অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র’ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর মান ২
অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র
(সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – মান: 2)
নিচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও:
1. ইজারাদারি ব্যবস্থা (Ijaradari system) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1772 খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস ভূমিরাজস্ব আদায়ের জন্য নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে 5 বছরের জন্য জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার যে প্রথা চালু করেন, তাকে ইজারাদারি বা পাঁচশালা বন্দোবস্ত বলা হয়।
2. দশশালা বন্দোবস্ত (Decennial Settlement) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1789 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলার জমিদারদের 10 বছরের জন্য যে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন, তাকে দশশালা বন্দোবস্ত বলা হয়। পরে 1793 খ্রিস্টাব্দে এটিকেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করা হয়।
3. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) কবে, কে প্রবর্তন করেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1793 খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এর ফলে জমিদাররা একটি নির্দিষ্ট রাজস্বের বিনিময়ে জমির বংশানুক্রমিক ও স্থায়ী মালিকানা লাভ করে।
4. সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি কঠোর নিয়ম ছিল সূর্যাস্ত আইন। এই নিয়ম অনুযায়ী, বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে জমিদারকে কোম্পানির প্রাপ্য রাজস্ব কোষাগারে জমা দিতে হতো; অন্যথায় তার জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে তোলা হতো।
5. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দুটি সুফল লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) কোম্পানির রাজস্ব আয় সুনিশ্চিত হয়, ফলে তাদের বাজেট তৈরিতে সুবিধা হয়। (2) জমিদাররা জমির স্থায়ী মালিকানা পাওয়ায় অনুগত এক নতুন জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি হয়, যারা ব্রিটিশ শাসনের প্রধান সমর্থক হয়ে ওঠে।
6. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের কী ক্ষতি হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কৃষকদের জমির ওপর কোনো অধিকার ছিল না, তারা জমিদারের দয়ানির্ভর প্রজায় পরিণত হয়। জমিদাররা নিজেদের মুনাফা বাড়াতে কৃষকদের ওপর যথেচ্ছ কর ও বেআইনি আবওয়াব চাপিয়ে তাদের চরম শোষণ করত।
7. রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে টমাস মুনরো ও আলেকজান্ডার রিড যে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন, তা রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এতে সরকার জমিদারদের বদলে সরাসরি কৃষকদের (রায়ত) সাথে 20 থেকে 30 বছরের জন্য রাজস্বের চুক্তি করত।
8. মহলওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে হোল্ট ম্যাকেঞ্জির উদ্যোগে যে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, তা মহলওয়ারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এতে কোনো একজন ব্যক্তির বদলে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি ‘মহল’ বা এস্টেটের সাথে সরকার রাজস্বের চুক্তি করত।
9. কৃষির বাণিজ্যকরণ (Commercialization of Agriculture) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ আমলে কৃষকরা নিজেদের খাদ্যশস্য উৎপাদনের বদলে যখন বাজারে বিক্রি ও শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য নগদ অর্থের বিনিময়ে নীল, পাট, তুলো বা চা-এর মতো ফসল চাষ করতে বাধ্য হয়, তখন তাকে কৃষির বাণিজ্যকরণ বলা হয়।
10. দাদন প্রথা (Dadan system) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘দাদন’ কথার অর্থ হলো অগ্রিম অর্থ প্রদান। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা বা দেশীয় মহাজনরা নীল ও পাট চাষ করার জন্য চাষিদের জোর করে যে সামান্য অগ্রিম টাকা দিত, তাকে দাদন প্রথা বলা হতো। এই দাদনের ফাঁদে পড়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হতো।
11. তিনকাঠিয়া প্রথা (Tinkathia system) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিহারের চম্পারণ অঞ্চলে ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা কৃষকদের তাদের মোট জমির অন্তত 3/20 অংশে (অর্থাৎ প্রতি 20 কাঠা বা এক বিঘায় 3 কাঠা জমিতে) নীল চাষ করতে বাধ্য করত। এই শোষণমূলক প্রথাই ‘তিনকাঠিয়া প্রথা’ নামে পরিচিত।
12. দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা (Deccan Riots) কেন হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: কৃষির বাণিজ্যকরণের ফলে তুলো চাষিরা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে এবং দেশীয় মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের জালে জড়িয়ে যায়। এই মহাজনদের চরম শোষণের হাত থেকে বাঁচতেই 1875 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের পুনে ও আহমেদনগরের কৃষকরা যে বিদ্রোহ করেছিল, তা দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা নামে পরিচিত।
13. অবশিল্পায়ন (Deindustrialization) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশদের একতরফা অবাধ বাণিজ্য নীতি এবং ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি সস্তা পণ্যের অসম প্রতিযোগিতার ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কুটিরশিল্পের (বিশেষ করে তাঁতশিল্পের) যে ব্যাপক পতন ও ধ্বংস ঘটেছিল, তাকেই অবশিল্পায়ন বলা হয়।
14. সম্পদের নির্গমন (Drain of Wealth) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে ভারতের বিপুল পরিমাণ অর্থ, কাঁচামাল এবং সম্পদ কোনো রকম বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিদান ছাড়াই ক্রমাগত ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যেত। ঐতিহাসিকরা ভারতের এই একতরফা সম্পদ পাচারকেই সম্পদের নির্গমন বলেছেন।
15. ব্রিটিশ সরকার কেন ভারতে রেলপথ নির্মাণ করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ সরকার প্রধানত দুটি উদ্দেশ্যে ভারতে রেলপথ নির্মাণ করেছিল: (1) অর্থনৈতিক— ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সস্তায় কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছে দেওয়া এবং ব্রিটিশ পণ্য গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া। (2) সামরিক— বিদ্রোহ দমনের জন্য দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো।
16. ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ (Guarantee System) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভারতে রেলপথ নির্মাণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ইংল্যান্ডের বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের বিনিয়োগ করা মূলধনের ওপর সরকার নির্দিষ্ট হারে (বার্ষিক 5 শতাংশ) সুদ দেওয়ার যে নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিয়েছিল, তাকেই ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ বলা হয়।
17. রেলপথ নির্মাণের ফলে ভারতীয়দের কী সুবিধা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থে রেলপথ বানালেও, পরোক্ষভাবে ভারতীয়দের যাতায়াতের ব্যাপক সুবিধা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীকালে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে সাহায্য করেছিল।
18. ‘অবাধ বাণিজ্য নীতি’ (Free Trade Policy) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1813 খ্রিস্টাব্দের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ভারতের বাজার সমস্ত ব্রিটিশ বণিকদের জন্য বিনা শুল্কে বা অতি সামান্য শুল্কে খুলে দেওয়া হয়। এটিই অবাধ বাণিজ্য নীতি নামে পরিচিত, যা ভারতের দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছিল।
19. ব্রিটিশ আমলে বাংলার তাঁতশিল্পের ধ্বংসের দুটি কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) ইংল্যান্ডের কারখানায় যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি সস্তা সুতির কাপড়ের সাথে বাংলার তাঁতিরা পাল্লা দিতে পারেনি। (2) ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক শুল্ক নীতির ফলে ভারতীয় কাপড় ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
20. অবশিল্পায়নের ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: অবশিল্পায়নের ফলে লক্ষ লক্ষ তাঁতি ও কারিগর কর্মহীন হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়, যার ফলে কৃষিজমির ওপর প্রচণ্ড চাপ বাড়ে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
21. ‘সম্পদের নির্গমন’-এর ফলে ভারতের কী ক্ষতি হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভারতের বিপুল সম্পদ কোনো প্রতিদান ছাড়াই ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার ফলে ভারতে চরম মূলধনের ঘাটতি দেখা দেয়। দেশে নতুন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি, উল্টে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও ঘন ঘন দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল।
22. ব্রিটিশরা কেন ভারতে চা ও কফি বাগিচা শিল্পে বিনিয়োগ করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বাজারে চা ও কফির প্রবল চাহিদা ছিল। ভারতের মাটি ও জলবায়ু এই চাষের পক্ষে উপযুক্ত হওয়ায়, সস্তায় দেশীয় শ্রমিক খাটিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশরা বাগিচা শিল্পে বিনিয়োগ করেছিল।
23. ‘নীল বিদ্রোহ’ (Indigo Rebellion) কেন হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা লাভজনক নীল চাষের জন্য কৃষকদের জোর করে দাদন বা অগ্রিম টাকা দিত এবং চরম অত্যাচার চালাত। এই অমানবিক শোষণ ও অলাভজনক নীল চাষের হাত থেকে বাঁচতেই 1859-60 খ্রিস্টাব্দে বাংলার কৃষকরা নীল বিদ্রোহ করেছিল।
24. নীল চাষিদের উপর নীলকর সাহেবরা কীভাবে অত্যাচার করত?
উত্তর দেখো
উত্তর: নীলকর সাহেবরা কৃষকদের উর্বর জমিতে জোর করে নীল বুনতে বাধ্য করত। কৃষকরা রাজি না হলে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, গবাদি পশু কেড়ে নেওয়া হতো এবং নীলকুঠিতে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।
25. ব্রিটিশ আমলে কৃষকদের মহাজনদের উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছিল কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ আমলে ভূমিরাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি এবং তা নগদে শোধ করতে হতো। খরা বা বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও রাজস্ব মকুব করা হতো না। তাই নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব মেটাতে কৃষকরা চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতো।
26. ভাইয়াচারি বন্দোবস্ত (Bhaiyachari Settlement) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: পাঞ্জাব অঞ্চলে ব্রিটিশরা যে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, তা ভাইয়াচারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় গ্রামের সমস্ত কৃষক বা ভাইয়াদের (যৌথ সম্প্রদায়ের) সাথে সরকার একত্রে রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করত।
27. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট নতুন জমিদার শ্রেণি কেন ব্রিটিশদের অনুগত ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: নতুন জমিদাররা ব্রিটিশদের আইনের দৌলতেই জমির স্থায়ী মালিকানা এবং বিপুল আর্থিক সুবিধা লাভ করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন টিকে থাকলেই তাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে, তাই তারা ব্রিটিশদের চরম অনুগত ছিল।
28. পাটের বাণিজ্যিকীকরণের ফলে বাংলার কৃষকদের কী অবস্থা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: নগদ লাভের আশায় বাংলার কৃষকরা খাদ্যশস্যের বদলে ব্যাপকভাবে পাট চাষ শুরু করে। কিন্তু পাটের বাজারদর পুরোপুরি ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকায়, দাম কমে গেলে কৃষকরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ত এবং খাদ্যাভাবে ভুগত।
29. ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা (Telegraph system) প্রবর্তনের পেছনে ব্রিটিশদের কী উদ্দেশ্য ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত সরকারি খবর আদানপ্রদান করা, বিশেষ করে যেকোনো বিদ্রোহ বা অশান্তির খবর দ্রুত সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল টেলিগ্রাফ প্রবর্তনের মূল সামরিক ও প্রশাসনিক উদ্দেশ্য।
30. ‘সম্পদের নির্গমন’ সম্পর্কে কোন কোন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ প্রথম সোচ্চার হন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ শোষণের ভয়াবহতা এবং সম্পদের নির্গমন নিয়ে প্রথম যাঁরা কলম ধরেন এবং জোরালো প্রতিবাদ করেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন দাদাভাই নওরোজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে এবং রমেশচন্দ্র দত্ত।
16. ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ (Guarantee System) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভারতে রেলপথ নির্মাণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ইংল্যান্ডের বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের বিনিয়োগ করা মূলধনের ওপর সরকার নির্দিষ্ট হারে (বার্ষিক 5 শতাংশ) সুদ দেওয়ার যে নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিয়েছিল, তাকেই ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ বলা হয়।
17. রেলপথ নির্মাণের ফলে ভারতীয়দের কী সুবিধা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থে রেলপথ বানালেও, পরোক্ষভাবে ভারতীয়দের যাতায়াতের ব্যাপক সুবিধা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীকালে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে সাহায্য করেছিল।
18. ‘অবাধ বাণিজ্য নীতি’ (Free Trade Policy) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর দেখো
উত্তর: 1813 খ্রিস্টাব্দের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ভারতের বাজার সমস্ত ব্রিটিশ বণিকদের জন্য বিনা শুল্কে বা অতি সামান্য শুল্কে খুলে দেওয়া হয়। এটিই অবাধ বাণিজ্য নীতি নামে পরিচিত, যা ভারতের দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছিল।
19. ব্রিটিশ আমলে বাংলার তাঁতশিল্পের ধ্বংসের দুটি কারণ লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: (1) ইংল্যান্ডের কারখানায় যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি সস্তা সুতির কাপড়ের সাথে বাংলার তাঁতিরা পাল্লা দিতে পারেনি। (2) ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক শুল্ক নীতির ফলে ভারতীয় কাপড় ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
20. অবশিল্পায়নের ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: অবশিল্পায়নের ফলে লক্ষ লক্ষ তাঁতি ও কারিগর কর্মহীন হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়, যার ফলে কৃষিজমির ওপর প্রচণ্ড চাপ বাড়ে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
21. ‘সম্পদের নির্গমন’-এর ফলে ভারতের কী ক্ষতি হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ভারতের বিপুল সম্পদ কোনো প্রতিদান ছাড়াই ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার ফলে ভারতে চরম মূলধনের ঘাটতি দেখা দেয়। দেশে নতুন কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি, উল্টে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও ঘন ঘন দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল।
22. ব্রিটিশরা কেন ভারতে চা ও কফি বাগিচা শিল্পে বিনিয়োগ করেছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বাজারে চা ও কফির প্রবল চাহিদা ছিল। ভারতের মাটি ও জলবায়ু এই চাষের পক্ষে উপযুক্ত হওয়ায়, সস্তায় দেশীয় শ্রমিক খাটিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশরা বাগিচা শিল্পে বিনিয়োগ করেছিল।
23. ‘নীল বিদ্রোহ’ (Indigo Rebellion) কেন হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা লাভজনক নীল চাষের জন্য কৃষকদের জোর করে দাদন বা অগ্রিম টাকা দিত এবং চরম অত্যাচার চালাত। এই অমানবিক শোষণ ও অলাভজনক নীল চাষের হাত থেকে বাঁচতেই 1859-60 খ্রিস্টাব্দে বাংলার কৃষকরা নীল বিদ্রোহ করেছিল।
24. নীল চাষিদের উপর নীলকর সাহেবরা কীভাবে অত্যাচার করত?
উত্তর দেখো
উত্তর: নীলকর সাহেবরা কৃষকদের উর্বর জমিতে জোর করে নীল বুনতে বাধ্য করত। কৃষকরা রাজি না হলে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, গবাদি পশু কেড়ে নেওয়া হতো এবং নীলকুঠিতে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।
25. ব্রিটিশ আমলে কৃষকদের মহাজনদের উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছিল কেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ আমলে ভূমিরাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত বেশি এবং তা নগদে শোধ করতে হতো। খরা বা বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও রাজস্ব মকুব করা হতো না। তাই নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব মেটাতে কৃষকরা চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতো।
26. ভাইয়াচারি বন্দোবস্ত (Bhaiyachari Settlement) কী?
উত্তর দেখো
উত্তর: পাঞ্জাব অঞ্চলে ব্রিটিশরা যে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, তা ভাইয়াচারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় গ্রামের সমস্ত কৃষক বা ভাইয়াদের (যৌথ সম্প্রদায়ের) সাথে সরকার একত্রে রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ করত।
27. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট নতুন জমিদার শ্রেণি কেন ব্রিটিশদের অনুগত ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: নতুন জমিদাররা ব্রিটিশদের আইনের দৌলতেই জমির স্থায়ী মালিকানা এবং বিপুল আর্থিক সুবিধা লাভ করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন টিকে থাকলেই তাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে, তাই তারা ব্রিটিশদের চরম অনুগত ছিল।
28. পাটের বাণিজ্যিকীকরণের ফলে বাংলার কৃষকদের কী অবস্থা হয়েছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: নগদ লাভের আশায় বাংলার কৃষকরা খাদ্যশস্যের বদলে ব্যাপকভাবে পাট চাষ শুরু করে। কিন্তু পাটের বাজারদর পুরোপুরি ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকায়, দাম কমে গেলে কৃষকরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ত এবং খাদ্যাভাবে ভুগত।
29. ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা (Telegraph system) প্রবর্তনের পেছনে ব্রিটিশদের কী উদ্দেশ্য ছিল?
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত সরকারি খবর আদানপ্রদান করা, বিশেষ করে যেকোনো বিদ্রোহ বা অশান্তির খবর দ্রুত সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল টেলিগ্রাফ প্রবর্তনের মূল সামরিক ও প্রশাসনিক উদ্দেশ্য।
30. ‘সম্পদের নির্গমন’ সম্পর্কে কোন কোন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ প্রথম সোচ্চার হন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ব্রিটিশ শোষণের ভয়াবহতা এবং সম্পদের নির্গমন নিয়ে প্রথম যাঁরা কলম ধরেন এবং জোরালো প্রতিবাদ করেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন দাদাভাই নওরোজি, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে এবং রমেশচন্দ্র দত্ত।