অষ্টম শ্রেণী: ইতিহাস, অধ্যায় – 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর মান 3

অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র
(বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 3) – পর্ব 1

নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও:

1. ওয়ারেন হেস্টিংস প্রবর্তিত ‘ইজারাদারি ব্যবস্থা’ বা পাঁচশালা বন্দোবস্তের প্রধান ত্রুটিগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
1772 খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত ইজারাদারি ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটিগুলি হলো:

  • অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ: ইজারাদাররা নিলামে জমি পেত বলে তারা বেশি রাজস্বের প্রতিশ্রুতি দিত। সেই টাকা তুলতে তারা কৃষকদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালাত।
  • কৃষির অবনতি: 5 বছরের জন্য জমির মালিকানা পাওয়ায় ইজারাদাররা জমির বা কৃষির উন্নতির কোনো চেষ্টা করত না, তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু মুনাফা।
  • কোম্পানির ক্ষতি: অনেক ইজারাদার নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হতো, ফলে কোম্পানির আয়ের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

2. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (1793) প্রধান শর্ত বা বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ছিল?

উত্তর দেখো
লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান শর্তগুলি ছিল:

  • স্থায়ী মালিকানা: জমিদারদের জমির স্থায়ী ও বংশানুক্রমিক মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জমিদার চাইলে তার জমি বিক্রি বা দান করতে পারত।
  • নির্দিষ্ট রাজস্ব: জমিদারদের ব্রিটিশ কোম্পানিকে প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। খরা বা বন্যায় এই রাজস্বের কোনো পরিবর্তন হতো না।
  • সূর্যাস্ত আইন: বছরের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে জমিদারকে তার প্রদেয় রাজস্ব কোষাগারে জমা দিতে হতো, না হলে তার জমিদারি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো।

3. রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে কৃষকদের অবস্থার কেন কোনো উন্নতি হয়নি?

উত্তর দেখো
দক্ষিণ ভারতে প্রবর্তিত রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে জমিদার না থাকলেও কৃষকদের (রায়তদের) অবস্থার উন্নতি হয়নি, কারণ:

  • অতিরিক্ত রাজস্ব: এই ব্যবস্থায় রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত চড়া (উৎপাদনের প্রায় 45% থেকে 55%)। খরা বা বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও রাজস্ব মকুব করা হতো না।
  • নগদে রাজস্ব প্রদান: রাজস্ব নগদে মেটাতে হতো বলে কৃষকদের মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতো এবং তারা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত।
  • জমির অধিকার হারানো: নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব বা ঋণ শোধ করতে না পারলে কৃষকদের জমি কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে সরকার নিজেই এক নির্মম জমিদারে পরিণত হয়েছিল।

4. মহলওয়ারি বন্দোবস্তের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর দেখো
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে চালু হওয়া মহলওয়ারি বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • রাজস্বের একক: এই ব্যবস্থায় কোনো একজন ব্যক্তি বা জমিদারের বদলে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি ‘মহল’ বা এস্টেটকে রাজস্ব আদায়ের একক ধরা হতো।
  • যৌথ দায়িত্ব: রাজস্ব জমা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ঐ মহলের সমস্ত কৃষকের যৌথ। তবে গ্রামের প্রধান বা মোড়ল এই রাজস্ব সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দিত।
  • রাজস্বের হার সংশোধন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো এখানে রাজস্ব চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট ছিল না। 20 বা 30 বছর অন্তর রাজস্বের হার সংশোধন বা বৃদ্ধি করার অধিকার সরকারের ছিল।

5. ব্রিটিশ আমলে কৃষির বাণিজ্যকরণ (Commercialization of Agriculture) বলতে কী বোঝায়? এর কারণ কী ছিল?

উত্তর দেখো
অর্থ: কৃষকরা নিজেদের খাদ্যের প্রয়োজনে শস্য উৎপাদন না করে, যখন দেশ-বিদেশের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অর্থকরী ফসল (নীল, পাট, তুলো, চা) চাষ করতে বাধ্য হয়, তাকে কৃষির বাণিজ্যকরণ বলা হয়।

কারণ:

  • ব্রিটিশ সরকারের চড়া ভূমিরাজস্ব নগদে মেটানোর জন্য কৃষকদের হাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন ছিল।
  • ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটিশ কারখানাগুলির জন্য প্রচুর পরিমাণে কাঁচামালের (যেমন- তুলো, পাট, নীল) প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।

6. ‘দাদন প্রথা’ কী? নীল চাষিরা কেন নীল চাষ করতে চাইত না?

উত্তর দেখো
দাদন প্রথা: নীল চাষ করার জন্য ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা কৃষকদের অত্যন্ত সামান্য কিছু টাকা অগ্রিম দিত, একেই ‘দাদন’ বলা হতো। একবার দাদন নিলে কৃষকদের পুরুষানুক্রমে নীল চাষ করতে হতো।

নীল চাষে অনীহা:

  • নীলকররা কৃষকদের সবচেয়ে উর্বর জমিতে খাদ্যশস্যের বদলে জোর করে নীল চাষ করতে বাধ্য করত।
  • নীল চাষ করলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যেত।
  • নীলের দাম অত্যন্ত কম দেওয়া হতো, ফলে কৃষকরা সারাবছর খেটেও দাদনের টাকা শোধ করতে পারত না এবং খাদ্যাভাবে ভুগত।

7. দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা (Deccan Riots, 1875) কেন সংঘটিত হয়েছিল?

উত্তর দেখো
1875 খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের পুনে ও আহমেদনগর জেলায় কৃষকরা মহাজনদের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ করেছিল, তার কারণগুলি হলো:

  • তুলোর দাম হ্রাস: আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ভারতীয় তুলোর দাম বাড়লেও, যুদ্ধ থামার পর তুলোর দাম ভয়ানকভাবে কমে যায়। ফলে কৃষকরা চরম লোকসানের মুখে পড়ে।
  • মহাজনদের শোষণ: ব্রিটিশদের চড়া রাজস্ব মেটাতে কৃষকরা গুজরাটি ও মাড়োয়ারি মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতো।
  • জমি দখল: ঋণ শোধ করতে না পারায় মহাজনরা প্রতারণার মাধ্যমে কৃষকদের জমি, গবাদি পশু এবং ঘরবাড়ি দখল করে নিচ্ছিল, যার ফলেই এই বিদ্রোহের সূত্রপাত।

8. ভারতে ‘অবশিল্পায়ন’ (Deindustrialization)-এর প্রধান কারণগুলি কী কী ছিল?

উত্তর দেখো
ব্রিটিশ আমলে ভারতের দেশীয় হস্ত ও কুটিরশিল্প ধ্বংস হওয়ার (অবশিল্পায়ন) কারণগুলি হলো:

  • অসম শুল্ক নীতি: ভারতীয় পণ্য ইংল্যান্ডে রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা অত্যন্ত চড়া শুল্ক চাপায়, অন্যদিকে বিনা শুল্কে ব্রিটিশ পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করে।
  • যন্ত্রের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা: ইংল্যান্ডের কারখানায় যন্ত্রের সাহায্যে দ্রুত ও সস্তায় তৈরি কাপড়ের সাথে ভারতের তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়ের দামের বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়।
  • কাঁচামাল পাচার: ব্রিটিশরা ভারতের উন্নত মানের কাঁচামাল (তুলো, রেশম) সস্তায় ইংল্যান্ডে পাচার করে দিত, ফলে দেশীয় কারিগররা কাঁচামালের অভাবে ভুগত।

9. ব্রিটিশ সরকার কেন ভারতে রেলপথ নির্মাণ করেছিল? এর দুটি উদ্দেশ্য লেখো।

উত্তর দেখো
ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের যাতায়াতের সুবিধার জন্য নয়, বরং নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থেই ভারতে রেলপথ নির্মাণ করেছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল:

  • অর্থনৈতিক শোষণ: ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম ও খনি অঞ্চল থেকে সস্তায় কাঁচামাল (তুলো, কয়লা, লোহা) বন্দরগুলিতে পৌঁছে দেওয়া এবং ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি পণ্য ভারতের বাজারগুলিতে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া।
  • সামরিক ও প্রশাসনিক: বিশাল ভারতবর্ষের যেকোনো প্রান্তে বিদ্রোহ বা অশান্তি দেখা দিলে দ্রুত সেখানে সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা।

10. ‘সম্পদের নির্গমন’ (Drain of Wealth) বলতে কী বোঝায়? এর দুটি ভয়াবহ প্রভাব উল্লেখ করো।

উত্তর দেখো
সম্পদের নির্গমন: পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা ভারতের বিপুল পরিমাণ অর্থ, মূল্যবান রত্ন এবং কাঁচামাল কোনো রকম বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিদান ছাড়াই ব্রিটেনে পাচার করতে থাকে। একেই ঐতিহাসিকরা ‘সম্পদের নির্গমন’ বলেছেন।

ভয়াবহ প্রভাব:

  • মূলধনের অভাব: দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বেরিয়ে যাওয়ায় ভারতে তীব্র মূলধনের ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে নতুন কোনো দেশীয় শিল্প গড়ে উঠতে পারেনি।
  • তীব্র দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ: কৃষকদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি পায় এবং দেশে চরম দারিদ্র্য ও ঘন ঘন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।

11. ভারতে রেলপথ নির্মাণের ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে কী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল?

উত্তর দেখো
ব্রিটিশদের তৈরি রেলপথ ভারতের অর্থনীতির পক্ষে বেশ ক্ষতিকারক প্রমাণিত হয়েছিল:

  • কাঁচামাল পাচার: রেলপথের মাধ্যমে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম ও খনি অঞ্চল থেকে অত্যন্ত সস্তায় কাঁচামাল (তুলো, লোহা, কয়লা) বন্দরে নিয়ে গিয়ে ইংল্যান্ডে পাচার করা সহজ হয়।
  • দেশীয় শিল্পের বিনাশ: ইংল্যান্ডের কারখানায় তৈরি সস্তা পণ্যগুলি ট্রেনের মাধ্যমে খুব দ্রুত ভারতের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যায়, যার ফলে দেশীয় হস্ত ও কুটিরশিল্প অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
  • সম্পদের নির্গমন বৃদ্ধি: রেলপথ নির্মাণের সমস্ত সরঞ্জাম (লোহা, ইঞ্জিন) ইংল্যান্ড থেকে চড়া দামে কেনা হতো এবং ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের চড়া সুদ দেওয়া হতো, যা সম্পদের নির্গমনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

12. ঔপনিবেশিক ভারতে চা বাগিচা শিল্পের বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল?

উত্তর দেখো
ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে চায়ের প্রবল চাহিদা থাকায় ব্রিটিশরা ভারতে চা চাষে উদ্যোগী হয়:

  • কোম্পানি গঠন: 1839 খ্রিস্টাব্দে আসামে প্রথম ‘অসম চা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, দক্ষিণ ভারত ও হিমাচল প্রদেশেও চা বাগান গড়ে ওঠে।
  • বিনিয়োগ: এই শিল্পে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা একচেটিয়া বিনিয়োগ করে এবং ভারত সরকার তাদের বিনাশুল্কে জমি দিয়ে সাহায্য করে।
  • শ্রমিক শোষণ: চা বাগানে কাজ করার জন্য বিহার, ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশ থেকে সস্তায় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক (কুলি) আনা হতো। তাদের নামমাত্র মজুরি দিয়ে ক্রীতদাসের মতো অমানবিক পরিশ্রম করানো হতো।

13. ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা (Telegraph) প্রবর্তনের পেছনে ব্রিটিশদের কী উদ্দেশ্য ছিল?

উত্তর দেখো
1851 খ্রিস্টাব্দে ভারতে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল:

  • প্রশাসনিক সুবিধা: বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত সরকারি নির্দেশিকা ও গোপন তথ্য আদানপ্রদান করা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা।
  • সামরিক উদ্দেশ্য: দেশের যেকোনো প্রান্তে বিদ্রোহ বা অশান্তি দেখা দিলে, তার খবর দ্রুত সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দিয়ে তা কঠোর হাতে দমন করা (1857 সালের মহাবিদ্রোহ দমনে এটি বড় ভূমিকা নিয়েছিল)।
  • বাণিজ্যিক স্বার্থ: বিশ্বের বাজারের কাঁচামালের দাম ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খবর দ্রুত আদানপ্রদান করে ব্রিটিশ বণিকদের সুবিধা করে দেওয়া।

14. ব্রিটিশ আমলে ভারতে কৃষকদের চরম দারিদ্র্য ও ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর দেখো
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় কৃষকদের চরম দুর্দশার মূল কারণগুলি হলো:

  • চড়া ভূমিরাজস্ব: জমিদার বা সরকার কৃষকদের ওপর অত্যন্ত চড়া হারে রাজস্ব চাপিয়েছিল। খরা বা বন্যায় ফসল নষ্ট হলেও রাজস্ব মকুব করা হতো না।
  • মহাজনি শোষণ: নির্দিষ্ট সময়ে নগদে রাজস্ব মেটানোর জন্য কৃষকদের দেশীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হতো, যা তারা আর শোধ করতে পারত না।
  • কৃষির বাণিজ্যকরণ: কৃষকদের জোর করে নীল, পাট বা তুলোর মতো ফসল চাষ করানো হতো, যার দাম নির্ধারণ করত কোম্পানি। ফলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পেত না এবং খাদ্যাভাবে ভুগত।

15. মহলওয়ারি ও রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর দেখো
  • অঞ্চল: মহলওয়ারি বন্দোবস্ত উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে চালু হয়। অন্যদিকে রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে (মাদ্রাজ ও বোম্বাই) প্রবর্তিত হয়।
  • রাজস্বের একক: মহলওয়ারি ব্যবস্থায় রাজস্বের একক ছিল কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত একটি ‘মহল’ বা এস্টেট। কিন্তু রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় রাজস্বের একক ছিল একজন নির্দিষ্ট কৃষক বা ‘রায়ত’।
  • চুক্তির প্রকৃতি: মহলওয়ারি ব্যবস্থায় সমগ্র গ্রামের সাথে যৌথভাবে চুক্তি করা হতো এবং গ্রামের মোড়ল রাজস্ব জমা দিত। রায়তওয়ারি ব্যবস্থায় সরকার সরাসরি প্রতিটি কৃষকের সাথে আলাদা চুক্তি করত।

16. ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ (Guarantee System) কীভাবে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের ভারতে রেলপথ নির্মাণে উৎসাহিত করেছিল?

উত্তর দেখো
রেলপথ নির্মাণের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল, যা ব্রিটিশ সরকার একা বহন করতে চায়নি। তাই তারা ইংল্যান্ডের বেসরকারি পুঁজিপতিদের ভারতে রেলপথ নির্মাণে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানায় এবং ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ চালু করে:

  • বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলিকে তাদের মূলধনের ওপর বার্ষিক 5% সুদ দেওয়ার ‘গ্যারান্টি’ বা নিশ্চয়তা ব্রিটিশ সরকার দিয়েছিল।
  • রেলপথ নির্মাণে ক্ষতি হলেও সরকার সেই ক্ষতিপূরণ দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং 99 বছরের জন্য তাদের বিনামূল্যে জমি প্রদান করে। এর ফলেই ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা নিশ্চিন্তে ভারতে বিনিয়োগ করেছিল।

17. নীল বিদ্রোহে (1859-60) বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা কেমন ছিল?

উত্তর দেখো
নীল বিদ্রোহ ছিল এমন একটি কৃষক বিদ্রোহ, যেখানে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ সক্রিয়ভাবে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল:

  • পত্রিকার ভূমিকা: হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা নীলকরদের নির্মম অত্যাচারের খবর এবং কৃষকদের দুর্দশার কথা ধারাবাহিকভাবে ছাপিয়ে জনমত গঠন করে।
  • সাহিত্য রচনা: দীনবন্ধু মিত্র তাঁর যুগান্তকারী ‘নীল দর্পণ’ নাটকের মাধ্যমে নীলকরদের শোষণের বাস্তব চিত্র সকলের সামনে তুলে ধরেন (যা পরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করেন)।
  • আইনি সাহায্য: শিক্ষিত সমাজ ও আইনজীবীরা নীলকরদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ ও সাহায্য করেছিলেন।

18. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘অবাধ বাণিজ্য নীতি’ (Free Trade Policy) কীভাবে ভারতের তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করেছিল?

উত্তর দেখো
1813 খ্রিস্টাব্দের পর ব্রিটিশরা যে ‘অবাধ বাণিজ্য নীতি’ প্রয়োগ করে, তা একতরফাভাবে ভারতের তাঁতশিল্পের বিনাশ ঘটায়:

  • অসম শুল্ক: ভারতের তৈরি সুতির কাপড় ইংল্যান্ডে বিক্রির ক্ষেত্রে অত্যন্ত চড়া আমদানি শুল্ক (প্রায় 70% থেকে 80%) চাপানো হয়। ফলে ইংল্যান্ডের বাজারে ভারতীয় কাপড়ের দাম প্রচুর বেড়ে যায় এবং বিক্রি কমে যায়।
  • সস্তা ব্রিটিশ পণ্য: অন্যদিকে ইংল্যান্ডের কারখানায় যন্ত্রে তৈরি কাপড় নামমাত্র শুল্কে ভারতে অবাধে প্রবেশ করতে শুরু করে। হাতে বোনা ভারতীয় কাপড় যন্ত্রের তৈরি সস্তা কাপড়ের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধ্বংসের মুখে পড়ে।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
শেয়ার