও প্রভাবগুলি আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: 1854 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘বোর্ড অব কন্ট্রোল’-এর সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার জন্য একটি সুদীর্ঘ নির্দেশনামা বা প্রস্তাবনা পেশ করেন। ভারতের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে এটি ‘উডের ডেসপ্যাচ’ নামে পরিচিত। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিমূল স্থাপন করার জন্য একে ‘শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা’ বা মহাসনদ বলা হয়।
প্রধান সুপারিশসমূহ:
- শিক্ষা দপ্তর গঠন: শিক্ষাব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রদেশে একজন ডিরেক্টরের অধীনে একটি করে স্বতন্ত্র শিক্ষা দপ্তর (Department of Education) গঠন করতে হবে।
- বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন: উচ্চশিক্ষার প্রসারে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গ্রাম স্তরে দেশীয় ভাষার স্কুল এবং জেলা স্তরে ইংরেজি-বাংলা মিশ্র (অ্যাংলো-ভার্নাকুলার) স্কুল ও কলেজ স্থাপন করতে হবে।
- শিক্ষক শিক্ষণ: শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য নরমাল স্কুল বা শিক্ষক-শিক্ষণ কলেজ স্থাপন করতে হবে।
- নারী শিক্ষা ও অনুদান: নারী শিক্ষার প্রসারে জোর দিতে হবে এবং বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলিকে সরকারি অনুদান (Grant-in-aid) দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রভাব ও গুরুত্ব: উডের ডেসপ্যাচের সুপারিশ মেনেই 1857 সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলেই ভারতে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত ও আধুনিক শিক্ষাকাঠামো গড়ে ওঠে, যা ভারতের আর্থ-সামাজিক জীবনে নবজাগরণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
অধ্যায় ৩: ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
(অতিরিক্ত বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
5. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারি এবং বেসরকারি উদ্যোগের (যেমন- ডেভিড হেয়ার) ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে ভারতে শিক্ষা বিস্তারে আগ্রহী না হলেও, ভারতের বুকে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার আলো জ্বালানোর কাজটি শুরু করেছিলেন মূলত বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি এবং কিছু বেসরকারি শিক্ষানুরাগী মানুষ।
খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা:
- শ্রীরামপুর ত্রয়ী: 1800 খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা দেশীয় ভাষায় প্রচুর স্কুল স্থাপন করেন, ছাপাখানা তৈরি করেন এবং পাঠ্যপুস্তক ও পত্রিকা প্রকাশ করে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী ভূমিকা নেন।
- আলেকজান্ডার ডাফ: স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ 1830 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন’ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
- নারী শিক্ষা: সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং নারী শিক্ষার প্রসারেও মিশনারিরাই প্রথম উদ্যোগী হয়ে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
বেসরকারি উদ্যোগ (ডেভিড হেয়ার):
- পেশায় ঘড়ি প্রস্তুতকারক ডেভিড হেয়ার তাঁর উপার্জিত সমস্ত অর্থ ভারতের শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করেন। 1817 খ্রিস্টাব্দে রাধাকান্ত দেব ও স্যার হাইড ইস্টের সহযোগিতায় তিনি ‘হিন্দু কলেজ’ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ (1817) গঠন করে ছাত্রছাত্রীদের হাতে সস্তায় ও বিনামূল্যে ছাপানো বই তুলে দেন এবং ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’ (1818) স্থাপন করে বহু অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন।
উপসংহার: সরকারি উদ্যোগ শুরু হওয়ার অনেক আগেই এই মিশনারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলি ভারতের বুকে আধুনিক শিক্ষার যে শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছিল, তা পরবর্তীকালে ভারতের সমাজ সংস্কার ও নবজাগরণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
6. ভারতে ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে বৈধতা দিতে বা টিকিয়ে রাখতে ব্রিটিশরা কোন কোন মতাদর্শের (Ideology) সাহায্য নিয়েছিল তা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
ভূমিকা: একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ ভারতকে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি বা পুলিশ দিয়ে চিরকাল শাসন করা সম্ভব নয়, তা ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল। তাই নিজেদের শোষণ ও শাসনকে ভারতীয়দের চোখে ন্যায়সঙ্গত বা বৈধ প্রমাণ করার জন্য তারা সচেতনভাবে বেশ কিছু মতাদর্শ বা তত্ত্বের সাহায্য নিয়েছিল।
ব্রিটিশ প্রশাসনের বিভিন্ন মতাদর্শ:
- প্রাচ্যবাদ (Orientalism): উইলিয়াম জোনস, ওয়ারেন হেস্টিংস প্রমুখ প্রাচ্যবাদীরা মনে করতেন, ভারতের প্রাচীন অতীত অত্যন্ত গৌরবময়। তাই ভারতীয়দের শাসন করতে হলে তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য, আইন, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। এর ফলেই এশিয়াটিক সোসাইটি, সংস্কৃত কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়।
- উপযোগিতাবাদ (Utilitarianism): জেমস মিল ও জেরেমি বেন্থামের এই তত্ত্বের মূল কথা ছিল “সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সর্বোচ্চ সুখ” নিশ্চিত করা। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্রিটিশ প্রশাসকরা দাবি করতেন যে, ভারতের সনাতন সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই সঠিক আইন প্রণয়ন ও কঠোর প্রশাসনের মাধ্যমেই ভারতবাসীকে ‘সুখী’ ও ‘উন্নত’ করা সম্ভব। কর্নওয়ালিস কোড এর একটি বড় উদাহরণ।
- প্যাটার্নালিজম বা পিতৃতান্ত্রিকতা: অনেক ব্রিটিশ প্রশাসক নিজেদের ভারতীয়দের ‘পিতা’ বা অভিভাবক বলে মনে করতেন। তাদের দাবি ছিল, ভারতীয়রা নিজেদের ভালোমন্দ বুঝতে অক্ষম, তাই শিশুদের মতো তাদের পরিচালনার দায়িত্ব ব্রিটিশদের।
- সভ্য করার মিশন (Civilizing Mission): ব্রিটিশরা প্রচার করত যে ইউরোপীয়রা উন্নত ও সভ্য এবং ভারতীয়রা অসভ্য ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তাই ভারতীয়দের ‘সভ্য’ করার এক ঐশ্বরিক দায়িত্ব (White Man’s Burden) ব্রিটিশদের ওপর ন্যস্ত। এই অজুহাতেই তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা ও রীতিনীতি ভারতের ওপর চাপিয়ে দেয়।
উপসংহার: প্রকৃতপক্ষে এই সমস্ত মতাদর্শের আড়ালে ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটিই— ভারতের সম্পদ শোষণ করা এবং নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসনকে ভারতীয়দের মনে একটি ‘প্রয়োজনীয় আশীর্বাদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।